somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বৈশাখী প্রস্তুতি

১২ ই এপ্রিল, ২০১০ দুপুর ২:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আরবীতে একটা লাইন “ ইন্নামাল আমানু বিননিয়্যাত” – অর্থ্যাৎ সকল কাজ নিয়াতের উপর নির্ভরশীল। সরল অর্থে, আপনি যে কাজটি করবেন বা শুরু করতে যাচ্ছেন তার সম্পূর্ণটাই নির্ভর করবে আপনার পূর্ব প্রস্তুতির উপর। প্রস্তুতি ভাল থাকলে কাজটা শুরু করা যেমন সোজা তেমনি চালিয়ে নিয়ে যাওয়াতেও অনেকখানি এগিয়ে থাকা যায়।

‘প্রস্তুতি’ নিয়ে বলার রহস্য, আজকাল হর-হামেশাই এই শব্দটার যথেষ্ট যাচ্ছেতাই ব্যবহারের নমুনা পাই। যদিও শব্দটার কোন বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও ‘প্রস্তুতি’ এখন আমাদের দিন-দিবসের মত সার্বক্ষণিক-সর্বময়।

‘পরীক্ষার প্রস্তুতি’ একসময় খুব এবং আজও কিঞ্চিত জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত শব্দ-জোড়া। ঠিক এখন থেকে আগে যখন মানুষ তার ভাবনার সীমাবদ্ধতায় প্রশস্ত কল্পনাশক্তিতে আনতেই পারেনাই; উৎসব, পর্বন কিংবা অনুষ্ঠান ইত্যাদি সমজাতীয় শব্দসমূহ ‘প্রস্তুতি’কে দখল করে নিবে; এক বিলাসিতায়।

একটা উদাহরণ টেনে ধরি, কাল রাতে যখন বাতি নিভে গেলো. দখিনা বারান্দাতে অন্ধকারে বসে রেডিও টিউন করছিলাম। আরজে রিসিভ করা এসএমএস গুলো বলে যাচ্ছিলো একের পর এক, এসএমএস পাঠেনেওয়ালাদের বেশীরভাগই আগ্রহ ছিলো সেলিব্রিটি আরজে’র ‘বৈশাখী প্রস্তুতি’ কেমন ? নি:সন্দেহে সুচতুর আরজে তাদের প্রত্যেকের মন বাচিয়েঁ উত্তর দিতে থাকেন, পাল্টা প্রশ্ন এবং টপিকও দিলেন তাই; ‘আপনাদের পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি কেমন তা জানিয়ে এসএমএস করুন .......... নম্বরে’।

ধরুন, ‘পরীক্ষার প্রস্তুতি’ কেমন জানতে চাওয়া হলে, উত্তর মিলবে গন্ডীর মধ্যে সাদামাটা ‘এইতো মোটামুটি’ কিংবা বেশী হলে ‘ভালো’। কিন্তু বৈশাখীর প্রস্তুতি ? ধূসর তো নয়, নতুনের মত জ্বলজ্বলে সাত রঙা। ‘নিজের একটা ফতুয়া, বাচ্চার জন্যও কেনা হয়েছে, আর ও .....’ ‘ইলিশ এনেছি তিনটে, দুটো বড় আর .....’ ‘রমনার বটমূলে তো যেতেই হবে .. মেকআপ কি নিবো এখোনো .....’ ইত্যাদি

আমার এ লেখাটা সংকলিত হতনা, যদি না সেদিন এরকম একটি ঘটনার মুখোমুখি হতাম। সংক্ষেপে বলি, আমার অফিসের এক কলিগ (ম্যডাম) তিনি স্ব-আগ্রহে জানতে এবং জানাতে এসেছেন ‘বৈশাখী প্রস্তুতি’ কেমন ! কিছুটা বিষ্মিত এবং অনুসন্ধানী সুরে জানতে চাইলাম ‘কেমন প্রস্তুতি’, তিনি তার বণর্নাটাই দিলেন- নিজের, বাচ্চাদের এবং হাজবেন্ডের প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে বৈশাখী পোষাক করেছেন, পান্তা – ইলিশেরও ব্যবস্থা হয়েছে, সকাল থেকে বিকেল অব্দি এবং রাত (পহেলা বৈশাখের দিন) কোথায় কোথায় কাটানো হবে তাও ঠিক করে রেখেছেন এবং আরো ইত্যাদি।

আমি কিছুটা ভেবে তাকে বসার আমন্ত্রণ জানই এবং চা অফার করি। আমাদের অফিস রুমে আমি ছাড়াও আরো তিনজন বসেন, ম্যাডম অন্য অফিসের। চা খেতে খেতে তাকে একটি প্রশ্ন করবার অনুমতি প্রার্থনা করি। তিনি সায় দিলে জানতে চাই “আজকে বাংলা তারিখের হিসেবে কোন সাল এবং কত তারিখ” – ম্যাডাম কিছুটা বিব্রতবোধে নিশ্চুপ হয়ে পড়েন, আমি অভয় দিয়ে, কোন দিন-পঞ্জিকার সাহায্য না নেয়ারও অনুরোধ করি। সত্যি তিনি এবার অসহায়ের মত আমার অন্য কলিগদের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলে আমার বোঝার আর অবকাশ থাকেনা ‘বৈশাখী প্রস্তুতি’ তিনি যথেষ্ট পটু হলেও স্বকিয়তার ক্ষেত্রবিশেষে তিনি অন্তসারশূণ্য।


ঠিক, একই প্রশ্নটি সম্ভাব্য বৈশাখ উৎসব পালন করবেন এমন বন্ধু-বৎসল, সহকর্মী এবং অনেকের কাছেই রেখেছিলাম, সবাই দু:খিত বললে, আমার বিষ্ময়ের সীমা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। এক অজানা আশংকা, ভয় ঘিরে ধরে, যখন আমরা নিজেরাই একটি প্রজন্মের ধারক ও বাহক হয়ে বাঙ্গালী ঐতিহ্যের মূল (বেসিক) প্রশ্নে নিজেরদেরকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছি, সেখানে ভবিষ্যত বংশধরদের দিকটা চিন্তা করার সাহসই হয়নি।

এ কথা অনস্বীকার্য, শহুরে ইট-ইস্পাতের ব্যস্ত জীবনে বছরের দু-একটা পর্বন-উৎসব আমাদের বিনোদেনের অনন্য মাধ্যম। এরই মাঝে বারেবারে খুজেঁ ফিরতে চাই ক্লান্তি অবসানের অবসর। কিন্তু সেটা যে শুধুই ‘দিন’ বা ‘দিবস’ নির্ভর আনন্দ-উৎসবের মিলমেলা ছাড়া আমাদের ব্যবহারিক দৈনন্দিন জীবনে তার বিন্দুমাত্র প্রভাবটুকু থাকছেনা, সেটাই ভয়ের- ভুত এবং ভবিষ্যতের।

একটি দিবসের মহত্ম শুধু ওই চব্বিশ ঘন্টার সময়ের হিসেবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নই। আমরা অনুপ্রেরণা পাই, উৎসাহিত হই, নিজেদেরকে সংগঠিত করি, দৃঢ় অঙ্গীকার প্রত্যয়ে। সমাজ-সংস্কৃতি এমনকি রাষ্ট্রে যুক্ত হয় নতুন-পুরনোদের প্রতিশ্রুতিশীল আগামী দিন গড়বার সংকল্পে।

আমরা ঐতিহ্যকে লালন করছি শত-যুগ ধরে, ভিন্ন আবহে এবং আঙ্গিকে, ভালবেসেছি আমাদের সংষ্কৃতিকে, তার ভাষা, আচরণ এবং মূল্যবোধকে। আমাদের ইতিহাস পুন:জাগরণের, শক্তি সঞ্চারের, সমুন্নত জাতিবোধের চেতনায় উদ্ভুদ্ধ।

কিন্তু যেখানে আনন্দই উপভোগ – উপভোগে উদযাপিত; এই সমীকরনে এগুতো থাকি তখন পহেলা বৈশাখের সাত দিন আগেও যখন আমরা বলতে পারিনা বাংলা সাল ও তারিখ, সেটাতে খুব আশ্চর্যিত হবার কিছুই থাকেনা। একটি বছর শেষে নতুন বছরের প্রথম দিনে পুরোনো গ্লানি, অবষাদকে ফেলে, নতুন উদ্যোমে বর্ষবরণের পূর্ণতা খুজিঁ, কিন্তু পূর্ণতা কি সেটাই ? বিনে চর্চায় পুরোটা বছরের ঐতিহ্য কে ভুলে একটি দিনের অপেক্ষা মাত্র ?

আমাদের প্রস্তুতি আছে, সাথে রয়েছে প্রাপ্তি এবং সবিশেষ পূর্ণতা। পূর্ণতার সুখাবহ আমাদেরকে আবিষ্ট করবে ঠিকই কিন্তু মোহাবিষ্ট নয়, এটাই প্রত্যাশা এবং কামনা নতুন বছরের এমন আগমনের সূচনায়।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০১০ দুপুর ২:৪২
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×