------------------------------------------------------
কর্মকার। ক্ষুদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর একটি অংশ। কামার নামেই তারা বেশি সমাদৃত। তাদের ওজনদার হাতুড়ির ঠক ঠক শব্দ যেন প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যের দুয়ারে কড়া নাড়ে। আর হাপরের দীর্ঘশ্বাসের সাথে লেপ্টে আছে তাদের জীবন। ভয়ানক দারিদ্র্যের মধ্যে কাটছে নোয়াখালীর সোন্দলপুরের কালামুন্সি বাজারের কামারদের দিনকাল। লৌহজগতে কঠিন তাদের পথচলা।
দশঘরা কামার বাড়ি: কালামুন্সি বাজারে চারটি কামারশালা। বাজারের পাশেই কামারদের বাড়ি। একই বাড়িতে থাকে সবাই। বাড়িতে সব মিলে ১০টা ঘর। ১০০ জনের মত মানুষ। এটাই সোন্দলপুরের একমাত্র কামার বাড়ি। প্রিয়লাল কর্মকার জানালেন, তারা ব্যতিরেকে পার্শ্ববর্তী ঘোষবাগ, অশ্বদিয়া, নেওয়াজপুর ইউনিয়নেও আর কোন কামার নেই। ৩/৪টি ইউনিয়নে তারাই একমাত্র কামার। এক সময় আরো কামার ছিল কিšদ এখন সকলেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। কামার বাড়ির পরিবেশের অবস্থা খুবই নাজুক। বাড়িতে কোন স্যানেটারী পায়খানা নেই। একটি মাত্র টিউবওয়েল থাকলেও সেটির অবস্থা খুবই করুণ। তাছাড়া টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক আছে কি নেই তাও তারা জানে না। বাড়ির এক গৃহিনী বলেন, আমাদের নুন ভাত দুটোর টান। আর্সেনিক পরীক্ষা করবো কখন, আর কি দিয়া করবো?
মৌসুমে দশ হাজার টাকার হাল বেইচতাম: কামাররা কাজ করে সারা বছর। আগের বিক্রির বিশেষ মৌসুম থাকলেও এখন বেচাকেনার আলাদা কোন মৌসুম নেই। আগে সাধারণত বছরে দু’বার বেশি বেচাকেনা হতো। সুভাষ কর্মকার বলেন, আগে চাষের সময় এক মৌসুমে ১০ হাজার টাকার লাঙলের হাল (ফাল) বেইচতাম। এখন বিদেশ থেকে কলের লাঙল এসেছে। কেউ গরুর হাল ব্যবহার করে না। আমাদেরও আর বিক্রি হয় না।
ঠুক ঠুক হাতুড়ি সারা বছর চলে: মনিন্ড কর্মকার (৪০) জানালেন, কামারদের হাতুড়ি সারা বছর চলে। বছরের সব সময় কম বেশি বিক্রি হয়। তবে বর্তমানে ধান আসলে বেশি বেচাকেনা হয়। সকলেই ধান কাটার জন্যে কাঁচি কিনে। এছাড়া বাকী সময়ে বিক্রি-বাট্টা কম থাকে। বিশেষত বর্ষার সময়ে একদম হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়। তখন সংসার চালাতে হয় সুদের টাকা দিয়ে।
ঋণের রশি মাজায় বাধা: প্রিয়লাল কর্মকার (৩২) বলেন, আমরা সারাদিন খাটলেও মজুরি পাই খুব কম। তাছাড়া এখন লোহা, কয়লার দামও বেড়েছে। অন্যদিকে কলের জিনিসপত্র, স্টিলের জিনিসপত্রের কারণে আমাদের পণ্যের চাহিদাও কম। তবু মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করলেও মানুষ জিনিসের যথাযথ দাম দেয় না। প্রিয়লাল আরো জানালেন, যখন মৌসুম থাকে না তখন মহাজনী ঋণ তাদের গ্রহণ করতে হয়। গোটা বছর টানতে হয় সুদের বোঝা। একদিকে সুদ, অন্যদিকে সংসার। কামারদের হৃদপিন্ড যেন দমে দমে থেমে যায়। মনিন্ড কর্মকার জানালেন, তিনি সব মিলিয়ে এ নাগাদ ২০,০০০ টাকা ঋণ গ্রহণ করেছেন।
জীবন কাটে যুদ্ধ করে: মনিন্ড কর্মকার। বয়স ৪০। আজ প্রায় ৩০ বছর ধরে কামারের কাজ করেন। ৩ মেয়ে। ১ ছেলে। ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করছেন ঠিকই তবে তাদের যোগান দিতে গিয়ে মনিন্ডের বুকে মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া প্রসঙ্গে সুভাষ কর্মকার বলেন, আমাদের আবার লেখাপড়া, কালামুন্সি স্কুলের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে তিনি বলেন, এ স্কুল হওয়ার সময় মায়ের জন্যে পান না কিনে চাঁদা দিয়েছি। অথচ আজ স্কুলের বেতনের জন্যে আমার ছেলেমেয়েদের পড়াতে পারছি না। আবার স্কুলে গেলেও বেতনাদির জন্যে হাজারো কথা শুনতে হয়।
হাপরের ঘন ঘন হয়ত থাকবে না: এক সময় প্রত্যেক গ্রামে কিংবা দু’তিন গ্রাম মিলিয়ে একজন কামার পাওয়া গেলেও এখন যায়না। প্রিয়লাল কর্মকার বলেন, সোন্দলপুর ইউনিয়নে প্রায় ৪০/৪৫ হাজার মানুষ অথচ কামার মাত্র ৩/৪ জন। আগামী ৫ বছর পর দেখবেন আমরাও নেই। তিনি আরো বলেন, আমাদের কাজটি খুব পরিশ্রমের। লোহার উপর হাতুড়ি পেটাতে পেটাতে আমাদের ঘাম তপ্ত লোহার উপর পড়ে। লোহা সে ঘাম টেনে নেয়। তারপর একটা জিনিস হয়। এত পরিশ্রম করা স্বত্ত্বেও আমরা সঠিক দাম পাইনা। তাই পরবর্তীতে কেউ আর এ পেশায় আসবে না। সুভাষ কর্মকার বলেব, ‘আঙগো হোলাহাইন দরকার অইলে চা দোয়ানে চাকরি কইরবো। ত আর কামারগিরি কইর ত ন। এ ক্ষোভের পেছনে তিনি বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেন। যেমন- পুঁজির অভাব, কাজের অভাব, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদিত দ্রব্যের দাম কম, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, হাটে জায়গা না পাওয়া প্রভৃতি।
বাপ ওস্তাদ, ছেলে সারগেদ: কর্মকারদের সাথে আলাপে জানা যায়, তারা সকলেই প্রায় ১২/১৩ বছর থেকে কাজের সাথে জড়িত। মনিন্ড কর্মকার বলেন, আমার বয়স যখন ১৫ বছর তখন থেকেই আমি কাজ শুরু করি। আমার বাবাই আমাকে কাজ শিখিয়েছে। সুভাষ কর্মকার বলেন, দেশে প্রত্যেক কাজে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের দেশে এ কাজের কোন প্রশিক্ষণ নেই। আমরা সকলেই আমাদের বাবা কিংবা ভাইয়ের কাছ থেকে কাজ শিখেছি। কাজ শেখা বা শিখানো প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, আমরা বাবা ভাইয়ের থেকে কাজ শিখলেও আমাদের ছেলেদের তা শেখাব না। আগুনের তাপ আর হাতুড়ির ওজনের সাথে বুক যেন ছিঁড়ে যায়। কিšদ দাম পাই না। তাহলে আমরা কাজ শেখাব কোন সাধে?
কামারের জায়গা নেই: প্রত্যেক হাটে বাজারে ক্ষুদ্র পেশাজীবিদের জন্যে আলাদা জায়গা বা ভিটে থাকলেও কামারদের জন্যে কোন জায়গা নেই। সুভাষ কর্মকার বলেন, আমরা হাটের দিন বিভিন্ন হাটে গেলে দেখা যায়, আমাদের বসার জায়গা দিতে চায় না। প্রত্যেক দোকানীর জন্যে আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট জায়গা থাকলেও আমাদের তা নেই। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুভাষ বলেন, অনেক কষ্ট করে কোন হাটে যদি একটু জায়গা করে নেই পরের হাটে আমাদের সেখানে বসতে দেয় না। যারা বাজারের দায়িত্বে থাকে তাদের খুব তোষামোদ করতে হয়। নিজেকে তখন খুব নীচ মনে হয়। প্রিয়লাল আক্ষেপের সুরে জানায়, কামারদের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা না থাকলেও তাদের হাটে খাজনা অন্যদের চেয়ে বেশি দিতে হয়।
ভাত খরচ যা লাগে ওষুধ খরচ ম্যালা লাগে: আমরা কি মাইনসের জগতে থাকিনি, আমরা থাই লোয়ার জগতে। সুভাষ কর্মকার বলেন, আমাদের দেশের মানুষের সামান্য গরম সহ্য হয় না। অথচ আমরা সারাদিন উনুনের সাথে বসে থাকি। ওজনদার হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিতে দিতে হাতে ফোস্কা পড়ে, খত হয়ে যায়। হাতুড়ির ঠক ঠক শব্দে এখন কানে কম শুনি। এভাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন যাপন। এত পরিশ্রমের কারণে প্রায় কামারই অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে ওষুধ খেয়ে আবার শরীর ঠিক করতে হয়। এ প্রসঙ্গে প্রিয়লাল বলেন, যা আয় করি তাতে ভাত খরচ যা লাগে, ওষুধ খরচ আরো বেশি লাগে। আমরা তো মানুষ, মানুষ কি সুস্থভাবে লোহার সাথে বাস করতে পারে?
হিরা করা ম্যালা ভালা: কামারদের সাথে আলাপকালে তারা জানায়, আগে অনেকে কাজ শেখার কারণে বর্তমানেও এ পেশায় টিকে আছে। যদি অন্য কোন কাজের সুযোগ থাকত তাহলে তারা প্রায় সকলে এ কাজ ছেড়ে দিত। তাদের অনেকে এ কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য কাজও করছে বলে জানান। এর মধ্যে কেউ কেউ স্বর্ণকার, কেউ ব্যবসা, কেউ ছোটখাট চাকুরী করছে। সুভাষ কর্মকার বলেন, ‘হিরা করা ম্যালা ভালা। ত এ কাম আর ভালা লাগে না’। যদি সরকার ইচ্ছে করে তাহলে হয়ত এ পেশাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে বলে তারা জানান।
জ্ঞাতিতে জ্ঞাতিতে বিয়ে হয়: কামাররা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। হিন্দু ধর্ম মতই তাদের আচার অনুষ্ঠান পালিত হয়। বিয়ের ক্ষেত্রে কামারদের সাথে কামারদের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। প্রিয়লাল কর্মকার বলেন, এ নিয়ম অবশ্য বর্তমানে কিছু ভাঙছে। কামারদের ভেতরে কেউ কেউ লেখাপড়া করার কারণে বর্তমানে অন্য বর্ণের সাথে কামারদের বিয়ে হচ্ছে। তার এক সময়ে কামাররা নিচু বলে অন্য জ্ঞাতির তাদের সাথে সম্পর্ক করত না। বিয়ের সময় হিন্দুদের মতই যৌতুক পন এসব দিতে হয় বলেও তিনি জানান।
ভোটের সময় ভাই ভাই: মজুুরি বৈষম্যহীন ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে ক্ষুদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্যে বিশেষ ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকলেও আমাদের দেশে এসব সুবিধা নেই। তবু সরকারি যে সকল সুযোগ-সুবিধা জনগণের জন্যে রয়েছে কামাররা তাও পায়না। সুভাষ কর্মকার বলেন, আমরা স্বাধীন দেশের মানুষ। দেশ স্বাধীন হবার পর অনেকে ভারতে চলে গেলেও আমরা যাইনি। দেশকে ভালবেসে আজও অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছি। অথচ সরকারি কোন সুযোগ সুবিধাই আমরা পাই না। সরকার যায় সরকার আসে, অথচ আমাদের পরিবর্তন হয় না। ভোটের সময় আমাদের ভাই ভাই বললেও ভোটের পর আমরা এক মুঠো কিংবা সাহায্য পাই না। মনে হয় আমরা যেন দেশের বাহিরের কেউ। দেশে অনেক এনজিও কাজ করলেও কামারদের নিয়ে কেউ কাজ করছে না বলে তিনি জানান।
আঁঙ্গো কি কে অ নাই: দা, ছুরি, বোটা, কোদাল বানানোই কামারদের কাজ। মাঝে মাঝে দেখা যায়, পুলিশ কামারদের দোকান তল্লাশী করে। সামান্য ছোরা পেলেও কামারদের জুলুম করে, ধরেও নিয়ে যায় অনেক সময়। এ প্রসঙ্গে সুভাষ কর্মকার বলেন, মানুষ সাধারণ ব্লেড দিয়েও খুন করতে পারে। দা ছোরা লাগেনা। অথচ আমরা যদি ছোট্ট একটা ছুরিও বানাই প্রশাসন আমাদের অত্যাচার করে। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, আঙ্গো কি কে-উ নাই। এজন্যে তিনি তার দরিদ্র অবস্থাকে দায়ী করেন। তার ধারণা কামাররা ক্ষুদ্র ও হত দরিদ্র বলে সকলে তাদের উপর জুলুম করে।
সমাজের চোখ: দেশের অন্যত্র কামারদের নীচু বলে সামাজিকভাবে দেখলেও এখানাকার কামারদের সেভাবে দেখে না বলে তারা জানান। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, তাদের নিবাসের আশেপাশে সবই হিন্দু পাড়া ছিল। কয়েক পুরুষের বসবাস এখানে তাদের। সকলে এখান থেকে চলে গেলেও তারা যায়নি। স্থানীয় এবং দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে সকলের সাথে তাদের সামাজিক গ্রন্থি বেশ শক্ত।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম: কামারদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ব্যাপারে তারা বেশ চিন্তিত। কোন কামারই চাচ্ছে না তার সন্তান এ পেশায় আসুক। এ প্রসঙ্গে মনিন্ড কর্মকার বলেন, খাই কিংবা না খাই আমার ছেলেকে আমি পড়ালেখা শেখাব। বড় ছেলে ৮ম শ্রেণীতে পড়ে। প্রয়োজনে সবকিছু খুইয়েও তাকে পড়াব। বর্তমানে কামারদের যে নাজুক অবস্থা তাতে করে কোন কামার তার ছেলেকে এ পেশায় আনতে চায় না। ছেলে প্রয়োজনে লেখাপড়া না করলে অন্য কাজ করবে তবুও কামার হবে না। সুভাষ কর্মকার বলেন, ‘আমরা যে ভুল করেছি আমাদের ছেলেদের সে ভুল করতে দেব না।’
যা করা যেতে পারে: কামারদের সাথে আলাপকালে দেখা যায়, বিভিন্ন সমস্যার কারণে অনেক কামারই এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। এভাবে পেশা বদলের ফলে এক সময় কামাররা হারিয়ে যাবে। আমাদের ঐতিহ্যের একটি অঙ্গ কামার। তাদেরকে স্ব পেশায় টিকিয়ে রাখার জন্যে সরকারিভাবে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ভাতার বরাদ্দ যেতে পারে। তাতে পরবর্তীতে অন্যদের কাজ শেখার আগ্রহ বাড়বে। কাজ শেখার জন্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে। কামারদের ব্যবহৃত কাঁচামাল কম মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে তাদের সাথে আলাপ করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে এবং কামারদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের পণ্য বিপননের ব্যবস্থার মাধ্যমেই এ ক্ষুদ্র জাতিসত্তাটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




