আমার কোন বোন নেই, দু ভাই আমরা। আমি বড়। অনেকদিন আগের কথা এখনও মনে আছে, একটা আপুর জন্য নাকি অনেক বায়না ধরতাম বাবা-মায়ের কাছে। তখনও জানতাম যাদের নাকি বোন থাকে সেই বোন নাকি শুধু আপু হয়। আমারও আপু হবে, ও খুব চঞ্চল হবে, খুব দুষ্টুমী করবে, বায়না ধরবে আর নাক-গাল ফুলিয়ে চিৎকার করে কাঁদবে।
ওর সেই কাঁদবার শব্দ কখনো পাইনি, কিন্তু কখন কিভাবে যে সেই আপুটার জন্য আনমনে বহু শতবার একা একা চোখের জল ফেলেছি, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেদেঁছি আবার চোখের জল গালের স্পর্শে আসতেই তা মুছেও ফেলতাম । হা হা হা, বড্ড হাসি পায় এখন, কত পাগলামী-ই না করেছি। প্রতিবেশীর কোন পিচ্চি বোন থাকলে তাকে ধরে নিয়ে আসতাম, লুকিয়ে লুকিয়ে। নিজের কাছে রেখে দিতাম ফেরত চাইতে গেলেই বিপত্তি ঘটতো, জগৎজাড়া কান্না জুড়ে দিতাম, আমার সেই কান্নার শব্দে সেই বোনটাও কেঁদে উঠতো। সবাই হাসতো তখন কিন্তু আমি কিছুই বুঝতাম না।
বড় হতে লাগলাম, একটা শূন্যতা ছিলো সবসময়, নিজের কাছে অনেককিছু থাকবার পরেও কিছু একটা না থাকার তীব্র অভাববোধে অনেক কষ্ট পেতাম। নিজেকেই সামলাতাম। কেউ বুঝুক আর নাই বুঝুক।
...................................................................................................
যেখানটায় কাজ করি, ছোট্ট একটা অংশ আছে “কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি”, খুব বেশী পরিসরে না হলেও সামান্যই যা, তাতে যারা অর্থের অভাবে চিকিৎসার অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন না, তাদের সাহাযার্থে কিছু করার প্রচেষ্টা।
বেশ কয়েকমাস আগের একদিন, আমি ডেস্কে কাজ করছি; একটা ছোট মেয়ের কন্ঠ শুনতে পেলাম আমার সামনের ওয়ার্কস্টেশনে বসা ম্যানেজারের সাথে এক আলাপচারিতায়। মনিটর থেকে চোখ ফিরিয়ে একবার দেখে নিলাম। অনেক অনুরোধ ছিল, আবদার ছিলো যেন শত প্রচেষ্টাতেও এই কাজে তাকে সাফল্য পেতেই হবে। মেয়েটার বয়স কত হবে ? হিসেবে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে এইরকম।
প্রায় ৫মাস পর। মেয়েটার চেহারা মনে ছিলোনা। আজ আবার এলো। ও একটা এপ্লিকেশন দিয়েছিল সেবার, ডোনেশন বক্স বসানোর জন্য। কিন্তু সেটা বসবে তাও প্রায় বছর খানেক পর। কিন্তু হঠাৎ আজ এলো কেন ? প্রশ্ন’টা করতেই মেয়েটা গলা ধরে এলো, দু-একবার চোখের পাতা বন্ধও করলো। স্পষ্ট দেখতে পেলাম মেয়েটা খুব সযতনে চোখের জল মোছার চেষ্টা করছে। ভারী আর কাঁপা গলায় বলতে না চাইলেও, জানালো এপ্লিকেশন’টা উইথড্র করতে এসেছে। আর বেশী কিছু জিজ্ঞেস করিনি, বুঝতে পেরেছিলাম।
কি অদ্ভূত একটা মায়া তার চোখে। তার ভাইটি মারা গিয়েছে এই ডিসেম্বরে। ক্যান্সার বাসা বেধেঁছিলো। অনেক চেষ্টাও করেও কিছুই হয়নি। যেভাবে বলছিলো কথাগুলো মনে হলো, তার ভাই তার সাথেই রয়েছে। আর তার ভাই যে নেই একথা সে এখনও বিশ্বাস করেনা, সবাই নাকি মিথ্যে বলে।
পেন্ডিং ফাইলটা থেকে ওর দেয়া এপ্লিকেশনটা বের করলাম, বললাম “ঠিক আছে, আমরা ব্যবস্থা নিবো” মেয়েটা উঠলো, কি ভেবে আবার পেছনে দাড়ালো। শুধু বললাম “আপু, তুমি এটা নিয়ে মন খারাপ করোনা, পৃথিবীটা এমনই – আমাদের সবাইকেই একদিন যেতে হবে।” আমাকে কিছু বলতে গিয়েও বললোনা। চলে গেল। ভাইয়ের ছবি দেয়া এপ্লিকেশন পেপারটা তখনও আমার হাতে, “এক্সপায়ার্ড” শব্দটা বড় বড় অক্ষরে লিখে অফিস এটেন্ডেন্টকে ডাক দিলাম।
মেয়েটা চলে গেলে, অসম্ভব এক শূণ্যতা নিজের পাজরে গেঁথে গেল, কাউকে বোঝাবার মত নয় সেই লুকানো ব্যথাটা, কর্পোরেট কালচারে খুব বেশী আবেগী হওয়াটাও ভাল না। সে দীক্ষাই নিজেকে সামলে নিতে নিতে শুধু একটা কথাই ভাবলাম “আজও আমার কোন বোন নেই”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


