ইজারা কি ? ইজারাদার বলতে কি বুঝি ? ইজারাদার প্রথার উদ্ভব কোথায় ও কি ভাবে ? ইজারা হচ্ছে সম্পদ ব্যবস্থাপনার ও রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে সহজ সর্টকাট একটি প্রক্রিয়া। ইজারাদার হচ্ছে সেই ব্যাক্তি বা গোষ্ঠি যে সরকারী কোন সম্পদ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভোগ করার স্বত্তাধিকারী। ইজারার মাধ্যমে সরকার পছন্দের অথবা নির্দিষ্ট অথবা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্ধারীত ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে ইজারাদার নিয়োগ করে; তার কাছ থেকে রাজস্ব গ্রহন করে তাকে ঐ সম্পদ ভোগ/ব্যবস্থাপনার অনুমতি দেয়।
সাধারনত বালু মহাল, জল মহাল, বাঁশ মহাল, খেয়া ঘাট, হাট বাজার, ব্রীজের টোল আদায় ইত্যাদী অসংখ্য ক্ষেত্র থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য ইজারা দেয়া হয়।
ইজারা প্রথার জন্ম বৃটিশ আমলে। বৃটিশরা এ অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের পর এখানকার সম্পদ ভোগ করা ও রজস্ব আদায়ের জন্য ইজারা প্রথার সৃষ্টি করেছিল।দখল করা ভূক্ষন্ড থেকে সম্পদ লুট বা উপার্জনের জন্য এই পন্থাটিই ছিল বৃটিশদের জন্য সবচেয়ে যৌক্তিক ও সহজ উপায়। এমনকি জমিদারী প্রথাও ছিল এক প্রকারের ইজারা প্রথা। এর মাধ্যমে সমগ্র ভূক্ষন্ডটি ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিশ্বস্ত ও পছন্দের বা সর্বোচ্চ দরদাতাকে তারা সে জমিদারীগুলি বরাদ্দ দিত।
ইজারাদাররা কি করে ? ইজারাদাররা ইজারা পাওয়ার পর নির্দিষ্ট পরিমান রাজস্ব প্রদান করে সেটা ব্যবসার ইনভেস্টমেন্ট বিবেচনা করে ঐ সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ লাভ/মুনাফা বের করার চেষ্টা করে। যেমন একটি জলমহাল/হাওয় ইজারা দেয়া হলে ইজারাদার প্রথমে নিশ্চিত করে চারপাশে বসবাসরত গ্রামের কেউ যেন এর ত্রিসীমানায়ও মাছ ধরতে আসতে না পারে। এর পর ইজারাদার জাল দিয়ে ঐ জলমহাল থেকে মাছ ধরা শুরু করে। শুকনা মৌসুম শুরু হলে পাম্প দারা পানি সেচের মাধ্যমে জলমহালটি শুকিয়ে ফেলে এবং বাকী মাছগুলি ধরে।
সমস্ত পানি সেচার পর বিলের তলার কাঁদায় কিছু মাছ লুকিয়ে থাকে । তখন ইজারাদারেরা ঐ পানি শূন্য জলমহালে রাতের বেলা বিভিন্ন জায়গায় হেজাক লাইট জ্বালিয়ে দেয়। রাতে ঐ হেজাকের আলোয় প্রচুর পোকামাকড় জমা হয় তখন কাঁদায় লুকিয়ে থাকা মাছগুলো সেই পোকামাকড় খাওয়ার জন্য বের হয়ে আসে। এবার ইজারাদারেরা ঐ মাছগুলি ধরে। এভাবে পানি শূন্য জলমহালটি শুকিয়ে প্রতিটি মাছ না ধরা পর্যন্ত ইজারাদার তার ভোগ করা অব্যহত রাখে। এটাই নিয়ম, সরকারকে টাকা দিয়ে ইজারা নিয়েছে তো সর্বোচ্চ পরিমাণ ভোগ করাই স্বাভাবিক ও যুক্তি সংগত। ইজারা নেয়ার পর মেয়াদের সময় জুড়ে ঐ সম্পদের মালিক ইজারাদার। ওখানে যা আছে সব কিছু তার । শত শত বছর ধরে এরকমই মনে করে এসেছে ইজারাদারেরা ।ইজারাদার হিসেবে আমাদের জাতীয় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাও পরিপক্ক হয়েছে।
সে জলমহাল হোক আর বন হউক আর যাই হউক সেখান থেকে সর্বোচ্চ বাণিজ্য করাই ঐতিহাসীক ভাবে ইজারাদারের কাজ। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো অনেক শর্ত থাকে আবার সেই শর্ত পালন না করারও অনেক রাস্তা থাকে। দূঃখের বিষয় বৃটিশরা চলে গেছে দেশও স্বাধীন হয়েছে কিন্তু ইজারা প্রথা এখনও আমাদের সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম উপায়।
এবার আসা যাক আমাদের সরকার ব্যবস্থা গনতন্ত্র এর সাথে ইজারা প্রথার আদৌ কোন পার্থক্য আছে কিনা ? স্বাধীনতার পর থেকে গত ৪০ বছরে যে সমস্ত গোষ্ঠি বা দল রাষ্ট ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তারা সবাই প্রকৃত পক্ষে দেশটা ইজারাই নিয়েছিল ও নিয়েছে। রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনী যখন যেই ক্ষমতায় এসেছে তারা সংঘবদ্ধ ভাবে দেশের সম্পদ লুটই করেছে এবং ইজরাদারের মানসিকতা নিয়েই দেশ পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যে রাজনীতি চলছে তা আসলে ইজারাতন্ত্রেরই একটি সংস্করন। আমাদের গনতন্ত্রকে কোন ভাবেই গনতন্ত্র বলা যায় না। বাস্তবতা ও মানসিকতায় এটা ইজারাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক দলগুলো এক একটি সংগবদ্ধ ইজারাদার।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ৯:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


