নিশিতার জন্য আরো চমক আসে!...কথায় কথায় জানতে পারে, ছেলেটা তাদের এলাকাতেই থাকে!...এক্টু পেছনেই!...নিশিতা আবারো ঘটনার কাকতাল নিয়ে ভাবনায় বুঁদ হয়। ... কি নাটকীয়ভাবে ঘটছে সবকিছু!...সেই পরিচয় হওয়া থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত কত গল্প-উপন্যাসের মত ব্যাপার হলো!...নিশিতার রুটিন বদলায়। রাত জাগার পরিমাণ বাড়ে। পড়ার টেবিলের সাথে যোগাযোগ বাড়ে। না বাড়িয়ে তার উপায় কি!...মাস খানেক পরই ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা, এখন তো পড়াশোনা করতে হবেই। তাই রাত জাগা, পড়ার বই নিয়ে বসা। কিন্তু সেটা কেবল ছুতো, পড়াশোনায় তার মন বসেনা, বই সামনে খোলা থাকে ঠিকই, কিন্তু এক লাইনও পড়া হয়না। চলতে থাকে অদেখা বন্ধু’র সাথে সংক্ষিপ্ত বার্তার আদান-প্রদান।
নাহিয়ান এর কথা মনে হতে থাকে নিশিতার। নাহিয়ানের প্রতি তার অনুভূতিটার নাম কি?...ভালোবাসা না মোহ???......অনুভূতিটাকে মোহ বলতেই আরামবোধ করে নিশিতা, কিন্তু মনে মনে ভাবে, হয়তো ভালোবাসাই বলতে পারলে খুশি হতো!...দুই বছর হয়ে গেলো নাহিয়ানকে চেনে নিশিতা। কোনোদিন ছেলেটার সাথে কথা হয়নি। স্মৃতির ঘরে নাড়া পড়ে নিশিতার মনে। সে ফিরে যায় এস.এস.সি পরীক্ষার আগের সেই সময়টায় যখন বাংলা মডেল টেস্ট দিতে গিয়ে প্রথম দিন দেখেছিল নাহিয়ানকে। ও আর সাদিয়া যেই টেবিলে বসেছিল, ওখানেই এসে বসেছিল দুইটা ছেলে। ওরা দু’জন যতটা চুপচাপ পরীক্ষা দিচ্ছিল, ঐ ছেলে দু’টো ততটাই বেশি কথা বলছিল। ছেলেটার নাম নাহিয়ান, পরে জেনেছিল নিশিতা। ওরা যেই ব্যাচ এ পরীক্ষা দিতো, নাহিয়ান ঐ ব্যাচ এই ছিল। ব্যাপারগুলো কিছুই ছিলোনা। ছেলেটা সম্পর্কে নিশিতা কিছু ভাবতোও না, তার মনোযোগের জায়গাতেও কোনোভাবেই ‘নাহিয়ান’ ছিলো না। আর দশটা ছেলে-মেয়ের মতই একজন সে ছিল, কিংবা কেউই ছিলোনা।
কিন্তু একদিন কি জানি কি হলো। এক রাতে নিশিতা স্বপ্ন দেখলো একটা ছেলের সাথে তার রাস্তায় চলার পথে দেখা হয়েছে, আর প্রথম দেখাতেই পরস্পরের মধ্যে একটা রোমান্টিক যোগাযোগ ঘটেছে। নিশিতা অবাক হলো, বিস্মিত হলো...। স্বপ্নে যে ছেলেটাকে দেখেছে সে নাহিয়ান!!...নিশিতা মনে মনে সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা খুঁজলো, পেলোনা। মন কিছুই বোঝাতে পারলোনা। নিশিতা’র ভাবনা কেন্দ্রীভূত হলো স্বপ্ন আর নাহিয়ানে। এই স্বপ্নই বা কেন দেখলো, আর সেখানে নাহিয়ানই বা কেন?...স্বপ্ন নাকি অবচেতনার ভাবনার বহিঃপ্রকাশ, তাহলে নাহিয়ান এই অবচেতনায় কেন?...তাকে নিয়ে সচেতনভাবে তো নিশিতার কোনো ভাবনা হয়নি কখনো??...তবে কি অবচেতনে কোথাও এই ভাবনার জন্ম হয়েছে, যা সে এই ক’দিন টের পায়নি?......
অতীত মুহুর্তগুলো সামনে আসতে থাকে নিশিতার...। আজকে পর্যন্ত হয়তো ভাবণাগূল এভাবে আশোট না, ‘নাহিয়ান’ নামটা হয়তো নিশিতা’র মনে এভাবে অঙ্কিত হতো না, যদি স্বপ্ন দেখার পালা এক রাতেই শেষ হয়ে যেতো। তাহলে হয়তো ভেবে নিতো এইটাও স্রেফ একটা ঘটনা, যেমনটা ঘটেছিল ক্লাস নাইন এ থাকার সময়টায়। স্কুলের এক মেয়ের মামা সবসময় তাকে আর তার ছোট বোনকে স্কুল শেষে বাসায় নিয়ে যেত। প্রতিদিন দেখা চেহারাগুলোর একজন ছাড়া সেই ছেলেটা আর কিছুই ছিলোনা। তাকেই একদিন ফট্ করে স্বপ্নে দেখে নিশিতা। তাও সেই স্বপ্নে আবার সেই ছেলের সাথে তার প্রেম ছিলো। এরকম স্বপ্ন আগে কাউকে নিয়ে দেখেনি সে, বাস্তবের কেউ তো নয়ই। বেশ প্রভাবিত হয়েছিলো পুরো ব্যাপারটায়। সেই বয়সে স্বপ্নটা তাকে অনেক বেশি নাড়া দিয়েছিলো। প্রশ্নের উত্তর খোঁজার বয়স হয়তো সেটা ছিলোনা। তাই তার মনে এই প্রশ্নগুলো ভাবনা হয়ে আসেনি যে সে কেন একটা মানুষকে এভাবে স্বপ্নে দেখলো যার সম্পর্কে সচেতনভাবে তার কোনো প্রকার অনুভূতিই নেই। কেবল চেনা একটা মুখের কেন এরকম ওরিয়েন্টেশন সেটাও ভাববার জন্য বয়সটা হয়তো অনেক কাঁচা ছিলো। বেশ কিছুদিন তাই নিশিতা মোহগ্রস্ত ছিলো ছেলেটাকে নিয়ে। বেশ নিয়মিত তাকে নিয়ে ডায়রিতে লিখতো, চুপিচুপি তাকে দেখতো যখন সে তার ভাগ্নীদের নিতে আসতো...ওদের বাসার ঠিকানাও কৌশলে বের করেছিলো নিশিতা। সেই বাসার সামনে দিয়ে যখন দিলীপ স্যারের বাসায় পড়তে যেত, আড়চোখে ঠিকই সেই বাসার গেট পেরিয়ে একবার নজর দিয়েই যেত।
নাহিয়ানকে আজ সে স্বপ্ন দেখেছে সেই মোহ কাটার বছর দুই পর। এখন সে যথেষ্ট ম্যাচিউরড, অন্তত সেই সময়টা থেকে। তাই নিশিতা স্বপ্নটা নিয়ে ভাবলেও, সেখানে নাহিয়ানকে কেন দেখলো সেটা নিয়ে খুব আলোড়িত হয়ে ভাবেনা।যেমনটা সেই ছেলের ক্ষেত্রে হয়েছিল। নিশিতা এবার আপন মনে হেসে ভেবে নেয়, ‘এটা আসলে একটা ফ্যাক্ট, আর কিছু নয়।‘
কিন্তু, ব্যাপারটা ঠিক ‘জাস্ট আ ফ্যাক্ট’ থাকেনা। একটা গন্ডগোল হয়ে যায়.........
নাহিয়ানকে নিয়ে পরের রাতেই আবারো একটা স্বপ্ন দেখে ফেলে নিশিতা............
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




