গত দুই তিন বছরে আমি আমার মা'র সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছি । এবং খারাপ ব্যবহারের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছিল । মা, মাঝে মাঝে দুই এক কথা বলত কিন্তু বেশীর ভাগ সময়ই চুপ করে থাকত । যখন আমার মাথা ঠান্ডা হয়, তখন বুঝি, মা'র সাথে চিল্লা-চিল্লি করাটা ঠিক হয়নি । মনে মনে আমি খুব অনুতপ্ত হই । কিন্তু মাকে কখনোই স্যরি বলা হয় না । মা গতকাল আমাকে বলল- পন্ডিত, তুমি আমাকে অনেক বাজে কথা বলেছো । যখন বলো, একবার ভেবে দেখো না, কাকে কি বলছো ! আমার তিন ছেলেকে নিয়ে আমি কখনো ভাবি না, তোমাকে নিয়ে সারাক্ষন আমার মাথায় টেনশন কাজ করে । তুমি বাইরে গেলে আমার অস্থির লাগে । তোমার সব বাজে ব্যবহারের জন্য আমার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত । মা'র এই সব কথার উত্তরে আমি বললাম- ক্যাট ক্যাট বন্ধ করো, ক্ষুধা লাগছে ভাত দাও । ঠিক করেছি মা'র সাথে আর খারাপ ব্যবহার করবো না । কিন্তু মেজাজ খারাপ হলে ঠিক করে রাখা কথাটা ভুলে যাই ।
আমার যখন এক বছর বয়স, নতুন হাটা শিখেছি মাত্র । তা-ও ঠিক করে হাঁটতে পারি না । দু'পা গিয়েই ধাম করে পড়ে যাই- একদিন আমাদের বাসা থেকে কিছু দূরে আগুন লেগেছিলো । মা, হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে আমাকে কোলে নিয়ে দৌড় দিয়ে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলো । কিন্তু আমার নানা বুড়ো মানূষ তার দিকে ফিরেও তাকায়নি । নানী, বাসায় ফিরে মাকে বলল, পুষ্প ( নানা-নানী মাকে আদর করে পুষ্প নামে ডাকতেন ) তুই এটা কি কাজ করলি, তোর বাবাকে ফেলে পালিয়ে গেলি নিজের ছেলেকে নিয়ে ! মা, নানীকে বলেছিল- সবার আগে আমার কাছে আমার ছেলে । আর আমি সেই ছেলে আজ মা'র সাথে খারাপ ব্যবহার করি । মা- একা একা কাঁদে ! ছিঃ রাজীব নূর ছিঃ !
একটা ছোট বাচ্চার জন্য তার জীবনে সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো- নিজের চোখে দেখা তার বাবা-মা ঝগড়া করছে, মারা-মারি করছে, জিনিস পত্র ভাঙ্গছে, এক জন আরেক জনকে বাজে কথা বলছে । এই ব্যাপার গুলো ছোটবেলায় এতবার দেখেছি, এখনো যদি দেখি কাউকে ঝগড়া করতে- বুক কেপে উঠে । বিকেলে আব্বা বাসায় আসছে, মা চা বানিয়ে আর মুড়ি মাখিয়ে দিলো । দুইজনে বারান্ডায় বসে চা খাচ্ছে মুড়ি খাচ্ছে আর খুব গল্প করছে হেসে হেসে । হঠাৎ দেখি, দুইজনের মধ্যে খুব ঝগড়া বেঁধে গেলো । তারা মারা-মারি শুরু করলো । বাজে কথা বলা শুরু করলো । এক পর্যায়ে ঘরের জিনিস পত্র ভাঙ্গা শুরু করলো । আমি ছোট মানুষ, আমি কি করবো ? আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম । আর আমার ছোট্র বুকের মধ্যে কেমন করতে তা কাউকে বুঝাতে পারব না ।
তখন ডিশ এন্টেনা ছিল না । বাবা-মাকে দেখতাম সপ্তাহে একদিন সারারাত ভিসিআর-এ সিনেমা দেখত । কি তাদের হাসা-হাসি । গল্প ! কিন্তু আমি থাকতাম ভয়ে ভয়ে, এই বুঝি ঝগড়া শুরু হলো...! ঠিকই সকালে আবার ঝগড়া, আবার জিনিসপত্র ভাঙ্গা-ভাঙ্গি ! অসংখ্যবার এ রকম হয়েছে । বাবা-মা কি তখন বুঝতে পারত তাদের ঝগড়া দেখে তার ছোট ছেলেটার কত কষ্ট হতো ! সত্যি কথা বলতে- আমার অনেক খারাপ লাগত । বুকের মধ্যে যেন কেমন করতো । আমার এখনও মনে আছে তখন আমি চুপ করে ছাদে গিয়ে বসে থাকতাম । আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম । তখন কি আমার চোখ ভিজে যায়নি ?
তার মানে কি আমার বাবা-মা'র মধ্যে ভালোবাসা নেই ? আছে, ভালোবাসা আছে । অনেক ভালোবাসা আছে । এখনও যদি কখনও মা অসুস্থ হয়ে পড়ে, আব্বা অস্থির হয়ে পড়ে । একটু পর পর বাসায় ফোন করে মা'র সাথে কথা বলে । বড় বড় ডাক্তার এর কাছে মাকে নিয়ে যায় । আমার বাবা, মা'র অসুস্থতার জন্য যে পরিমান টাকা কখচ করেছে, সেই টাকা দিয়ে ঢাকা শহরে তিনটা বাড়ি অনায়াসে করা যেত ।
প্রতিটা ছেলে-মেয়ের আদর্শ হওয়া উচিত তাদের বাবা-মা । এই জন্য বাবা-মাকে অসাধারণ হতে হবে সবক্ষেত্রে । কারণ ছেলে-মেয়েরা তাদের বাবা-মা'র কাছ থেকে শিখে । ভালোটা যেমন শিখে-মন্দটাও শিখে । আমার আদর্শ কিন্তু আমার বাবা-মা নয় । তাদের কাছ থেকে কিচ্ছু শিখিনি । কথায় বলে- জন্ম দিলেই মা হওয়া যায়, কিন্তু মাতৃত্ব আসে হৃদয় থেকে । আর বাবার কথা কি বলব ! কোনো দিন বাবা-মাকে দেখিনি, আমার লেখা-পড়ার খোঁজ খবর নিতে । আমার মনে পড়ে না, কখন আমার বাবা আমাকে কোলে করে স্কুলে নিয়ে গেছে । টাকা লাগবে টাকা নাও । বাসায় তিনটা টিচার রাখবে রাখো । একবার আমার মনে আছে, বছর শেষে দেখা গেল পরীক্ষায় ফেল করেছি । আব্বা মা'র দিকে তাকিয়ে বলল- আমার ছেলে কিছুতেই ফেল করতে পারে না । ওই স্কুলটাই ভালো না । আমাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করা হলো । আব্বা আমাকে বলত তুমি মন খারাপ করো না । স্কুলটাই ভালো না । আর ফেল করলে করছো ফেল, তাতে কি হইছে ! চলো তোমাকে কিছু কেনাকাটা করে দেই । আব্বা সব সময় আমাদের বিদেশী জিনিস কিনে দিত । জামা-কাপড় থেকে শুরু করে সব । এমনকি ডা্ক্তারও দেখাতো বিদেশের । ( অনেক সময় নানান কারণে বিভিন্ন কাজে বিদেশ থেকে ডাক্তার আসতো, এসে আব্বার হো্টেলেই উঠত । )
আমার আব্বা আমাকে কোনো দিন একটা চড়ও দেইনি ।ধমক দিয়েছে, আব্বা তো ধমক ছাড়া কথাই বলতে পারে না । সেই ধমকের মধ্যেও কেমন যেন একটা আদর আদর ভাব থাকে ! কয়দিন পর পর এই ধমক না শুনলে আমার ভালো লাগে না । মা আমাকে দুই একবার চড় দিয়েছে । এবং একদিন রুটি বানানোর সময় তরকারীর স্টীলের চামুচ আমার দিকে উড়িয়ে মেরেছিল । সেই স্টীলের চামুচ আমার কপালে লেগে কেটে গিয়েছিল । আমাকে কয়েকবার মুখে সাধান করেছিলো । সাধান বাণী আমি শুনিনি । ফলাফল, শার্ট রক্তে ভিজে গিয়েছিল । আমার অপরাধ ছিল, আমি আমার খুব প্রিয় একটা খেলা খেলছিলাম । খেলা টা হলো, বিছানার উপর থেকে বালিশ গুলো নিচে ছুড়ে মারা । আবার নিচ থেকে বালিশ গুলো বিছানায় ছুড়ে মারা ।
ভালো থাকুক আমার বাবা-মা, ভালো থাকুক তোমার বাবা-মা, ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবা-মা । কেউ বাবা-মা'র সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না । আর করেও থাকলেও ক্ষমা চেয়ে নিন । নিজের বাবা-মাকে ভালোবাসুন, এক সময় দেখবেন আপনি সবাইকেই ভালোবাসতে পারছেন । আর একটা কথা, বাবা-মা তো ফেরেশতা না, তারাও ভুল করতে পারেন । তাদের ভুল গুলো মাথায় রাখা উচিত নয় । ভালোবাসুন বাবা-মাকে । " ঈশ্বর তুমি আমার কাছে বড় না, আমার কাছে বড় আমার বাবা-মা । তোমার নাম নেওয়ার আগে আমি আমার বাবা-মা'র নাম নিবো ।
( চলবে-- )
আলোচিত ব্লগ
বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন
অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিএনপির আবালীপনা।


আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।