চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে ৬ বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার বেণীপুর সীমান্ত থেকে বাংলা-দেশী ছয় কিশোরকে ধরে নিয়ে গেছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা। এদের মধ্যে বিএসএফের নির্যা-তনের শিকার হাবিবুর রহমান ওরফে হারান কৌশলে পালিয়ে এলেও বাকি কিশোররা এখনো বিএসএফের কাছে বন্দী। অন্যদিকে সাতক্ষীরার কলারোয়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, কুসুমপুর ক্যাম্প বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) কমান্ডার রেজাউল করীম জানান, জেলার জীবননগর উপজেলার কয়া গ্রামের সলেমান আলীর ছেলে খায়রুল ইসলাম (১৭), আশাদুল ইসলামের ছেলে সুমন (১৬), আবুল কালামের ছেলে লাল্টু (১৫), রমজান আলীর ছেলে সাইফুল ইসলাম (১৬), মুছাবারির ছেলে হাবিবুর রহমান ওরফে হারান এবং ধান্যখোলা গ্রামের মলি্লক ম-লের ছেলে ইছাহক আলী মঙ্গলবার রাতে উপজেলার বেণীপুর সীমান্ত দিয়ে গরু আনার জন্য ভারতে অবৈধভাবে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় বিএসএফ সদস্যরা তাদের সীমান্ত থেকে জোরপূর্বক ধরে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করে। এদের মধ্যে নির্যাতিত হাবিবুর রহমান ওরফে হারান বুধবার সন্ধ্যায় কৌশলে পালিয়ে এলে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আটক বাকি পাঁচজনের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা নিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যরা অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। তবে অপহৃত পাঁচজনকে ভারতের মোনাগঞ্জ ক্যাম্প বিএসএফ আটক কওে কোর্টে চালান দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সীমান্তে গুলি একেবারে বন্ধ করা যাবে না- বিএসএফ প্রধানের এমন বক্তব্যের দুই দিনের মাথায় সাতক্ষীরার কলারোয়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। বর্ডার গার্ড ৩৮ ব্যাটেলিয়ন (বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু বাসির বলেন, উপজেলার কাকডাঙ্গা সীমান্তের সোনাই নদীর পাড়ে গুলিবিদ্ধ হন ওই দুই বাংলাদেশি। আহতরা হলেন- ইয়াকুব আলী (২৫) এবং আবদুল হামিদ (৩০)। ইয়াকুব কলারোয়ার কেড়াগাছি গ্রামের দাউদ সরকারের ছেলে এবং হামিদ যশোরের শার্শা থানার কায়বা গ্রামের করিম সর্দারের ছেলে। তারা দুজনই রাখাল। বিজিবির আবু বাসির জানান, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের তারালি ক্যাম্পের সদস্যরা পর পর চার রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ সময় সীমান্তের সোনাই নদীর পাড়ে (মেইন পিলার ১৩, সাব পিলার ৩-এর রিভার পিলার ৪ এর কাছে) বসে থাকা দুইজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবির পক্ষ থেকে গুলির ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে সীমান্তের কালিয়ানি এলাকায় এ ব্যাপারে বিজিবি ও বিএএসএফের ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়েছে। হত্যাকা- গ্রহণযোগ্য নয় : দীপু মনি এদিকে চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, বিএসএফের গুলি ও কোনো ধরনের নির্যাতনের ঘটনা এবং হত্যাকা- গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ সরকার এসব ঘটনার বারবার প্রতিবাদ করে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারও একমত। দুইদেশের সরকার এই সীমান্তের এ হত্যাকা- শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে চাঁদপুর সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, বুধবার সংসদের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন টিপাইমুখ নিয়ে যে যৌথ সমীক্ষা হবে তাতে দু'দেশের প্রতিনিধি থাকবে। এতে আমাদের দাবি হচ্ছে, বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই যৌথ নদী সমীক্ষা সম্পন্ন হবে। বিএসএফ প্রধানের বক্তব্য উদ্বেগজনক অন্যদিকে বিবিসি জানায়, বাংলাদেশ ভারত-সীমান্তে গুলিবর্ষণ নিয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ মহাপরিচালকের বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএসএফের মহাপরিচালক ইউ কে বনসাল বলেন, যতদিন পর্যন্ত সীমান্তে অপরাধ বন্ধ না হচ্ছে, ততদিন সীমান্তে গুলিবর্ষণ বন্ধ করা কখনোই সম্ভব না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সীমান্তে গুলিবর্ষণ এবং নির্যাতনের বিষয়ে যখন আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনা হচ্ছে তখন বিএসএফের এ বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগজনক। সীমান্তে হত্যাকা- নিয়ে বেশ অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক বেশ কিছু মানবাধিকার সংস্থা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সমালোচনা করে আসছিল। কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় বিএসএফ সদস্যদের বিচার দাবি করে একটি বিবৃতি দেয়। ভারত সরকার থেকে বেশ কয়েকবার সীমান্তে গুলিবর্ষণ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও সীমান্তে নিয়মিতভাবেই গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটছে। মঙ্গলবার বিএসএফের মহাপরিচালক ইউকে বনসাল বলেন, অপরাধ দমনে বিএসএফের এ ধরনের গুলিবর্ষণ বন্ধ করা কখনোই সম্ভব নয়। 'গুলি চালানো কখনোই বন্ধ করা সম্ভব না, যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অপরাধমূলক কর্মকা- হতে থাকবে, ততদিন সেই অপরাধ আটকাতেই হবে বিএসএফকে। এটাই বাহিনীর দায়িত্ব।' বলেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক ইউকে বনসাল। বিএসএফ প্রধানের এ বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও শালিস কেন্দ্র তাদের বিবৃতিতে বলেছে, বন্ধুপ্রতিম দুটি দেশ যখন সীমান্তে গুলি চালানো বন্ধের চেষ্টায় লিপ্ত, ঠিক এই সময়ে বিএসএফ মহাপরিচালকের এমন উক্তি এ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, বিএসএফের এ বক্তব্য উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, 'সীমান্তে সমস্যা থাকতে পারে। তবে আমাদেরকে এমন পথ ঠিক করতে হবে যাতে কোনো প্রাণহানি না হয়। সেখানে যদি সরাসরি বলা হয় যে, কোনোভাবেই গুলি বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে সেটি অবশ্যই দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক এবং উদ্বেগের বিষয়।' কিছুদিন আগে বিএসএফ সদস্যদের হাতে একজন বাংলাদেশির নির্যাতনের ভিডিওচিত্র প্রকাশ হলে তা বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এর আগেও গতবছর বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানির গুলিবিদ্ধ হয়ে সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকার চিত্র নিয়ে বাংলাদেশে বিক্ষোভ হয়। বিএসএফের পক্ষ থেকে সীমান্তে অপরাধমূলক কর্মকা- প্রতিরোধে গুলিবর্ষণের কথা বলা হলেও একথা মানতে নারাজ মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, সীমান্ত চোরাচালান এবং অপরাধের ঘটনা অনেক দেশে দেখা গেলেও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এমন আক্রমণাত্মক মনোভাব কোথাও দেখা যায় না। তিনি বলেন, 'পৃথিবীর বহু সীমান্তেই অপরাধমূলক ঘটনা হয়, সেখানে কি এভাবে গুলি করে মানুষ মারে আগ্রাসী ভূমিকা থাকার কারণেই তারা এটা করতে পারছে। ভারতের সাথে চীন, পাকিস্তান এবং বার্মারও সীমান্ত আছে। সেখানে কি তারা এটা করতে পারছে? কিন্তু বাংলাদেশের সাথে এটা করছে।' বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তাক্ত সীমান্ত হিসেবেও অভিহিত করেন মি. খান। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতবছর বাংলাদেশ সফরে এসে সীমান্তে কোনো অবস্থাতেই গুলিবর্ষণ হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর আগে ভারত সরকার থেকে সীমান্তে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। কিন্তু এরপরও গত দুই মাসেই বিএসএফের গুলিতে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



