somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমলাতন্ত্রের ইতিহাস ও বর্তমান ।

২৩ শে জুলাই, ২০১০ বিকাল ৪:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের আমলাতন্ত্রের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় বৃটিশ আমলে এই আমলাদের জন্ম এর উত্তরসূরীদের বলা হত আইসিএস অফিসার (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ডেভিড গিলমোর তার এক বিখ্যাত লেখায় দাবী করেছেন, “১৯০১ সালের দিকে, রাণী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর এই উপমহাদেশে মাত্র হাজার খানেকের কিছু বেশি আইসিএস অফিসার ছিল, যাদের এক-পঞ্চমাংশ যেকোন সময়ে হয় ছুটিতে নয়ত অসুস্থ থাকত। অথচ এই গুটি কয়েক অফিসাররাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বর্তমানের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং মায়ানমার নিয়ে গড়া এক বিশাল অঞ্চলের প্রায় ৩০ কোটি লোকের প্রশাসন চালাত”।

বিখ্যাত রাশিয়ান নেতা জোসেফ স্টেলিন থেকে শুরু করে অনেক হোমরা চোমরাই এই আইসিএসদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। লয়েড জর্জ এই আইসিএসদের বৃটিশ ভারতের ‘স্টিল-ফ্রেম’ উপাধি দিয়েছিলেন। একটা ব্যাপার উঠে এসেছে গিলমোর সহ অনেকের লেখায়, তা হলো অফুরন্ত দুর্নীতির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই এলিট প্রশাসক শ্রেণী সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল

খোদ বৃটেনে বৃটিশ সিভিল সার্ভিস ‘প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সবার (বৃটিশ) জন্য উন্মুক্ত’ করে দেয়া হয় ১৮৭০ এর দশকে। অথচ এই উপমহাদেশে সিভিল সার্ভিস ‘প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সবার (বৃটিশ) জন্য উন্মুক্ত’ করা হয়েছিল আরও আগে, ১৮৫০ এর দশকে, কিন্তু তখনও আইসিএস নেটিভদের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। (এর আগে ছিল ‘সিলেকসন বাই পেট্রোন্যাজ’) এবং সেই দশকেই অবশ্য নেটিভদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল। বলে রাখা উচিত এর আগে ইন্ডিয়ানদের উঁচু পদে যাবার অধিকার ছিল না।

নেটিভদের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেও আইসিএসে সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারটা এত সোজা ছিল না। কালাপানি পাড়ি দিয়ে বিলেতে গিয়ে বৃটিশদের সাথে প্রতিযোগিতার করে সুযোগ পাওয়া কঠিন একটা কাজ ছিল। যার ফলে পরবর্তী চৌদ্দ বছরে শুধু মাত্র একজন নেটিভ আইসিএস হতে পেরেছিল। এবং তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রথম নেটিভ আইসিএস।

এই আইসিএসদের ব্যাপারে যে মডেলটা অনুসরন করা হত তা হল, কঠিন বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন। বাছাইয়ের পরে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়াশুনা করা এবং অন্যান্য কঠিন প্রশিক্ষণের ভেতর দিয়ে যাওয়া। এই আইসিএসরা ছিল ‘জেনারেলিস্ট’, এদের মধ্যে সুপিরিওরিটি ও আরোপ করা হত। দৃশ্যতই বৃটিশ-রাজ একটা এলিট প্রশাসক শ্রেণী গঠন করতে চেয়েছিল। এবং স্বীকার করতেই হয় সফলও হয়েছিল।

বড় সব সিদ্ধান্ত গ্রহনকারী এবং আমলাতন্ত্রের উপরের পদ গুলো (সেন্ট্রাল, প্রভিন্সিয়্যাল এবং জেলা পর্যায়ে) আইসিএসদের দখলে থাকত। অন্যান্য স্পেশালাইজ ক্যাডারের লোকজন উপরের পদ গুলোতে যাওয়া প্রায় অসম্ভবই ছিল, এবং তারা সাধারনত আইসিএসদের সাবোর্ডিনেট হিসাবেই থাকত।

১৯৪৭ সালে, পাকিস্তান এবং ভারত নামের দুটি নতুন রাষ্ট্রই এই সিভিল সার্ভিসের জন্য গর্বিত ছিল। পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরেই করাচিতে একটি সরকারি প্রচারপত্রে পাকিস্তনের সিভিল সার্ভিসকে আইসিএসদের উত্তরসূরী বলে গর্বভরে প্রচার করা হয়েছিল। আইসিএসকে বলা হয়েছিল, ‘দ্য মোস্ট ডিস্টিংগুইসড সিভিল সার্ভিস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। ১৯৪৭ স্বাধীনতার পরেই আইসিএসের আদলে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস গড়ে তোলা হয়েছিল, ১৯৫০ এর নামকরণ করা হয় সিভিল সার্ভিস অভ পাকিস্তান বা সিএসপি।

পাকিস্তানে সিএসপি নামের এই এলিট শ্রেণী কিন্তু মন্ত্রীদের কিংবা আইনসভার দ্বারা চালিত না হয়ে শক্তিশালী রুলিং পার্ট হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রায়ই তারা মন্ত্রী এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করত। আইসিএসদের ঐতিহ্য বজায় রেখে কেন্দ্রীয় এবং প্রভিন্সিয়্যাল সেক্রেটারিয়েটের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রেখেছিল। সিএসপিরা আইসিএসদের মত স্বায়ত্তশাসিত ছিল। তারা তাদের বাছাই প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ, ইনডোক্ট্রিনেশন, ডিসিপ্লিনারি ব্যাপার, প্রমোশন এমনকি বিভাগীয় অনুসন্ধান সবকিছুই একক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করত”, আর সেই জেনারেলিস্ট, স্পেশালিস্ট দ্বন্দ্ব তো ছিলই। জেনারেলিস্ট সিএসপিরা সবসময় স্পেশালিস্টদের অবদমিত করে রাখত।

১৯৪৭ সালের পরবর্তীতে পূর্ববাংলার সচিবালয়ের সমস্ত উচ্চপদগুলি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী (এবং ভারত থেকে উদ্বাস্তু অবাঙ্গালীরা) আমলাদের দখলে। এবং স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সাথে তাদের ব্যবহার ছিল প্রভূর মত। আমলাদের অধিকারে ছিল পৃষ্টপোষকতার সম্পদ। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় পূর্ব বাংলার মুখ্য সচিব আজিজ আহমদের হাতে বিপুল ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। সচিবদের বদলির ব্যাপারে তার কথাই ছিল ফাইনাল।

পাকিস্তানের প্রথম গভর্ণর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানও আমলাদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এমনকি আমলাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন রাজনীতিবিদদের উপর নজর রাখতে। আরেকটা উদাহরন দেয়া যেতে পারে। সিএসপি চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর জন্য সেক্রেটারী জেনারেলের পদ তৈরী করা হয়েছিল। ১৯৫১ তে তিনি যখন আর্থমন্ত্রী হলেন তখন এই পদ বিলুপ্ত করা হয়েছিল।

কাশ্মির এবং ভারত ইস্যুতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী দ্রুতই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। আশ্চর্যজনক ভাবে আমলা এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে আঁতাত খুব ভালই হত এবং রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির ব্যাপারে তারা সোচ্চারও ছিল।

তবে পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র তাদের পূর্বপুরুষদের ইনকরাপ্টএবল খ্যাতি বজায় রাখতে পারেনি। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রন বিহীন হয়ে, পৃষ্টপোষকতার সম্পদ তাদের করেছিল দুর্নীতিবাজ। মজার ব্যাপার আইয়ূব খান এবং ইয়াহিয়া খান দু’জনেই আমলাতন্ত্রকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, কিন্তু আমালাদের সাপোর্ট ছাড়া তাদের নিজেদেরই ভিতই ছিল নড়বড়ে।

ষাট এর দশকে পূর্বপাকিস্তানে স্বাধীকার আন্দোলন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে রুপ নেয়। তখন গুটিকয়েক দেশ প্রেমিক অফিসার ছাড়া বেশির ভাগ আমলারাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তেমন কোন ভুমিকা রাখেন নি। তাদের বেশির ভাগই পাকিস্তান সরকারের কাজ করেছেন।

১৯৭১ সালে অল পাকিস্তানে ৫০০ জন সিএসপি ছিল। ৩০০ জন পশ্চিম পাকিস্তানী, ২০০ জন পূর্বপাকিস্তানী। এই ২০০ জনের মধ্যে ১৭ জন ছিল বিহারী। বাকি ১৮৩ জন সিএসপিই ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দেশটা চালচ্ছে কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে। সাথে আছে কয়েকশ সংক্রামিত সিএসপি।

চলবে
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০১০ বিকাল ৪:৫৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×