প্রায় ১৩/১৪ বছর আগের কথা, আমার সহপাঠী "আনন্দ" খুন হলো আর কিছু সহপাঠীর হাতে; কয়েকজন বন্ধু মিলে খুন করল বন্ধুকে। হ্যাঁ, বন্ধু ছিলাম সবাই; বিকালবেলা দল বেধে গান গেয়ে ক্যাম্পাস ঘুরা, সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে আড্ডা, দুপুরে ক্যাফেটেরিয়ার আড্ডা, রাতে হলের টিভি রুমের আড্ডা, মুক্ত মঞ্চে একসাথে সীট দখল করে নাটক দেখা, বাসে ১ টাকা করে ভাড়া দিয়ে চেচিয়ে বলা “এই – তোর ভাড়া হয়ে গেছে”... ... ! সবই ছিল একসাথে, এখন যেমন আছে। অন্তত প্রথম বছরটা তো ছিল, তারপর যা হয় তাই হলো... আস্তে আস্তে বড় গ্রুপটা ছোট হতে থাকল। কেও কেও পড়াশুনার চাপে ডিপার্টমেন্টে-লাইব্রেরীতে বন্ধি হলো, কেও কেও প্রেম করে মহিলা হলের সামনে আর কাঠাল তলায় আটকে গেল, আর কেও কেও ছাত্ররাজনীতির অন্যরকম এক গরম দুনিয়ায় ঠুকে পড়ল। ছাত্র রাজনীতিতে যারা ঢুকল কিছু দিন পর ক্ষমতার দ্বন্দে তারা দুই গ্রুপ হয়ে গেল ... যার ফলস্রুতিতে এক সময় খুন হলো “আনন্দ”।
আজকে জুবায়ের এর ঘটনাটা সেই পুরাণ স্মৃতি গুলোকে জাগিয়ে দিল, মনে হচ্ছে সেই ঘটনার পুণরাবৃতি। অনেকে অনেক ভাবে অনেক কথাই লিখছে- অনেক আবেগ, অনেক ক্রোধ, অনেক ঘৃণা নিয়ে। আমি ওদিকে আর না যাই, আনন্দ’র ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বরং বিশ্লেষন করি জুবায়ের হত্যার ফলে কার কার কি কি লাভ বা ক্ষতি হলোঃ
জুবায়ের খুন হওয়ার ফলে সবচেয়ে লাভবান হবে তার গ্রুপ, প্রাক্তন সভাপতি শাফিন এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা। হামলা-মামলার ভয়ে ক্যাম্পাস থেকে বর্তমান গ্রুপ বিতাড়িত হওয়ার ফলে তারা বিনা বাধায় ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করবে।
এরপরে লাভবান গ্রুপ হচ্ছে উপাচার্য+প্রক্টর বিরোধী শিক্ষক গ্রুপ, যারা বাগে পেয়ে উপাচার্য+প্রক্টর কে এক হাত দেখে নিবেন।
এরপর বেনিফিসিয়ারী গ্রুপ হলো, ক্যাম্পাসে বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছাত্রছাত্রীরা। এরা সাধারণত ক্যাম্পাসে খুব অবহেলিত থাকে, এরকম কিছু একটা ঘটলে তাদের পোয়া বারো; তারা এখন প্রত্যেকে নিজেকে এক একটা লেলিন ভাবা শুরু করবে, আর খেয়ে না খেয়ে লেগে পড়বে তাদের কল্পিত বিপ্লব সফল করতে।
আরো অনেক সুবিধা ভোগ কারী আছে, যেমন সাধারন ছাত্র-ছাত্রী- “কয়েকদিন পড়াশুনা+পরীক্ষার হাত থেকে বাচা গেল”; জাবি’র ঘাপটি মারা কিছু শিবির – “আমাদের ক্যাম্পাসে ঠুকতে দিস না, এখন বুঝ ঠেলা, নিজেরা মারামারি করে মর নাস্তিকের দল”; আর অবশেষে আমার মত কিছু ব্লগার, যারা অনেক দিন পর লেখার মত একটা টপিক পেল।
আর ক্ষতি হলো কাদের ...???
কিছুটা ক্ষতি হলো উপাচার্য আর তার গ্রুপের প্রশাসনের উচুতে দাপটের সাথে বসে থাকা কিছু শিক্ষকদের- “কত না আরামে ছিলাম, মাঝখান থেকে কি এক উটকো ঝামেলা এসে পড়ল”!
এরপর, আর একটু বেশী ক্ষতি হবে খুনি গ্রুপের নেতা আর তার চেলাদের – “অর্ডার দিলাম হাত-পা ভেঙ্গে দিতে, কিন্তু ফাউল গুলো কোন কাজই ঠিক মত করতে পারেনা, একদম মেরেই ফেলল”! এখন কিছুদিন ক্যাম্পাসের রাজত্ব ছেড়ে জঙ্গলে থাকতে হবে!
ক্ষতির তালিকায় এরপর থাকবে বহিষ্কৃত ৩ ছাত্র আর তাদের পরিবার। আমরা খুব আবেগ প্রবন, আমাদের সহানুভুতি যেমন প্রচন্ড ঘৃণাও তেমন ভয়ংকর। আমাদের সব ঘৃণা এখন এদের উপর। জুবায়ের মারা গেছে, সুতরাং সে ছিল ফেরেশতা, আর এরা সব নরকের কীট। আসলে কি তাই? এক বছর আগে জুবায়ের যখন এদের একজন কে পিটিয়েছিল তখন যদি সে মারা যেত তাহলে আমাদের অনুভুতি কি এটাই হতো? এদের জীবনও নষ্ট হলো, পরিবারের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। এদের প্রতি বেশী সহানুভুতি দেখাতে গেলে গালি খেতে হবে। আনন্দ হত্যাকারীদের আমি ঐ ঘটনার পরে ৪/৫ বছর খোজ খবর জেনেছি, কি অসহনীয় জীবন যে তারা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল, তা বর্ণনা করা সম্বব নয়। প্রায় ৩ বছর পর একদিন ২ নং আসামী “বিদ্যুত” এর সাথে হঠাত দেখা ফার্মগেটে; চেহারা চেনার উপায় নেই। ওর একটা কথা এখনও আমার কানে লেগে আছে “দোস্ত ওই দিন যদি আনন্দ খুন না হয়ে আমি খুন হতাম তাহলে অনেক ভাল হতো রে- এই জীবন এর চেয়ে মৃত্যু অনেক ভাল“।
আর সবচেয়ে বেশী ক্ষতি কার হবে সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। সে যে কত বড় ক্ষতি তা আমার ধারনার বাইরে, কারণ আমার ফ্যামিলিতে এমন ঘটনা ঘটেনি, এই কষ্ট/ক্ষতি লিখতে যাওয়া আমার জন্য অনধিকার চর্চা হবে!
লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে, শেষে একটা পুরাণ আবেদন নতুন করে করতে চাই। জানি এর কোন ভ্যালু নেই, যাদের কাছে এই আকুতি তাদের কানে তা কোন দিনও পৌছেবে না। খামাখা কিছু লোকের চক্ষুশূল হব। অনেকেই বিজ্ঞের মত অনেক যুক্তি আর অতীত ইতিহাস নিয়ে হাজির হবেন। আমরা বাংগালিরা বড়ই অতীত-প্রিয় জাতি; সব গর্ব আমাদের অতীত নিয়ে, আমরা বর্তামানকে অবহেলা করি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদাসীন থাকি। অন্তত এই একটা বিষয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপট আর ভবিষ্যত ভেবে সিধান্ত নেই!
পরীক্ষামূলক ভাবে হলেও অন্তত ৫ বছরের জন্য ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করুন!
সবার জন্য শুভ কামনা!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


