আমার একটা বন্ধুপ্রতিম বড় আপু ছিলো। ঝিনু আপু। অনেকদিনের পরিচয়। পথ চলতে গিয়ে খুব যে তার সাথে পায়ে পায়ে সমান্তরাল হওয়া হতো তা নয়। কিন্তু দূর থেকেও আত্মিক একটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। ছবি আঁকার স্কুলে দেখা হতো, মাঝে মাঝে কথা হতো। ঝিনু আপু, কলি আপু আর আমি, তিনজনের অনেক স্মৃতি জমে আছে সেই ছবি আঁকতে যাওয়ার দিনগুলোতে।
সম্পর্কটা অনেক জমে গিয়েছিলো, যার সূত্র ধরে আর্ট স্কুল ছেড়ে যাবার পরও ভালো সম্পর্কটা ছিলো...একসাথে ঘুরতে যাওয়া, এর বাসায়, তার বাসায়, কিংবা এমনিই ইচ্ছেমতোন যেখানে সেখানে...ধানমন্ডি পাঁচ নাম্বারের মাথায় ফুচকার দোকানে স্পেশাল টক নিয়ে গবেষণা, নিউমার্কেটে রঙ এর দোকান- রঙ-তুলি-ক্যানভাস, গাউসিয়ার প্রচন্ড ভীড়ে ঘুরতে ঘুরতে বৈশাখের শাড়ি কেনা, পুরান ঢাকা-শাঁখারিবাজার-তাঁতিবাজার-ছবি তোলা-ছবি আঁকা...অনেক স্মৃতি...আড্ডা-গল্প-কথা......ছুটির দিনে কাজ ফেলে ঘুরতে চলে যাওয়া আশুলিয়া, কিংবা কলি আপুর ঘর রঙ করতে গিয়ে রাত জেগে হই-হুল্লোড়...কলি আপুর বিয়ের আয়োজনে পাত্রীর বান্ধবী হয়ে সাথে থাকা, সব কাজ করা......
সব স্মৃতিগুলো আজকে একসাথে এসে ভীড় করছে মনের কোণে...চলতে ফিরতে প্রায়ই তো মনে পড়ে ঘটনাগুলো, আজ তবু সব একজোট হয়ে কড়া নাড়ছে মনের দরজায়...আমার সাথে তার কত ঝগড়া, কত মনোমালিন্য হতো!...আমি কথায় কথায় রেগে যেতাম, আর ও হাসতে হাসতে ভেঙ্গে পড়তো, 'এত্ত রাগ!...ক্ষেপিস কেন?...মজা করতেসি তো!...তোর সাথে মজা করবো না তো কার সাথে করবো??...' তারপরও আবার ঝগড়া হতো......তাও কি সামান্য সব বিষয়ে! রাগ পড়ে গেলে হাসতাম......সেও মাঝে মাঝে রাগ করে ফেলতো, আবার হেসেও ফেলতো......
হঠাৎই সব কেমন যেন হয়ে গেলো। ওর অ্যাপেন্ডিসাইটিস এর অপারেশন হলো। সেই অপারেশন করতে গিয়ে ওভারিতে টিউমার ধরা পড়লো। ওভারি ফেলে দেয়া হলো, কিন্তু ততদিনে টিউমার অনেক ক্ষতি করে ফেলেছে। ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে শরীরে। এমনিতেই অপুষ্ট শরীর, তার মধ্যে ক্যান্সার, দ্রুত শরীর দূর্বল হয়ে যেতে লাগলো। বাড়ি থেকে বের হতোনা, মাঝে মাঝে ক্লিনিকে যেতো, কেমোথেরাপি দেয়া হতো...এভাবেই চলছিলো......
আজ খবর পেলাম, আপু মারা গেছে। শুনেই মনটা কেমন জানি হয়ে গেলো। ভাবছি, কেন এমন হয়! কতই বা হয়েছিলো মেয়েটার বয়স?...২৪-২৫......এই বয়সেই তাকে চলে যেতে হবে???......সুস্থ না হয়ে যাচ্ছিলো ! শেষ যখন দেখা হলো, তখনও তো বেশ সবল দেখেছি ওকে!...এক-দেড় মাস আগেই.........সেই মানুষটা কেন এভাবে চলে যাবে??...ওর সাথে ফোন থাকতো না, যোগাযোগ করতে পারতাম না। ও নিজেই মাঝে মাঝে ফোন দিতো। ওর নাম্বারে মাঝে অনেকবার ফোন দিয়েছিলাম। পাইনি। আর কোনো নাম্বারও জানা ছিলো না । ওর ফোনের অপেক্ষায় থাকতাম। কোনোদিন হয়তো ফোন দিয়ে বলবে, 'প্রজ্ঞা, কেমন আছো?...আমি ভালো হয়ে গেছি...'
আর বলবে না। ভালো হয়ে গেছে, জানি। মৃত্যুর পর কি আর এসব রোগ-শোক থাকে নাকি! কিন্তু কিছু না জানিয়ে এভাবে চলে যাবে তাই বলে!...ভালো হবার এত তাড়া ছিলো তার!...হয়তো বাতাসে মিশে আছে এখন সে, অথবা অনেক দূরে আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে কোনো এক জায়গায় বসে দেখছে সবাইকে......
বাতাসে হয়তো উড়ে যাবে ওর নাম......সবার অলক্ষ্যে......
ঝিনু আপু, তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো...আর মনে রেখো, তোমাকে মন পড়বে......অনেক জায়গায়...অনেক ভাবে......সব স্মৃতিদের সঙ্গী করে নিয়ে.........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



