আজ অফিসে লাঞ্চ আওয়ারে আড্ডাবাজির সময় এক কলিগের সাথে তর্ক বেঁধে গেল। তাহার ধারণা মানব জীবনের এবং সমাজের সকল সমস্যার মূল হচ্ছে ধর্ম (ইসলাম) ঠিকমত পালন না করা। তার ধারনা সমাজের সবাই যদি ইসলামি অনুশাসন ঠিকমত মেনে চলতো তবে সমাজে কোন সমস্যাই থাকতো না। বেচারা নিতান্তই সাদাসিধা মানুষ। ধর্ম যে সব সমস্যার সমাধান নয় তা নিয়ে কিছু যুক্তিতর্ক উত্থাপনের পর সে বলে বসলো, "আপনি নাস্তিক মানুষ, ইসলাম সম্পর্কে জানেন না তাই এটা বলতেছেন। ইসলামই পরিপূর্ণ জীবন ব্যাবস্থা। এখানেই আছে সমগ্র মানবজাতির মুক্তি।" বেচারার তালগাছ নিয়ে কাড়াকাড়ি না করে তর্কে ক্ষান্ত দিলাম। সন্ধায় অফিস থেকে বের হয়ে পরলাম বিরক্তিকর জ্যামে। রাস্তার আসেপাশের দৃশ্যাবলি দেখতে দেখতে চোখ পরলো এক ক্যানভাসারের দিকে। সেই লোক মাইক ব্যাবহার করে বিভিন্ন ধরণের কবিরাজি ঔষধ বিক্রি করছে। আর গোটা চল্লিশেক লোক চারিদিকে জটলা তৈরী করে রেখেছে।এই ধরনের বিক্রেতাদের সাধারণত একটা অদ্ভুত ঔষধ বিক্রি করতে দেখা যায়- সর্বরোগের মহৌষধ। যেটা ব্যাবহারে নাকি জটিল সব রোগ ভালো হয়ে যায়। এটা ভাবতে ভাবতেই মনে পরলো সহকর্মীর বানী- "ইসলামেই আছে সমগ্র মানবজাতির মুক্তি।"
সকল ধর্মের সাধারণত দুইটা ভিন্ন দিক রয়েছে। একটা হচ্ছে বিশ্বাস, আর আরেকটা হচ্ছে আচার। বিশ্বাস অনেকটাই ব্যাক্তিগত। কোন ব্যাক্তি কি বিশ্বাস করছে তা সমাজের ওপর সরাসরি কোন প্রভাব ফেলে না। ধর্মীয় আচারের ব্যাক্তিগত ও সামাজিক উভয় ধরনের প্রভাবই রয়েছে। ধর্মীয় আচার আবার বিশ্বাস হতে উদ্ভুত। অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় আচার ব্যাবহার ধর্মের (অর্থাৎ আধ্যাত্মিকতার) গন্ডি ছাড়িয়ে সমাজের অন্যান্য বিষয়ের ওপরও আধিপত্য করতে চায়। এই ক্ষেত্রে যেই বিশ্বাসটি কাজ করে তা হলো, ধর্ম যেহেতু ঐশ্বরিক এবং ঈশ্বর যেহেতু সকল ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে তাই ধর্ম সকল ক্ষেত্রে যে সমাধান দেয় তাই সঠিক সমাধান। সত্যিই কি ধর্মে রয়েছে সকল বিষয়ের সমাধান?
এই বিষয়ে আমি তিনটি যুক্তি উপস্থাপন করতে চাই:
১. ঈশ্বরের অস্তিত্ব এখনো অপ্রমানিত বিষয়
২. ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমানিত হলেই ধর্ম সমূহের ঐশ্বরিক উৎস্য প্রমানিত হয় না
৩. ধর্মের ঐশ্বরিক অস্তিত্ব মেনে নিলেও বলতে হবে, ধর্মীয় আচার আচরন ও অনুশাসনে মানুষের হস্তক্ষেপ রয়েছে। ধর্মগ্রন্থের একই বাক্যের শতরকমের ব্যাখ্যা রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোই পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই সকল ব্যাখ্যা একই সাথে সত্য হতে পারে না। এখানে ব্যাখ্যাকারীর ব্যাক্তিগত মতামতই মূলত প্রকাশিত হচ্ছে।
মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষ অনেক বিষয়েই জ্ঞানার্জন করছে, অনেক পুরানো সমস্যারও সমাধান করতে সক্ষম হচ্ছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ধর্ম অনেক ক্ষেত্রেই অনেক সমস্যার সমাধান দেয়। যদিও তা বিশ্বাসের ভিন্নতা হেতু সবার কাছে গ্রহনযোগ্য হয় না। কিন্তু সকল বিষয়ের সমাধান দেয়া ধর্মের পক্ষে সম্ভব নয়। বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজ-বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান; জ্ঞানের এসকল শাখা অনবরত অনেক কিছু আবিস্কার করে চলেছে। মানবজাতির কল্যাণ নতুন নতুন জ্ঞানের সন্ধানের মধ্যেই নিহিত। মধ্যযুগে প্রবর্তিত কোন ধর্মে সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে ভেবে জ্ঞান-বিজ্ঞান হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া হবে আত্মঘাতি।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ১১:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


