চরকি মারে আর গান গায়
আজ রাতে আমি লিখে যেতে পারি পৃথিবীর
বিষন্ন কবিতা
আমি তাকে ভালোবাসি , আর সেও
ভালোবাসে কখনও আমাকে'
কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র, নেফাতালি রেইয়েস। সাহিত্য বিদ্বেষী পরিবারে জন্মানোর কারণে দ্বিতীয় প্রকাশের আগেই নাম পাল্টে ফেলতে বাধ্য হলেন। অথবা, বলা যায় ছদ্মনাম নিলেন। পাবলো নেরুদার সেই কাব্যগ্রন্থের নাম কুড়িটি প্রেমের কবিতা ও একটি নিরাশার গান । যার একটা কবিতা আবার লেখা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের গান তুমি সন্ধার মেঘমালা"কে নতুন করে সাজিয়ে।
পাবলো নেরুদা এমন একজন কবি, যিনি কেবল কবিতা লেখার জন্যই নিজের নাম পাল্টে ফেলেছিলেন সে সময়কার তুমুল জনপ্রিয় চেক লেখক ইয়ান নেরুদার নাম থেকে। চিলির জনগন ও তার কাব্য শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে বসাতে চেয়েছিল রাষ্ট্রপতির আসনে। আগামী ১২ জুলাই আধুনিক পৃথিবীর এ সেরা কবির ১০৪তম জন্মদিন। ১৯০৪ সালের এ দিনে দক্ষিন আমেরিকার চিলিতে এ মহান কবির জন্ম। যার সারাটা জীবনই কেটেছে কবিতার ঘোরগ্রস্থতা ও রাজনীতির উষ্ঞ আলিঙ্গনে।
১৯২৩ - নিজের সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে নেরুদা প্রকাশ করেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ - টোয়েলাইট। কিন্তু পরের বইটির জন্য নেরুদাকে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। প্রকাশক জুটে যায়- কুড়িটি প্রেমের কবিতা এবং একটি নিরাশার গান' এর । এরপর আর নেরুদাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এ বইই তাকে লাতিন আমেরিকার জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিনত করে। নেরুদা কলেজ জীবনে এমন খ্যাতির ছুড়ায় ওঠার ফলে লেখা-পড়া ছেড়ে দিয়েপুরোপুরি সাহিত্যসেবায় মন দেন।
লাতিন আমেরিকার প্রথা হলো বিশেষ প্রতিভাবান কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে চাকরি দিয়ে ডিপ্লোমেট করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া। নেরুদার আগেও চিলির অন্য একজন নোবেল জয়ী কবিগ্রাবিয়েলা মিস্ত্রাল ও এ সম্মানে ভূষিত হন। যার নাম তৈরী করা হয়েছিল ইওরোপের লেখকদের নামের টুকরো দিয়ে।
নেরুদা কূটনৈতিক জীবন শুরু হয় বার্মায় ১৯২৭ সালে। যা কেন্দ্র করে প্রায় পুরো দক্ষিন ও পূর্ব এশিয়া ঘুরে বেড়িয়েছেন টো- টো করে। ইয়োকোহামায় হাটু গেড়ে বসে দেখেছেন নো নাটক , যার ভাষা না বুঝলেও দৃশ্য এবং অভিনয়শৈলী তাকে এমন মুগ্ধ করে যে , তিনি তার একমাত্র অপেরা - হোয়েকিন মুরিয়েতার মহিমা ও মৃতু্ তে তার ব্যাবহার করে ছিলেন। কিশোর নেরুদা হুয়ান রামোন হিমোনাথের ভাষায় রবীন্দ্র পড়ে মুগ্ধ হলেও রবীন্দ্রনাথে সঙ্গে দেখা করার জন্য দেখা করার জন্য কোলকাতায় আসেন এ সময়, অর্থাৎ ১৯২৭ -এ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সে সময় সেখানে ছিলেন না। নেরুদা কোলকাতার অলিগলি একা একা ঘুরে বার্মায় ফিরে যান। পরে অবশ্য আরও একবার কোলকাতায় এসেছিলেন তিনি-১৯৫৭-এ। তখন রবীন্দ্রনাথ নেই , কিন্তু নেরুদা সঙ্গ পেলেন বিষ্ঞুদের।
১৯৩৩-এ প্রতিবেশী দেশ আর্জেন্টিনার বুয়েন্সয়ার্সে কনসাল জেনারেল হয়ে আসেন নেরুদা। সেখানেই গাঢ় বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয় নেরুদার ভাষায় বিশ শতকের মহান সাহিত্যিক, স্পানিশ কবি- ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার সঙ্গে। এ বন্ধুত্ব নেরুদার রাজনৈতিক জীবনে এক বিসাল পরিবর্তন ঘটায়।
এরপর নেরুদা ১৯৩৪-এ আসেন স্পেনের মাদ্রিদে। ১৯৩৬- স্পেনের গৃহযুদ্ধের মর্মান্তিক দৃশ্যপট মারাত্মক ছাপ পড়ল তার ওপর। ভয়ঙ্কর সে দিনগুলোতে তিনি লিখতে থাকেন গৃহযুদ্ধের ক্রনিকল্, ইস্পানা ইন কোরাজন ১৯৩৭-এ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রকাশিত হয়। মানুষের জন্য ভালোবাসা ও যন্ত্রনার দলিল হয়ে উঠতে লাগল পাবরো নেরুদার কেবিতা। এরপর নেরুদা ফিরে আসেন চিলিতে এবং কিছুদিনের মধ্যেই মেক্সিকোতে চলে যান দূতাবাসের দায়িত্ব নিয়ে। ফিরে আসেন ঠিক চার বছর পর। নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৩-এ তিনি সিনেটর নির্বাচিত হন এবং একই সঙ্গে যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে।
চিলিতে কমিউনিজমের পতন হলে পার্টি নিষিদ্ধ হয় এবং নেরুদাকে সিনেট থেকে বের করে দেয়া হয়। নেরুদাও বেছে নেন গুপ্ত জীবন। আত্মগোপন করে তিনি লিখে চলেন তার বিধ্বংষী কবিতাবলী। যা ১৯৫০ তে ক্যান্টো জেনারেল নামে প্রকাশত হয়।
১৯৫২ সালে চিলি সরকার কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়। নেরুদাও ফিরে আসেন প্রিয জন্মভূমী চিলিতে। চিলিতে এসই তিনি বিয়ে করেন মাতিলদে উরুতিয়াকে। এটা অবশ্য নেরুদার তৃতীয় বিয়ে। এর আগের দুই বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর একুশ বছর নেরুদা জনগনের কবি হিসেবে জনপ্রিয় হতে থাকলেন ক্রমশ। তখন এক দিকে জনতার মধ্যমনি হয়ে উঠছেন আর অন্যদিকে পাচ্ছেন প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান। ঠিকযেন শিরোপা আর পুরস্কারের বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছে তার ওপর। ১৯৫৩ সালে তিনি ভূষিত হন লাতিন আমেরিকান শান্তি পুরস্কার এবং স্টালিন শান্তি পুরস্কারে। ।আর সাহিত্যে নোবেল পেলেন ১৯৭১ সালে। আমাদের স্বাধীনতার সময়।
এরপর ফ্রান্সে রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগদান করেন নেরুদা। আর সেখানেই ক্যান্সার ধরা পড়ে তার। নেরুদা ফিরে এলেন চিলিতে। ঠিক যে দিন চিলির গনতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটল তার ১২ দিন পর, ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, সান্তিয়াগো শহরে লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন , লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ট্র কবি, পৃথিবীবর প্রিয়তম কবিদের রাজা , নেরুদা।
প্রেম ও প্রতিবাদের কথা, যুদ্ধ ও শান্তির কথা, তাঁও যুদ্ধক্ষেত্রের কথাকে একই রকম দক্ষতায় মহান কবিতায় যিনি রূপ দিতে পারেন তাকে কি সামকবি বা প্রেমের কবির মতো ছোট গন্ডিতে আবদ্ধ করা যায়? পাবলো নেরুদা , বিশ্বজোড়া অগনিত পাঠককে কয়েক দশক ধরে উজ্জিবিত রেখেছেন ; তাঁরা ভরা আকাশের নিচেয় দাড়িয়ে আজও এ পৃথীবির কত প্রেমিক প্রেমিক আজো শুনিয়ে চলছে নেরুদার লাইন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

