গুগল কথন - ৩ : গুগলপ্লেক্সের ভিতরে বাইরে
২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:০৫
ইন্টার্নশীপের প্রথম দিনেই হাজির হলাম গুগলের সদর দপ্তরে। এতো বিখ্যাত কোম্পানি, কিন্তু নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি নেই। প্রথম দিনে লবিতে আমার ইন্টার্নশীপের কাগজপত্র আর আইডি দেখানোর পরে ছবি সহ গুগল ব্যাজ দেয়া হলো। ব্যাস, এই ব্যাজ থাকলে গুগলের সর্বত্র অবাধে আসা যাওয়া করা সম্ভব।
গুগলের প্রধান অফিসকে বলা হয় গুগলপ্লেক্স। প্রযু্ক্তির প্রাণকেন্দ্র সিলিকন ভ্যালির একেবারে কেন্দ্রস্থল মাউন্টেইন ভিউ শহরে এর অবস্থান। আসলে সান ফ্রান্সিস্কো হতে সান হোসে পর্য্ত প্রায় ৪০ মাইল লম্বা যেই উপদ্বীপ আকারের এলাকা, তার পুরোটাই আধুনিক প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যবসার কেন্দ্র। মাউন্টেইন ভিউ এর পাশেই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, পালো আল্টো নামের শহরে। প্রযুক্তিগত বিভিন্ন বিষয়ে এখানে অভাবনীয় সব গবেষণা হয়ে চলেছে শ খানেক বছর ধরেই, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের দিক থেকেও এটা দুনিয়ার প্রথম কাতারে। নামজাদা সব মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিশেষত ইদানিংকার অধিকাংশ সফটওয়ার কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা অনেকেই এখানকার ছাত্র ছিলেন। গুগলের সের্গেই ব্রিন আর ল্যারি পেইজ তো বটেই, ইয়াহু!র প্রতিষ্ঠাতা ফিলো এবং ইয়াং, সানের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাকনিলি, বিনোদ খোসলা - এরা সবাই স্ট্যানফোর্ডে পড়ার সময়ে বা পাস করেই নিজেদের কোম্পানিগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর সেই কারণেই পালো আল্টো বা মাউন্টেইন ভিউতে এই সব কোম্পানির সদর দপ্তর গড়ে উঠেছে।
ফিরে আসি গুগলপ্লেক্সের কথায়। গুগলের শুরুটা হয়েছিলো ব্রিন ও পেইজের এক বন্ধুর গ্যারেজে, মাত্র কয়েকটি কম্পিউটার নিয়ে। মেনলো পার্কের ঐ গ্যারেজে পরে গুগল চলে আসে পালো আল্টো শহরে। কিন্তু গুগলের অভাবনীয় সাফল্যের কারণে জায়গার দরকার বাড়তে থাকে অচিরেই। তাই ২০০৩ সাল এক কালের নামকরা কোম্পানি সিলিকন গ্রাফিক্সের ১৬০০ অ্যাম্ফিথিয়েটার পার্কওয়েতে অবস্থিত বিশাল হেড কোয়ার্টারটি গুগল ভাড়া নেয়। এখানে রয়েছে চারটি ভবন - বিল্ডিং ৪০, ৪১, ৪২, এবং ৪৩। আগেই বলেছিলাম, এই চারটি ভবনের মাঝখানের চত্ত্বরের বিশাল ডাইনোসরটির কথা। এছাড়াও মাঝখানের চত্ত্বরে রয়েছে একটি ভলিবল কোর্ট। সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে কেউ না কেউ খেলে বেড়াচ্ছে ... দেখলে মনে হবে অফিস নয়, বরং একটা হোটেলের খেলার কোর্ট। অনেকের কাছে শুনেছি, বিকেলের দিকে সের্গেই ব্রিন বা পেইজও নাকি যোগ দেয় খেলাতে। আমার অফিসটা অবশ্য একটু অন্যপাশে থাকায় সেই দৃশ্য দেখিনি।
এর পাশেই ক্যাফের চত্ত্বর। গুগলের সুবিখ্যাত খাওয়া দাওয়া নিয়ে পরে লিখবো। কিন্তু এটুকু বলতে পারি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেরা সেরা সব রেস্তোঁরার খাওয়াকেই গুগলের ক্যাফেগুলো হার মানায়। মোট ক্যাফের সংখ্যা এখানে ১৫টি। একেক ক্যাফে একেক রকমের - প্রধান ক্যাফেটা গুগলপ্লেক্সের বিল্ডিং ৪০এর চার্লিজ ক্যাফে। ওখানে এক সাথে প্রায় কয়েক হাজার লোকের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় প্রতিদিন।
আমাদের ওরিয়েন্টেশন হয়েছিলো বিল্ডিং ৪৩ আর ৪২ এর বিশাল অডিটোরিয়ামে। প্রথম দিনের সব কাজ কর্ম শেষে পুরো গুগলপ্লেক্স ঘুরে দেখানো হলো। প্রতিটি তলাতেই একটু পর পর মাইক্রো কিচেন আছে, যাতে থরে থরে সাজানো আছে নানা রকম ফলের রস, চিপ্স, আইসক্রিম, ডাবের পানি, চকলেট, স্যান্ডউইচ থেকে শুরু করে কতো কি!! এই ব্যাপারে নাকি সের্গেই ব্রিনের একটা নীতি আছে, "কোনো মানুষকেই খাবার দাবারের থেকে দেড়শো ফুটের বেশি দূরে রাখা ঠিক না"। কাজ করতে করতে একটু খিদে পেলেই দূরে যাবার দরকার নেই, অফিস থেকে দুই পা হাঁটলেই একটা মাইক্রোকিচেন, আর সেখানে এরকম জিভে জল আনা সব খাবার।
গুগলপ্লেক্সের চারটি ভবন ছাড়াও এই এলাকাতেই কেবল গুগলের অফিস রয়েছে মোট ১৬টি। এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত প্রায় ২ মাইল দূরত্ব। আমার অফিসটি পড়েছিলো পশ্চিম পাশে। অবশ্য এক অফিস থেকে আরেক অফিসে যাবার জন্য অনেক ব্যবস্থা আছে। পুরো ক্যাম্পাসের প্রতিটি ভবনের সামনেই রয়েছে গুগলের মনোগ্রাম লাগানো বাই সাইকেল বা জি-বাইক। যে কেউ যে কোনো জি-বাইক নিয়ে অন্য অফিসের সামনে গিয়ে পার্ক করে রাখে, পরে আবার সেটা অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারে। তালা মারার ব্যাপার নেই। এটা ছাড়াও রয়েছে ইলেকট্রিক স্কুটার, শাটল বাস, এবং দুই চাকার অদ্ভুত যান সেগওয়ে। কিন্তু সবকিছুকে হার মানায় মাকড়শার মতো আকৃতির কনফারেন্স বাইক। প্রথম যেদিন দেখলাম, অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মাকড়শার অনেক গুলো পায়ের মতো এই বাইকের সাতটি বসার জায়গা বৃত্তাকারে বসানো, কেন্দ্রের একটি বিন্দুতে যুক্ত। বসার সময় কেন্দ্রের দিকে মুখ করে সবাই বসে। প্রতিটি সিটের নীচে প্যাডেল রয়েছে। সবাই প্যাডেল চালালে এক অদ্ভুত উপায়ে সেটা এক সাথে যুক্ত করে বাইকটিকে চালায়। আটজনের মধ্যে একজনের হাতে স্টিয়ারিং থাকে, সে এটা কোনদিকে যাবে তা ঠিক করে। আর এই বাইকের নাম কেনো কনফারেন্স বাইক হলো? আসলে গুগলের প্রকৌশলীরা কনফারেন্স রুমে মিটিং না করে অনেক সময় এই বাইকে মজা করে চালাতে চালাতে মিটিং করে থাকে, এমনকি ল্যাপটপে করে ইন্টারনেটে যোগাযোগ, সবই করা সম্ভব এটাতে।
গুগলপ্লেক্সে মোট কাজ করে হাজার ছয়েক মানুষ। এদের অজস্র গাড়ি পার্ক করার জন্য যে পার্কিং লট রয়েছে, গুগল সেটাকেও অন্যভাবে কাজে লাগিয়েছে। গুগলপ্লেক্সের স্যাটেলাইট ছবিতেই দেখবেন, পুরো গুগলপ্লেক্সের উপরের ছাদ, এমন কি পার্কিং লটের অনেক অংশের ছাউনির উপরে সোলার প্যানেল বসানো। এই সোলার প্যানেলগুলো থেকে প্রতিদিন যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যুত উৎপাদন করা হয় - দিনে গড়ে ২ মেগাওয়াটেরও বেশি। আর গুগলের নিজস্ব আরেকটা প্রজেক্ট হলো প্লাগ-ইন হাইব্রিডের গবেষণা, অর্থাৎ এমন গাড়ি বানানো, যা বাসার ইলেক্ট্রিক সকেটে প্লাগ ঢুকিয়ে চার্জ করে নেয়া যাবে।
থাক, আজ এতটুকুই, পরের পর্বে গুগলের বিখ্যাত খাবার দাবারের গল্প করা যাবে ...
(ছবিগুলো গুগলপ্লেক্স, আমার অফিসের বাইরের অংশ, গুগলপ্লেক্সের মধ্যকার ভলিবল কোর্ট - এই সব এলাকার)
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): গুগল, গুগল, গুগল গুগল, গুগল গুগল গুগল গুগল, গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল, গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল, গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গ, গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গ, গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গ, গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গ, গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গুগল গ ;
কালপুরুষ বলেছেন:
সময় হাতে নিয়ে পড়বো। দেখে গেলাম।
সাইফুর বলেছেন:
আপনার লেখার জন্য অনেকদিন ্ওয়েট করছিলাম..ধন্যবাদ ৫
সাইফুর বলেছেন:
আপনার লেখার জন্য অনেকদিন ্ওয়েট করছিলাম..ধন্যবাদ ৫
ঝড়ো হাওয়া বলেছেন:
পুরা পুরি স্বপ্ন রাজ্য মনে হচ্ছে।মাইক্রোকিচেন এর ছবি কি দেওয়া সম্ভব ?
তাছাড়া, যে সব আজব ব্হনের কথা বললেন সেগুলো খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
মাইক্রোকিচেনের দুই একটা ছবি বোধহয় লুকিয়ে চুরিয়ে তুলেছি (ভবনের ভেতরে ছবি তোলা মানা ছিলো)। তবে মাইক্রো কিচেন তো নস্যি, মেইন ক্যাফে গুলোর বর্ণনা সামনে দিবো, অবিশ্বাস্য মজার সব খাবার দাবার। আর সবই হলো ফ্রি!!
কনফারেন্স বাইকের লিংক দিয়ে দিয়েছি পোস্টে, গুগলেরটা না তবে উইকিপিডিয়ার এন্ট্রি থেকে। গুগলে এটাই ব্যবহার করা হয়।
মহা পাজি বলেছেন:
কনফারেন্স বাইকের একটি ছবি পরের পর্বে পোষ্ট করেন প্লিজ....(যদি সম্ভব হয়)
সান ফ্রান্সিস্কোতে অনেক অনেক বার গেছি আমি আর জারিয়া। অসাধারণ সুন্দর একটা শহর। ছবি তুলেছি হাজার কয়েক, পোস্ট দিবো পরে।
সাইফুর বলেছেন:
আরো কিছু ছবি পোষ্ট করুন প্লিজ
সাইফুর বলেছেন:
রাগিব ভাই..আপনার কাছ থেকে একটি েপাষ্ট আশা করছি..যাতে অপটিকেল ফাইবার ও বাংলাদেশের ইন্টারনেট সম্পরকে আপনার মতামত চাই
অন্যরকম বলেছেন:
অসাধারণ...........তয় রোজা রমজানের দিনে .... ১৫০ফুটের মাঝে মজাদার সব খাবার.... ফ্রীঈঈঈ.... অবস্থা ত কেরোসিন। এইটা কি ঠিক করলেন ভাইয়া?
ইফতারের পরে খাবারের ছবি পেস্ট কইরেন!
৫
আমার এইখানে এখন সেহেরির সময়, তাই খাবার দাবারের কথা মনে পড়লো
প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব বলেছেন:
ইফতারের পরে খাবারের ছবি পোস্ট কইরেন! রাগিব ভাই .. ধন্যবাদ... চমত্কৃত হইলাম...
সামী মিয়াদাদ বলেছেন:
শুনে তো্ জিবে জ্ল....তারপরো ৫। পরের গুলার কবে দেবেন....? তাড়াতাড়ি....
চিলে কোঠার সেপাই বলেছেন:
দারুন...আপনার গুগল কথন এর মাধ্যমে আমাদের ও গুগল (ভারচুয়াল) ভ্রমন ঘটে চলচে...চালিয়ে যান।
সাইফুর বলেছেন:
ধন্যবাদ
মোসতফা মনির সৌরভ বলেছেন:
৫। অপেক্ষায় রইলাম পরবর্তী পর্বগুলোর
শাহেদুর রহমান বলেছেন:
রাগিব ভাই,আপনার কাছ থেকে আরো কিছু বিষয়ে তথ্যবহুল পোষ্ট আশা করছি।
১. যারা বর্তমানে CSE/CS নিয়ে পড়ালেখা করছে তারা ভবিষৎতে যাতে ভালো, বড় কোন ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানে কাজ পেতে পারে তার জন্য কোন কোন Subject/Technology/Language র উপর গুরুত্ব দেয়া উচিত।
২. একইভাবে যারা সদ্য Graduation সম্পন্ন করেছে তারা কোন কোন Technology/Language র উপর গুরুত্ব দিতে পারে।
৩. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে Open Source সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এর গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা।
শাহেদুর রহমান বলেছেন:
ধন্যবাদ।
মাহবুব মোর্শেদ বলেছেন:
হেভি ব্যাপার।
আন্ধার রাত বলেছেন:
আরো লিখেন, ছবি দেন।
গুগলের অনেক কিছুই এরকম মজার। আমাদের অফিসে বড় একটা ডিসপ্লে স্ক্রিন ছিলো, একদিন দেখলাম ঐটাতে ভিডিও গেইম লাগিয়ে সবাই মিলে মজাসে খেলছে। আর গুগলপ্লেক্সের একটা তলাতে তো কয়েন অপারেটেড ভিডিও গেইম মেশিন দেখেছি (বাংলাদেশে দেশে বছর কয়েক আগে যেসব মেশিন দেখেছি দোকানে, ওরকম)।
আদনান™ বলেছেন:
একটা জিনিস বুঝি না। গুগল এত বস্। তারপরও কেন alexa ranking এ ১ নম্বর হতে পারছে না !!!
অধিকাংশ মানুষের কম্পিউটারে অরিজিনাল যে হোমপেইজ সেট করা আছে (এমএসএন) সেইটাই রয়ে যায়, আর পালটায় না। আর তা ছাড়া ইয়াহু মেইল তো আছেই।
আমি নিজেও গুগলের ওয়েবসাইটে সরাসরি আদৌ যাই না। ফায়ারফক্সের সার্চ বক্স দিয়েই সব সার্চ করি, গুগলের হোম পেইজে না।
সাইফুর বলেছেন:
রাগিব ভাই আমাদের বাংলাদেশ ইন্টারনেটে কেন এত পিছনে পড়ে আছে...প্লিজ আপনার সুচিন্তিত মতামত ও সমাধান কি হতে পারে তা একটি পোষ্টে পোষ্ট করুন....আপনার কাছ থেকে জ্ঞান আহরনের সুযোগ পেতে চাই ....সামহোয়্যারের মাধ্যমে..
নেই মানুষ বলেছেন:
জটিলস্য জটিল।
রাশেদ বলেছেন:
ঝাকানাকা!
বিহংগ বলেছেন:
আহা!গুগলের পাশ দিয়ে ঘুরে এলাম।যদি আপনার সংগ পেতাম একবার ভিতরে ঢু মারতে পারতাম।ভাবীর হাতের চায়ের কথা নাই বা বললাম।অনেক যত্ন করে লিখা, দারুন লেগেছে।
গন্ডার বলেছেন:
ভালো লাগলো পড়ে
তারিফএজাজ বলেছেন:
আমার স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো না, গুগল ক্যাফেটা তুলে আনলে মন্দ হত না, রাগিব ভাইয়া তো অন্তত খেয়েছে, এটাই স্বান্ত্বনা।

















