.....................................................................................................
একটি টেলিভিশন এ্যাডের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। অনেকেই হয়তো এ্যাডটি দেখেছেন; দারুন কৌশলী বিজ্ঞাপণ চিত্রে নির্মিত ওই এ্যাডটি নি:সন্দেহে আমাদের সামাজের একটি বিশেষ অংশের মানুষকে তাদের ভাষা সেবার ক্রেতা হিসেবে পাওয়ার মূলমন্ত্র ছেড়ে দিয়েছে। জাতি হিসেবে সেই ভাষার ব্যবহারে আমরা কতটা দূর্বল সে প্রকাশ প্রকাশ্যে না থাকলেও তাকে যে রাখঢাক রেখে প্রচার করা হয়েছে তাও কিন্তু নয় !
বলছিলাম এ্যাডের কথা। বিটিভি সহ দেশের সকল স্যাটেলাইট চ্যানেলে ইতোমধ্যে প্রায় একাধিকবার প্রচারিত হয়েছে এ্যাডটি। এই এ্যাডটি প্রচার হবার পূর্বে এ্যাড প্রচারক কোম্পানীর আরো দুটি কি তিনটি সমবিষয়ক এ্যাড প্রচার হয়েছিলো। কিন্তু সেগুলো অতটা স্থায়ী হয়নি টেলিভিশনের পর্দায় যতটা এই এ্যাডটি হয়েছে। আগের দুটো এ্যাডের প্রচার স্বল্পতার কারণ হিসেবে তাদের অবাস্তব তুলনা হয়তো ‘পাবলিক’ গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিলনা বা সুযোগ্য স্ক্রীপ্টের অভাবে ‘উপায় নেই’ গোছের হাব-ভাবে চালিয়ে দেয়া।
আগের দুটি এ্যাডের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এরুপ :
ক) গ্রামের কিশোরী, নি:সন্দেহে চঞ্চলা-চপলা, দুরন্তপনার অতিশয্যে সে তার বাড়ীর আঙ্গিনার প্রিয় ‘মুরগী’কে ধরতে এমন কৌশল রপ্ত করেছে তাতে নিশ্চয় তার শরীর চর্চার অতি আধুনিক এ বিদ্যার প্রশংসা না করে থাকা যায়না। যারা মুরগী খামারী তারাও হাজার হাজার মুরগী মানুষ করতে গিয়ে এমন কৌশলের কথা জানেন কিনা, তা আমার অভিজ্ঞতার ঘাটতি। মূল বিষয় সেটা না, এ্যাডের ভাষায় মুরগী ধরার মত ‘এত কঠিন’ কাজটি মেয়েটি জানলেও মেয়েটি জানেনা কিভাবে ইংরেজীতে কথা বলতে হয়, আর তার এই ইংরেজী ঘাটতি পুষিয়ে দিতেই ইংরেজী প্রচারকেরা বাজারে এনেছেন ইংরেজী শেখানোর জন্য বিশেষ ‘জানালা’ যা দিয়ে সহজেই প্রবেশ করবে ইংরেজী জানার সকল তরিকা। (পয়সা প্রযোজ্য)
খ) প্রায় প্রথম এ্যাডটির আদতেই করা এটিও, শুধু চরিত্রের লিঙ্গ পরিবর্তন। স্ত্রী’র পরিবর্তে এবার পুং লিঙ্গের চিত্রায়ন। তারও একই দশা, বেশ সুদর্শন, টাইট ইন করা শার্ট – প্যান্টের সাথে গলায় ঝোলানো দড়ি (টাই) স্পষ্টতই প্রমাণ করে ছেলেটি ‘স্মার্ট’ শুধু স্মার্ট বললে ভুল হবে ‘ওভার স্মার্ট’। শহুরে জীবনে চলার পথে এমন কৌশল সে জানে যেকোন প্রতিকুলতার হাত থেকেই নিজেকে বাচিয়েঁ তোলা সম্ভব। কিন্তু দৃশ্যায়নে তখনই অস্পষ্ট চিত্রের ভাষায় ‘আনস্মার্ট’ বা ‘ক্ষ্যাত’ হিসেবে দেখানো হয় যখন জানা যায় এতসব কিছু জানলেও ইংরেজী জানার প্রতি রয়েছে তার দূর্বলতা। আর তখনই আবির্ভাব হয় সেই ‘জানালা’ যা দিয়ে সহজেই প্রবেশ করে ইংরেজী শেখার সকল তরিকা। (অবশ্যই পয়সা প্রযোজ্য)
লেখক হিসেব আমি যতটা আনস্মার্ট হইনা কেন, পাঠক হিসেবে আপনারা নিশ্চয় ততটা নন, অবশ্যই স্মার্ট বা ওভারস্মার্ট। এখানে পাঠক অবশ্য একজন দর্শকও বটে। আপাতত দর্শকের ভূমিকায় থেকে চিন্তার সম্প্রসারণ করি। উপরের এ্যাড দুটিকে খুব বেশী সময় টিভিতে দেখিনি, হয়তো বাস্তবভিত্তিক চিন্তায় ‘অবাস্তব তুলনা নির্ভর’ দৃশ্যকল্প দর্শককুলকে সাময়িক আনন্দ দিতে সক্ষম হলেও ‘সংখ্যা তত্ত্ব’ হিসেবে যে ‘লার্নার’ (কাষ্টমার) পাওয়ার কথা ছিলো তা হয়তো না পেয়েই পরবর্তীতে ‘বাস্তবসম্মত’ এ্যাড নির্মাণের দিকে ঝুকেঁ যান ইংলিশ শেখানোর প্রচারকেরা।
এবার আসি সেই প্রসঙ্গ কেন্দ্রিক এ্যাডটির বণর্ণায় :
বাড়ীর গৃহিনী সকালে নাস্তা তৈরীতে ব্যাস্ত। নিশ্চয় অফিসের উদ্দেশ্যে কর্তা কিছুক্ষণ বাদেই বেরিয়ে পড়বেন। এদিকে কর্তা তখন গোসলখানায়। পানির ঝিরঝির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ঠিক সে সময়ই কর্তার মোবাইলে কল আসে। অনুগত গৃহিনী দৌড়ে এসে মোবাইলটি ধরে গোসলখানার দরজায় মুখ রেখে কর্তাকে জানান দেন, মোবাইলে ডাক এসেছে। মোবাইলের রিংটোন ততক্ষনে বেজেই চলেছে। কর্তা ওপাশ থেকে গৃহিনী’কে মোবাইলের ডাকটি রিসিভ করার আদেশ দেন। গৃহিনী কিছুটা বিচলিত – কি করবেন? ওপাশে চুলোয় রান্না চাপানো, এদিকে - সাতপাঁচ ভাববার আগেই মোবাইল রিসিভ করেন। ব্যাস, ঘটনা ফিট – মোবাইলের ওপার থেকে ভেসে আসে বৈদেষিক ভাষার মানুষের কন্ঠ। গৃহিনী এবার তো পুরো “ধরা খাওয়া’র ভঙ্গিতে একেবারে ভ্যাবাচাকা অবস্থা। পারলে গোসলখানায়ই মোবাইলটা চালান করে দেন, কর্তার ফোন কর্তাই কথা বলুক। কর্তা আবারো তাকে আদেশ দেন ‘কিছু না কিছু’ বলার জন্য। এই ‘কিছু না কিছু’ কি বলবেন তা তখন গৃহিনীর ভাবনায়, আর টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা আমরা দর্শকদের অবস্থা অনেকটাই নাজুক, কিন্তু না সবাইকে তাক লাগিয়ে অবাক বিষ্ময়ে খুব সুন্দর এবং স্পষ্ট ভাষায় বিদেশীকে অনুরোধ করছেন ‘কিছুক্ষন পরে ফোন দিতে’ – এবং তা অবশ্যই ইংরেজী ভাষায়। বিষ্ময়ের তখনো বাকী, এবার কর্তা নিজেই ‘কট বিহাইন্ড’ গৃহিনীর এমন পারদর্শিতায়। তাই যখন গোপন রহস্যের কথা জানতে চান, গৃহিনী পায়ের উপর ভর করে নিজেকে উঁচু করে বলেন ‘বিবিসি জানালা’
এ্যাডটির সমাপ্তি ওখানেই; কিন্তু না তারপরেও কিছু সময়ে টেক্সট এ্যানিমেশনে দেখানো হয়েছে কিভাবে কত নম্বরে কল করে পয়সা’র বিনিময়ে আপনাকে সেই ‘জানালা’ সরবরাহ করা হবে তার বিবরণ।
প্রথম দুটি এ্যাড থেকে তৃতিয়টি যে বাস্তব বিবর্জিত নয়, সেদিকে পরিচালক এবং প্রচারক উভয়কুলই প্রশংসার দাবী রাখেন। এ্যাডটি দেখার পর হয়তো আমরা কেউ কেউ বাহাবা দিয়েছে এই ভেবে, আমাদের নারী সমাজ বিশেষত: বাড়ীর গৃহিনীরাও এখন ইংরেজী বলতে পারছে সেই ‘জানালা’র সুবাদে। এমনটা ঘটে থাকলে আমি নিজেও সাবাশ দেবার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। বীরত্বকে তো অন্য কোন কপটতা দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব না।
সবার দৃষ্টিভঙ্গী নিশ্চয় এক হবার কথা নয়, ভাববার বৈচিত্র তো আছেই। আমার দৃষ্টিকোণে এ্যাডটিতে নারীকে হেয় বা ছোট করার যে মানসিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিলো পরিচালক সুচারুরুপে প্রচারকের গুণকীর্তি গাইতে গিয়ে শেষে তাকেই মহান করে তোলেন। একটি পারিবারিক সম্পর্কের দুটি চরিত্রের উপর নির্ভর করে তুলনামূলক বাড়ীর কর্তাকে ‘বড়’ এবং গৃহিনীকে ‘ছোট’ করে দেখানো হয়েছে। এক্ষেত্রে, তিনি কতটাই বা সফল হয়েছেন ? অসফলতার কথা নয়; উপস্থাপনার তাগিদে যেনো অপ্রাসঙ্গিক কোন প্রেক্ষাপট ‘মূল বিষয়বস্তু’ না হতে পারে সেটাই চিহ্নিত করাই এ লেখার সূক্ষ প্রয়াস।
একদা নেপোলিয়ান বলেছিলেন “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদেরকে একটি শিক্ষিত জাতি দিবো” – অপরপক্ষে বেগম রোকেয়া তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার চিত্র এভাবেই লিপিবদ্ধ করেছিলেন “অনেকে বলেন, স্ত্রীলোকদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নাই। মেয়েরা চর্ব্ব্য, চোষ্য রাধিতেঁ পারে, বিবিধ প্রকার সেলাই করিতে পারে, দুই-চারিখানা উপন্যাস পাঠ করিতে পারে, ইহাই যথেষ্ট” – দুজন মহানের কথায়ই স্পষ্টত – অস্পষ্টত প্রমাণ মেলে আমাদের জাতিকে জ্ঞাণত সমৃদ্ধরুপে দেখতে চাইলে তা একজন শিক্ষিত নারীর উপর অনেকাংশই নির্ভরশীল। এজন্য তাকে কর্মে-গুণে-মহিমায় অনন্যা হতে হবে, যার বাহক শিক্ষা।
ওই এ্যাডটির পরিচালক ও প্রচারক এই ‘শিক্ষা’ শব্দটির উপর ভর করেই আমাদের দৃষ্টিকোণকে সরাতে চেয়েছিলেন, আর সেখানেই আমাদের বাড়ীর গৃহিনীদেরকে এমন একটি ‘ক্যাটাগরী’তে নিয়ে অবস্থান দেন যেখানে বাংলাদেশের প্রকৃত নারী শিক্ষার হারকেই তীরবিদ্ধ করেছে। স্পষ্টতই প্রমাণ করেছে তাদের অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষা যোগত্যা, ইংরেজী না পারা এবং ভীত বোধ তাদেরকে সমাজের চোখে ছোট থেকে ছোটতর করেছে। এবং অপেক্ষাকৃত সকল যোগত্যা পুরুষকেন্দ্রিক। তারাই সবটার ধারক ও বাহক, তাই স্ত্রীর বলা ইংরেজী কথাতে বিন্দুমাত্র বিষ্ময়বোধ প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি এ্যাডটির কর্তা। এখানেও আরেক দফায় গৃহিনী’কে অপদস্থ হবার প্রয়াস ছিলো, তাচ্ছিল্যের প্রকাশ বলাই বাহুল্য। অবশ্য পরিচালক ‘না বলা ভাষায়’ তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ‘দৃশ্য অভিনয়ে’ !
একটি পারিবারিক টেলিভিশনে যখন এ্যাডটি প্রচারিত হতে থাকে, পরিবারের সকল সদস্যের মাঝে আমাদের গৃহিনী’রাও থাকেন। তার সন্তানেরা বা তার সন্তানের সন্তানরাও থাকেন। যখন এ্যাডটি দেখে কারও বুঝতে বাকী থাকেনা ‘গৃহিনী’র ইংরেজী ভীতি বা স্বল্প শিক্ষিতা বা অশিক্ষিতা তখন ইংরেজী স্কুল পড়ুয়া কোন বাচ্চা সন্তান ইংরেজীতে প্রশ্ন করে থাকে “আর ইউ অলছো লাইক দ্যাট ?” – তখন আমাদের গৃহিনীর কাচুমাচু মুখে শত-সহস্র চেষ্টায় উত্তর খুজতে ব্যার্থ অসফল-লজ্জিত মুখখানিতে পারিবারিক যে অসম্মানের ভীত গড়ে উঠে তা কি ওই এ্যাড বিন্দুমাত্র মোচন করতে পারবে ?
এ্যাডটিতে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, আমাদের বাসা-বাড়ীতে যে গৃহিনীরা কাজ করেন তার অধিকাংশই এমন শিক্ষিতা যারা ইংরেজী বুঝতে ও বলতে চরম মাত্রায় অদক্ষ। আমিও অস্বীকার করছিনা, আমাদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় বর্তমান যে ধারা তাতে শুধু গৃহিনী কেন কর্পোরেট অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মদক্ষ কিন্তু ইংরেজীতে বলা বা লেখায়ও অনেক অদক্ষ পুরুষ ও মহিলা উভয়কেই পাওয়া যাবে। কিন্তু একটি সামাজিক এ্যাডে কেনো নারী’কে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে হলো, অবশ্য সে রাস্তা থেকে উত্তোরণের পথও বাতলে দেয়া হোলো – তার একমাত্র সমাধান “বিবিসি জানালা”।
আমাদের নীতি নির্ধারকদের গলাধকরণ: করানো হয়েছে – ইংরেজীতে পিছিয়ে থাকা আমাদের নারীদেরকে সেই ভাষা শেখানোর মহান কাজটি করছে ‘বিবিসি’, আমার আপত্তি সেখানে না – বিষয়টি সবার জন্যই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু কেন নারী ভূমিকায় থাকবে ? সেখানে তো কোন পুরুষকেও দেখানো যেত ? নারীকে কোন বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ‘দূর্বল’ দেখানোর অর্থ তো সুষ্পষ্ট – তাকে হেয় বা অপমানিত করা।
একজন নারীকে এখনো আমরা ঘরের চারকোণায় বন্দী করে রাখতে যায়, সে নারীর কপালে এ বন্দীদশা শুরু হয় তার নিজ গৃহ হতেই, তারপর স্বামীর গৃহ – অত:পর জীবনের শেষ দিনগুলোতে কোথাও না কোথাও বন্দীদশাতেই কেটে যায় বাকী সময়গুলো। নারী বেরিয়ে আসতে চাইছেনা ? না আমরা বেরিয়ে আসতে দিচ্ছিনা ? তাহলে প্রতিবন্ধকতা কোথায় ? এটাই কি স্পষ্ট আমরা প্রতিবন্ধকতাকে লালন করছি, পুষ্টি দিয়ে তাকে বড় করছি – যেখানে নারীর স্বাধীনতাকে হরণ করার প্রত্যেকটা সূত্রই রয়েছে ?
শেষ করছি একটি সম্ভাব্য আংশকা নিয়ে,
খুব শীঘ্রই প্রচার পাবে অনুষ্ঠানটি যেকোন টেলিভিশনে, নারী সংঘ আয়োজিত ‘আর্ন্তজাতিক নারী দিবস’-এর শর্তবর্ষে পদার্পন উপলক্ষে নারীর অধিকার, দাবী ইত্যাদি যৌক্তিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন দেশের প্রথম সারির নারী আন্দোলনে সক্রিয় কয়েকজন নারী।
আশংকার কথা এই, সেই অনুষ্ঠানটি প্রচার সহযোগিতা করছে ‘বিবিসি জানালা’ খ্যাত সেই বিখ্যাত এ্যাডটি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

