মিডিয়াকে কীভাবে সামাল দেয়া উচিত এই বিষয়ে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড একটা কর্মশালার আয়োজন করেছিল কয়েক বছর আগে। ভারতীয় মিডিয়া জগতের জীবন্ত কিংবদন্তী প্রণয় রায় এলেন প্রধান বক্তা বা প্রশিক্ষক হয়ে। স্টার নিউজ করে তিনি জানিয়েছেন পাশ্চাত্যের মতো উপমহাদেশেও ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল করা সম্ভব। তারপর করলেন এনডিটিভি, দেখালেন সংবাদ কীভাবে রুচিশীল বিনোদন হতে পারে। সেই তারকা প্রণয় রায়ের বক্তৃতা, কাজেই ভারতীয় ক্রিকেটের মহাতারকারাও টিপসগুলো মন দিয়ে শুনছিলেন। তা বক্তৃতার এক পর্যায়ে প্রণয় রায় বললেন, ক্রিকেটারদের উচিত হবে শাহরুখ-আমিরের মতো সিনে তারকাদের অনুসরণ করা, মাথায় এমন প্রচণ্ড চাপ নিয়েও তারা যেভাবে মিডিয়া সামলান সেটা একটা ব্যাপার বটে। শুনে ফুঁসে উঠলেন তখনকার অধিনায়ক সৌরভ। তার বক্তব্য, সিনে তারকারা কখনোই ক্রিকেটার বা খেলোয়াড়দের মডেল হতে পারে না ,‘‘যারা দশটা শট দিয়ে তার সেরাটাই শুধু মানুষকে দেখায় তাদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের তুলনা চলে কী করে, যেখানে আমাদের সুযোগ একটাই। একবার আউট হলেই সব শেষ। আর চাপ! খেলুক না ওরা মাঠের মধ্যে পক্ষ-বিপক্ষের লাখো দর্শকের সামনে।’’
নিয়তির পরিহাস এই যে, যে সৌরভ সিনে তারকাদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের তুলনাটাকেই গৌরবময় মনে করেননি, আজ তাকে নিয়েই খেলছেন একজন সিনে তারকা। সিনেমার নায়করা হিট ছবির জন্য চান দারুণ স্ক্রিপ্ট, শাহরুখ সৌরভের জন্য সেই স্ক্রিপ্ট নিয়ে হাজির। ভারতের ইতিহাসের সফলতম অধিনায়ক তিনি এবং কলকাতার ক্রিকেটের প্রতীকও। অথচ সবদিক থেকে সম্পূর্ণ বহিরাগত শাহরুখের দলের বহু অধিনায়ক তত্ত্বটা হলো এই যে তাকে বেশ কয়েকজন অধিনায়কের একজন হতে হবে। শাহরুখ বা তার পোষ্য হয়ে ওঠা কোচ বুকাননের যেদিন মন চাইবে সেদিন সৌরভ অধিনায়ক। অন্যদিন অন্যজন। সৌরভ জবাব অবশ্যই দেবেন। প্র্যাকটিস ম্যাচে দিলেন। ব্যাট হাতে ম্যাচ সর্বোচ্চ রান করলেন, অধিনায়ক হয়ে জয়যাত্রায় নেতৃত্বও দিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্রিকেট মাঠে এক অনুপ্রবেশকারী নায়কের কাছে কেন জবাব দিতে হবে সৌরভকে! হত যদি সিনেমা, এবং যদি সৌরভ যেতেন অভিনয়ে তাহলে ঠিক ছিল। সেখানে শাহরুখ বাদশা। সৌরভের শট ঠিক না হলে তিনি বারবার বলতেন। সৌরভকে তাই করতে হত। কিন্তু ক্রিকেটের অঙ্গনে! টাকা আর গ্ল্যামারের গরমে শাহরুখের ঔদ্ধত্য অবশ্য এতখানি বেড়ে গেছে যে তিনি সুনীল গাভাস্কারের ক্রিকেটজ্ঞান নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়ছেন না। এসব হচ্ছে এবং নিশ্চিতভাবেই হতে থাকবে। কারণ আইপিল হচ্ছে। এবং নিশ্চিভাবেই হতেই থাকবে।
অমিতাভ না গাভাস্কার, শাহরুখ না শচীন ভারতীয় জনমানসে এমন বিতর্ক চিরদিনের। ওদের জীবনে গৌরবের দুটো জিনিস, একটা ক্রিকেট আর অন্যটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। প্রেম (রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে অমৃতা সিংয়ের) এবং স্ক্যান্ডালসূত্রে (সৌরভের সঙ্গে নাগমা বা যুবরাজের সঙ্গে শিল্পা) দুটো কখনও-সখনও মিলেছে যদিও বা, কিন্তু তার মধ্যে একটা সূক্ষ ইগোগত লড়াই আছেই। সেই গৌরবের লড়াইয়ে অগৌরবের হার নিশ্চিত করে দিচ্ছে আইপিএল। টোয়েন্টি-টোয়েন্টি নামের যে ক্রিকেট চলে সেটা চরিত্রে আমাদের ডাংগুলির কাছাকাছি। ফুটবলীয় উত্তেজনার কিছু উপাদান আমদানি করে হাস্যকর কিছু আইনের (এর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম অবশ্যই টাইব্রেকার, ফুটবলের অনুকরণ করতে গিয়ে যা হয়েছে তা লোক হাসানোর জন্য খুব আদর্শ) আওতায় একটা শক্তিরই প্রদর্শনী। ওটা কোনোভাবেই ক্রিকেট সংস্কারের কোনো রূপ নয়, ক্রিকেটজাত বিনোদন হতে পারে বড়জোড়। যেহেতু বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর ভোক্তা সব মানুষ, কাজেই সব মানুষকেই তাদের ক্রিকেট শেখাতে হবে, সবাইকে-ই ক্রিকেট ভালো লাগাতে হবে। তাই এমন একটা কিছু করো যাতে কিছু না বুঝলেও সব বোঝা যায়। জোরে-জোরে মারা আর অংকের হিসাব রাখা তো সবাই জানে। তাই টোয়েন্টি-টোয়েন্টি। আর এই বিনোদন আর বাণিজ্যের সূত্রে টাকার থলি নিয়ে মদ কোম্পানির মালিক থেকে শুরু করে সিনেমার রগরগে নায়িকারা এখানেও হাজির। সৌরভরা তাদের স্ক্রিপ্টের বিষয় হয়ে যাচ্ছেন। গাভাস্কারদের ক্রিকেট শিখতে হচ্ছে!
অর্থ জীবনের সবচেয়ে অর্থবোধক জিনিস যেমন তেমনি অর্থ অনর্থের মূলও। টাকা ছাড়া ক্রিকেটের বিস্তার সম্ভব নয়, কিন্তু টাকার বিস্তারের জন্যই যখন চলে সব কায়কারবার তখন খেলাটা হলো নিছকই একটা উপলক্ষ। আইপিএল-এ ক্রিকেটটাও ঠিক তেমনই। নইলে কীভাবে ‘ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ’ আয়োজিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়! টিভি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি আছে, তারা আবার অনেক-অনেক কোম্পানির কাছে স্পনসরশিপ বাবদ টাকা নিয়ে বসে আছে, কাজেই ভারতীয় সাধারণ জনগণ যখন ভোট দিয়ে ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করবে তখন শাহরুখ-প্রীতি-শিল্পারা তাদের অর্থ-রূপ আর গ্ল্যামার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসাবেন মজলিশ। অবশ্য যেখানেই যান না কেন ভারতীয় আম-জনতাকে লাগবেই। তাই খেলা শুরু করতে হবে ভারতীয় সময়ের হিসাব করেই, যে সময়ে এখানকার মানুষরা টিভি দেখার সুযোগ পায়। এই টিভি যুগের আগেও ক্রিকেট ছিল, ছিল তার মহান গৌরবময়তাও, চায়নিজ রেডিও’র চুং-চাং এড়িয়ে আকাশবাণী ধরে নিবিড়চিত্তে ক্রিকেট উপভোগের মানুষও ছিল তখন। কেন যেন মনে হয় আজকের টিভিজাত এই সার্কাসের তুলনায় সেটাই ছিল নির্ভেজাল ক্রিকেট। তখনকার ক্রিকেটে রং ছিল না বটে, কিন্তু রূপে সে ছিল অপরূপ। মেকআপ করা নায়িকার মতো সেজে থাকা এই ক্রিকেটের ভীড়ে হৃদয়ের ক্রিকেটই না হারিয়ে যায়!
ভয় পাচ্ছি। আবার একটু নিশ্চিতও থাকতে পারছি। টেস্ট ক্রিকেটে যেহেতু বাণিজ্য নেই কাজেই টেস্টের আইপিএল নিশ্চয়ই হবে না। টাকা দিয়ে নিশ্চয়ই শাহরুখ খান-প্রীতি জিনতারা দলও কিনতে পারবে না। সৌরভদের নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলবে না। গাভাস্কারের ক্রিকেটজ্ঞান নিয়ে কথা বলার সাহসও পাবে না কেউ!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


