ছুটির দিন গুলোতে দূরে কোথাও ঘুরে আসতে সবারই ভাল লাগে।আর ছুটিটা যদি হয় বেশ কিছুদিনের জন্য তাহলে কোন নতুন জায়গা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারলে মন্দ হয়না।একটা নতুন জায়গাকে দেখা,তার রীতিনীতি সংস্কৃতি সম্বন্ধে জানা এই বৈচিত্রময়তাটা বেশীর ভাগ মানুষেরই ভাল লাগার কথা।যেহেতু ঘুরতে আমাদের দারুন ভাল লাগে তাই যখনই কোন লম্বা ছুটি পাই আমরা কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাওয়ার চিন্তা করি।সেভাবেই এইবারের ছুটিতে আমরা গেছিলাম কানাডাতে ঘুরতে,উফফ সে এক দারুন স্মৃতি.....
২৭ শে মার্চ ২০০৮ আমরা কানাডার উদ্দেশ্যে রওনা দেই ওয়েষ্ট আফ্রিকা থেকে....আমার সেই প্রিয় Emirates এ করে....

সন্ধ্যা ৭:৩০ টায় ছিল আমাদের ফ্লাইট,প্লেনে বসে থাকতে থাকতে আমি মরেই যাচ্ছিলাম, এত্তো লম্বা সফর বাপরে বাপ.....

আফ্রিকা থেকে দুবাই প্রায় ১২ ঘন্টা..৩ ঘন্টা দুবাই এয়ারপোর্টে ঘোরাঘোরি তারপর দুবাই থেকে কানাডা প্রায় ১৪/১৫ ঘন্টার ধাক্কা।জান শেষ হয়ে গেছিল আমার,মনে হচ্ছিল একটা বক্সের
ভেতরে আমাকে অনন্তকাল ধরে বসিয়ে রাখা হয়েছে।বিরক্তিকর প্লেন জার্নী আমার কখনোই ভাল লাগে না....

প্লেনে বসে থেকে ঘুরতে যাওয়ার মজাটাই মাটি হয়ে যায়।যাইহোক এতক্ষণ প্লেনে বসে থেকে কোন মতে সুস্থ দেহে (মাথাব্যথা সহ...

) কানাডার টরন্টোতে পিয়ারসন এয়ারপোর্টে নামলাম।এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই অসম্ভব একটা ঠান্ডা বাতাস এসে আমার শরীরের ভেতরের হাঁড় শুদ্ধো কাঁপিয়ে দিল....

আমার গায়ের পাতলা সোয়েটারটা কোন কাজেই দিল না,বুঝলাম খবর আছে...

বাইরে বের হয়েই আমার হাজবেন্ডের কাজিনের সাথে দেখা হলো,আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল সে।ওর সাথে আমার আগে শুধুমাত্র ১/২ বার দেখা হয়েছিল।তাই যখন থেকে শুনেছিলাম কানাডাতে আমরা ওর বাসাতেই থাকবো তখন থেকেই আমি একটু সংকোচে ছিলাম।কিন্তু আমাদেরকে দেখা মাত্র সে এত আপন ভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরলো যে আমার সেই সংকোচটা একদমই রইলনা।পার্কিং থেকে গাড়ি নিয়ে ওর হাজবেন্ড আসলো,উনিও খুবই ভাল একজন মানুষ।তারপরে তারা আমাদের কে নিয়ে গেল তাদের বাসায়।সেখানে তাদের ছেলে মেয়ের সাথে দেখা হল,খুবই মিশুক ওরা।তারা সবাই আমাদের সাথে এমন ভাবে মিশে গেছিল যে মনেই হচ্ছিল না আগে মাত্র ১/২ বার দেখা হয়েছে।আমার প্রচন্ড মাথা ব্যথার করছিল তাই আমি বেশীক্ষণ বসে থাকতে পারিনি,ঔষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে গেছিলাম...

যখন ঘুম থেকে উঠি দেখি রাত হয়ে গেছে।অন্ধকার রুমের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ১৫ তলার উপর থেকে রাতের কানাডার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ব্যস্ত রাস্তাটা দেখে মনটা ভরে গেছিল।রাস্তার সোডিয়াম লাইটের রঙিন আলোর মাঝে ব্যস্ত গাড়িগুলোর দ্রুতবেগে ছুটে চলার দৃশ্য তখন অদ্ভুত ভাল লাগছিল আমার কাছে।খাওয়া দাওয়া করার জন্য টেবিলে যেয়ে দেখি সে এক বিরাট আয়োজন...

( আমরা যে কয়দিন কানাডাতে ছিলাম একেকদিন একেক আইটেম আমাদেরকে খাওয়ানো হতো---অসাধারণ রান্না ছিল,খুবই মজাদার।) খাওয়া শেষে তারা আমাকে বলে ,কালকে নায়াগ্রা ফল্স দেখাতে নিয়ে যাব,যেতে পারবেন তো নাকি মাথা ব্যথা থাকবে....

আমি বলি আমার এতকালের একটা স্বপ্ন নায়াগ্রা ফল্স দেখার (যদিও কোনদিন দেখব কল্পনা করিনি) আর যেতে পারব না মানে...
রাতে খুব ভাল একটা ঘুম দিয়ে সকালে উঠেই গোসল করে নাস্তা খেয়ে কিছুক্ষণ পরে চললাম নায়াগ্রা ফল্সের পথে।যাওয়ার পথে দেখলাম রাস্তার দুই ধারে,মাঠে অনেক অনেক বরফ জমে আছে।কিছু কিছু জায়গায় উঁচু হয়ে বরফের পাহাড় জমে আছে।তাপমাত্রা এত কম আর প্রচুর ঠান্ডা ছিল যে প্রচন্ড রোদেও সেগুলো গলছিল না।এইরকম ভাবে চারিদিকে বরফ জমে থাকা দেখার একটা প্রবল ইচ্ছা ছিল আমার সবসময়,এরকম বরফ দেখার জন্য আমার প্রায়ই সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার ইচ্ছা হয়...

,এইবার কানাডায় যেয়ে সেই ইচ্ছা অনেকটা হলেও পূরণ হয়েছে...

আর নায়াগ্রা দেখার তীব্র ইচ্ছাটা মনের কোণে বারে বারে উঁকি দিচ্ছিল,যে আরেকটু পরেই দেখব আমার সেই স্বপ্নের নায়াগ্রা ফল্স।ছোটবেলায় টিভিতে একবার দেখেছিলাম ইত্যাদি অনুষ্ঠানে হানিফ সংকেত নায়াগ্রা ফল্স দেখাতে কানাডায় নিয়ে গেছিল।তখন টিভিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই ফল্সটাকে দেখে মনে মনে ইচ্ছা হয়েছিল... ইশ যদি সত্যিকার ভাবে খুব কাছ থেকে এটাকে একদিন দেখতে পেতাম।আল্লাহ এতদিন পর আমার মনের সেই ইচ্ছা পূরণ করতে যাচ্ছে এইটা ভেবে নিজের কাছেই খুব খুশি লাগছিল...

পথটা যেন শেষই হচ্ছেনা একসময় এমন লাগা শুরু হলো।অবশেষে প্রতিক্ষার পালা শেষ করে নায়াগ্রা ফল্সে এসে পৌঁছালাম,সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমি যখন গাড়ি থেকে নামলাম তখন মনে হলো আমি বোধহয় এখানেই জমে বরফ হয়ে যাব,আর হাঁটতে পারবো না...

কি আর করা গায়ের উপরে ২/৩ টা সোয়েটার আর মোটা জ্যাকেট চাপিয়ে সোজা হাঁটা ধরলাম আমার স্বপ্নের জলপ্রপাতটিকে খুব কাছ থেকে দেখার জন্য।যত কাছে যাওয়া যায় গেলাম।অবাক হয়ে দেখলাম পাথরের পাহাড় দিয়ে কি অদ্ভুত রকমের গর্জন করে পানিগুলো পাহাড় থেকে হঠাৎ করে নীচে পড়ে যাচ্ছে তারপর আবার সজোরে ছুটে চলছে অন্যপথে...

পুরো জলপ্রপাতটা অর্ধগোলাকার,বিরামহীনভাবে চারিদিক দিয়ে প্রচন্ড গতিতে তীব্রবেগে সারাদিন রাত ২৪ ঘন্টা খালি পানি পড়েই যাচ্ছে।সূর্যের আলো আর পানির ঝাপটায় জলপ্রপাতটার উপরে সারাক্ষণ একটা রংধনু দেখা যাচ্ছিল....অদ্ভুত সুন্দর এই পৃথিবীটা আল্লাহ যে কত সব সৌন্দর্য দিয়ে তৈরি করেছেন সেটা নিজের চোখে না দেখলে বুঝা যায়না।আল্লাহর কাছে অশেষ ধন্যবাদ যে আমাকে পৃথিবীর এইসব সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য তিনি দিয়েছেন।নায়াগ্রার অপরপাশে আমেরিকার বাফেলো শহর দেখা যাচ্ছিল।বর্ডার ক্রস করে ঐপাশে বাফেলো শহরটা ঘুরে আসা যেত,কিন্তু এত ঠান্ডা ছিল যে সেই ইচ্ছাটা আমাদেরকে বাদ দিতে হয়েছিল...

দূর থেকেই আমেরিকার বাফেলো শহরের উঁচু উঁচু বিল্ডিং গুলো দেখে মনের কিছুটা সাধ মিটালাম আর কি...

প্রচুর ফটোসেশন আর ভিডিও করে আমরা বাসার দিকে পা বাড়ালাম।ফেরার পথে আমাদের দেহের তাপমাত্রা নরমাল করার জন্য আমাদেরকে গরম গরম টিম হরটনের (অন দ্যা রানের) কফি আর টিম বিটস খাওয়ানো হলো।কফিটা খেয়ে মনে হলো যাক প্রচন্ড ঠান্ডায় হারানো অনুভূতিটা আবার যেন ফিরে পেলাম...

নায়াগ্রা ফল্স দেখাটা আমার স্মৃতির মণিকোঠায় এক অমূল্য স্মৃতি হয়ে জ্বলজ্বল করবে বাকিটা জীবন।
কানাডাতে আমাদের বেশ কয়েকজন পুরোনো বন্ধুরা থাকে।প্রায় ৭/৮ বছর পরে তাদের সবার সাথে দেখা হলো।এত গুলো বছর পরে সবাইকে একসাথে পেয়ে ৭/৮ বছর আগের সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে চলে গেছিলাম সবাই,প্রচন্ড ভাল লাগছিল আমাদের।আসলে আমরা সবাই নিজের দেশ,আপনজন ফেলে বিদেশে এসে থেকে খুব একা হয়ে গেছি।তাই নিজের দেশের কাউকে দেখলে,কথা বললে খুব আপন মনে হয়।আর এতদিন পরে এত কাছের বন্ধুদের একসাথে পেয়ে সেই ভাল লাগা,সেই আবেগটা অনেক অনেক বেড়ে গেছিলো,যেটা আমি লিখে প্রকাশ করতে পারছি না...

আপনারা যারা নিজের আপনজনদের ছেড়ে দূরে আছেন তারা নিশ্চয়ই আমাদের সেই আবেগটা অনুভব করতে পারছেন....

তো কানাডায় সেইসব বন্ধুদের সাথে আমাদের প্রায় ১/২ দিন পর পরই দেখা হতো,দাওয়াত খাওয়া হতো...
একদিন একজন বন্ধুর বাসায় দাওয়াত ছিল,খাওয়া দাওয়া শেষ হলে সেই বন্ধু বলে চল তোদেরকে একটা দারুন জিনিষ দেখিয়ে আনি।আমরাও রাজী হয়ে গেলাম...দারুন দারুন জিনিষ দেখার জন্যই তো কানাডায় এসেছি...

তো সে আমাদেরকে বললো "লেক সিমকো" দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে।লেকের নাম শুনে আমার যাওয়ার আগ্রহটা দপ করে নিভে গেল...

লেক দেখার আবার কি আছে,এই ঠান্ডায় লেকের ধারে বসে থাকার কোন ইচ্ছাই আমার হচ্ছিল না।তারপরেও এত খুশি হয়ে যখন বলছে না তো আর বলা যায় না,রওনা দিলাম লেক দেখতে...

তারা যখন গাড়িটা নিয়ে লেকের কাছে গেল আমরা তো দেখে পুরা তাজ্জব,ওরে আমার আল্লাহ রে এই কি দেখছি আমরা, নদীর মত এত বড় একটা লেক পুরোটাই জমে বরফ হয়ে গেছে...

এমন কি পানির যে ঢেউ সেটাও ঐভাবেই বরফ হয়ে জমে আছে...অদ্ভুত সে দৃশ্য!!!!! ইংলিশ ছবি গুলোতে দেখি নদী,সাগর জমে বরফ হয়ে গেছে,তার উপরে মানুষ হাঁটছে,কত অ্যাকশান করছে,আর আজকে আমি সেই বরফ হয়ে যাওয়া পানির উপরে হাঁটছি....আহ ভাবা যায়,অকল্পনীয়...

কিছু কিছু সাহসী সাদা চামড়ার ছেলে মেয়েরা সেই বরফের উপরে গাড়ির মত কি যেন চালাচ্ছিল।একবার যদি বরফে ফাটল ধরে ভেঙ্গে যায় তাহলে একদম ঠান্ডা পানির ভেতরে ঢুকে যেতে হবে,বাঁচার কোন উপায় নাই।কেউ কেউ আবার লেকের মাঝখানে যেয়ে বরফ ভেঙ্গে ভেঙ্গে মাছ শিকার করছিল...আইস ফিশিং বলে মনে হয় ঐটাকে।আমাদের জানের মায়া আছে তাই আমরা এত ভেতরে যাইনি,যতটা যাওয়া নিরাপদ মনে হয়েছিল ততোটা গেছিলাম।অনেকক্ষণ ধরে দুচোখ ভরে সেই অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।স্বপ্নের মত মনে হচ্ছিল,চারিদিকে ধবধবে সাদা বরফের মাঝখান দিয়ে আমি হাঁটছি,রোদের আলোতে বরফ গুলো আরও উজ্জ্বল সাদা দেখাচ্ছিল,চিকচিক করছিল।জীবনেও এমন অদ্ভুত দৃশ্য দেখা হতোনা যদি না যেতাম সেই লেক সিমকো তে,বন্ধুটির কাছে আমরা অনেক অনেক কৃতজ্ঞ এত সুন্দর একটা জায়গা আমাদেরকে দেখানোর জন্য।সেখান থেকে আমরা গেলাম কানাডার বাংলা টাউন,ইন্ডিয়ান টাউন দেখার জন্য,অনেক দিন পরে বাংলা হোটেলে ছোলা,মুড়ি,পিঁয়াজু,সামোসা,সিংগাড়া এইসব খেলাম,আফ্রিকাতে এই সবের দেখা পাওয়া খুবই কষ্টকর...
সি এন টাওয়ার যাকে বলা হয় টপ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড,কানাডায় এসে এইটা না দেখলে কি হয়...

একদিন ডাউনটাউনের রাস্তা ঘুরে আমরা দেখতে গেলাম সেই টাওয়ার।বিশাল উঁচু ,আসলেও টপ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড সেটা।আমি মালেয়শিয়ার কুয়ালালামপুরে ঠিক এই রকমই একটা টাওয়ারে উঠেছিলাম,নীচের থেকে দেখে যতটা ভাল লেগেছিল উপরে উঠে কেন জানি অতটা ভাল লাগেনি।তাই সি এন টাওয়ারের উপরে উঠার তেমন একটা ইচ্ছা হচ্ছিল না আমাদের আর এত লম্বা লাইন দেখে ইচ্ছাটা একদমই হয়নি।নীচে থেকে উপরে তাকিয়ে দেখতেই বেশী ভাল লাগছিল।সি এন টাওয়ারের কাছেই "হার্বার ফ্রন্ট" নামের একটা জায়গা ছিল,সেখানে গেলাম।সেখানে জাহাজে করে পুরো অন্টারিও লেকটা ঘোরানো হয়,আমরা যেহেতু সন্ধ্যায় গেছিলাম তাই তখন বন্ধ হয়ে গেছিল।আরেকটা জায়গা ছিল "থাউজেন্ডস আইল্যান্ড" সেখানেও আমাদের যাওয়া হয়নি,জায়গাটা ঠান্ডার সময় বন্ধ থাকে।এইরকম আরও কিছু জায়গা তারা ঠান্ডার সময় বন্ধ রাখে,গরম শুরু হলে খুলে।আরেকদিন গেলাম "উডবাইন বীচ" আর "ব্লাফার্স পার্কে",যদিও এই দুটো জায়গাও বন্ধ ছিল তারপরেও সেখানে ছবি তোলা গেছিল,বিশেষ করে ব্লাফার্স পার্কটা ছবি উঠানোর জন্য দারুন একটা জায়গা।এজেক্স, রিচমন্ড, ভিক্টোরিয়াপার্ক এসব জায়গায় আমাদের বন্ধুবান্ধবদের বাসা থাকায় ওগুলোও ঘোরা হয়েছে।আর সবচেয়ে দারুন ব্যাপার হলো টরন্টোতে আমরা একদিন তুষারপাতও দেখলাম...

আহ সে কি দারুন দৃশ্য,সাদা সাদা তুলার মত তুষারগুলো আকাশ থেকে উড়ে উড়ে আসছিল বৃষ্টির বদলে।যদিও খুব কম সময়ের জন্য হয়েছিল,হালকা ভাবে।তারপরেও তুষারপাত দেখার জন্য মনের কোণে যে বহুকালের একটা চাপা ইচ্ছা লুকানো ছিল সেটা তো পূরণ হলো....
৪ই এপ্রিল আমরা এয়ার কানাডা তে করে টরন্টো থেকে ভ্যাঙ্কুভারে রওনা দিলাম।শুনেছিলাম এই শহরটা নাকি একেবারে ছবির মত সুন্দর।সেখানে যেয়ে দেখি আসলেও তাই,অসম্ভব সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা পুরো শহরটা।চারিদিকে উঁচু পাহাড়ে ঘেরা,পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ছড়িয়ে আছে সুন্দর সুন্দর সব বাড়িঘর।পুরো শহরটা সবুজ আর ভরে আছে রঙবেরঙের ফুলের গাছে....লাল,গোলাপী,ম্যাজেন্টা,হলুদ,সাদা নানা রঙের ফুলের
সমারহ সেখানে।অথচ টরন্টোর গাছগুলোতে এই সময় কোন পাতাই ছিল না,সব গুলো গাছ যেন কংকাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কিন্তু ভ্যাঙ্কুভারে একদম ভিন্ন দৃশ্য,এর কারণ হচ্ছে এখানকার আবহাওয়া ভাল কিছুটা আর্দ্র আর পাহাড়ী এলাকা,আর টরন্টো থেকে ভ্যাঙ্কুভারে বসন্তকালটা শুরু হয় কিছুটা আগে সেজন্য।এখানে সব কিছুই সুন্দর খালি একটাই সমস্যা প্রতিদিন বৃষ্টি হয়।সবসময় মেঘলা আকাশ আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হতেই থাকে।কোথাও বেড়াতে গেলে বৃষ্টি হলে বেড়ানো যায়না,একদম বোরিং লাগে...

আমরা তো প্রথম ২ দিন কোথাও যেতে পারিনি।অনেক পুরনো আর খুব কাছের একজন বন্ধুর বাসায় আমরা ছিলাম,তাই এই ২ দিন তাদের সাথে কথা বলে আড্ডা দিয়ে সময়টা পার হয়ে গেছিল।ওদের বাসার খাওয়ার ঘরের জানালা দিয়ে পাহাড়ের চূঁড়া দেখা যায়,দূর থেকে দেখে মনে হত পুরো পাহাড়টা কালো আর মেঘের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় পাহাড়ের চূঁড়াটা সাদা বরফে ঢেকে আছে...অসম্ভব ভাল লাগতো দেখে মনটা ভরে যেত,মনে হত এখানেই থেকে যাই সারাজীবন...

২ দিন পরে যখন রোদ উঠল মেঘ সরে গেল তখন আরও পরিষ্কার ভাবে দেখা গেল যে গাঢ় কালছে সবুজ গাছে ভরা পাহাড়ের একদম চূঁড়ায় সাদা বরফগুলো হীরার মত জ্বলজ্বল করছে,দেখে চোখ ফেরানো যায়না।রোদ উঠার সাথে সাথেই আমরাও বেরিয়ে গেলাম সেই অদ্ভুত সুন্দর পাহাড়টাকে কাছ থেকে দেখার জন্য।আমরা গাড়ি করে পাহাড়ের অনেক উপরে উঠলাম "গ্রোসমাউন্টেন" নামের জায়গাটায় গাড়ি রাখলাম।ঐখান থেকে যারা বরফের উপরে স্কী করতে চায় তাদেরকে রোপওয়ে তে করে পাহাড়ের একদম চূঁড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।যারা স্কী করতে যাচ্ছিল তাদের কাপড় চোপড় আর জুতার ওজন যে কত হবে তা আল্লাহ মালুম...

আমরা তো আর স্কী করবোনা তাই পাহাড়ের চূঁড়ায় বরফের মাঝে উঠিনি।যতদূর উঠেছিলাম সেখান থেকে চারিদিকের উঁচু সবকটা পাহাড় দেখা যাচ্ছিল,মাথাগুলো সাদা বরফে ঢেকে ছিল আর রোদ্রচ্ছটায় জ্বলছিল।সেখান থেকে গেলাম আমরা "সাইপ্রেস প্রভিনসিয়াল পার্ক" দেখতে,পাহাড়ের উপর থেকে পুরো প্রশান্ত মহাসাগরটা দেখা যাচ্ছিল সেখান থেকে।খুবই ভাল লাগছিল পাহাড় আর সাগরকে একসাথে কাছে পেয়ে।তারপরে গেলাম "হর্সসু বে" তে,এইখান থেকে জাহাজে করে আরেকটা আইল্যান্ড ঘুরানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়,সেটাও খুব সুন্দর জায়গা।ভ্যাঙ্কুভারের শপিং মল গুলোও বেশ সুন্দর,বড় বড়।সেখানেও ঘুরে দেখলাম,খুব ভালোই লাগলো এই শহরটা...এখনও চোখে ভেসে উঠে।
১১ই এপ্রিল ভ্যাঙ্কুভার থেকে আবার টরন্টোতে ফেরত আসলাম।সেখানে আরও কিছুদিন বন্ধুবান্ধবদের বাসা আর শপিং মলে ঘুরাঘুরি করে সময় কাটালাম যাতে কোন রকমের আফসোস না থাকে,যে এটা করলাম না ওটা করলাম না এইসব আর কি...

সবশেষে ১৮ই এপ্রিল আমরা আবার আফ্রিকা ফেরত আসার জন্য দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম এই কয়দিনের মায়া লাগানো টরন্টো শহরটাকে বিদায় দিয়ে।১৯শে এপ্রিল দুবাই নামলাম,সেখানে এক রাত থাকলাম হোটেলে পরেরদিন ২০শে এপ্রিল ভোরে রওনা দিয়ে ভালভাবে আফ্রিকা এসে পৌঁছালাম......

এর আগের বছর আমরা গেছিলাম লন্ডন আর ফ্রান্স ঘুরতে,খুবই সুন্দর সে জায়গা দুটো,কিন্তু এইবার কানাডাতে ঘুরতেই আমার সবচেয়ে বেশী ভাল লাগলো।মনে হচ্ছে আমি কানাডার প্রেমে পড়ে গেছি......
********************************************************************
লেখাটা অনেক অনেক বড় হয়ে গেল...

আমি দুই ভাগে লিখতে পারতাম কিন্তু কেন যেন ভাগ করে লিখতে ভাল লাগে না আর কোন ভাগ করা লেখা পড়তেও আমার ধৈর্যে কুলায় না।তাই একবারেই লিখলাম,আপনাদের যদি ভাল না লাগে,বোরিং লাগে তাহলে না পড়লেও চলবে...

আমি কিছু ছবি শেয়ার করলাম,কিন্তু কিভাবে ১টার বেশী ছবি শেয়ার করতে হয় সেটা জানিনা...দেখি চেষ্টা করে,হয় নাকি।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৩৭