নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার-বহির্ভূত রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড বন্ধ করা ও ইতোপূর্বে সংঘটিত হত্যাকান্ডের অর্থবহ তদন্ত করার প্রতিশ্রুতি পদদলিত করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট-সরকার অনুরূপ খুন-খারাবি অব্যাহত রেখেছে। ২০০৯-এর জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭১টি বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডের নেতৃত্ব দিয়েছে লীগ সরকার। শুধু তাই নয়, এই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে সমাজের নানান গণতন্ত্রমনস্ক সংগঠন ও ব্যক্তির সোচ্চার প্রতিবাদের মুখে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা এই হত্যাকান্ডের পক্ষে ন্যায্যতা যোগানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। দেশে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী সাহারা খাতুন গত রবিবার ফতোয়া দিয়েছেন, অভিযুক্ত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার প্রক্রিয়ায় গুলি করে হত্যা করা জায়েজ। এই মন্ত্রীর পদত্যাগী সহকর্মী, যিনি তার অধীনে সরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, একবার প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে, মানবধিকার কর্মীরা যাকে বিচার-বহির্ভূত, ফলে অবৈধ, হত্যাকান্ড বলছেন, তার কোন বিকল্প নেই। কারণ, পুলিশ বা তার র্যাহপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন নাকি ‘আত্মরক্ষার্থে’ অভিযুক্ত সন্ত্রাসীদের গুলি করে হত্যা করে চলেছে। একই গল্প আমরা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে শুনেছি, শুনেছি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। কিন্তু রাজনীতিমনস্ক ও গণতন্ত্রপরায়ণ নাগরিকরা এইসব গাঁজাখুরি গল্প আমলে নেয়নি কখনই, নিচ্ছে না এখনও। কারণ, এটা আজ এক সতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত যে, ২০০৮ সাল থেকে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডের এ যাবৱ শিকার প্রায় এক হাজার অভিযুক্ত ‘সন্ত্রাসী’র অধিকাংশই মৃত্যুর সময় সশস্ত্র ছিল না। তাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। খুন করার পর প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ ও র্যা ব প্রথমে ‘ক্রসফায়ার’ ও সম্প্রতি ‘এনকাউন্টারে’ মৃত্যুর এক একঘেয়ে গল্প ফেঁদেছে।
এদিকে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীবর্গ যখন এই বিচার-বহির্ভূত সরকারী খুন-খারাবিকে ন্যায্যতা দানে উদগ্রীব, তখন আউর রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সম্প্রতি দাবি করেছেন, দেশে ‘বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডের কোন ঘটরা নজরে আসেনি’ তাঁর। এটা কি শ্রেফ ক্ষীণ দৃষ্টি, না অন্ধত্ব-শারীরিক, না রাজনৈতিক? দেশের জন্যে একজন চক্ষু্ষ্মান, ঋজু আইন মন্ত্রী বড় বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, রাষ্ট্রের এমনকি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে সংগঠিত রাষ্ট্রেরও, হত্যা করার অধিকার আছে। রাষ্ট্র গঠনের ধারণার ভেতরে যেমন, গঠিত রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের মধ্যেও তেমনি, কোন নাগরিককে হত্যা করার এই রাষ্ট্রীয় অধিকারের পেছনে সক্রিয় রাজনৈতিক-দার্শনিক লক্ষ্য ও রাষ্ট্রের দিক থেকে সেই অধিকার ভোগ করার রীতি-নীতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সকলের ধারণাটা পরিস্কার থাকা চাই।
কোন জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র হিসেবে সংগঠিত হওয়ার পেছনে কতগুলো সাধারণ আশা-আকাঙ্খা সক্রিয় থাকে, বাঙালির যেমন ছিল আইনের শাসনের আওতায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক ধর্ম-নিরপেক্ষ জাতীয়তাদের বিকাশ, অর্থনীতির স্বাধীন উত্থান ও জাতীয় সম্পদের সুষম বন্টন, ইত্যাদি। আমাদের জনগণের এইসব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আকাঙ্খার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। জনগণের সামষ্টিক স্বার্থের আর এক অপরিহার্য উপাদান হল তার নিরাপত্তা-জীবন, সম্পদ ও মানবীয় মর্যাদার নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা আক্রান্ত হতে পারে দুদিক থেকেই-দেশের বাইরে থেকে যেমন, দেশের ভেতর থেকেও। দেশের বাইরে থেকে আগত নিরাপত্তা হুমকি অন্তত প্রাথমিকভাবে মোকাবেলা করার জন্য রাষ্ট্র গড়ে তোলে তার স্থায়ী সেনাবাহিনী, জনগণের নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনার অধীনে থেকে দেশের অতন্ত্র প্রহরী হিসেবে নিজেকে নিরন্তর নিয়োজিত রাখাই যার প্রধান পেশাগত কর্তব্য। অন্যদিকে, কোন নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মানবীয় মর্যাদার নিরাপত্তা যদি দেশের ভেতর থেকে আক্রান্ত হয়, তা প্রতিরোধ করার জন্যে গড়ে তোলা হয় নানান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ব্যক্তি নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষা করাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তব্য-নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা হরন করা তার কাজ নয়।
কোন উচ্ছৃঙ্খল নাগরিক যদি অন্যান্য নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়, তাঁকে দমন করার, এমনটি সমষ্টির নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে আবির্ভূত সেই ব্যক্তি নাগরিকের জীবন হরণ করার অধিকারও রাষ্ট্রকে দেয়া হয় অনেক দেশে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেও সে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের সংবিধান রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগকে, অর্থাৎ সরকার ও তার নানান আই-শৃঙ্খলা বাহিনীকে, সেই ক্ষমতা দেয়নি-দেয়া হয়েছে বিচার বিভাগকে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এটাই নিয়ম। কেননা, গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কোন রাষ্ট্র তার নাগরিকের জীবন সকচেয়ে মূল্যবান মনে করে-সে সন্ত্রাসী নাগরিকটি আসলেই সন্ত্রাসীর হলেও। অভিযুক্ত সন্ত্রাসী নাগরিকটি আসলেই সন্ত্রাসী কি-না তা ‘সন্দেহাতীতভাবে’ প্রতিষ্ঠার পূর্বে সে নাগরিকের জীবন হরণ করা কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যে নাজায়েজ। এটাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক বিধান, আইনের নির্দেশ।
এহেন বিধানের পেছনে ক্রিয়াশীল রয়েছে জীবনের প্রতি সংবেদনশীল একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবিক প্রত্যয় ভুলবশত দশজন অপরাধী মুক্তি পাক, কিন্তু ভুলবশত একজন নিরপরাধীরও যাতে কোন ধরনের শাস্তি না হয়-মৃত্যু তো দূরের কথা।
এই মানবিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সম্মান করার ভেতর দিয়েই কেবল গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে সংগঠিত জনগণ নিজেকে একজন স্বেচ্ছাচারী সন্ত্রাসীর চেয়ে উন্নততর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পরে। একজন স্বেচ্ছাচারী সন্ত্রাসী মানুষ হত্যা করে নিজের সংকীর্ন স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করার জন্যে, আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসীকে’ হত্যা করে নাগরিকদের সামষ্টিক স্বার্থ সমুন্নত রাখার প্রয়োজনে। মানুষ হত্যা করার পেছনে সন্ত্রাসীর বেলায় সক্রিয় থাকে তার স্বার্থান্ধ স্বেচ্ছাচার, আর সন্ত্রাসীর প্রাণ হরনের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বেলায় সক্রিয় থাকে জনগণের সামষ্টিক কল্যাণ-বোধ। নাগরিকের জীবনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে অতএব স্বেচ্ছাচারী হলে চলে না, কারোর প্রাণ হরণের পূর্বে তাকে নিশ্চিত হতে হয় অভিযুক্ত মানুষটি সত্যিই অপরাধী কি-না, আর সেটা নির্ধারণের জায়গা হল আইনসঙ্গত আদালত-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দফতর, কিংবা র্যাপব-পুলিশের হেড-কোয়ার্টার্স নয়।
তবে এইসব বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ড কেবলমাত্র সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করার উদ্দেশ্য পরিচালিত হচ্ছে –এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ নেই। রাষ্ট্রের কিছু কিছু হত্যাকান্ডের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন নয়। সামাজিকভাবে পরিচিত উচ্ছৃঙ্খল সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি অন্য যারা রাষ্ট্রের এই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার নেতা-কর্মী –মূল ধারার মিডিয়া যাদের চরমপন্থী বামধারা হিসেবে চিত্রিত করেছে। আমরা যদি মনে রাখি যে, ‘মৌলবাদী জঙ্গি’ হিসেবি পরিচিত লাভ করেছে এমন চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক ধারার একজন সশস্ত্র নেতা-কর্মীও এ পর্যন্ত কথিত ‘ক্রসফায়ার’ কিংবা ‘এনকাউন্টারের’ শিকার হয়নি, তাহলে বিভিন্ন সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের একটা ভাষাদর্শিক কর্মসূচিও চোখে পড়তে বাধ্য। দেশের উত্তরাঞ্চলে ত্রাস-সৃষ্টিকারী জঙ্গি সন্ত্রাসী তথাকথিত ‘বাংলাভাই’ কিংবা সারাদেশে যুগপৎ বোমা-বিস্ফোরণকারী জামাতুল মজাহিদীন, বাংলাদেশ নামের চরম ডানপন্থী নেতা শায়খ আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার করে আইন-আদালতের হাতে সোপর্দ করার একই রাষ্ট্র বামপন্থী রাজনীতির নেতা-কর্মী মোফাখ্খার চৌধুরী কিংবা ডা. টুটুলকে তাদের ‘অবৈধ’ রাজনৈতিক তৎপরতার জন্যে ‘ক্রসফায়ার’ নাটকের আশ্রয় নিয়ে বিনা-বিচারে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করে না। বাম রাজনৈতিক ধারার প্রতি মর্মের দিক থেকেই বিরূপ বিদ্যমান রাষ্ট্রযন্ত্রটির এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অবশ্য নতুন নয়, ১৯৭৫ সালের জানুয়ারী মাসে খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা ও বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা সিরাজ শিকদারকে বন্ধী অবস্থায় হ্ত্যা করার সময় তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ একই ধরনের গল্পের অবতারণা করেছিল। এই প্রবণতা অবশ্য বাংলাদেশের জন্য কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়, প্রতিবেশী ভারতেও অনুরূপ বামপন্থী রাজনৈতিক ধারার নেতা-কর্মীরা বহুকাল যাবৎ পুলিশী এনকাউন্টারের শিকার হয়ে চলেছেন, হচ্ছেন এখনও। এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রপঞ্চটি একটি যথার্থ রাজনৈতিক গবেষণার বিষয়বস্ত হতে পারে, যেটাকে বোঝা প্রয়োজন ‘নিও লিবারেল ইকোনোমির’ আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে।
লেখক: নূরুল কবীর
সূত্র: সাপ্তাহিক বুধবার(সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ) -২য় সংখ্যা;৯ সেপ্টেম্বর ২০০৯
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


