দেবেন্দ্রনাথ তার কনিষ্ঠ পুত্রটিকেই সব ক'টি জমিদারি দেখাশোনার ভার দিয়েছেন।বছর খানেকের মধ্যেই এ কাজে রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।রবীন্দ্রনাথ মাসোহারা পেতেন তিন শো টাকা।রবীন্দ্রনাথ ঘোড়ায় চড়তে জানতেন না।শিকার করতে পারতেন না।মদ খেতে পারতেন না কিন্তু খুব চিরতার রস খেতেন।বেশির ভাগ জমিদাররা বাঈজী নাচাতেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোনদিন না।
রবীন্দ্রনাথ অনেক সময় বজরা নৌকায় রাত্রিযাপন করতেন।সে সময় তিনি নানান ধরনের লেখা লিখতেন।স্লেটে লেখা তার অনেক দিনের অভ্যাস।কাটাকুটি মুছে ফেলার সুবিধে হয়।এক স্লেট লেখা হয়ে গেলে সে একটি বাঁধানো খাতায় কপি করতেন।কখন সাথে সাথে অন্য কাগজে দ্বিতীয় একটি কপি করে কোনও প্রিয়জনকে চিঠির সাথে পাঠিয়ে দিতেন।বজরার একটা সুবিধা মৃধু দুলুনিতে তন্দ্রা আসে।সামান্য ঘুমেই বহু স্বপ্ন দেখেন রবীন্দ্রনাথ।অনেক স্বপ্ন থেকেই রবীন্দ্রনাথ তার লেখার উপাদান পেয়ে যেতেন।কোনও কোনও স্বপ্ন আসে গল্পের বেশে।কোনও কোনও স্বপ্নে থাকে কবিতার ইঙ্গিত। "তবু মনে রেখো/যদি জল আসে আঁখিপাতে/একদিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে/তবু মনে রেখো...।"
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ যখন দেশের বাইরে ঘুরতে শুরু করলেন তখন তার উপলদ্ধি হলো যে দেহভঙ্গির ভাষা নিজেকে প্রকাশ করার একটি বড় শক্তিশালী মাধ্যম।এ উপলদ্ধির পরে তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে নাচের দিকে জোর দিলেন।তার কাছে তখন মনে হয়েছিল কবিতা বা গান দিয়ে যেটা বোঝানো যাচ্ছে না,নাচ দিয়ে সেটা সম্ভব।
যেহেতু রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতি ভালোবাসতেন ,বাহুল্য এবং চাকচিক্য পছন্দ করতেন না সে কারনে তিনি তখন কথক নৃত্যকে গ্রহন করতে পারেন নি।ভরত্নাট্যমেও চোখের যে অভিনয় সেটাও তিনি গ্রহন করতে পারেন নি।
রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রে কিছু চিঠি আছে,যেখানে তিনি অন্ধকারের বর্ননা দিচ্ছেন।অন্ধকার আমাদের কাছে নিরেট বিষয় মনে হলেও রবীন্দ্রনাথ কিন্তু অন্ধকারের পরতে পরতে চোখ ফেলতেন।পদ্মার ওপর বোটে বসে তিনি দেখেছেন সামনের মৃদু অন্ধকার।তার পেছনে ঘন অন্ধকার।তার পেছনে আরো ঘন অন্ধকার বিছিয়ে আছে।এই অন্ধকারের পরত দেখতে দেখতে এক সময় তিনি রঙের বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন।যদিও রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো আঁকিয়ে ছিলেন না,অর্থ্যাৎ তার ড্রইং খুব উঁচু দরের ছিল না।কিন্তু ছবিতে তিনি অভিব্যক্তি এবং প্রকাশের বলিষ্ঠতা আনতে পেরেছেন।যা তিনি সাহিত্যে প্রকাশ করতে পারেন নি,তা ছবিতে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।১৯৩০ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনী হয়।
১৯১৯ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়।যেহেতু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্বপথিক,তিনি যুদ্ধের প্রভাবকে নানাভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন।রবীন্দ্রনাথ পরিস্কার উপলদ্ধি করতে পারলেন যে,মানব জাতির আদর্শ-মানা সত্যের পেছনে যে অসত্য লুকিয়ে আছে,শুভর পেছনে যে অশুভ,তা খুব প্রবল,খুব তীব্র।এই একটা দুঃখবোধ থেকে হয়তো তার হতাশাও দেখা দিয়েছিল।আর ব্যক্তিগত জীবনে তার অপূর্নতাগুলো তো প্রকাশের অনেক চেস্টা তিনি করেছেন।তার নিজের দুঃখ-কষ্ট,না পাওয়ার অতৃপ্তি-এই সবকিছুর সম্মিলিত একটি প্রকাশ তিনি হয়তো চিত্রকর হিসেবে তার আত্মপ্রকাশের জন্য।ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকা দেখেছিলেন।কিন্তু শিলাইদহে তিনি প্রথম ছবি আঁকার মকস করলেন।পেন্সিল দিয়ে স্কেচ করলেন।চিঠিতে তিনি লিখেছেন-'আমি এখানে এসে ছবি আঁকা শুরু করেছি।'তবে ওই সময় তার পেন্সিলের রবারের খরচটা বেশি হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রে দেখা যায়,তার কাছে সূর্যোদয়ের সময়টা ভালো লেগেছে।রৌদ্র ভালো লাগছে।আর সবচেয়ে ভালো লাগছে সন্ধ্যার সময়,যখন আলো চলে যায়।অথচ তিনি তার কবিতায়,গানে সবসময় আলোর কথা বলেছেন।নানাভাবে বলেছেন।কিন্তু তার দৃশ্য ভালো লাগছে যখন আলো কমে যাচ্ছে।(রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে বলেছেন- আজকে যে দৃশ্য আমি দেখতে পাচ্ছি আমার কোনো ক্ষমতা নেই যে সেটাকে আমি প্রকাশ করি।)
একদিন রাতেরবেলা রবীন্দ্রনাথ চিত্রকলা অর্থ্যাৎ নান্দনিকতার ওপর বই পড়ছেন।তার ভালো লাগছে না খট মটে সব কথা।তখন তিনি বইটি বন্ধ করলেন।ফু দিয়ে প্রদীপটি নিভিয়ে দিলেন।তখন দেখলেন যে জানালা দিয়ে আলো আসছে।তিনি একটি কথা লিখলেন- আমি অবাক হয়ে গেলাম একটি প্রদীপের পেছনে এত বড় সুন্দর এতক্ষন কী করে আটকে ছিল?একবার রবীন্দ্রনাথ ৩২ বছর বয়সে দুঃখ করে বলেছিলেন,আমার প্রেয়সী তো অনেক।কবিতাও আমার খুব প্রিয়,সঙ্গীতও আমার প্রিয়,কিন্তু আরেকটি আছে যাকে আমার লোভ হয়।তাকে আমি দেখতে পাই।সে আসে,সে চলে যায়।
"বৃথা মনোআশা এত ভালোবাসা বেসেছি/শেষে নিশিশেষে বদন মলিন,/ক্লান্ত চরণ,মন উদাসীন,/ফিরিয়া চলেছি কোণ সুখহীন ভবনে!"
(চলবে.....)
আলোচিত ব্লগ
পাখি মন

রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৃঙ্খল মুক্তি আমার
শৃঙ্খল মুক্তি আমার

ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন
=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন
রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।