আমার প্রিয় পোস্ট
- কাক কাকের মাংস না খেলেও জার্নালিস্ট জার্নালিস্টের মাংস ঠিকই খায় - জাহিদুর রহমান মাসুদ
- শেখ সাহেবের গপ্পো - রাগিব
- মিছিলে কাছাকাছি থেকো - প্রণব আচার্য্য
- মুন্নি বদনাম হইসে। (রম্য) - জিকসেস
- দাগলাগা শিরোণাম - প্রণব আচার্য্য
- একজন বৃহন্নলার আত্মকথন - সীমান্ত আহমেদ
- শিরোনামের প্রয়োজন নেই, শুধু তুমি ঈশ্বরী - প্রণব আচার্য্য
- অর্ন্তজালের বাংলা ওয়েব সাইটগুলোর একটা তালিকা তৈরী করলাম। - একজন ব্লগার
- কবিতার ভাষা। - ফরহাদ উিদ্দন স্বপন
- একদিন বুঝবে (উৎসর্গ মহাকবি মাইকেল মেহেদী) - হাসান বিপুল
- আমার মা, আমার ঈশ্বর। - ফরহাদ উিদ্দন স্বপন
- ১৯৭১ ট্রাজেডিঃ মুক্তিযুদ্ধে চা শ্রমিকদের ঐতিহাসিক দলিল.... - ভাস্কর চৌধুরী
ক্রমশ সংকোচিত হওয়া
১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:৩৯
ঈদটা আগে দাদা বাড়িতেই করা হত। দাদার সাথে ঈদের নামাজ পড়তে ঈদগাহে যেতাম। বিশাল ঈদগাহ। বহু দূরের গ্রাম থেকে মানুষ আসত। দাদা সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন, বুকে জড়িয়ে ধরতেন। অবাক হয়ে ভাবতাম, দাদা এতো মানুষ চিনেন কি করে! দাদা মারা গিয়েছেন বছর খানেক হল, দাদী তারও আগে। একটু বড় হওয়ার পর তাঁদের সাথে আর ঈদ করা হয়নি। গত পনের বছর এই শহরের বদ্ধগলিতেই ঈদের নামাজ পড়ছি। এখানে ঈদগাহ নেই। ছোট্ট কুঠোরির মত মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ি। আগতদের বেশিরভাগকেই চিনি না। এখানেই নিকট প্রতিবেশীটির সাথে বছরে পথমবারের মত (শেষবারের মতোও) দেখা হয়। মুখে কষ্টের হাসি এনে তাঁকে স্বাগত জানাই, কুশল জিজ্ঞাসা করি। নামাজ শেষে প্রথা মাফিক অনেকের সাথে বুক মিলাই। বলাবাহুল্য, এই মিলানোটা শুধুই প্রথা, শুধুই বাহ্যিক।
বার্ষিক পরীক্ষাটা ছিল রোজার মতই কষ্টকর। ঠিক তেমনি পরীক্ষা পরবর্তী সময়টা ছিল ঈদের মতই আনন্দের। এই আনন্দের প্রধান কারণ ছিল ছুটির এই সময়টাতেই নানাবাড়িতে যেতাম। শুধু আমি একা নই, আমার অন্যান্য খালাত ভাইবোনেরাও খালাদের সাথে আসত। আমার নানা ছিল বয়সে তাঁর ভাইদের চেয়ে অনেক বড়। সেকারণে নিজের মামারা বয়সে অনেক বড় হলেও চাচাত মামাদের অনেকেই আমার সমবয়স্ক ছিল। সম্পর্কটা ছিল তুই, তুক্কারি টাইপের। খালাত ভাই আর মামাদের সাথে সারাদিন মিলে ঘুরে বেড়াতাম, পুকুরে সাতার কাটতাম। দুপুরে খাওয়ার কথা প্রায়ই ভুলে যেতাম। বিকেলবেলা বিশাল প্রান্তরে দাড়িয়াবান্ধা, ঘোল্লাছুট, ফুটবল খেলতাম। ক্রিকেটের প্রচলন তখনও তেমনটা ঘটেনি। রাত্রে খেতে খেতে নানার মুখ হতে রামায়ন আর কারবালার বিয়োগান্তক কাহিনীগুলো শুনতাম। গল্পগুলো বহুবার শুনেছি। তারপরেও নানা যখন বলতেন মনে হত এই প্রথমবারের মত শুনছি। স্থানের অভাবে খালাতো ভাইয়েরা গড়াগড়ি করে একই চকিতে চার পাঁচজন ঘুমাতাম। তবুও কারো কোন অভিযোগ ছিল না।
নানা মারা গিয়েছেন বছর চারেক হল। তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য শেষবার নানাবাড়িতে গিয়েছিলাম। আর হয়ত কোনদিনও যাওয়া হবে না। শূন্য ভিটায় কার কাছেইবা যাব! মামারা সবাই এখন শহরের বাসিন্দা। নানী এই শহরেই এক মামার বাড়িতে থাকেন। মামারা এখন পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রী করার প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত। বেচতে বেচতে হয়ত নানার ভিটাটাও একদিন শেষ করে ফেলবে। তারপরেও হতাশ হইনা, কষ্ট পাইনা। কারণ এটা ভেবে স্বস্তি পাই যে, আমার অন্তত একটা নানার বাড়ি ছিল। নানার আদর পেয়েছি, অনেক স্মৃতি পেয়েছি। কিন্তু আমার সন্তানেরাতো এর কিছুই পাবে না। সেও হয়ত নানার বাড়িতে যাবে। তবে বিশাল কোন উম্মুক্ত ময়দান পাবে না, সঙ্গীও পাবে না। ছোট্ট খুঠুরীতে বসে তাঁর নানাও হয়ত তাঁকে গল্প বলবে। তবে সেটা কারবালার কাহিনী হবে না। ডলারের বিপরীতে টাকার কেন পড়ে যাচ্ছে গম্ভীর মুখে তার কারণ ব্যাখ্যা করবেন।
ফাল্গুনের শুরু থেকেই শহরের আকাশটা রংঙিন ঘুড়িতে ভরে যেত। আমি কখনও ঘুড়ি উড়াইনি, উড়াতে পারতামও না। তবে আমার এক খালাত ভাই ছিল এ কাজে সিদ্ধহস্ত। এই সময়টাতে আমি তার পিছন পিছন ঘুরতাম। সুতাতে মাঞ্জা দেওয়া, রঙিন করা, ঘুড়ি কেনা প্রতিটা কাজেই আমি তাঁর সাগরেদ হিসেবে কাজ করেছি। ফলশ্রুতিতে মা, খালার অনেক বকাও খেয়েছি। খালাত ভাই দেশ ছেড়েছে দশ বছর হল। মাঝে মাঝে দেশে আসলেও আমার সাথে দেখা হয় না। তেমনি দেখা হয় না এই শহরের আকাশের ঘুড়িগুলোর সাথেও। এই শহরের আকাশ এখন সম্পূর্ণ ঘুড়িমুক্ত। নতুন প্রজন্ম এখন মায়েদের একান্ত বাধ্য। বইয়ের পাতা ছাড়া তাঁরা কিছু বুঝে না।
শবে বরাতের রাতে পুরো আকাশটা তারা বাতি , মরিচাবাতিতে ভরে যেত। বলাবাহুল্য, এগুলো সবই ছিল নিজেদের তৈরি (Home Made)। শবে বরাতের অনেক আগে থেকেই এর জন্য প্রস্তুতি নিতে হত। আমার খালাত ভাই এ কাজেও ছিল পটু। যথারীতিআমি ছিলাম তাঁর সাগরেদ। এখন আর শবেবরাতে মরিচা বাতি, তাঁরা বাতি দেখিনা। ব্যাপক প্রচার, সচেতনতা ও জাগরণের মাধ্যমে আমরা মহিমান্বিত রাতটির মর্যাদা রক্ষা করতে আমরা পুরোপুরি সফল হয়েছি। আমাদের সন্তানেরা এখন আর কেউ হৈ-হুল্লোর করেনা, মরিচা বাতি জ্বালায় না। তাঁরা আশাতীত সুবোধ হয়ে গেছে।
পনের বছর আগে যখন বাবার হাত ধরে পুরনো নিবাস ছেড়ে এখানে এসেছিলাম তখন এ স্থান ছিল বিশাল পৃথিবীর মতোই এক উম্মুক্ত জায়গা। সে আমাকে আপন করেছিল অপার মমতায়। তখন এখানে ধানক্ষেত ছিল, ক্যানেল ছিল, হিন্দু বাড়িগুলোতে পুকুরও ছিল। একটা শ্মশানও ছিল যেখানে মৃত হিন্দুদের দাহ করা হত। বছর দশেক পরে হঠাৎ একদিন দেখলাম শক্তিমান ও দানবীর এম.পি মহোদয় কলেজের মাঠ বানানোর কথা বলে এই শ্মশানটি দখল করে নিয়েছেন। তারপরে একদিন দেখলাম সেই মাঠ দোকান, গ্যারেজ, বাশের আড়ত হয়ে গেছে। ধানক্ষেতগুলো ধীরে ধীরে বিশালকায় অট্টলিকাতে পরিনত হল। ক্যানেল, পকুর, আর হিন্দুবাড়িগুলো শক্তিমান ও দানবীর এমপি ও তার সহযোগীরা করায়ত্ত্ব করেছেন বিভিন্ন সেবামূলক কাজ সম্পাদনের মহৎ উদ্দেশ্যে।
শক্তিমান, দানবীর এম.পি মহোদয় এখন কারাগারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না। জনগণের জন্য কাজ করলে একটু, আধটু ওখানে যেতেই হয়। তবে আশা করা যায় খুব শীঘ্রই জনতার ভালবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি পুনরায় আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। আবার মহৎ কাজের উদ্দেশ্যে পুরণো কর্মকান্ড শুরু করে দেবেন। ক্যানেল, পুকুর, আর হিন্দুবাড়িগুলোতো আগেই দখল করে নিয়েছেন। এবার হয়ত পরম ভালবাসা দিয়ে আমাদের এই নশ্বর দেহটাকে দখল করে নিবেন। হাড় আর পাজরগুলোকে একাকার করে একান্তই নিজের করে নিবেন।
এভাবে বারবার ক্রমশ দলিত, সংকোচিত, ক্ষুদ্র হওয়া অবশ্য কাছের নতুন কিছু না। এটা কষ্ট বা অপমানেরও কিছু না। অনাদিকাল কাল হতেই বংশানুক্রমে আমরা ও আমাদের পুর্ব পুরুষরা বিশেষ পারদর্শীতার সাথে এই সংকোচন প্রকিয়াটিকে শুধু রপ্তই করেনি যথার্থ যোগ্যতার সাথে প্রয়োগও করেছি। আশা করি, আমাদের সন্তানেরা এ কাজে আরও পারদর্শী হবে, নতুন কলাকৌশল প্রয়োগ করবে। ঈশ্বর তাদের সহায় হোন।
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার কথা বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মার্চ, ২০০৯ দুপুর ২:১১ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
কৌশিক বলেছেন:
+ (শিরোনামে দাড়ি দেয়া পাইছো কোথায়?)
লেখক বলেছেন: বাতিল করছি।
সীমান্ত আহমেদ বলেছেন:
প্লাস।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।
বাবুয়া বলেছেন:
অসম্ভব সুন্দর সৃতিচারন! পড়তে পড়তে আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম আমার কৈশোরে। আমার কৈশোর ছিল অত্যন্ত কস্টের, খুব বেশী দুঃখের! আমি নাপেয়েছি মা, বাবার আদর। না পেয়েছিলাম নানা বাড়ীর এমনকি দাদা বাড়ীর কারো আদর!
তারপরো আপনাদের সুখ সৃতি পড়ে/ যেনে মন ভালো হয়ে যায়।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ, বাবু ভাই। লেখাটাকে শুধু স্মৃতিচারণ হিসেবে মূল্যায়ন করলে একটু কষ্ট পাব।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ, মিল্টন ভাই।
কাক ভুষুন্ডি বলেছেন:
কঠিন প্রকাশ।ভাল্লাগ্লো।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ, কা! কা! ভাই।
বাবুয়া বলেছেন:
ফরহাদ ভাই, আপনার অসাধারণ সুন্দর লেখাটা আমি শুধুই সৃতি চারণ ভাবিনি। আপনার লেখায় ফুটে উঠেছে আমাদের পারিবারিক বন্ধন, ঐতিয্য, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট। যা আমরা নিবির ভাবে ভাবলেই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারি।কিন্তু লেখাটা পড়ে আমি কিছুটা নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পরেছিলাম-যার কারনে বেশী কিছু লিখতে পারছিলামনা।
লেখক বলেছেন: অনেক, অকে ধন্যবাদ।
জেরী বলেছেন:
+ ভালো হয়েছে।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ।
ইউনুস খান বলেছেন:
নস্টালজিক লিখা। ভালো লাগলো।
লেখক বলেছেন: শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।
অনিশ্চিত বলেছেন:
ভালো লাগলো।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। অনেকদিন পর আমার ব্লগে আসলেন।
অনিশ্চিত বলেছেন:
ব্লগে আসি ঠিকই। কিন্তু লগইন করি না। আর মন্তব্য তো আরো কম করি। তবে পড়া হয় ঠিকই।
লেখক বলেছেন: এই কমের মাঝেও আপনে আমার লেখাটিতে মন্তব্য করেছেন, আমি ধন্য হলাম।
অনিশ্চিত বলেছেন:
ছিঃ মানুষ অ্যামনে লজ্জা দেয়!
লেখক বলেছেন: কি যে কন!!!!
লেখাজোকা শামীম বলেছেন:
কোথায় সেই সব মধুর দিন ! এই শহুরে প্রজন্ম কোনদিন তার দেখা পাবে না। হতভাগ্যের দল।
লেখক বলেছেন: আসলেই ভাই। দিন দিন আমরা আরও হতভাগা হয়ে যাচ্ছি।
রাহুল বলেছেন:
পিলাচ,ভালো লাগলো।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যাবাদ।
ফেরারী পাখি বলেছেন:
ভিড় করে ইমারত আকাশ টা ঢেকে দিয়ে চুরি করে নিয়ে যায বিকেলের সোনা রোদ। সত্যি ভালো লাগলো লেখাটা।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ।
লেখক বলেছেন: আসলেই আর ফিরে আসবে না। আমাদের সন্তানেরা হয়ত এগুলোর অস্বিত্ব ছিল তাও জানবে না। এ হিসেবে আমরা তাদের চেয়ে ভাগ্যবান।
|জনারন্যে নিসংঙগ পথিক| বলেছেন:
খুব দারুণ স্ম্রতিচারণ । মনে হচ্ছিলো আমার শৈশবের ঈদটাকেই দেখতে পাচ্ছি। একটা কথা বলি, গ্রামের ঈদের মত মজা
আনন্দ মেলামেশা কোথাও হয় না। তাই প্রতি বছরই অনেক কষ্ট করে ঈদে গ্রামে যাই । শহরে আলাদা হলেও গ্রামে আমরা একান্নবর্তী পরিবার। সব চাচা চাচী ভাই বোনরা (সর্বমোট ৩৩ জন!) মিলে একটা সপ্তাহ যে কীভাবে যায় না। ফিরে আসার সময় চোখ মুছতে মুছতেই আসতে হয়।
যান্ত্রিক বাস্তবতায় সবই আমরা মানিয়ে নিচ্ছি নিতে হয় , অনেক সময় করার কিছুই থাকে না।
লেখক বলেছেন: আসলেই তাই। ছেলেবেলায় যখন গ্রামে ঈদ করতাম তখন এই বিষয়টাই উপভোগ করতাম। আর ফিরবার সময়ে চোখের জলে বুক ভাসাতাম।
সেই দিনগুলো আর কোনদিন ফিরে আসবেনা। কোনদিনও না।
রণক্লান্ত বলেছেন:
প্রসঙ্গ: আস্তিকতা ও নাস্তিকতার সীমাবদ্ধতা ও এর উত্তরণ।০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১২:৪৯
আপনার এই পোষ্টএর একটা জবাব দিব বলেছিলাম। দয়া করে একটু পড়ে দেখবেন। আপনার মূল্যবান মন্তব্য কামনা করছি।
Click This Link
ভাল থাকবেন।
লেখক বলেছেন: একটু সময় নিয়ে মন্তব্য করতে চাই।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
















