বিজয়ের এ দিনে কোন স্মৃতিশৌধে যাওয়া হয়না, না কোন সমাধির পাটাতনে একগুচ্ছ লাল-সবুজ গোলাপ দেয়া হয়, কোন শোভাযাত্রায় পিছনের সারিতেও আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা, কোন আনন্দ মিছিলে উল্লাসরত তরুন-তরুনীর ভীরেও এই মানুষটির অস্তিত্ব নেই, সকালে পত্রিকার পাতায় বড় বড় করে পৃষ্ঠা জুড়ে দেওয়া মন্ত্রী মহোদয়ের বিজয়ের বাণীও পড়া হয়না, টেলিভিশনের রঙ্গিন পর্দায় স্বাধীনতার বছরগুলোর কোন যুদ্ধ স্মৃতির দৃশ্যও দেখা হয়না, আমার অক্ষমতা, আশংকা এ দিনেও আমাকে সংকুচিত করে রাখে।
এ বিজয়ের দিনে আমার একমাত্র প্রধান এবং সর্বউত্তোম কর্ম, তাঁর পা ছুয়ে সালাম করা, তিনিই আমার বাবা, একজন মুক্তিযোদ্ধা বাবা। বিজয়ের দিনটি শুরু করি এভাবেই, কারণ তিনিই আমার কাছে একটি স্মৃতিশৌধ, একটি শোভাযাত্রার উপলক্ষ, আনন্দ মিছিলের উল্লাস, পত্রিকার সব কটি কবিতার বাণীর ছন্দ, তিনিই মুদ্ধিযুদ্ধ, যুদ্ধের অস্ত্র, রসদ, কন্ঠের বজ্রস্বর, অর্জন এবং সর্বোপরি বিজয়। বিজয়ের সব অর্জনকে দেখতে পাই আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবার দৃষ্টিতে যেমনটি অনুভব করি সমস্ত হারিয়ে যাওয়া, বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের চোখের ভাষায়। সমস্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করি আমার দেশের বীর মা, বোন ও ভাইদের প্রতি।
বাবার কাছ থেকে তার অনুভবটি কিছু সময়ের জন্য হলেও ধার চেয়ে নিই, টগবগে রক্তের এক যুবক, মায়ের আচঁল ছেড়ে নিষেধের তোয়াক্কা, যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রহাতে এক স্বাধীন দেশ গড়ার প্রত্যয়ে সাধারণ সৈনিক, অসাধারণ বনে যাবার নেশায় দশটা বুলেট বিদ্ধ শকুনের দেহ আর একটি বুলেটের অপেক্ষা, ৯মাসের সশস্ত্র সংগ্রামে পাশের ভাইয়ের রক্তমাখা শার্ট, বোনের ইজ্জত হারানোর দৃশ্যে চোখদুটোকে অভিশাপ দেয়া, সšতান হারানো মা-এর হাহাজারির আর্তনাদ আরো বিদ্রোহী করে তুলে, অবশেষে যখন বিজয় এল উল্লাশ তখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে, উল্লসিত হতে পারিনি খুজেঁ ফিরেছি হারিয়ে যাওয়া মা, ভাই আর বোনকে।
সময় গড়িয়েছে, পার হয়েছে আরও কতটি বছর, উল্লসিত হতে পারিনা আজও, উল্লাসের এ দিনে শোক, ব্যথা, বেদনা, হারানোর কষ্টগুলোও আমাকে ভাবায়, কাঁদায়। একটিই কষ্ট আজও, আমাকে বাস করতে হচ্ছে তাদের সাথে, যাদের সাথে যুদ্ধের আগে ও পরে যুদ্ধ হয়েছে, জয় হয়েছে একটি দেশর কিন্তু হারাতে পারেনি রাজাকারদেরকে তাদের দোসরদেরকে, রক্তের পিশাচদেও !
পরাজিত এক সৈনিকের আত্মকষ্টে ভোগা মুক্তিযোদ্ধা বাবার সমস্ত দায়িত্বটুকু যখন আমার হাতে হস্তান্তরিত হয় তখনও সমস্ত বিষ্ময়, ভয়, আশংকা কাজ করে আমিও কি পারব ? না আমার উত্তরসুরীদের হাতে এভাবেই হয়ত হস্তান্তরিত হবে দায়িত্বটি যা যুগ যুগ ধরে বয়ে চলবে তাদের উত্তরসুরীদের কাছে।
আজ গর্ব করতে পারি আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যে গর্ব এদেশ করবে, দেশের মানুষ, আমার সন্তান, তার সন্তান তার তার এবং তার কোনদিন মৃত্যু হবার নয় এ গর্বের।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



