আমার প্রিয় পোস্ট

কিংবদন্তী ঢাকার মসলিন (শেষপর্ব)

১৩ ই মার্চ, ২০০৯ ভোর ৬:৩৩

শেয়ারঃ
0 1 0

কিংবদন্তী ঢাকার মসলিন (পর্ব-১)
কিংবদন্তী ঢাকার মসলিন (পর্ব-২)
কিংবদন্তী ঢাকার মসলিন (পর্ব-৩)


পরবর্তীতে মসলিন রপ্তানীর ব্যবসা প্রায় পুরোটাই করায়ত্ত করে নেয় ইংরেজ কোম্পানি। তাদের রপ্তানী হত মূলত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে। পলাশীর যুদ্ধের আগ পর্যন্ত দালালরা বিভিন্ন জায়গা থেকে দামি মসলিন সংগ্রহ করে কোম্পানিতে সরবরাহ করতো। পলাশীর যুদ্ধের পর মসলিন সংগ্রহের জন্য গোমস্তা নিয়োগ করা হয়, যারা ছিল কোম্পানির বেতনভুক্ত কর্মচারী। এই গোমস্তারা মসলিন সংগ্রহের জন্য হয়ে উঠে নিষ্ঠুর, চালাতে থাকে অমানুষিক অত্যাচার। মসলিন তাঁতীরা দিশেহারা হয়ে উঠে এই গোমাস্তাদের অত্যাচারে। এখানে লক্ষণীয় যে, দেশীয় গোমাস্তারাই হয়ে উঠেছিলো দেশের মানুষের শত্রু।

কিন্তু মসলিনের সাথে জড়িত আমাদের দেশের প্রতিটি কৃষক, শ্রমিক, তাঁতীকে নানাভাবে ঠকানো হত, নির্যাতন করা হত। গরীব চাষিকে টাকা ধার দিয়ে তার কাছ হতে খুব কম দামে কার্পাস নিয়ে যেত একশ্রেনীর দেশী মানুষ। দেশী মানুষরা যারা দালাল-পাইকার হিসেবে কাজ করতো তারাও তাঁতীদেরকে ঠকাতো নানা ভাবে। গোমস্তারাতো রীতিমত অত্যাচার করতো তাঁতীদেরকে। হিসেবে দেখা যায়, আনুমানিক ১৭৪০ সালের দিকে এক টাকায় পাওয়া যেত প্রায় একমণ চাল। আর একজন তাঁতী মসলিনের কাজ করে পেত মাসে দুই টাকা, অর্থাৎ দুই মণ চালের দাম! যাতে তার পরিবারের খাবারই ঠিকমত চলতো না, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যতো অনেক দূরের কথা।

কি ভীষন ট্রাজেডি, যারা তৈরি করতেন বাংলার গর্ব-যাদের তৈরি কাপড় গায়ে উঠতো সম্রাটের, রপ্তানী হত বিদেশে, তাঁর গায়েই থাকতো না কাপড়, পেটে পড়ত না ঠিক মত খাবার। আর সবচেয়ে দুঃখজনক বোধহয় এটাই যে-এই অবিচারের পিছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলো এ দেশেরই দালার, পাইকার আর গোমস্তারাই।

প্রচলিত আছে যে- ইংরেজরা নাকি মসলিন তাঁতীদের আঙুল কেটে ফেলতো। আবার এও শোনা যায় যে- তাঁতীরা নিজেরাই নাকি নিজেদের আঙুল কেটে ফেলতো, যাতে করে এই অমানুষিক পরিশ্রম আর কম পারিশ্রমিকের কাজে তাদের বাধ্য না করা হয়। তবে আঙুল কেটে ফেলা ঘটনার কোন ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমানিত না হলেও কার্পাস কৃষক আর তাঁতীদের উপর কোম্পানী, ব্যবসায়ী, গোমস্তা আর পাইকাররা যে অমানুষিক অত্যাচার চালাত সেটি জাজ্বল্যমান সত্যি। আমাদের গর্বের এই মসলিনের সঙ্গে কালিমার মত লেপ্টে আছে এই রূঢ় সত্যটাও।

চার-পাঁচশো বছর আগে যে মসলিন হয়ে উঠেছিল পৃথিবী বিখ্যাত, মাত্র দেড়শো বছরের মধ্যেই তা হারিয়ে গেল কেন?

--
১৮৪৪ সালে ঢাকার কমিশনার আই. ডানবার কোম্পানীর সদর দপ্তরে মসলিন শিল্প বন্ধ হবার কারণ উল্লেখ করে একটি রিপোর্ট পাঠান। ডানবার
সাহেবের মতে মূল কারণগুলো ছিলঃ

১) ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে সস্তায় সুতা আর কাপড় উৎপন্ন হতে থাকে। ফলে দামি মসলিনের চাহিদা কমে যায়।

২) বিলেতের সস্তা সুতা ঢাকায়, ভারতে আসতে থাকে, সে থেকে তৈরি হতে থাকে কাপড়, হারিয়ে যেতে থাকে মসলিন।

৩) বিলাতে ঢাকাই মসলিনের ওপরে উচ্চহারে কর আরোপ করা হয়, ফলে মসলিনের দাম ওখানে বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। স্বভাবতাই বিক্রি কমে যায় মসলিনের।
--

মসলিনের পড়তির সময়টায় পতন ঘটতে থাকে আমাদের নবাব-সম্রাটদেরও। তাঁরা আর বেশি টাকা দিয়ে মসলিন কিনছেন না- চাহিদা কম ছিল অভ্যন্তরীন বাজারেও। তাছাড়া মুঘল সম্রাট, নবাব, ব্যবসায়ী-কেউই এ শিল্প রক্ষা কিংবা প্রসারে কোন সময়ই তেমন কোন উদ্যোগ নেননি, সব সময় চেষ্টা করেছেন কিভাবে কৃষক-তাঁতীদের যতটা সম্ভব শোষণ করে নিজেরা লাভবান হওয়া যায়- এই সব মিলিয়ে এভাবেই ধিরে ধিরে আমাদের আরও অনেক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের মত হারিয়ে যায় মসলিনের স্বর্ণযুগও।

-- শেষ --

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): কিংবদন্তী ঢাকার মসলিনকিংবদন্তী ঢাকার মসলিনকিংবদন্তী ঢাকার মসলিনকিংবদন্তী ঢাকার মসলিন ;
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১:০৫ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৭:০৮
নিঃসঙ্গ বলেছেন: শোকেসে তুলে রাখার মত পোস্ট তাই ঐটাকে ঐ খানে পাঠাইয়া দেয়া হইলো।
১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৭:১৭

লেখক বলেছেন: পুরো মসলিন সিরিজে পাশে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ নিঃসঙ্গ ভাই।


আজকাল আপনি তো আবার মুরুব্বি মানুষ হয়ে গেছেন, ভাবভঙ্গিতে কথাবার্তা বলেন...দোয়া রাইখেন বেশি কইরা মুরুব্বি.../:)

২. ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৭:১৩
তর্পন বলেছেন: গবেষণাধর্মী পোষ্টের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ । কষ্ট হয়, কী করে মুনাফার লোভে ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর হস্তশিল্পটিকে ধবংশ করে দিল ঔপনিবেশিক ডাকাতের দল ।

=================================
সাম্প্রতিক পোষ্ট:
ইউটিউবের দুটো পুরনো ট্রিক্স
ইউটিউব কে নিষিদ্ধ করেছিল যে সব দেশ
১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৭:২৭

লেখক বলেছেন: পুরো মসলিন সিরিজে পাশে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

দোষ শুধু ঔপনিবেশিকদের একার ছিলনা, স্থানিয় গোমস্তা, পাইকারি ব্যবসায়ী এমনকি সম্রাট-নবাব তাদেরও চরম অনীহা ছিল এতবড় একটা শিল্পকে যথাযথভাবে লালন করার, যার ফলে একবড় একটা ঐতিহ্যবাহী শিল্প মাত্র দেড়শত বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে বাংলার বুক থেকে।

১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৭:৩১

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ শূন্য আরণ্যক, লেখাটির সঙ্গে থাকার জন্য।
আপনাদের উৎসাহ পেয়ে আগামীতে ঢাকা শহরের ঐতিহ্যবাহি আরোকিছু ইতিহাস শেয়ার করার ইচ্ছা রইল।
শুভেচ্ছা।

৪. ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৮:০৮
সামুরাই বলেছেন: ৫+
প্রিয়াইলাম সবগুলান পর্ব
১৬ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৮:০৭

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ সামুরাই। খুব ভালো লাগলো আপনাকে সাথে পেয়ে। শুভেচ্ছা।

৫. ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৯:৩৮
বাংলাদেশী সাইকেল ভ্রমণকারী বলেছেন: অসাধারন! তাই প্রিয় এবং +

আরো কিছুর অপেক্ষায় রইলাম।
২২ শে মার্চ, ২০০৯ ভোর ৬:১৪

লেখক বলেছেন: ভাই, আমাদের দেশের প্রতি ভালবাসার টানে আপনি যেভাবে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ছুটে যাচ্ছেন, দেশটাকে নয়ন ভরে দেখবেন বলে সেই ব্যাপারটাই কত অসাধারন!

আমরাও আপনার কাছে আশা করি আপনি যখনই যে জেলায় ঘুরে আসবেন আমাদের সাথে সেই সব অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন...:)

শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইল অনেক। ভালো থাকুন।

৬. ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৯:৪২
সহেলী বলেছেন: খুবভড় একটা কাজ করছেন , শুভকামনা আপনার জন্য ।
২২ শে মার্চ, ২০০৯ ভোর ৬:১৭

লেখক বলেছেন: আপনা কেঅনে কধন্যবা দসা থেথা কারজ ন্য। ভালথা কুনস হেলী:D

২২ শে মার্চ, ২০০৯ ভোর ৬:১৭

লেখক বলেছেন: :)

২২ শে মার্চ, ২০০৯ ভোর ৬:২০

লেখক বলেছেন: পিডিএফ এ একসাথে সবগুলো পর্ব করার ইচ্ছা আছে। উৎসাহ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ অনেক:)

৯. ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ১০:৪৪
মেহবুবা বলেছেন: এ জন্যই সা.ইনে সময় দেয়া ; অসাধারন একটা উদ্যোগ আপনার । প্রিয়তে রেখে দেই ।
২৩ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ৩:৩৪

লেখক বলেছেন: মেহবুবা,
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আর শুভেচ্ছা
এই উৎসাহ ও পাশে থাকার জন্য।
সা.ইনে এসে জীবনে যে কি পেলাম...



১০. ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ১১:০৬
জেরী বলেছেন: ভালো পোস্ট...+++...।
২৬ শে এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ১০:৩৭

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ জেরী'পু..

১১. ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৩৫
নিঃসঙ্গ বলেছেন: আমি মুরুব্বী হয়ে গেছি কবে কখন কেমনে ? /:)
২৬ শে এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ১০:৪০

লেখক বলেছেন: ..../:)

১২. ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০৪
অ্যালন বলেছেন:
দারূন হলো পর্বগুলো, এগ্দম দারূন..বভিষ্যতেও এরকম পোশটো পাবো..এই আশায় য়পেক্ষা.. :-< ..

@রাহি ভাইঃ জ্বেই টুপি লাগাইসেণঁ..আমার্কাসেইতো মুঢ়ুব্যী ল্যাগে.. /:)
২৬ শে এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ১০:৪৩

লেখক বলেছেন: ইনশাল্লাহ দোয়া রাইখেন এমন পোস্ট যেন বভিষ্যতেও দিতে পারি... /:) :-<

১৩. ১৪ ই মার্চ, ২০০৯ রাত ১২:১০
শুভ্র দেব রায় বলেছেন: অনেক কিছু জানলাম.....................ধন্যবাদ
২৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৫:২৯

লেখক বলেছেন: আপনাকেও অনেক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য...

১৪. ১৬ ই মার্চ, ২০০৯ ভোর ৬:১০
তামিম ইরফান বলেছেন: চমৎকার তথ্যবহুল পোষ্টের জন্য আপনাকে দেশ ও জাতির পক্ষ হইতে দিক্কার জানানো হইলো:D
২৮ শে মে, ২০০৯ সকাল ৯:০২

লেখক বলেছেন: আপনাকেও জাতি ও দেশের পক্ষ হতে ধিক্কার জানাই এমন একটা মন্তব্য প্রদান করার জন্য :D

১৫. ১৬ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৮:১৫
অন্ধকারের রাজপুত্র........ বলেছেন: মসলিন নিয়ে আপনার পোষ্টগুলো সত্যিই চমৎকার।সবগুলো পর্ব এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম।
২৮ শে মে, ২০০৯ সকাল ৯:০৩

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার নিকটা অনেক সুন্দর, তবে আশা করি একদিন আলোকিত রাজপুত্র তে পরিণতি লাভ করবে। ভালো থাকুন।

১৬. ২২ শে মার্চ, ২০০৯ ভোর ৬:২৪
নিহন বলেছেন: শেষ --??

তাইলে প্রথম থেইকা আবার পইরা আসি ।
তারপর ঘুমামু ।
২৮ শে মে, ২০০৯ সকাল ৯:০৬

লেখক বলেছেন: কেমন লাগলো নিহন ভাই?..মসলিন নিয়ে যত জানতে পারি ততই অবাক হই..আমাদের এই অমূল্য ঐতিহ্য এখন শুধুই এক ইতিহাস
সেই ইতিহাসটাই বা আমরা কতটুকু ধরে রাখতে পারছি..:(

১৭. ২৫ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ১:০৫
একরামুল হক শামীম বলেছেন: শোকেসে রাখলাম :)
ধইন্যাপাতা তোমারে। :)
২৮ শে মে, ২০০৯ সকাল ৯:০৮

লেখক বলেছেন: তোমারও এক আঁটি ধইন্যাপাতা :)

২৮ শে মে, ২০০৯ সকাল ৯:২৭

লেখক বলেছেন: :) ডং

২০. ১৬ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৯:৫৯
অ্যালন বলেছেন:
ণঁতূঁন্পোঁষ্টঁ কোঁতাঁয়ঁ..মনু হেইয়া কি রিশ্কা দিয়া য়াইতেয়াসে../:)
২২. ২৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৫:৩৩
মে ঘ দূ ত বলেছেন: পুরুটা একেবারে পড়বো বলেছিলাম, এখন শেষ যখন হয়েছে আয়েশ করা পরা শুরু করা যায়।

ধন্যবাদ এমন সুন্দর একটা কাজের জন্য।
২৫. ১৬ ই জুলাই, ২০০৯ ভোর ৪:৪৫
মারূফ মনিরুজ্জামান বলেছেন: মসলিন কি এখন কোনভাবে বানানো সম্ভব? মানে প্রযুক্তিটা কি জানা যায়?

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯২৯৩ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
"রাতের নিকষ কালো আঁধারের পরেই ভোরের আলোর আগমন.."

nhasin14[at]gmail.com
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ