অনেক দিন পর আজকে সারা দুপুর-সন্ধ্যা শহরে হেঁটে বেড়ালাম; এক সময় অভ্যাস ছিল। দুই হাজার চার, পাঁচ., ছয়...। অপ্রকৃতস্থের মতো কখনো, কখনো কৌতুহলী পরিব্রাজকের মতো অথবা কখনো শৌখিন মেজাজে এ শহর কত হেঁটে গ্যাছি। সড়কগুলো তখন আমাকে বন্ধু বলে ডাকতো। আমি তাদের বন্ধু ছিলাম। পথে নামলেই ওরা আনন্দে ঝলমল করে উঠতো। মধ্য রাতে, কিম্বা ঠিক মধ্য দুপুরে পথে নামলেতো কথাই ছিলনা- গনগনে কালো পিচের উষ্ণ অভ্যর্থনা, কিম্বা শিশির স্নাত নৈঃশব্দিক বোধন নিয়মিতই জুটতো আমার। সারা দিনের বিষন্নতার পর সন্ধ্যার কিছু আগে স্ট্রিট লাইগুলো যখন তন্বী বালিকার মতো হেসে উঠতো তখন আমি মুহূর্তের জন্য চঞ্চল প্রেমিক হয়ে যেতাম। আর তখন শহরময় আমার তস্বী প্রেমিকারা আমাকে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে রাখতো; আমার প্রেমিক হৃদয় ক্লান্তিকর ভ্রমণ শেষে এভাবে মিশে যেতো প্রনয়িনীর দীঘল খোঁপাপুঞ্জে।
বাদশার চা'য়ের স্টলে কিম্বা পার্টি অফিসে মার্কস-লেনিন-শিব দাশেরা আমার নিভাঁজ প্রেমিক হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিত। আমি তখন রীতিমতো বিপ্লবের মন্ত্রে উজ্জীবিত চে। শ্রেনী সংগ্রাম, যৌথ খামার, ডিসক্লাস, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো, দ্বন্দ্বমুলক বস্তুবাদ আর আমার প্রেমিকারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতো; ফলে কিছুদিন বেনসনের বদলে নেভীর কড়া ধোঁয়ায় কেশেটেশে তৃষ্ণা মেটাতাম। আবার কোন কোন দিন আবৃত্তি সঙ্ঘের সঙ সেজে বাংলা কবিতার সঙ্গত দিতাম।
ফ্রেব্রুয়ারি-২১: এখানে তো বোনাস ভাউচারের খেলা নেই, কিংবা নেই মায়া ...
ডিসেম্বর-১৬: তোমাকে অভিবাদন বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছো ...
মার্চ-২৬: ... আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো সেই তেজী তরুন ...
রুদ্র, তোমার দারুণ দিপ্তী এসেছে দুয়ার ভেদিয়া বলে পহেলা বৈশাখও বাদ যেতো না।
আমার প্রেমিকাদের চোখের সামনেই কখনো কখনো রাত-বালিকারা আমাকে ভালোবাসতে চাইতো; তাদের পান খাওয়া ঠোঁটের রক্তিমতায় আমি কয়েকটি মরা মাছির ওড়াওড়ির প্রমাণ পেতাম। সংলগ্ন স্ট্রিট লাইটটা আমাকে টেনে নিয়ে যেতো সেই নর্দমা থেকে। আমি সড়কে ফিরে আলিঙ্গন করতাম পৌরসভার সামনের সব চেয়ে সুডৌল সোডিয়াম আলোটিকে.... প্রাচীন প্রথার মতো চাঁদ থেকে থরে থরে ঝরতে থাকতো নিস্পৃহ আলো। আর আমাদের পায়ে লুটিয়ে পড়েই হয়ে উঠতো সতেজ শিউলী। আমার প্রেমিক হৃদয় সড়কেই ফুলেল শয্যা পেতে নিত ...
সেই শহরে আজ আমি অচেনা। সেই চেনা পথগুলো বেশ অচেনা হয়ে গেল গত কয়েক বছরে। আমাকে চিনলোনা, ঝলমল করে উঠলোনা সড়কগুলো। পার্টি অফিসের চেয়ারগুলোর মতো মার্কস-লেনিনের ছবিগুলোতে জমেছে ধূলোর মলিন আস্তরন। এমনকি অত্যন্ত দুঃখজনক ভাবে আমার সান্ধ্যাকালিন প্রেমিকারাও আমাকে চিনলো না; কেমন বিষাদগ্রস্থের মতো শুধু জ্বলে রইল। আমি কেবল তাদের বিষন্ন আলোর ভেতর দিয়ে হেঁটে চলে আসলাম অস্পষ্ট অভিমানে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


