চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ; অরি দূর সমুদ্রের 'পর
হাল ভেঙ্গে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে, 'এতদিন কোথায় ছিলেন ?'
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন ।
জীবনানন্দ দেখতে পেয়েছিলেন এমন চোখ, যা নীড়ের মতো স্নেহে ও আশ্রয়ে পরিপূর্ণ । বিদিশার রাত্রির মতো চুল, শ্রাবস্তীর কারুকার্যের মুখ, বা- আরো আশ্চর্য- 'উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা'- কালিদাসের কাব্যাদর্শ অনুসারে এ-সব উপমার কোনো অর্থই করা যাবে না, কিন্তু আমাদের কাছে এদের অর্থ সব-কিছু । শ্রাবস্তী ও বিদিশা বিষয়ে তবু বলা যায় যে এই দুই নগর যেমন লুপ্ত, সুদূর, স্মৃতিভারাক্রান্ত, তেমনি কবির জীবনে বনলতা সেন নাম্মী নারী, কিংবা তিনি মানবীও নয়, এক স্বপ্নচারিণী, যাকে কখনো পাওয়াও যাবে না, ভোলাও যাবে না । কিন্তু উটের গ্রীবার সঙ্গে নিস্তব্ধতার সম্বন্ধ কী ? এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমরা যখন ভাশগা খুঁজে পাই না, তখনও আমরা উপমাটিকে অত্যন্ত সংগত ব'লে অনুভব করি ; এই উপমা আমাদের চিত্রবৃত্তিকে জাগ্রত ও কর্মিষ্ঠ ক'রে তোলে, তার প্রেরণায় বিশ্বের দুই সুদূরপরাহত বস্তুর মধ্যে সেতুবন্ধন সহজ হ'য়ে যায় ।
এই কথা বলেছিল তারে
চাঁদ ডুবে চ'লে গেলে- অদ্ভুত আঁধারে
যেন তার জানালার ধারে
উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে ।
( 'আট বছর আগের একদিন' )
বিচ্ছিন্নভাবে পড়লে অনর্থক মনে হ'তে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ কবিতাটি যার জানা আছে তিনি বুঝতে চাইলেই বুঝতে পারবেন যে, 'উটের গ্রীবা' অদ্ভুত ব'লেই আশ্চর্য রকম সাথর্ক । মৃত ব্যক্তিকে আত্মহত্যার পরামর্শ দিয়েছিলো এই নিস্তব্ধতা ; উটের চিত্রকল্পটিতে তারই ভয়াবহতা সূচিত হয়েছে, আত্মহত্যার প্রাক্কালে নৈশ স্তব্ধতার রোমহর্ষণ । আসলে, উটের গ্রীবার উপমেয় এখানে ঠিক নিস্তব্ধতা নয়, মৃত্যু- মৃত্যুই তার ভীষন গ্রীবা বাড়িয়ে দিলো জানলা দিয়ে, পূর্ব- পঙক্তির 'অদ্ভুত' বিশেষণও কোনো এক অজানার ইঙ্গিত দিচ্ছে । উক্ত ব্যক্তির পক্ষে উট অচেনা জন্তু, উটের বাসস্থল মরুভূমি, আকার বৃহৎ ও আকৃতি অসুন্দর- এই তথ্যগুলিতে, পুরো কবিতাটি প'ড়ে ওঠার পর, আমরা লক্ষ করি এক গম্ভীর ও অশুভ ইঙ্গিত, যা কবিতাটির মূল ভাবনাকে প্রগাঢ ক'রে তোলে । যে- সার্ধম্য আমরা কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অংশে খুঁজে পাই না, তার সামগ্রিক প্রভাবে আবিষ্ট হ'তে হয় ।
ইঙ্গি্তময় উপমার একটি শর্ত হলো এই যে উপমেয় ও উপমানে কোনো যান্ত্রিক যোগ থাকবে না, একটি তির্যকভাবে অন্যটির প্রান্ত ছুঁয়ে চ'লে যাবে । অবশ্য কোনো উপমাতেই দুই অংশে কোষ-তরবারি সম্বন্ধ থাকতে পারে না ।চাঁদমুখ' বললে চাঁদের মনোহারিত্ব শুধু মনে পড়ে আমাদের, তার শৈত্য, গোলত্ব বা মৃত অবস্থা নয় ; কিন্তু রোমান্টিক কবিতায় উল্লিখিত প্রসঙ্গেই কথা ফুরোয় না, তাকে আস্তে সরিয়ে দিয়ে উপমার অভিপ্রায় আরো দূরে উত্তীর্ণ হয় । রোমান্টিক আর্ট আমাদের শিখিয়েছে বহিরিন্দ্রিয়ের প্রতি দাস্যভাব থেকে মুক্ত হপ্তে ; তার শ্রেষ্ঠ প্রতিভূদের রচনায় আমরা দেখেছি, কেমন করে কবির চিত্তে বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমান্তরেখা ভেঙ্গে যায়, সব বিপরীত অনিষ্ট হয়ে ওঠে, কবি আমাদের জন্য জয় করে আনেন অজানাকে ।
জীবনানন্দ দাশ (জন্মঃ ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯, বরিশাল - মৃত্যুঃ অক্টোবর ২২, ১৯৫৪, বাংলা ৬ই ফাল্গুন, ১৩০৫) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাংলা কবি। তিনি বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অগ্রগণ্য। মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ পাদে তিনি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন এবং ১৯৯৯ খৃস্টাব্দে যখন তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছিল ততদিনে তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম কবিতে পরিণত হয়েছেন। তিনি প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশ করেছেন। তবে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে অকাল মৃত্যুর আগে তিনি নিভৃতে ১৪টি উপন্যাস এবং ১০৮টি ছোটগল্প রচনা গ্রন্থ করেছেন যার একটিও তিনি জীবদ্দশায় প্রকাশ করেন নি। তাঁর জীবন কেটেছে চরম দারিদ্রের মধ্যে। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধকাল অনপনেয়ভাবে বাংলা কবিতায় তাঁর প্রভাব মুদ্রিত হয়েছে। রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসাবে তিনি সর্বসাধারণ্যে স্বীকৃত।
জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের জেলাশহর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণা নিবাসী। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৯৩৮-৮৫) বিক্রমপুর থেকে স্থানান্তরিত হয়ে বরিশালে আবাস গাড়েন। সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। তিনি বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর মানবহিতৈষী কাজের জন্যে সমাদৃত ছিলেন। জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্তের সর্বাসন্দের দ্বিতীয় পুত্র। সত্যানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৬৩-১৯৪২) ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক।
জীবনানন্দের মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি, তাঁর সুপরিচিত কবিতা আদর্শ ছেলে (আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে) আজও শিশুশ্রেণীর পাঠ্য। জীবনানন্দ ছিলেন পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। তার ডাকনাম ছিল মিলু। তার ভাই অশোকানন্দ দাশ ১৯০৮ সালে এবং বোন সুচরিতা দাশ ১৯১৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কম বয়সে স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিরোধী ছিলেন ব'লে বাড়িতে মায়ের কাছেই মিলুর বাল্যশিক্ষার সূত্রপাত। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পিতার কণ্ঠে উপনিষদ আবৃত্তি ও মায়ের গান শুনতেন। লাজুক স্বভাবের হলেও তার খেলাধুলা, ভ্রমণ ও সাঁতারের অভ্যাস ছিল। ছেলেবেলায় একবার কঠিন অসুখে পড়েন। স্বাস্থ্যউদ্ধারের জন্যে মাতা ও মাতামহ হাসির গানের কবি চন্দ্রনাথের সাথে লক্ষ্মৌ, আগ্রা, দিল্লী প্রভৃতি জায়গা ভ্রমণ করেন।
১৯০৮ সালের জানুয়ারিতে আট বছরের মিলুকে ব্রজমোহন স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করানো হয়। স্কুলে থাকাকালীন সময়েই তার বাংলা ও ইংরেজিতে রচনার সূচনা হয়, এছাড়াও ছবি আঁকার দিকেও তার ঝোঁক ছিল। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রজমোহন বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগসহ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। দু'বছর পর ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় পূর্বের ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটান এবং অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার উদ্দেশ্যে বরিশাল ত্যাগ করেন। জীবনানন্দ কলকাতার নামকরা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৯ সালে তিনি এ কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ. পাশ করেন। ওই বছরেই ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় তার প্রথম কবিতা ছাপা হয়। কবিতাটির নাম ছিল বর্ষ আবাহন। কবিতাটিতে কবির নাম ছাপা হয়নি, কেবল সম্মানসূচক শ্রী কথাটি লেখা ছিল। তবে ম্যাগাজিনটির বর্ষশেষের নির্ঘন্ট সূচিতে তার পূর্ণ নাম ছাপা হয়: শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত, বিএ। ১৯২১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে দ্বিতীয় বিভাগসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কিছুকাল আইনশাস্ত্রেও অধ্যয়ন করেন। সে সময়ে তিনি হ্যারিসন রোডের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে থাকতেন। তবে পরীক্ষার ঠিক আগেই তিনি ব্যাসিলারি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন, যা তার প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত করে। ১৯২২ সালে জীবনানন্দ কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন ছেড়ে দেন।
(চলবে )
বনলতা সেন এবং বিষন্ন এক কবি'র কথামালা - ১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই
আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।
তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।