গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে একদিন (৩/শেষ) - প্রকৃতি, বিষ্ময়, আর জীবন যেখানে বহমান
২৩ শে নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:২১
(প্রারম্ভ ) (পর্ব ১ )
(পর্ব ২)
শাটল বাসগুলোর যাত্রা শুরু হয় গ্রান্ড ক্যানিয়ন ভিলেজ থেকে। মাইল খানেক পর পর একএকটি পয়েন্ট, যেখানে বাস থামে, আর বিভিন্ন দিক থেকে ক্যানিয়নের সৌন্দর্যকে উপভোগ করা যায়। সেই বাসে চেপে আমি আর জারিয়া রওনা হলাম, গ্রীষ্ম কাল বলে পর্যটকদের ভীড় খুব বেশি, নানা দেশের নানা জাতির লোক বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে চলেছে আসেপাশে।
সেই সকালে নাস্তা করেছি, বেলা সাড়ে বারোটার দিকে বেশ খিদে পেয়ে গেলো। দেশে হলে চা নাস্তার দোকান গিজগিজ করতো, কক্সবাজার সী বিচে বসে খাওয়া দাওয়ার কোনো সমস্যা দেখিনি। কিন্তু মার্কিন প্রকৃতিপ্রেমিকেরা প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট করে দোকানপাট খোলার বিরোধী, তাই এখানে রেস্তোঁরার সমাগম নেই। তবে প্রায় ১০০ বছর আগে এখানে কয়েকটা হোটেল খোলা হয়েছিলো, সেই ঐতিহ্যবাহী হোটেলগুলো এখনো চালু আছে।
এখানে আসার আগে একবার ভেবেছিলাম ক্যানিয়নের ভেতরের হোটেলে থাকবো। কিন্তু সেগুলোর ওয়েবসাইটে গিয়ে তো চোখ চড়কগাছ ... একে তো ভাড়া আকাশছোঁয়া, তার উপরে এখানে থাকতে গেলে ৮-১০ মাস আগে থেকে বুকিং দেয়া লাগে! হোটেলগুলোর সামনে এসে বুঝলাম কারণটা কী ... ছিমছাম পুরানো দিনের স্থাপত্যে কাঠের তৈরী হোটেলগুলো ক্যানিয়নের ঠিক পাশে, হোটেলের বারান্দা থেকে মনোরম দৃশ্য দুচোখ ভরে উপভোগ করা যায়। কাজেই হোটেলগুলোতে প্রচন্ড ভীড় লেগে থাকে সারাবছরেই।
থাকতে নাহয় নাই বা পারলাম, হোটেলগুলোতে ঘুরতে আর খেতে তো সমস্যা নেই! তাই নেমে পড়লাম "এল টোভার" হোটেলের সামনে। পুরানো বনেদী হোটেল, পুরোটা ১৯০৫ সালে তৈরী, কালচে কাঠের কারুকাজ করা। ভেতরে আদিবাসীদের শিল্পকর্ম শোভা পাচ্ছে। একশো বছর আগে যেভাবে সাজানো, এখনো সেভাবেই রাখা আছে সবকিছু। রেস্তোঁরার মেনু অবশ্য যথারীতি গলাকাটা, তাই হালকার উপরেই দুপুরের খাবার সারতে হলো। খাওয়ার জায়গাটার পাশের জানালা দিয়ে তাকালেই বোঝা যায়, এই হোটেলের জনপ্রিয়তার কারণ -- ক্যানিয়নের মাত্র ৬ মিটার দূরে হোটেলটা তৈরী হয়েছে।
হোটেলের সামনেই "হোপি হাউজ", হোপি আদিবাসীদের ঘরবাড়ির আদলে তৈরী। ভেতরে হোপি ইন্ডিয়ানদের তৈরী করা গয়না, পালকের মুকুট, পুতুল -- এসব কিছু বিক্রি হচ্ছে ছোট্ট একটা দোকানে। যা দাম, তাতে অবশ্য কেনার উপায় নেই কিছু।
বাইরে তখন রোদ বেশ চড়া। শাটল বাস রওনা হলো হারমিট রোড (সন্ন্যাসী সড়ক) ধরে। চমৎকার এই রাস্তাটি নির্মিত হয়েছিলো ১৯৩৪-৩৫ সালের দিকে। প্রায় ৭ মাইল দীর্ঘ এই রাস্তায় মাইল খানেক পরে পরেই পর্যটকদের জন্য এক একটি পয়েন্ট বা পর্যবেক্ষণ স্থান রয়েছে। হোপি পয়েন্ট, মারিকোপা পয়েন্ট, মোহাভে পয়েন্ট এরকম করে বিভিন্ন নামের এই পয়েন্টগুলোর একেকটাতে একেক রকমের দৃশ্য দেখা যায়। আমরা দুএকটা বাদে সবগুলো পয়েন্টেই নামলাম। কিন্তু চমক অপেক্ষা করছিলো হারমিট রোডের শেষ মাথায় ...ক্যানিয়নের একেবারে কিনারা ঘেঁষে তৈরী হয়েছে একটা টাওয়ার, পাথর দিয়ে তৈরী টাওয়ারটার নাম Hermit's Rest, তথা সন্ন্যাসীর আস্তানা। সাধাসিধে গড়নের টাওয়ার, জাঁকজমকের আতিশয্য নেই, দেখলে আসলেই মনে হয় কোনো সন্ন্যাসী ধ্যান করছে এর চুড়ায় বসে। পাশেই পাথরের দেয়াল, তার নিচেই ১ মাইল গভীর গিরিখাত।
ওখানে যখন পৌছালাম, সূর্য তখন অস্তগামী, বিকেলের সোনালী আলোর আভা আলোকিত করে তুলেছে পুরো গিরিখাতের লালচে কমলা পাথর-ভাষ্কর্যগুলোকে। অনেক নিচে, কালো সুতার মতো দেখা যাচ্ছে স্রোতস্বিনী কলোরাডো নদীকে, যার প্রবহমান জলরাশির আঘাতে পাথর ক্ষয়ে সৃষ্টি হয়েছে এই প্রকৃতির বিষ্ময়ের।
পাথরে খোদিত এতো কিছুর মাঝেও রয়েছে প্রাণের ছোঁয়া। মাঝে মাঝেই ডানা মেলছিলো বিভিন্ন পাখি, ক্যানিয়নের মাঝের দেয়াল ঘেঁষে গজানো গাছে তাদের বাস। আর হারমিটস রেস্টে যখন দাঁড়ালাম, সামনে এসে পাথুরে দেয়ালে হাজির হলো এক কাঠবেড়ালী, জুলজুল চোখে তাকিয়ে রইলো আমাদের দিকে।
অবশেষে নেমে এলো সন্ধ্যা, নেমে এলো অন্ধকার। আক্ষরিক অর্থেই। পুরো এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধরে রাখার স্বার্থে এখানে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা নেই বললেই চলে -- রাস্তা ঘাটে তাই ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই আঁধারের মাঝে হাতড়ে হাতড়ে গাড়ি খুঁজে বের করে ফের শুরু করলাম আমাদের মহাযাত্রা, গুগল থেকে ইলিনয়ের ভুট্টা ক্ষেতের পানে।
পেছনে পড়ে রইলো ইতিহাসের সাক্ষী গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, আর কলোরাডো নদীর চির প্রবহমান জলরাশি। আর প্রকৃতির অপার, অবাক বিষ্ময়।
(শেষ)
(নামাংকিত ছবিগুলো আমার তোলা, আর বাকিগুলো নেয়া হয়েছে পার্কের সাইট থেকে )
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): ভ্রমণ, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ;
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার ডায়েরি, স্মৃতিচারণ বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:৫৪ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
মুকুট বলেছেন:
ধন্যবাদ, রাগিব ভাই এই সিরিজের জন্য! Hermit's Rest এর ছবিটা দেখে ভয় পেলাম, ১মাইল গভীর খাদ! নিচে তাকাইছিলেন???
লেখক বলেছেন: কাঠবিড়ালির পাশে পাথরের রেলিং এ বসে ছবি তুলেছিলাম। নিচের দিকে নিরাপদ দূরত্ব থেকে তাকিয়েছি। ভালো করে খেয়াল করলে খালি চোখেই কলোরাডো নদীটা দেখা যায়।
বাবুয়া বলেছেন:
অনেক ধন্যবাদ রাগীব।প্রায় কাছাকাছি সময় দুটো কিস্তি পড়তে পারার জন্য বেশী ভালো লেগেছে-যা নিশ্চই মিস করতাম আগের মতো দেরী হলে।
অপেক্ষায় থাকছি-তোমার নতুন কোন লেখা পড়ার আশায়।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ। ভালো থাকুন, ফিরে আসুন সুস্থভাবে।
অচেনা সৈকত বলেছেন:
ভাল লিখেছেন,ছবিগুলোও সুন্দর।আমিও সময় করে দেখে আসব।
লেখক বলেছেন: তোমাদের ওখান থেকে তো বেশি দূরে না সম্ভবত। তবে এখন ঠান্ডার সময়ে না গিয়ে গ্রীষ্মকালে গেলে ভালো করবে।
জেরী বলেছেন:
ছবিগুলো সহ লেখাটা ভালো হয়েছে,রাগিব ভাই ।
রিক্তা বলেছেন:
গ্রান্ড ক্যানিয়ন গিরিখাত ইন্টারনেটে লাইভ দেখার ব্যবস্থা কি আছে ?
লেখক বলেছেন: এখানে একটা ওয়েবক্যাম আছে, বাংলাদেশে রাতের বেলাতে চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
Click This Link
রিক্তা বলেছেন:
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
কে এম তানভীর আহম্মেদ বলেছেন:
ছবিগুলো খুব সুন্দর, পোস্টের জন্য রাগিব ভাইকে ধন্যবাদ।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।
আমার ক্যামেরাটা অনেক পুরানো, এসএলআর থাকলে অনেক ভাল আসতো ছবিগুলো। আর তাছাড়া ওখানে ছবি তোলার উপযুক্ত সময় হলো সকাল বেলা বা সন্ধ্যা বেলা, যখন নরম আলো থাকে। দুপুরে তোলাতে ঠিক ছবিতে গভীরতা আর রঙ ঠিক আসেনি।
সৌম্য বলেছেন:
ইসসসস। যাইতেই হবে। এইখানে ট্রেকিং না করলে জীবন বৃথা। ডিসকভারীতে কয়েকদিন আগে দেখলাম হাইকার দের একটা দল রাস্তা হারায় ফেলছে। ডি হাইড্রেশনে অবস্থা শেষ। আমাদের বান্দারবানের মত জঙ্গলে মারফা কিংবা আমলকি নাই। একটা নদী নামার রাস্তা নাই। শেষে ২০০ ফিটের মত ছেছড়ায় নামলো। কিন্তু ডি হাইড্রেশনে একটা ছেলে খতম।
লেখক বলেছেন: এটা আসলেই বেশ কঠিন। তবে ফাঁকিবাজি করতে চাইলে ট্রেনে করে নামার ব্যবস্থা আছে। ![]()
...অসমাপ্ত বলেছেন:
এই পরিবেশে একমাএ কাককেই মানায়। ভয়াবহ সুন্দর। ....যেতেই হবে। ক্যানিয়ন এর ভেতর দিয়ে কলোরাডো ধরে যদি সবটা ঘুরে দেখা যেত...
লেখক বলেছেন: কাক ছাড়াও ঈগল পাখিকে উড়তে দেখেছি।
সাইফুর বলেছেন:
আরো কিছু ছবি দেয়া যায় না রাগিব ভাই?
লেখক বলেছেন: ছবি সব ফ্লিকারে ছিলো। ব্যাটাদের বছরে ২৪ ডলার ফি দিতে হয়, এবার দেইনি বলে ছবিগুলোকে জিম্মি করে রেখেছে, দেখাচ্ছেনা, কিন্তু টাকা দিলেই ছেড়ে দেবে।
পোস্ট শেষের লিংকটা দিয়ে পার্কের সাইট থেকে সরাসরি ছবি দেখতে পারেন কিছু।
উপমাআহমদ বলেছেন:
খুব ভাল পোস্ট। একটা জোক বলি। অনেক আগের শোনা। প্রাসঙ্গিক বলে লিখছি।
এক লোক তার স্ত্রী সহ গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে বেড়াতে গেছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে স্ত্রী মোহগ্রস্হ। স্বামীকে শুধালো - এই গভীর খাদ দেখে তোমার কি অনুভূতি হচ্ছে?
' কোনো শ্বাশুড়ীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার জন্য কি আদর্শ স্হান'-স্বামীর উত্তর!!!!!!!!!
লেখক বলেছেন: ![]()
রন্টি চৌধুরী বলেছেন:
এইবার ডিভিটা ছাড়তেই হচ্ছে!
অচেনা সৈকত বলেছেন:
রাগিব ভাই, ঠান্ডায় মে তো জমে আইসক্রীম হো গিয়া।তাহলে গরমেই যাব।
লেখক বলেছেন: ডাকোটাতে তো ঠান্ডা পড়বেই
। আর মিনেসোটাতে যাবার কথা বলেছো তোমার ব্লগে, ঐটাও তো "আমেরিকার আইসবক্স"।
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে অতো ঠান্ডা হয়তো থাকবে না, কিন্তু অনেকটা তো থাকবেই। গরম কালে অনেক সুবিধা। অসুবিধাটা হলো খুব শুষ্ক থাকে সবকিছু তখন, বোতলের পর বোতল পানি খেলেও গলা শুকিয়ে যায়। বিকেলের দিকে আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছিলো পিপাসায়।
নাফিস ইফতেখার বলেছেন:
উঁচু জায়গা নিয়ে উঁচু মানের লেখা.........সিরিজটা খুবই ভালো লেগেছে রাগিব ভাই। মনের অনুভূতিগুলো সরল করে প্রকাশ করার ক্ষমতাটা খুব বিরল। আপনার তা আছে.........আমার ইন্টারনেটের ইতিহাসের লেখাটার শেষ পর্ব পোস্ট দিয়েছি। কষ্ট করে দেখে আসতে পারেন: Click This Link
আমি হনুমান বলেছেন:
আমি ঢুকলেই আপনি আমার পাশে বইসা থাকেন,এজন্য ধন্যবাদ আপনাকে।
ইন্ডিয়ানা জোন্স বলেছেন:
ভূগোল বইয়ে গ্রান্ড ক্যানিয়নের কথা পড়েছিলাম... ইন্ডিয়ানা জোন্সের হলি গ্রেইল বিষয়ক ছবিতেও মনে হয় গ্রান্ড ক্যানিয়ন দেখাইছিল
রাশেদ বলেছেন:
ঈদ মোবারক!
জেরী বলেছেন:
ভাইয়াকে পরিবারসহ ঈদের শুভেচ্ছা রইলো........... ঈদ মোবারক!
বিবর্তনবাদী বলেছেন:
রাগিব ভাই, ঈদ মোবারক
প্রলয় হাসান বলেছেন:
রাগিব ভাই, ঈদ মোবারক
রাগিব বলেছেন:
আপনাদের সবাইকেও ঈদ মোবারাক।
পাপী বলেছেন:
ঈদ মোবারক রাগিব ভাই!!
পাপী বলেছেন:
ঈদ মোবারক রাগিব ভাই!!
মেঘাচ্ছন্ন বলেছেন:
ঈদ মুবারক.....!!
চাচামিঞা বলেছেন:
Eid mubarak,
ঝড়ো হাওয়া বলেছেন:
ভাই ... আমাকে পোষ্টের ভেতরে ছবি দেয়ার উপায়টা বলেন।এই জিনিসটা জানা খুব দরকার, অপেক্ষায় আছি।
লেখক বলেছেন: এইটা তো খুব সহজ। ছবি আপলোডও করার দরকার নাই। ধরেন ছবির লিংক হলো Click This Link । এইটাকে দেখাতে হলে ইমেজ ট্যাগ দিয়ে দেন এইভাবে
থার্ড ব্র্যাকেট শুরু img | Click This Link থার্ড ব্র্যাকেট শেষ
এইভাবে দিলেই ছবি আসবে। আর যদি আপলোড করেন, তাহলে অন্য একটা "নতুন পোস্ট" খুলে সেখানে আগে আপলোড করে নেন, তার পর লিংক কপি করে নেন।
ঝড়ো হাওয়া বলেছেন:
ধন্যবাদ রাগিব ভাই
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

















