রবীন্দ্রনাথের কোন বিকল্প নাই -২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় ৪০৯৭ টি বাংলায় লেখা চিঠি পাওয়া গেছে।এখনও বহু চিঠি পড়ে আছে বিভিন্ন ব্যক্তির নিজস্ব সংগ্রহে।শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রভবনে বহু অপ্রকাশিত পত্র প্রকাশের জন্য সম্পাদনা করা হচ্ছে।আর৪ সেখানে রক্ষিত তার লেখা ইংরেজী চিঠির সামান্য অংশই এযাবৎ প্রকাশিত হয়েছে।
বহুমুখী রবীন্দ্র-ব্যক্তিত্বের কয়েকটি দিক ও তার বহুবিধ কার্যকলাপের কিছু কিছু অজ্ঞাত তথ্য চিঠি গুলোতে লাভ করা যাবে।আমি, রবীন্দ্রনাথের চিঠির কিছু কিছু অংশ এই লেখাতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি-
সন্তোষ চন্দ্র মজুমদার (১৮৮৪-১৯২৬) রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঔপন্যাসিক শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের (১৮৬০-১৯০৮) জ্যেষ্ঠপুত্র, শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রথম পাঁচ জন ছাত্রের অন্যতম। ২১ আগষ্ট ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে লিখেছেন, " সন্তোষ, তোমার চিঠিতে অনেক খবর জানতে পারা গেল। তার থেকে ভালো গুলোই সঞ্চয় করে নিলুম, মন্দ গুলোকে মন থেকে বিদায় করার ব্যবস্থা করা গেল। আগামী শনিবারে লন্ডনের অভিমুখে চলেছি......। নিজের লেখা ইংরেজিতে তর্জ্জমা করার কাজেই আমার সময় যাচ্চে। সেটা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য বলেই অনেকটা চেষ্টা তার দিকে প্রয়োগ করতে হয়। ......, শিউলির ফুল যে গাছের তলায় পড়ে মনে করে সেখানেই তার সমাপ্তি। কিন্তু কোনো ফুল-কুড়ানির সাজির উপর চড়ে সে যে কোন মন্দিরে পৌছয় তার ঠিকানা নেই। ......, লোকে কি বলচে সেটা ভুলতে পারলেই বাঁচি কেননা সেদিকে মনটা বাঁধা পড়লেই সেই মনের ভিতর দিয়ে ভগমানের কাজ বাধা পায়- কেননা তিনি ত মানুষের হাততালির তাগিদে কোনো কাজ করেন না। মন যতই মুক্ত থাকবে ততই তার কাজ ভিতর দিয়ে সুস্পষ্ট হতে থাকবে।"
লর্ড সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহ (১৮৬৩-১৯২৮) শান্তিনিকেতনের নিকটবর্তী রায়পুর গ্রামে বিখ্যাত জমিদার বংশে জন্মগ্রহন করেন।১৮৮৬ সালে ব্যারিস্টারি পাস করে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা আরম্ভ করেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে তার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল।(১৮ ডিসেম্বর ১৯২৫ 'আনন্দবাজার পত্রিকা'য় লেখা হয়ঃ 'বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে লর্ড সিংহ বোলপুরে গিয়াছিলেন।লর্ডঁ সিংহ 'বিশ্বভারতী' দেখিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে ছিলেন।'বিশ্বভারতীর' উদ্দেশ্য সফল কামনায় তিনি ১০,০০০ টাকা দান করে ছিলেন। এখানে আর একটু বলে রাখি- (প্রসিদ্ধ চিকিৎসক ডাঃ নীল রতন সরকার (১৮৬১-১৯৪৩) রবীন্দ্রনাথের বন্ধুস্থানীয় ছিলেন।)১৯ আগষ্ট ১৯২৫ সালে লর্ড সিংহ কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- "বিশ্বভারতী ছাত্রনিবাস নির্মানের জন্য আপনি দশ হাজার টাকা দিতে অঙ্গীকার করেছেন, সংবাদ পেয়ে বিশেষ আনন্দ লাভ করেছি।এতে করে আমাদের বড় একটি অভাব দূর হতে পারবে।আপনি আমাদের কৃ্তজ্ঞতা জানবেন। আমি য়ুরোপ যাত্রার জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েছিলুম, ইতিমধ্যে সার নীল রতন এসে পরীক্ষা করে আমাকে যাত্রার অযোগ্য বলে স্থির করে দিয়েছেন। এখন থেকে বিশ্রাম করে যদি যথেষ্ট বল লাভ করি তাহলে গ্রীষ্মের সময় যেতে পারব এই আশা মনে রইল।"
সাধারণ ব্রহ্মসমাজের সভাপতি কৃষ্ণকুমার মিত্র (১৮২৫-১৯৩৬) 'সঞ্জীবনী' সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।কৃষ্ণকুমার মিত্রকে ৯ সেপ্টেম্বর ১৯২২, তাকে রবীন্দ্রনাথ লিখে ছিলেন- " ....., জীবনে অকারণে বা সামান্য কারণে এত কটু বাক্য শুনিয়াছি যে তাহা আমি মনে নিই না।এমন কোনো কাজই কখনও করি নাই যে জন্য কোনো না কোনো পক্ষ হইতে আমি নিন্দা সহ্য করি নাই- তাহাতে ক্ষতি কিসের ?"
এটি একটি টাইপ করা চিঠি- একটি কপি প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে পাঠিয়ে রবীন্দ্রনাথ তলায় স্বহস্তে লিখেছেনঃ এই চিঠি ব্রহ্মবিহারীর মাকে লিখেচি।এই ব্রহ্মবিহারী ও তার মায়ের পরিচয় জানা যায়নি।২ নভেম্বর ১৯২৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মবিহারীর মাকে লিখেছিলেন- "......, কত মিথ্যা কথার দ্বারা আমার নামের সঙ্গে তোমাদের এই কুৎ্সাজনক ব্যাপারকে জড়িত করেচ, একবার চিন্তা মাত্রও করলে না এতে আমার ও আশ্রমের কত নিন্দা কত ক্ষতি করা হলো।"
রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৮৮-১৯৬১) রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র।১৯১০ সালে প্রতিমা দেবীর সাথে তার বিবাহ হয়, কিন্তু তারা নিঃসন্তান।একবার রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবী গ্রীষ্মবকাশ কাটানোর জন্য দার্জিলিং গিয়ে ডঃ নীলরতন সরকারের 'গ্লেন ইডেন' নামক বাড়িতে ওঠেন।জুন ১৯৩৩ সালে রবীন্দ্রনাথ, তার পুত্ রথীন্দ্রনাথ কে লিখেছিলেন- " ......,কাল জ্বর আসেনি।বোধ হচ্চে আর আসবে না। বিজয় সিংহের নিমন্ত্রনটা ফিরিয়ে দিয়েছি বলে মনে অনুতাপ বোধ হচ্চে।......, করুণাকে কি সেই নতুন দুটো কবিতা বিচিত্রিতার জন্যে আজ পর্যন্ত তুই পাঠাসনি?"
নির্মলকুমারী প্রশান্ত মহলানবিশের স্ত্রী।তার ডাক নাম ছিল রাণী।নির্মলকুমারীর সাথে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় এবং ধীরে ধীরে তিনি নানা দিক থেকে তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।তাকে লেখা রবীন্দ্রনাথের প্রাপ্ত বাংলা চিঠির সংখ্যাই সর্বাধিক । রবীন্দ্রনাথকে লেখা নির্মলকুমারীর চিঠি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রভবনে বেশি রক্ষিত হয়নি।১৯ আগষ্ট ১৯২৭ (২ ভাদ্র ১৩৩৪) সালে রবীন্দ্রনাথ নির্মলকুমারীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, "......, রাণী, কাল সন্ধের সময় সিঙাপুর ঘাটে এসেচি, এটা জাভা যাত্রার পথে। হয়ত দেশের চিঠি সেখানে এমেরিকান একসপ্রেসের হাতে এসে জমেচে হয়ত বা জমেনি।......, তোমাদের কাল আমাদের কালের ছন্দ এক নয়- আমাদের ছন্দে তোমাদের দিনের হিসাব যদি কল্পনা করি তবে সেটা অসঙ্গত হবে। ......, যে-কাজ করচি তার উপরে বিশ্বাস চলে যায়- যেমন চিবিয়ে না খেয়ে গিলে খেলে খাদ্যটাকে খাদ্য বলেই মনে হয় না, তেমনি এই রকম হুড়মুড় করে কাজ করে গেলে কর্তব্যকে কর্তব্য বলে উপলব্ধি করা যায় না।......, উপলব্ধির গভীরতার জন্যে একটা তৃষ্ণা প্রত্যহ বেড়ে উঠচে, মৌমাছিকে ঝোড়ো হাওয়ায় তাড়া খেয়ে কেবল যদি উড়তেই হয়, সে যদি স্থির হয়ে ফুলের উপর বসবার সময়মাত্র না পায়, তা হলে তার ঘুরে বেড়ানোটা যেমন ব্যর্থ হয় আমিও তেমনি ব্যর্থতার পুরো দমে একদিন থেকে আর একদিনে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেচি- গতির সঙ্গে প্রাপ্তির যোগ হারিয়ে গেছে। এর থেকে স্পষ্টই বুঝতে পারি আমি, কোনো জন্মেই আমেরিকান ছিলুম না। অভিজ্ঞতার দ্রুত সংগ্রহ ব্যাপারে আমার লোভ নেই।......, পাওয়া কাকে বলে যে-মানুষ জানে না ছোঁওয়াকেই সে পাওয়া মনে করে। আমার মন স্ন্যাপশট বিলাসী মন নয়, সে চিত্র বিলাসী। এইমাত্র সুনীতি এসে তাড়া কাগাচ্চে, বেরোতে হবে, সময় নেই। সময় না থাকা একটা অদ্ভুত ব্যাপার- যেমন কোলরিজ বলে গেছেন, সমুদ্রে জল সর্ব্বত্রই কিন্তু এক ফোঁটা জল নেই যে পান করি- সময়ের সমুদ্রের মধ্যে আছি কিন্তু একমুহুর্তও সময় নেই।"
(চলবে......)
[ আজ দুপুরবেলা ভাত খেয়ে হঠাৎ টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গভীর ঘুম। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখলাম রবীন্দ্রনাথকে।স্বপ্নে রবীন্দ্রনাথ কবি নয়, তিনি একজন দাঁতের ডাক্তার। আমি তার চেম্বারে বসে আছি। তিনি আমার দাঁত ফেলবেন। রবীন্দ্রনাথ বললেন- ভয়ের কিছু নেই। তুমি বুঝতেও পারবে না দাঁতটি আমি কখন তুলে ফেলেছি। আমি বললাম, তবু আমার ভয় লাগছে ডাক্তার রবি। দাঁতের গোড়ায় ইনজেকশন - ওরে বাপরে ! আমি মরে যাবো। রবীন্দ্রনাথ বললেন- এতই যখন ভয় পাচ্ছো, এক কাজ করো, খানিকটা ব্র্যান্ডি খেয়ে নাও। ব্র্যান্ডি খেলে দেখবে সাহসটা বেড়ে গেছে। আমি ডাক্তার রবীন্দ্রনাথের দেওয়া ব্র্যান্ডি খেলাম। রবীন্দ্রনাথ বললেন- এবার সাহসটা বেড়েছে তো? আমি বললাম, বেড়েছে মানে? দাঁতের গোড়ায় একবার হাত লাগিয়ে দেখুন না, এক ঘুষিতে আপনার সব ক'টি দাঁত আমি গুঁড়ো করে দিব। ]
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে।

ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে। এই স্থানটি খুবই নিরিবিলি। দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা খুবই খারাপ। এমন ফাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল
আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।