গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে একদিন (২) - অতল খাতের গহীন বিষ্ময়
২২ শে নভেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১২:৪৩
(প্রারম্ভ ) (পর্ব ১ )
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে যাওয়ার রাস্তাটা দেখলে বোঝা যায় না, পুরো এলাকাটা সমূদ্রসমতল থেকে এতো উঁচু। আসলে পুরো এলাকাটা মালভূমি - তাই পাহাড় পর্বত বেশি নেই। উইলিয়ামস নামের ঐ শহরটা থেকে পরদিন সকালে রওনা হলাম আমরা, প্রায় ৫০ মাইল দূরে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কের অবস্থান।
পার্কে ঢোকার আগে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটা ছোটখাটো সিনেমা হল আছে, আইম্যাক্স থিয়েটারে দেখানো হয় এই গিরিখাতের পুরো ইতিহাস। হাতে সময় আছে, তাই ঠিক করলাম ওখানে একবার ঢুঁ মেরে যাই।
এ এলাকায় সাদা মানুষের আসার অনেক আগে, সেই ৪০০০ বছর আগে সেখানে আদিবাসীদের বসতি ছিলো। সেই প্রাচীন শিকারী যাযাবর আদিবাসীদের খুব বেশি নিদর্শন নেই, কেবল বাচ্চাদের জন্য গাছের ডাল আর সুতা/লতা দিয়ে তৈরী করা কিছু কাঠের খেলনা পাওয়া গেছে, যা ৪০০০ বছরেরও বেশী পুরানো।
এই যাযাবরদের পরে অনেক দিন কেটে যায়, তার পর এখানে আসে "আনাসাজি" নামের আদিবাসীরা। আজ থেকে ২৫০০ বছর আগে থেকে এদের বসবাস শুরু হয়, পাথরের ঘরবাড়ি তৈরী করে বাস করতো তারা এখানে। ১২শ শতকে এখানে প্রচণ্ড খরার মুখোমুখি হয়ে আদিবাসীরা চলে যায় অন্যত্র। এর পরে অনেকদিন জনমানবহীন কাটার পরে নতুন পাইউতে আদিবাসীরা আসে। আর শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে স্পেনীয় অভিযাত্রীরা এখানে আসে ষোড়শ শতকে, আর পরে উনবিংশ শতকে প্রথম চেষ্টা চালানো হয়, নৌকায় করে এই ক্যানিয়নের তলায় অবস্থিত কলোরাডো নদী পাড়ি দেয়ার। অনেক অভিযাত্রীর মরণের পরে সম্ভব হয় প্রথম এটা পাড়ি দেয়া, আর এই এলাকার মানচিত্র তৈরী করা।
আজ অবশ্য এতো ঝামেলা পোহাতে হয়না, আইম্যাক্স থিয়েটারে বসে চোখের নিমেষে নেমে এলাম ক্যানিয়নের উপর থেকে এক মাইল গভীরে, খরস্রোতা কলোরাডো নদীর স্রোতের সাথে ভেসে চললাম ক্যানিয়নের তলদেশ ধরে, দেখতে পেলাম গভীরের সেই গুহাগুলো, যেখানে এক সময় আদিবাসীদের বসবাস ছিলো। দিব্য চোখে দেখতে পেলাম হাজার বছর ধরে বিষ্ময়ে অভিভূত মানুষদের ... প্রকৃতির প্রকাণ্ডতার কাছে নিজের সামান্যতা বোঝার মতো এরকম জায়গা দুনিয়াতে কমই আছে।
----------
ক্যানিয়ন পার্কে ঢুকতে গাড়ি প্রতি ২৫ ডলার লাগে, সেটা দিয়ে দিলে ভেতরে ঢোকা যায় ৭ দিন। আমাদের অবশ্য একটা দিনই সম্বল। মার্কিনীরা অভিযানপ্রিয়, তাই অনেকে আরভি-তে করে রীতিমতো সংসার নিয়ে পার্কে চলে যায়, এখানেও তার ব্যতিক্রম দেখলাম না। পার্কের ভেতরে এইসব ঘরবাড়ি মার্কা গাড়িগুলো পার্ক করে রাখার জায়গা আছে আলাদা। তবে নির্দিষ্ট জায়গার পরে আর গাড়ি নিতে দেয় না, পার্কের নির্ধারিত বাসে করে ঘুরতে হয়।
----------
সময় মাত্র এক দিন, কিন্তু দেখার আছে অনেক কিছু। ঠিক করলাম বাসে করে পশ্চিম দিকের পয়েন্ট গুলো দেখবো। পার্কের কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রায় মাইল দশেক জায়গা জুড়ে পর্যটকদের দেখার জন্য বিভিন্ন স্থানে ব্যবস্থা করা আছে। পার্কে ঢুকতেই শুরুতে পড়ে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ভিলেজ, যেখান থেকে শাটল বাসগুলোর যাত্রা শুরু। গাড়িটা পার্ক করে আমরা দুজনে প্রথমে কাছের পয়েন্টটাতে সরাসরি চলে গেলাম। ইয়াভাপাই অবসারভেশন স্টেশন নামের এই জায়গাটা আসলে নামেই গালভরা ... প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নষ্ট হতে না দেয়ার জন্য অল্প একটু রেলিং দেয়া একটা জায়গা। সেখানে পৌছে যখন তাকালাম সামনে, এক অভাবনীয় দৃশ্য ভেসে এলো চোখের সামনে, লাল গোলাপী কমলা রঙের পাহাড় যেন এক অজানা ভাষ্কর খোদাই করে রেখেছে চোখের সামনে। রেলিং এর উপর দিয়ে সাহস করে নিচে তাকালাম, খাড়া নেমে গেছে পর্বত, ১ মাইল গভীরে। এর আগে শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ারের উপরে উঠেছিলাম, সেটা বড়জোর ১৪০০ ফুট (৪৪০ মিটার) উঁচু, আর সেই তুলনায় এখানে পর্বত খাড়া নেমে গেছে ১ মাইল (৫০০০+ ফুট!!)। গাইডেরা বার বার সাবধান করে দিচ্ছে ছবি তোলার উৎসাহে বেশি এগিয়ে না যেতে, একটু বেখেয়াল হলেই পপাৎ ধরণীতল, সেই ১ মাইল গভীরে পড়ে মৃত্যু নিশ্চিত।
কিন্তু আমাদের মনে তখন আর নেই শংকা, অপার বিষ্ময়ে দেখে চলেছি প্রকৃতির এই ভাষ্কর্যরাশি।
(চলবে)
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): ভ্রমণ, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, ভ্রমণ, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ;
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার ডায়েরি, স্মৃতিচারণ বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ২২ শে নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:২৫ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
রাজামশাই বলেছেন:
প্লাসাইলাম।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদাইলাম ![]()
...অসমাপ্ত বলেছেন:
ভয়াবহ সুন্দর।...পুরান মানুষগুলো দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে এই "বিশাল গর্তে" থাকা কি জন্য পছন্দ করেছিল কে জানে! এখানে ফসলই বা ফলাত কোথায়!!
লেখক বলেছেন: খেয়াল করুন, ক্যানিয়নের তলায় কিন্তু নদী। এজন্যই হয়তো মানুষগুলো ওখানে থাকতো।
চিটি (হামিদা রহমান) বলেছেন:
একবার আরিজোনা গিয়েও মিস করেছি। যাবার কথা অনকেদিন ধরে ভাবছি। আপনার ছবি ও লেখা দেখে যাবার লোভ আরো বেড়ে গেলো। শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ রাগিব ভাই।
আশাকরি ভালো আছেন??
লেখক বলেছেন: জ্বি, আমি ভালো আছি। আসলে হুট করেই ঠিক করা, গুগল থেকে ইলিনয়ে ফেরার পথে ওখানে থামবো। অ্যা্রিজোনার আরেক সুন্দর জায়গা সেডোনাতে যাবার ইচ্ছা ছিলো, আর সময় হয়নি।
...অসমাপ্ত বলেছেন:
গুগোল ইমেজ এ দেখলাম নদীগুলোর পাড় পর্যন্ত পাথুরে। আমাদের দেশের মত বালিময় না। বড়ই আজিব। আচ্ছা গ্রান্ড ক্যানিয়ন এ নাকি স্কাইওয়াক নামে একটা স্ট্রাকচার করছে গ্লাস ব্রিজ টাইপের... উপর খেকে নিচের বিশাল শূন্যতা দেখার জন্য?
লেখক বলেছেন: ঐটা এখানে না, এখান থেকে আরো পশ্চিম দিকে। সেই এলাকার আদিবাসীরা পয়সা কামানোর জন্য কাঁচের একটা বেরিয়ে থাকা বারান্দার মতো করেছে, যা ক্যানিয়নের মধ্যে বেরিয়ে আছে অনেকটা দূর। তবে ব্যাটারা ব্যবসা বোঝে, বেশ পয়সা নেয় ওটাতে উঠার জন্য। সেখানে আর যাওয়া হয়নি।
লেখক বলেছেন: আসলেই। প্রতি বছর কিনারায় গিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে অনেক লোক পা পিছলে ... ![]()
আলী আরাফাত শান্ত বলেছেন:
এতবড় খাদ!
লেখক বলেছেন: কয়েকশো মাইল দীর্ঘ। চওড়াতে উত্তর দক্ষিণে মাইল দশেক বা তারো বেশি। ১ম পর্বে সম্ভবত ম্যাপ দিয়েছি, গুগল ম্যাপে স্যাটেলাইট ফটো দেখে নিতে পারেন। কঠিন জায়গা!
বাবুয়া বলেছেন:
প্রিয় রাগীব,ক্যামন আছো তুমি?
তোমার লেখার প্রথম পর্বটা পড়ার প থেকেই অপেক্ষা করছিলাম-কবে পরের পর্বটা পড়বো! এতো দিনে তোমার সময় হলো? জানি তুমি খুব বেশী ব্যাস্ত থাকো-তারপরও তোমার কাছে আমাদের প্রত্যাশা তোমার কর্ম ব্যাস্ততার কথা আমাদের মানিয়ে রাখতে পারেনা!
অসম্ভব সুন্দর লেখা। খুবই তথ্যপুর্ণ লেখা। তোমার পোস্ট মানেই অনেক তথ্য, অনেক অজানাকে জানা! তোমার আরো তথ্যবহুল লেখা আমার শেষ না করা অব্ধি আরো পড়ার আকুতি থেকেই যাবে। যলদি লিখবে...............
অনেক দিন ধরে চলুক...............
শুভ কামনায়।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। আমি কিন্তু আপনার "কড়চা" বেশ মজা করেই পড়ছি। ![]()
লেখক বলেছেন: বিশাল চাপে ছিলাম। আজ সকালে ঘন্টা দুয়েক ধরে ৫ জন প্রফেসরের সামনে রিসার্চ প্রপোজাল নিয়ে লেকচার দিলাম। এটার জন্য ২ সপ্তাহের উপরে প্রস্তুতি নিয়েছি, তাই লেখালেখি বন্ধ ছিলো।
নুশেরা বলেছেন:
চমৎকার। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
অক্ষর বলেছেন:
চাঙ্কু বলেছেন: সুইসাইড খাদকদের জন্য চমৎকার জায়গা । লাফ দিতে পারলে ১০০% মৃত্যুর সফলতাভাইরে, এইখান থিকা পরলে তো ব্যাথা পাবো অনেক
ভাঙ্গা পেন্সিল বলেছেন:
ভয় পাইলাম...এক্রোফোবিয়া আছে। জনতা ব্যাংকের ২৪ তলা থেকে নিচে দেইখা ভয় পাইছিলাম। তবে দেখার ইচ্ছাও আছে গ্রান্ড ক্যানিয়ন
ইয়াহিয়া বলেছেন:
নদীর পানি খুব স্বচ্ছ হওয়ার কথা।নীচে নামার কোন ব্যবস্থা আছে?
লেখক বলেছেন: হ্যাঁ, হাইকিং করে নামা যায়, আর সেই সামর্থ/সাহস না থাকলে ট্রেনে করে নামার ব্যবস্থা আছে।
কে এম তানভীর আহম্মেদ বলেছেন:
পড়ে ভালো লাগল। রাগিব ভাইকে ধন্যবাদ।
জেরী বলেছেন:
চলুক........+++.........
লেখক বলেছেন: হাইকিং করার সময়েও মরে ... অনেকের নিজের শক্তি সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও শখ করে ১ মাইল নিচে নামতে গিয়ে ...
নাফিস ইফতেখার বলেছেন:
চমৎকার আর অনন্য অভিজ্ঞতা।"প্রকৃতির প্রকাণ্ডতার কাছে নিজের সামান্যতা" - উপমাটা অতুলনীয় হয়েছে..........
হৃদছায়া বলেছেন:
ভালো লাগলো
পাপী বলেছেন:
গল্পের মতো লাগলো। ++++++++++++++++++++++++++++++
|জনারন্যে নিসংঙগ পথিক| বলেছেন:
ওয়াও...কবে যে যাবো?
রোকসানা লেইস বলেছেন:
ভালোলাগল ...গ্রান্ডক্যানিয়ানে ঘুরার স্মৃতি মনে পড়ে গেল
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...



















