[পূর্ব প্রকাশের পর]
ঘেরের পাহারাদার পেটানো শরীরের কালো ষাঁড় হামিদ খসখসে গলায় বলে ওঠে, ‘ছোটভাই, কন কার লাশ ফেলে দিতে হবে। আপনি বললে যে কারো লাশ ফেলে দিতে পারি। শুধু আপনি একটু পিছনে থাকলে হবে।’
আমি নিজেও কেমন যেন ধন্ধে পড়ে গেছি, ‘নির্দিষ্ট কারোর লাশ নয়। যে কোন লাশ হলেই হবে।’
ইয়াছিন ভাই বলে উঠল, ‘ছোট ভাই, যে কোন লাশ দিয়ে কি করবেন? কারোর উপর রাগ থাকলে বলেন লাশ ফেলে দেই।’
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘মানে ব্যাপারটা তা না। আমার যে কোন মরা লাশ হলেই হবে। লাশ পড়তে হবে। ডাক্তারি পড়তে লাশ লাগে। লাগে লাশের হাড়গোড়।’
বাবুল আবার চমকে উঠল, ‘মরা লাশ! পড়তে!’
‘হু। আমাদের স্যারেরা বলে দিয়েছে ফাস্ট ইয়ারে লাশের হাড়গোড় পড়তে হয়। তাই ভাবলাম কই না কই পাব। যদি গ্রাম থেকে নেয়া যায় তো ভাল। শুনেছি হাড়গোড়ের বেশ দাম। ঢাকা শহরে দশ বার হাজার টাকা লাগে হাড় পেতে।’
হামিদ ভাই আগের মত খসখসে গলায় বলল, ‘ছোট ভাই কি কন? লাশের হাড়ের দাম দশ হাজার টাকা? তাহলে তো প্রত্যেকদিন একটা করে লাশ নিয়ে ঢাকায় যেয়ে বেঁচে দিতে হয়। শুধু টাকা আর টাকা।’
‘যেরকম সহজ ভাবছ ওরকম সহজ না। ঝামেলা আছে। তাছাড়া অত লাশ তুমি পাবা কই?’
হামিদের বুদ্ধিশুদ্ধি কম বলেই মাথা চুলকে বুদ্ধি বের করার চেষ্টা করে বলল, ‘তা ঠিক। গ্রামের লোক সহজে মরেও না।’
ইয়াছিনের মাথা মোটামুিট ঠান্ডা, সে ভেবে বলল, ‘ছোটভাই মরা লাশের কথা বলছিলেন। কবর দেয়া লাশ হলে চলবে?’
‘কতদিন আগে কবর দেয়া? শুনেছি বেশি আগের কবর দেয়া হলে হাড়গোড়ের গায়ে মাটির দাগ হয়ে যায়। ওই হাড় আর পড়া যায় না।’
ইয়াছিন হাতে কর গুনে বলল, ‘দুইদিন আগের। আজ বুধবার। লাশ মাটিতে পুতে ফেলেছে সোমবারে।’
‘হু। তাহলে হবে। শুনেছি তিনদিনের আগে হলে কাজ চালানো যায়। লাশে তেমন পঁচন ধরে না। হাড়গুলো ফ্রেশ থাকে।’
‘ফ্রেশ থাকতে পারে। বেশ ভাল লাশ। যুবতী বৌ-তো। আর এনড্রিন খাওয়া। বিষ খাওয়া লাশ সহজে পচে না।’
হামিদ ওপাশ থেকে বলল, ‘ইয়াছিন ভাই কার কথা বলছ?’
‘কেন বাগদী পাড়ার সন্ন্যাসীর বউ। এনড্রিন খেয়ে আত্মহত্যা করে মরল। তারপর সেই লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলেছে না!’
আমি একটু অবাক গলায় বললাম, ‘বাগদীরা পোড়ায় না নাকি?’
ইয়াছিন বলল, ‘মনে হয় না। পোড়াতে অনেক খরচ। ওরা অত খরচ পাবে কই? সব দিন আনে দিন খায়। তারপর বিষ খাওয়া, অপঘাতে মরা লাশ। পা ভেঙে সোজা করে মাটিতে পুঁতে ফেলে।’
বাবুলও দেখলাম ওই বাগদী বৌয়ের মরার কথা জানে। বলল, ‘ওই লাশে ঝামেলা আছে কিন্তু। বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে ভেবে পুলিশ টুলিশও এসেছিল। চেয়্যারম্যান চাচাই তো পুলিশদের ঠান্ডা করে রেখেছে। পুলিশ মনে হয় এখনো গ্রামেই আছে।’
হামিদ হাত দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার মত করে বলল, ‘দুর, দুর। পুলিশ কি আর এখনও পাহারা দিয়ে বেড়াচ্ছে নাকি? রাত দুপুরে মাটি খুঁড়ে লাশ তুলে আনলে পুলিশের চৌদ্দ গুষ্টিও জানবে না। ছোটভাই, আপনার লাশ কবে লাগবে?’
‘বাগদীর বউয়ের হলে আজ রাতেই তুলে ফেলা ভাল। তিনদিন হয়ে গেলে আমার আর কোন কাজে আসবে না। আর নতুন লাশ হলে দু’একদিন পরে হলেও চলবে।’
ইয়াছিন বলল, ‘নতুন লাশ তো বললেই পাওয়া যাবে না। কারোর মরার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। না হলে নিজেরাই কাউকে লাশ বানিয়ে ফেলতে হবে। তারচেয়ে বাগদী বৌতে যদি কাজ হয় তো চলেন আজ রাতে লাশ তুলে ফেলি।’
আমিও ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘সেটা করাই ভাল। দেরী হলে লাশ নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া মাংস খসিয়ে হাড়গোড় বের করতে বেশ সময় লেগে যাবে।’
বাবুল বলল, ‘তুই কি রাতে থাকবি নাকি এখানে?’
‘হু। আমি না থাকলে লাশের মাংস ছাড়িয়ে হাড় বের করার সময় খেয়াল রাখবে কে? একটু এদিক ওদিক হলে হাড় নষ্ট হয়ে যাবে। আর আমার সাথে সাথে তুইও থাকছিস। কোন অসুবিধে আছে তোর?’
‘নাহ। আমার আর কি অসুবিধে? দু’চারদিন বাড়িতে না ফিরলেও কেউ খোঁজ নেবে না। সৎ মা থাকার সুবিধে অনেক।’
‘কিন্তু আমার বাড়িতে একটু খবর দিয়ে আসতে হবে। আর খাওয়া দাওয়ার কি ব্যবস্থা হবে?’
হামিদ এক গাল হেসে বলল, ‘ও নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আপনি খাবেন। রাজহাঁস কেটে দিয়ে রান্না চড়িয়ে দেব এখানেই। শুধু বাড়ির থেকে চাল আনতে হবে। আর সব আছে এখানে। আপনার কথা বললেই দেবে। বলব পিকনিক করছি।’
‘ওই চিন্তা বাদ দাও হামিদ ভাই। লাশ-টাশ ঘাঁটাঘাঁটির রাতে ওসব না করাই ভাল। লাশের মাংস ছাড়িয়ে কেউ গোশ দিয়ে ভাত খেতে পারবে না। সব বমি হয়ে যাবে। তাছাড়া কাজও অনেক। পিকনিকের পিছনে সময় নষ্ট করা যাবে না। ওর চেয়ে তুমি আমাদের কথা বলে বাড়ির থেকে ভাত নিয়ে এসো। ইয়াছিন ভাই, কয়টার দিকে বেরুলে ভাল হয়?’
‘সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রাত একটু বাড়লে বের হই। আজ রাতটা বেশ ভাল আছে। ঘুটঘুটি অন্ধকার চারিদিকে। কাজ সারতে সুবিধে হবে।’
বাবুল চিন্তিত স্বরে বলল, ‘আকাশে কিন্তু কালো মেঘ আছে। বৃষ্টি এসে না পড়লেই হয়।’
হামিদ ধমকের স্বরে বলল, ‘একটা লাশ তুলতে আর কতক্ষণ লাগবে? বৃৃষ্টি পড়ার আগেই কাজ সেরে ফেলতে পারব।’
যোগাড় যন্ত্র চলতে থাকে। ডাইলের এখনও ক’টা ফুলবোতল আছে। ও কয়টা পরে কাজে লাগবে। হামিদ চলে গেল আমাদের জন্য বাড়ি থেকে ভাত নিয়ে আসতে। এশার আজান হয়ে গেছে। গ্রামের দিকে কেরোসিনের তেল পোড়ানোর ভয়তে লোকজন সন্ধের পরপরই খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কাজেই আমরাও খেয়ে দেয়ে লাশ তুলতে বেরিয়ে পড়তে পারব।
ঘেরের মধ্যেই প্রায় সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যায়। কোদাল, শাবল সবই এখানে আছে। ঘেরের কাজেই লাগে ওগুলো। লাশ বয়ে আনতে বস্তাও জোগাড় হয়ে গেল একটা। চিংড়ি মাছের খাবার আনা হয় ওই বস্তায়। আনা হয় চুন।
চুনের বস্তা দেখেই ব্যাপারটা মাথায় খেলে গেল আমার। ইয়াছিন ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চুন আছে নাকি ইয়াছিন ভাই?’
‘কতটুক?’
‘এই বস্তাখানিক।’
‘তা হবে। কিন্তু কি করবেন?’
‘চুনগোলা পানিতে লাশ ফেলে পানি ফুটালে হাড়ের গা থেকে সহজে মাংস ছাড়িয়ে যায় শুনেছি। মেডিকেলের মামারা নাকি ওভাবেই হাড়ের গা থেকে মাংস ছাড়ায়।’
বাবুল বলে উঠল, ‘গন্ধ হবে না?’
‘তা হয়তো হবে একটু। কিন্তু ঘেরের এই ফাঁকা জায়গায় গন্ধ হলেও তা শুধু আমাদের ছাড়া আর কারো নাকে লাগবে না। এই একশ বিঘের মধ্যে কারো ঘরবাড়ি নেই।
হামিদের ভাত নিয়ে ঘেরে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। এত জনের ভাত বলে নতুন করে রান্না করেই নিয়ে আসতে হয়েছে। খেয়ে গুছিয়ে উঠতে এগারোটা। তারপর ঘেরের আ’ল ধরে বিশাল ঘের ছাড়িয়ে গ্রামে ঢুকে গ্রামের শেষ মাথার বাগদী পাড়ায় পৌছতে পৌছতে রাত বারোটা বেজে গেল। এদিকে আবার ঠান্ডা হাওয়া ছেড়েছে। যে কোন মুহুর্তে কালবোশেখী আক্রমণ করতে পারে। তা না করলেও বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে।
আমরা তিনজন এসেছি। ঘের পাহারা দিতে হবে বলে হামিদ আসেনি। তবে সে ঘেরে নিষ্কর্মা বসে থাকবে না। বস্তার চুন বড় পাত্রে ঢেলে সেটা পানি দিয়ে ফুটাতে থাকবে। যাতে আমরা ফিরে এসেই ওর মধ্যে লাশ ছেড়ে দিতে পারি।
ঠান্ডা বাতাস ছেড়েছে। আলকাতরা অন্ধকারে গাছের পাতাগুলো কালো ভূতের মত দুলছে। তিন ব্যাটারির টর্চের আলো ফেলে পথ চলছি। ঘের থেকে বাগদী পাড়া কম দূর নয়। ওরা অস্পৃশ্য বলে বোধ হয় গ্রামের শেষ মাথায় নদীর ধারটাতেই পাড়াটা গড়ে উঠেছে।
বাগদী পাড়ায় পৌছতে পৌছতে রাত বারোটা ছাড়িয়ে গেল। আমার আলো জ্বলা ঘড়িতে দেখে নিয়েছি। ছোট ছোট ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে চারিদিক আলোকিত করে দিচ্ছে। তারপর কবরের অন্ধকার।
আমি একটু উঞ্চ গলায় বললাম, ‘ইয়াছিন ভাই, বাগদীদের কবর খানাটানা কোন দিকে? তাড়াতাড়ি চলো সেদিকে। বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি এসে গেলে কিন্তু কাকভেজা হয়ে যেতে হবে।’
অন্ধকারে ইয়াছিন ভাইয়ের গলা ভেসে আসে, ‘ঘেরেই পড়ে থাকি ছোটভাই। বাগদী পাড়ার কোন জায়গায় কি ঠিক মনে নেই। অনেক আগে এসেছি তো!’
পাশ থেকে বাবুল বলে ওঠে, ‘টর্চটা আমার কাছে দেন ইয়াছিন ভাই, দেখি। আমি খুঁজে পাই কি না। ওদের তেমন বাঁধা ধরা কোন কবর খানা টানা নেই। নদীর ধারে পুঁেত রাখে শুনেছি। চিহ্ন টিহ্ন আছে কিনা খুঁজে দেখতে হবে।’
এই বৃষ্টির রাতে এখন নদীর ধারে ধারে কবর খানা খুঁজে বেড়াও। মেজাজ খারাপ করতে গিয়েও সামলে নিলাম। এসেই যখন পড়েছি দেখি পাওয়া যায় কিনা। গেলে বেশ হবে। আব্বুর কাছ থেকে হাজার দশেক টাকা ঠিকই লাশ কেনা বাবদ আদায় করবো। শুধু শুধু লাশটা পেয়ে গেলে টাকাটা ডাইল কেনার কাজে রেখে দিতে পারব। ঢাকায় ডাইলের দাম কেমন কে জানে!
বাবুলের চোখ শকুনের চোখ। সে এই অন্ধকারেও শুধু টর্চের আলোয় ভরসা করে ঠিকই বাগদী বৌয়ের কবর খুঁেজ বের করল। পাশাপাশি কয়েকটা কবর আছে ঠিকই কিন্তু নতুন কবর দেখলেই চেনা যায়। কবরের মাটি এখনো পাশের মাটির সাথে মিশ খাইনি।
নদীর তীরে একটা অতিপ্রাকৃত দৃশ্যের অভিনয় হতে থাকে। টিপ টিপ বৃষ্টি এবং নদীর থেকে উঠে আসা হু হু বাতাসের মধ্যে কবরখানায় আমি দাঁড়িয়ে আছি টর্চ জ্বালিয়ে। ইয়াছিন ভাই কোদাল দিয়ে কবরের মাটি তুলছে আর বাবলু হাত দিয়ে দিয়ে সে মাটিয়ে সরিয়ে স্তুপ করে রাখছে পাশে।
কবরের মধ্যের ওটাকে কোনমতেই কফিন বলা চলে না। চারটে বড় সড় তক্তা দিয়ে কোন মতে একটা বাকসো মত তৈরি করা হয়েছে। তার মধ্যে কেবল পচন ধরেছে বাগদী বৌয়ের যুবতী লাশ।
আমি ভয়ে লাইটটা ধরে অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম, ‘ইয়াছিন ভাই, তাড়াতাড়ি লাশটা তুলে বস্তায় পুরে ফেলো। এখন অত দেখার সময় নেই। ঘেরে নিয়ে দেখলে হবে কি অবস্থা।’
বাবুলের চোখ সত্যিই শকুনের চোখ। এই অন্ধকারেও সে বলে দিল ‘ইয়াছিন ভাই, ব্যস্ত হাত লাগান। ওয়াপদার রাস্তা দিয়ে কেউ এদিকে আসছে মনে হয়।’
শুনে ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে গেলাম নাকি!
ইয়াছিন ভাই একটু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘এই সময় সাথে হামিদটা থাকলে ভাল হতো। ওর সাহস খুব। একা আমাদের সাথে লাগতে আসলে আরেকটা লাশ বেশি করে ফেলত। ছোটভাই এক্কেবারে টাটকা লাশ পেয়ে যেত।’
আমি টর্চ জ্বেলে আছি। ওরা দুজনে মিলে ধরাধরি করে বড় সড় বস্তায় যুবতী বৌয়ের ভারী লাশ পুরে মুখ বন্ধ করে ফেলে।
বস্তা নিয়ে রাস্তায় উঠতেই বাবুলের দেখা সেই রাতের আগন্তুকের সাথে দেখা হয়ে যায়।
ইয়াছিন ভাই গলা সপ্তমে তুলে টর্চ জ্বেলে বলে, ‘কে? এত রাতে কে যায়?
ওপাশের অন্ধকারের লোকটা কাচুমাচু কন্ঠে বলে, ‘আমি। বাগদী পাড়ার সন্ন্যাসী বাগদী।’
ইয়াছিন ভাইয়ের বড় গলা। চোরের মায়ের, ‘এই রাত বিরাতে এদিকে কি করছিস রে! কি মতলব?’
‘কবর খানার দিকে যাচ্ছিলাম।’
‘কবর খানায় কি? তুই কি কবরের পাহারাদার?’
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




