ছোটবেলায় যখন পূর্ণিমার রাত হত,আমি অবাক হয়ে আমার ঘরের জানালা দিয়ে সেই চাঁদ দেখতাম।তখন আমার নানীর কাছে গল্প শুনতাম পরীদের।এই পূর্ণিমার রাতে নাকি অসংখ্য পরী তাদের রথে ( পরীদের দেশের প্লেন টাইপের কিছু হবে হয়ত,যাকে রথ বলে) করে পৃথিবী ঘুরতে বের হয়।তাদের রথটা খুব সুন্দর রং বেরং এর আলো দিয়ে সাজানো থাকে,রথের ভেতরে পূর্ণিমার আলোয় সারা রাত ধরে চলে পরীদের নাচ গান।পৃথিবী তখন থাকে ঘুমে অচেতন।তো আমি নানীকে বলতাম,আমি কেন পরীদের দেখতে পাইনা ( আমার আবার পরী দেখার অনেক শখ এখনো,কিন্তু আজও দেখলাম না....
যখন কিছুটা বড় হলাম তখন বুঝলাম যে এই গুলো সব কল্পনায় বানানো গল্প,কিন্তু পূর্ণিমার চাঁদের প্রতি মোহটা গেল না।এই রাতে মাঝেমাঝে ছাদে চলে যেতাম।দেখতাম পৃথিবীটাকে কি অদ্ভুত লাগছে জ্যোৎসনার আলোয়।বেশী দূর চোখ যেত না কারণ ঢাকা শহরের উঁচু বিল্ডিং এর জ্বালায় চোখ আটকে যেত সীমার মধ্যে,আর দিনের আলোয় যে বিল্ডিং দেখতাম রাতের পূর্ণিমার আলোতেও সেই একই উঁচু উঁচু ইট পাথরের বাড়ি ঘর দেখতে বেশীক্ষণ ভাল লাগত না।এই রাতে গাড়িতে করে লং ড্রাইভে যেতে বেশী ভাল লাগে,শহর থেকে কিছু দূরে কোলাহল মুক্ত গ্রামের পরিবেশে পূর্ণিমা দেখার আনন্দই অন্যরকম।একবার দাদার বাড়ি থেকে ঢাকায় ফেরার পথে দেখেছিলাম পূর্ণিমা,অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য ছিল সেটা।আজও চোখে লেগে আছে।চারিদিকে শুধু মাঠ আর মাঠ,ক্ষেত,কিছু কিছু ছোট ঘর আর তারা ভরা আকাশে মস্ত বড় একটা পূর্ণিমার চাঁদ।সেই চাঁদের জ্যোৎসনার আলোতে চারিদিক মোহনীয় হয়ে ছিল।রাতের আঁধারেও সব কিছু কি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।কি অসম্ভব সুন্দর এই পৃথিবী।গাড়ি দিয়ে আসছিলাম আর তখনও মনে মনে পরীদের খুঁজছিলাম,যদি দেখতে পাই....
এখনও যখন দেখি আকাশে পূর্ণিমা, শত কাজের মাঝেও আমার চোখ যাবেই সেই চাঁদের দিকে।একটু পর পর জানালা দিয়ে চাঁদটাকে দেখেনি।না হয় বারান্দায় বসে জ্যোৎসনার আলোটা উপভোগ করি কিছুক্ষণ।আমার রুমের বারান্দাটা বেশ বড়,ঐখান থেকে আকাশটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়।আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে তারার আর পূর্ণিমার অসম্ভব নৈসর্গিক সৌন্দর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করি।
মাঝেমাঝে মনে হয় আমার মত সবাই যদি পূর্ণিমার এই রাতটা উপভোগ করতে পারত।কিন্তু সবাই তা পারে না।এখন যারা না খেয়ে রাস্তার ধারে জীবন যাপন করছে তাদের কাছে এই সব কখনো ভাল লাগার কথা না।যারা এখন ক্ষুধার জ্বালায় মরছে তাদের কাছে এই পূর্ণিমার চাঁদটাকেও মনে হয় একটা ঝলসানো রুটি।সুকান্তের একটা কবিতায় পড়েছিলাম অনেক আগে....
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
পৃথিবীর সবাই যদি পেট ভরে দুবেলা খেয়ে ভাল ভাবে বাঁচতে পারত তাহলে সবার কাছেই পৃথিবীটা অসম্ভব সুন্দর হত।তখন সবাই এই পূর্ণিমা রাতের চাঁদের আলোর জ্যোৎসনা উপভোগ করতে পারত,ঠিক এখন যেমনটা আমি করছি।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মার্চ, ২০০৮ রাত ২:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


