বৌদ্ধ জাতক মানুয়েল আন্তনিও নরিয়েগা মোরেনা ১৯৩৪ সালে পানামা শহরে তার মানবজন্ম গ্রহণ করেন। মা-বাপ অর্থহীন ছিল বইলা লেখাপড়া হয় নাই। গ্রান্ড মাদারের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। পানামার রাস্তায় বৈদেশী নাবিক আর দেশী বেশ্যা আর বিবিধ নৃশংসতার মধ্যে বড় হইতে থাকেন তিনি। সমবয়সীরা বেটেখাটো নরিয়েগারে (ডাকনাম টনি) রাস্তায় পাইলে হরদম প্যাদানি দিতেন। তাই টিনএজ বয়স থিকাই পিস্তল সঙ্গে রাস্তা মাড়াইতেন তিনি। একটু বয়স হইতেই ছোটলোকদের বড়লোক হইয়া ওঠেন। সোশালিস্ট পার্টির নেতা লুইস কার্লোসের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। যোগ দেন সোশালিস্ট পার্টিতে।
নরিয়েগারা পুরা পানাম্যানিয়ান ছিলেন না। লোকে তাদের ক্রেয়লে বলত। নরিয়েগা ছিলেন স্প্যানিশ আর আফ্রো-আমেরিকান শংকর। অল্প বয়স থিকাই তাঁর ছিল প্রেসিডেন্ট হাউসে গতায়াত। স্কুলের ইয়ার বুকে কী হইতে চাও-এর উত্তরে লিখছিলেন: পানামার প্রেসিডেন্ট। তিনি মনোবিজ্ঞানীও হইতে চাইছিলেন। পানামা মেডিকেল স্কুলে চেষ্টা কইরা বিফল হওয়ার পরে স্রেফ বিজ্ঞানী হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। এই চেষ্টার রাশ আলগা হয় তার এক বন্ধু কলেজের পয়সা দিতে না পারার কারণে যখন মেক্সিকোতে আর্মিতে যোগ দেন তখন। দেখাদেখি নরিয়েগা যোগ দেন পানামার জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীতে। তার বিদ্যাবুদ্ধির কারণে মিলিটারি একাডেমিতে স্কলারশিপ পাইয়া যান। শনৈ শনৈ উন্নতির চক্র আরম্ভ হয় তার। অতি অল্পকালেই সামরিক কর্তাব্যক্তিদের নিকটস্থ হইয়া যান তিনি। একাডেমি শেষ করার পরে তার বন্ধু ওমর তরিহস তারে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে লেফটেনান্ট হিসাবে হাই পজিশন দেন। কিছুদিন পরে পানামার প্রেসিডেন্ট মার্কো রবলেসরে খেদাইয়া ওমর তরিহস যখন ক্ষমতা দখল কইরা জেনারেল হইয়া ওঠেন তখন বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ নরিয়েগারে ক্যাপটেনের পদ দেন। নরিয়েগা মিলিটারির ক্ষমতা আর আয়তন বাড়াইতে ছিলেন। ছয় মাসের মাথায় ওমর তরিহস বিমান দুর্ঘটনায় অক্কা পান। ১৯৬০ সাল থিকাই নরিয়েগা আছিলেন সিআইএর আন্ডার কভার রিক্রুট। তরিহস মারা যাওয়ার বছর খানেকের মধ্যে পানামার নির্বাচনে সিভিলিয়ান আর জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিবিধ নেতারে টপকাইয়া বিজয়ী হন নরিয়েগা। পানামার এই শিরোমণি ১৯৮৩ থিকা ১৯৮৯ পর্যন্ত দুর্নীতি, খুন, গুম ও দমন-পীড়নে সবিশেষ নাম কামান।
২.
১৯৮৮ সালে আমেরিকার ফ্লোরিডার একটি আদালতে তার বিরুদ্ধে চোরাচালান, কোকেন ব্যবসা ও অর্থ কেলেঙ্কারীর অভিযোগ ওঠে। এতসব খারাপ কাজে বিরক্ত বড় বুশ ও কলিন পাওয়েল নরিয়েগারে শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে জানা যায় এই ড্রাগ ব্যবসায়ী কুশাসকটি ৩০ বছর ধইরাই সিআইএ-র পয়সা খাইয়া আসতেছে। অথচ—এতদিন পরে মার্কিন তাবড়রা দেখলেন যে এইটা তো আসলে একটা ডাবল এজেন্ট! এইটা তো কিউবার কাছে আমগো গোপন ফরমুলা পাচার করতাছে!! এইটা তো রাশানগো কাছে আমগো সামরিক কেরামতি বিক্রি কইরা দিতাছে!!! এইটা তো লাতিন গেরিলা পোলাপাইনগো কাছে আমগো অস্ত্র বেচতাছে!!!! এইসব অবৈধ বিস্ময়চিহ্নে খামোশ মহারাজা বাবা বুশ ১৯৮৯ সালে ১৩০০০ সোনার টুকরা সৈন্যরে পানামা পাঠান। যে, যাও, বজ্জাত নরিয়েগাকে ধরে আনো। সেইখানেই আগে থিকাই ১২০০০ মার্কিন সোলজার অপেক্ষা করতে ছিলেন।
মার্কিন দেমাগে বুশের বাহিনী পানামার হাজার খানেক সিভিলিয়ান হত্যা কইরা, তাদের বসতবাটি মিসমার কইরা জ্যান্ত জেনারেলের কল্লাখানি মার্কিন আদালতে হাজির করে। মার্কিন খবরদার মিডিয়া তথা সিবিএস, এনবিসি, সিএনএন-এর বিরুদ্ধে এই সরকারী মৃগয়ায় চক্ষু বন্ধ রাখার প্রমাণাদি আছে। কোন এক সাংবাদিক নাকি টিভিতে লাইভ ব্রডকাস্টের কালে অধিক উত্তেজনায় বইলা বসছিলেন, আমরা এখন পৌঁছে গেছি জেনারেল নরিয়েগাকে ধরবার খুব কাছাকাছি বা এমনই কিছু একটা। আমরা বলতে সাংবাদিক বোঝাইতে চাইছিলেন এমেরিকান সৈনিকদের কথা।
তো, জীবিত জেনারেলরে ধইরা নেওয়ার পরে, যুক্তরাষ্ট্রের আইন তো আর পানামাঅলাগো মত অত সোজা না, তারা মি. নরিয়েগার হাতে নম্বর ধরাইয়া দিয়া তার মাগশট তোলে। সে ছবি আপনেরা দেখতেছেন। কিছুদিন পরে ১৯৯১ সালে মায়ামিতে নরিয়েগার বিচার অভিনীত হয়। ভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানকে মার্কিন আদালতে শাস্তি দিতে পারার বাস্তব ঘটনার মধ্য দিয়া 'মার্কিন ভোটার' = 'বিশ্ববিবেক'-এর কাছে গ্র্যান্ড জুরি সাহেব বিশ্বের জুরি হিসাবে আইনগত ভিত্তি লাভ করলেন। এই (অ)বিচারে ৪০ বছরের জেল খাইতে দেওয়া হয় নরিয়েগাকে। জাতক সেইখানে ১৯৯০ সালেই খ্রিষ্টধর্মের স্মরণ লইয়া লইছিলেন।
৩.
হয়তো যীশুর কৃপায়ই, ১৯৯৯ সালে নরিয়েগার শাস্তি ১০ বছর কমাইয়া ৩০ বছরে ফিক্সড করেন সদাশয় বিচারক। পরে ফর হিজ গুড বিহেভিয়র ৩০ বছর থিকা ১৭ বছরে নাইমা আসছে শাস্তি। ১৭ বছর ডিটেনশন আর জেলখানা উপভোগের পর ২০০৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় তাঁর শাস্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হইয়া গেছে। নরিয়েগা মুচলেকা দিছেন আর রাজনীতি করবেন না; তাঁরে যেন পানামায় ফিরতে দেওয়া হয়। সেখানে পক্ষপাতমূলক বিচারের আশা আছে তাঁর। এমনকী প্রেসিডেন্টের তরফে আছে ক্ষমার আশাও। কারণ পানামায় বর্তমানে প্রেসিডেন্ট হিসাবে বিরাজিত আছেন নরিয়েগার বন্ধু ও মেন্টর ওমর তরিহসের ছেলে মার্টিন তরিহস। নরিয়েগার অ্যাটর্নির বক্তব্য আন্ডার জেনেভা কনভেনশন এমেরিকার এইটাই করার কথা।
অন্যদিকে ফেডারেল বিচারক নরিয়েগাকে পাইবার ফ্রান্সীয় চাহিদায় সাড়া দিতে চান। মানি লন্ডারিং মামলায় সেদেশে তাঁর দশ বছর জেল খাটার কথা। ইউএস অ্যাটর্নি জানাইতেছেন জেনেভা কনভেনশনে এই ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নাই।
তবে নরিয়েগার বয়সের কথা বিবেচনা কইরা বিবেচক এমেরিকা তাঁরে হয়তো হাউস অ্যারেস্টই রাইখা দেবেন, তেমন আশা/আশঙ্কাই বেশি। নরিয়েগার বয়স এখন ৭৫।
৪.
নরিয়েগা সিএনএন-এর অনেকগুলা ইন্টারভিউর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেও ল্যারি কিং-এর লগে আলাপে বসছিলেন ১৯৯৬ সালে। তিনি দাবি করেন বুশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষার আছে। কারণ তিনি নিকারুগুয়ার কম্যুনিস্ট সান্দানিস্তাদের বিরুদ্ধে বোম্বিং এবং স্যাবোটাজ করার একটা মার্কিনি অনুরোধে রাজি হইছিলেন না।
সূত্র: ছুটির দিনে, প্রথম আলো ২০০০; ঈষৎ সম্প্রসারিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

