এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের গাড়ি চালক কামাল হোসেন কালার স্ত্রী নার্গিস আক্তারের দাবি, যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম হত্যা মামলায় তার স্বামীকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। তার স্বামী খুনী নয়। সে খুন করতে পারে না। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনো অভিযোগ নেই। কোনো থানায় একটি মামলা কিংবা জিডিও নেই। হঠাত্ কেন তাদের পরিবারে এমন দুর্দশা নেমে এসেছে কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি। নার্গিসের দাবি, তার স্বামীকে ইব্রাহিম হত্যা মামলায় বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। হত্যা-কাণ্ডের দায় কালার কাঁধে চাপিয়ে প্রকৃত অপরাধীকে রক্ষার চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেন নার্গিস। তবে এসব বিষয়ে তিনি খোলামেলাভাবে মিডিয়ার সামনে এখন কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন বলে জানান। কারণ, নানা দিক থেকে তিনি এখন চাপে রয়েছেন। স্বামী গ্রেফতার হওয়ার পর কেউই তাদের পাশে নেই। স্বামীর একমাত্র ভাই আব্দুল হান্নান মাঝেমধ্যে খোঁজ-খবর নেন। তিনিও থাকেন মধুবাগে এমপি শাওনের বাসার কাছে। তারা মিডিয়ায় তাকে কথা বলতে নিষেধ করেছে। তারপরও স্বামী যাতে ন্যায়বিচার পায় এ দাবি জানান তিনি। কোনো মিথ্যা মামলায় যেন তার স্বামীকে ফাঁসিয়ে দেয়া না হয়, এ জন্য সবার কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন নার্গিস। তিনি বলেন, বিভিন্ন মিডিয়ায় তার স্বামীকে অপরাধী ও সন্ত্রাসী উল্লেখ করে খবর প্রচার হয়েছে। নার্গিস বলেন, তার স্বামী সন্ত্রাসী নয়। তার বিরুদ্ধে কোনোদিন কেউ অভিযোগ পর্যন্ত করেনি।
গতকাল রাজধানীর বাড্ডায় পোস্ট অফিস গলির বাসায় এ প্রতিবেদককে এসব কথা বলেন কালার স্ত্রী নার্গিস। এসময় তাকে ভীতসন্ত্রস্ত মনে হয়েছে। কালা গ্রেফতার হওয়ার পর ভাশুর আব্দুল হান্নান সংসার চালানোর দায়িত্ব নিয়েছে। তিনি বৃদ্ধা মাকে নিয়ে থাকেন মগবাজারের মধুবাগে। কালার ব্যাপারে নার্গিসকে মুখ খুলতে নিষেধ করে দিয়েছে হান্নান। সে বলেছে, সব কিছু আমি দেখছি। কোনো সমস্যা হবে না। কালা নির্দোষ। তাকে কোর্ট থেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ১১ মাসের শিশুসহ তিন সন্তান নিয়ে অভাব-অনটনে সংসার চলছে নার্গিসের। তিনি বলেন, ঈদের আগের দিন হান্নান ২০ কেজি চাল ও ৫ হাজার টাকা দিয়ে গেছে। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে ঢাকায় থাকা সম্ভব নয়। তাই শরিয়তপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে।
নার্গিস জানান, ১৩ আগস্ট সন্ধ্যার আগে তার স্বামী বাসায় আসে। প্রতিদিনের মতো ওই দিন সকাল ৮টায় বাসা থেকে বেরিয়ে যায় কালা। ইফতারির পরে একটি ফোন পেয়ে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে চলে যায় তার স্বামী। ইফতারির সময়ও তাকে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। হঠাত্ বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় কি হয়েছে, কেন এত দ্রুত যাচ্ছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলেও কোনো কথা বলেনি। একটু সমস্যা হয়েছে বলে সে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর গভীর রাতে কালা বাসায় আসে। কিন্তু সেদিনও সে ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু বলেনি। নার্গিস জানান, কোথায়, কে খুন হয়েছে তা আমি জানি না। তার স্বামীও কখনও বাইরের কোনো কথা তাকে বলতো না। ডিবির হাতে গ্রেফতার হওয়ার পরই ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি।
কালা পরিবারের দাবি, কালা ঘৃণ্য রাজনীতির শিকার হয়েছেন। নানাভাবে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তার মুখ দিয়ে ইব্রাহিমকে হত্যার কথা স্বীকার করানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, কালার বিরুদ্ধে কোনো থানায় একটি জিডিও নেই। অনেক কষ্টের মধ্যেই কালা তার স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত। কালা নিজে গুলি করে ইব্রাহিমকে হত্যা করার কথা স্বীকার করায় তার স্ত্রী নার্গিস আক্তার রীতিমতো হতবাক। বিভিন্ন চ্যানেলে খবর দেখেও তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি দাবি করেন, কালা এখনও মুখে স্বীকার করেনি যে সে গুলি করে ইব্রাহিমকে হত্যা করেছে। ডিবির কর্মকর্তারাই বিভিন্ন মিডিয়ায় এসব জানিয়েছে।
কামাল হোসেন কালার পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, কালা কাউকে খুন করেনি। তাকে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ঘনিষ্ঠজনরা বলেছেন, নির্দোষ কালা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে।
বাড্ডার পোস্ট অফিস গলিতে কালার ভাড়া করা টিনশেড বাসায় পৌঁছতেই তার স্ত্রীনার্গিস ও বড় মেয়ে ফারজানা আক্তার বন্যা (১১) কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাত্র আড়াই হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় একটি টিনশেড ঘরে অমানবিক জীবনযাপন করেন তারা। কালার অনুপস্থিতিতে পুরো পরিবারটিতে নেমে এসেছে সীমাহীন দুর্দশা। আগস্টের ঘর ভাড়া এখনও দিতে পারেননি। কালা গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তিনবেলা খাবারও তাদের জুটছে না। এরই মধ্যে অর্থাভাবে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ুয়া বন্যার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। নার্গিস আক্তার জানান, ১৫ বছর আগে প্রেম করে কালার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দু’জনের বাড়িই শরিয়তপুরে। তিনি বলেন, কালা প্রথমদিকে রামপুরায় গাড়ির গ্যারেজে কাজ করত। গত ১১ বছর ধরে এমপি শাওনের গাড়ির চালক হিসেবে যোগ দিলে কিছুটা হতাশা কাটে পরিবারের। কালা ১২ হাজার টাকা বেতন পেত। তবে সকালে বাসা থেকে গেলেও কখনও রাত আড়াইটার আগে আসতে পারত না। তিনি বলেন, তার স্বামী যদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকত অন্তত তার কাছে বলত। তিনি বলেন, গ্রেফতার হওয়ার পর ডিবি থেকে রাত আড়াইটায় তাকে ফোন করে খবর দেয়। ডিবির কাছ থেকে খবর পেয়ে পরের দিন কিছু জামাকাপড় ডিবি কার্যালয়ে দিয়ে আসেন। এরপর ঈদের পরের দিন কারাগারে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। দেখা হয়নি। নার্গিস বলেন, তার স্বামী গ্রেফতার হওয়ার পর এমপি শাওন একদিনও তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তিনি মন্তব্য করেন, এতটি বছর ধরে এমপি সাহেবের গাড়ি চালায় তার স্বামী। অথচ একটা দিনও এই পরিবারের খোঁজ নিল না। নার্গিসের এক আত্মীয় বলেন, এমপি সাহেব কালার বড় ভাই হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। হান্নানকে ম্যানেজ করে এমপি শাওন এখন নার্গিসকে তিন সন্তানসহ গ্রামে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। হয়তো দু’একদিনের মধ্যেই নার্গিস তার সন্তানদের নিয়ে গ্রামে যেতে বাধ্য হবে।
ইব্রাহিম হত্যা মামলার নথি সিআইডিতে : যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম হত্যা মামলার কেস ডকেট (নথি) এখন সিআইডির হাতে। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি মেট্রো জোনের এএসপি খন্দকার আবদুল হালিম গতকাল বিকেল ৪টায় গোয়েন্দা পুলিশের কাছ থেকে মামলার কেস ডকেট বুঝে নেন। পরে নিজ দফতরে গিয়ে হত্যা মামলার তদারকি কর্মকর্তা সিআইডি মেট্রো জোনের বিশেষ পুলিশ সুপার মারুফ হাসানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। তদন্ত কর্মকর্তা খন্দকার আবদুল হালিম বলেন, তারা শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ ও ডিবির তদন্ত কার্যক্রম পর্যালোচনা করা শুরু করেছেন। প্রথম থেকে কেস ডকেট হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত কিভাবে তদন্ত হয়েছে তা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে।
বিশেষ পুলিশ সুপার মারুফ হাসান জানান, ইব্রাহিম হত্যা মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করবে সিআইডি। তদন্তের ধারাবাহিকতায় তারা পুনরায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন, মামলার বাদী, সাক্ষী এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে। কি পরিস্থিতিতে ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তা খতিয়ে দেখবে। মারুফ হাসান বলেন, আলোচিত এই মামলা নিয়ে যাতে কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে তারা সচেষ্ট থাকবেন। কারণ, এটার সুষ্ঠু তদন্তের ওপর নির্ভর করছে পুলিশ ও সরকারের ইমেজ। তদন্তকারী সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে, আজ-কালের মধ্যে সিআইডি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারে।
খবরটা এখানেঃ Click This Link পড়লাম।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ১২:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


