আমরা শুভকে আবাহন করি, মঙ্গলকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইঃ
পয়লা বৈশাখ ১৪১৬ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। এইদিন গ্রীষ্মের দাবদাহ মাথায় নিয়ে আমরা নববর্ষকে আবাহন করতে যাচ্ছি বিচিত্র উপায়ে। গীতে-নৃত্যে, পদ্যে-গদ্যে, মঙ্গল শোভাযাত্রায়; আহারে-বেশভূষায়; হালখাতায়; এবং নীরবে। এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। যদিও রবীন্দ্রনাথ গ্রীষ্ম নিয়ে বেশি গান বাঁধতে পারেন নি।
আড়ম্বর করে নববর্ষ উদ্যাপন শুরু হয়েছে শতাধিক বছর। তার আগে গ্রামে মেলা ছিল, শহরে-ক্ষেত্রবিশেষে গ্রামেও-হালখাতার উৎসব ছিল। সাহেবদের দেখাদেখি খ্রিষ্টীয় উনিশ শতকের শিক্ষিত নগরবাসীরা নিউ ইয়ার্স ডে পালন করতে শুরু করেন। তা দেখে স্বাদেশিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাঙালি ভাবলো, তারও তো নিজস্ব পঞ্জিকা আছে, সুতরাং তারা কেন না নববর্ষ উদ্যাপন করবেন? এই জাতীয়তাবাদী ভাবধারা থেকে খ্রিষ্টীয় উনিশ শতকের শেষার্ধে নববর্ষ পালন শুরু হয়। রাজনারায়ণ বসু নিজেকে এই উৎসবের প্রবর্তক বলে দাবি করেছেন।
জাতীয়তাবাদী ভাবধারার আরেক ঢেউ বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের বাংলাদেশে নববর্ষ-পালনকে গুরুত্বদান করে। চল্লিশের দশকের শেষে ও পঞ্চাশের দশকে বাংলা নববর্ষ ছোটোবড়ো করে উদ্যাপিত হয়েছে। দেখা গেল, পাকিস্তান সরকারের তা পছন্দ হচ্ছে না। তখন কত রকম ব্যাখ্যাদান চলল। বাংলা সন হিন্দুর নয়, মুসলমান সম্রাটের প্রবর্তন-এর সঙ্গে হিন্দুয়ানির সম্পর্ক নেই। ইরানিরা যেমন মুসলমান হয়েও নওরোজের উৎসব করে, আমরা পাকিস্তানবাসী বাঙালি মুসলমানেরা তেমন করে নিজেদের নববর্ষ পালন করলে দোষ কী!
দোষ যে আছে, তা বুঝতে পারলে কি আর আমরা বাঙালি হতাম! ভাষা নিয়ে, হরফ নিয়ে, রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বিতর্কের মতো, শারদোৎসব-বসন্তোৎসব-নববর্ষ উৎসবও বিতর্কের বিষয় হয়ে গেল। তবে বাঙালিরও রোখ আছে। বাধা দিলে বাধবে লড়াই। নববর্ষ নিয়ে ধুন্ধুমার বাধিয়ে দিলো। রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগ চাই, অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে চাই, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে চাই। নববর্ষ-উদ্যাপন তারই প্রতীক হয়ে গেল। ছায়ানটের উদ্যোগ এক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। পয়লা বৈশাখে রমনা বটমূলে সমবেত হওয়া-সপরিবারে, সানন্দে, কষ্টস্বীকার করে-ঢাকার বাঙালি মধ্যবিত্তের অবশ্যকর্তব্য হয়ে গেল।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থানে মনে হয়েছিল ওসব বাজে তর্কের অবসান হলো। তা যে হয়নি, তা বোঝা গেল রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখে যখন বোমা হামলা হলো। আজ থেকে সাত বছর আগে। তখন অনুমান করা গিয়েছিল কারা আততায়ী। এখন তো সব রহস্যই উন্মোচিত হয়েছে। যারা ধর্মের নামে অবলম্বন করেছে জঙ্গিবাদ, তারাই। নিরীহ মানুষের জান যায় যাক, তবু যাকে তারা অনাচার মনে করে, তাকে রুখতে হবে।
গত শতাব্দীর বাধার চেয়ে এ-বাধা অনেক উন্মত্ত, অনেক প্রচণ্ড, অনেক ভয়ংকর।
আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সবক দিচ্ছেন, জন্তু-জানোয়ারের মুখোশ পরে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা নিষেধ। কেন নিষেধ? ওই মুখোশ পরলে মানুষ কি জানোয়ার হয়ে যাবে? ভোরবেলায় সমবেতভাবে গান করলে কি প্রকৃতিপূজা হবে?
যারা নির্দোষ মানুষের প্রাণ নেয়, তারা কি মানুষ না জানোয়ার? মানুষের জীবন থেকে যারা আনন্দকে নির্বাসিত করতে চায়, তারাই বা কী? নিরীহের প্রাণবধের প্রতিজ্ঞা যারা করে, তারা ধর্মের কাছে দায়ী হয় না? কিংবা মসজিদে যারা অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে রাখে অন্যের ওপর তা ব্যবহার করবে বলে, তারা মসজিদের অবমাননা করে না?
বাংলাদেশে আজ অশুভ শক্তির কালোছায়া ক্রমে প্রলম্বিত হচ্ছে। সে অপশক্তির সঙ্গে চিরন্তন দ্বন্দ্ব আমাদের।
আমরা শুভকে আবাহন করি, মঙ্গলকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। প্রকৃতির মধ্যে যা সুন্দর, জীবনে তা বরণ করে নিতে চাই। সৌন্দর্যের স্রষ্টারূপে মানুষকে দেখতে চাই। আমার মধ্যে অসুরের দান যদি থাকে, তবে তাকে পদানত করে রাখতে চাই। যা কিছু আমার ভালো, তা দিতে চাই দেশকে এবং মানুষকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


