..........মন ছুটে চলে স্বপ্নবাড়ি, রোদেলা দুপুর , মেঠোপথ, শাপলা বুকে জলে ভেজা নারী, ডাহুক ডাকা রাত, খোলা জানালায় আশ্বিনের চাঁদ, কমলা রোদ, ধানের মাঠ, নদীর পাড়, কাশবন........আর ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া কিশোরীর হাত-আমাকে পাগল করে চার দেওয়ালে ঘেরা শহুরে বেশ্যার রাত! ঘুমোতে পারিনা, চোখ জ্বলে স্মৃতির কামড়ে, অন্ধকার মানে নিঃসঙ্গতার সাথে গোপন সঙ্গম। আমাকে মা কর কলমী তোলা প্রিয় কিশোরী, মা কর হেমন্তের ধানকাটা উলঙ্গ মাঠ, মা কর নির্মলাদি তোমাকে বলেছিলাম ফিরবো আজও ফিরিনি, তোমার ছেঁড়া শাড়িটা পাল্টিয়ে দিতে পারিনি অথচ আমার খুব ইচ্ছে তোমাকে একটা টাঙ্গাইল শাড়ি কিনে দেই!
...........একবার চেয়েছিলাম সব ছেড়ে একদৌঁড়ে চলে যায় বর্ষা ভোরে। আইলের পিচ্ছিল মাটি আমাকে কি আটকে রাখতে পারবে? যদি ডিগবাজি খেয়ে পড়ে যায় আমি দ্রুত লাফ দেবো আমাদের শানবাধানো পুকুরে। মনে পড়ে প্রিয় কিশোরী জামগাছটার মাথায় উঠে একলাফে পড়তাম পুকুরে। তুমি বলতে একলাফ এক চুমু, আমি লাফের পর লাফ দিতাম কিন্তু কখনও চুমু খাওয়া হতো না। তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে জামের আচার আনতে, আমি তোমার হাতে আচার খাওয়ার লোভে কতদিন যে স্কুলে যায়নি! প্রিয় কিশোরী আজ তোমার হাতে জাম কই অথচ আজও আমার হাতে জামের গন্ধ.......।
............রাত মানে মৃত্যুর পূর্ব প্রস্তুতি। যে বার বুঝলাম এই রোবট শহরে ঘড়ির কাঁটা কেবলই শ্রমের, এখানে মনে মনে মনে রাখার ব্যাপারটা নিছক কল্পনা, যে বার এ শহর আমার কাছ থেকে কেড়ে নিল প্রিয় ভালবাসাটাকে টাকার অংকে, খুব ইচ্ছে হচ্ছিল একবার মরে গিয়ে বিধাতার সম্মুখে দাঁড়ায় প্রশ্নর্কতার ভূমিকায়......প্রিয় কিশোরীর মুখটা আজ খুব মনে পড়ে না, শুনেছি ভাল আছো কিন্তু প্রিয় ভালবাসাটা আমাকে কুরে কুরে খায়, প্রিয় কিশোরীটা ছিল ভাললাগা, প্রিয় ভালবাসাটা ছিল মোহ, পাওয়ার।
............ এইসব আগডুম বাগডুম চিন্তা করে পাড়ি দিচ্ছি এলোবেলে সময়গুলো। বৃষ্টি, মেঘ, কৃষ্ণচূড়া, গোলাপ, জন্ম, মৃত্যু, ভোর, রাত সব একই। সমীকরণ মেলে না। বন্ধুত্বের পাখা মেলার আগে হারিয়ে যায়, ভালবাসা হারানোর ভয়ে মুষড়ে পড়ি, সম্পদের সাধনায় সততা বিসর্জন দিতে পারিনা, রাত হলেই কেবল হিসাব মেলাতে বসি, ইচ্ছে করে নিকোটিনের বিষাক্ততায় নিজেকে পুড়িয়ে ফেলি, বুকটা, ফুসফুসটা পঁচে যাক....পারিনা প্রিয় ভালবাসা আমাকে হারতে নয়, জেতাতে চাই। অথচ আমি ভালবাসাবিহনে বেঁচে থাকাকে বলি অর্ধমৃত!
............বেদনার চাদর গায়ে কষ্ট চেপে শুয়ে থাকি। নীল কষ্ট, লাল কষ্ট, হলুদ কষ্ট.....সবচেয়ে বড় কষ্ট এই শহর আমাকে বুঝে না, এই শহরের রাস্তায় রাস্তায় আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ে, বড় বড় দালানের ফাঁকগলে হাসতে পারে না আমাদের সুরুজ, রেললাইনে আমাদের আত্মজা থাকে, নালার উপর দুগ্ধবতী মা শিশুকে জড়িয়ে রাখে তবুও সবচেয়ে সুখী দেশের মানুষ হিসেবে নামকামাই আমরা। কেবল রিয়েল স্টেট কোম্পানি আকাশ বিক্রিতে মেতে উঠেছে, শহরের খুঁটি পাহাড়গুলো কেটে কেটে আবাসিক প্লট বানাচ্ছে, প্রকৃতি আজ ভারসাম্যহীনতায় কষ্টে মূহ্যমান।
.............প্রিয় ভালবাসা তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি সুনীল হয়েই ছিলাম, তুমি বরুণা হতে পারোনি, তোমাকে দোষ দেইনা, কেন এক আগন্তুকের হাতে তুলে দেবে তোমাকে, যেখানে চালের ড্রামে টাকা থাকে, যেখানে চাঁদাবাজি করে গাড়ি, বাড়ি করে আমাদের মহান ত্রাতারা তাদের হিংস্রথাবা থেকে তোমাকে পাওয়া আর আকাশ থেকে চাঁদ পেড়ে খাওয়া একই।
............আজ খুব বৃষ্টি হচ্ছে। ভেবেছিলাম এই বরষায় তোমাকে বেলী ফুলের মালা দেব। কদমের ছোঁয়া দেব তোমার গালে। কিছুই হয়নি। বৃষ্টির আগেই তোমাকে হারিয়েছি। এই পাহাড়ের নিচে ছোট্ট ঘরটা যে দিন ভাড়া নিলাম তুমি বললে একদিন আমার সাথে এই পাহাড়ে উঠবে, আমার হাত ধরবে তারপর উপর থেকে নিচের দিকে তাকাবে নিচের জিনিসগুলোকে কেমন দেখায় দেখবে। পাহাড়ের গা ঘেষা ঘরটায় তোমার আসা হয়নি। আমিই একা পাহাড়ে উঠেছি। কেমন দেখায় জান, খুব ছোট আমার মত। আমি ছোট বলেই আমার আর গায়ে ফেরা হয়নি, আমি ছোট বলেই আমার শহর আমাকে আমার ভালবাসা দেয়নি, আমি ছোট বলেই সব নিঃসঙ্গতার পাহাড় বুকে চেপে পাড়ি দিচ্ছি কষ্টময়...দিন...রাত।
........অতঃপর মাটি গড়িয়ে পরার শব্দ এবং এক নিঃসঙ্গ যুবকের নিঃসঙ্গ প্রস্থান। একা। সোমবার ১১ জুন ২০০৭।
মঙ্গলবার সকালে পাওয়া মৃতদেহ এবং একটি ডায়েরি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


