একবার রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়ার শিলাইদহে যাচ্ছিলেন জমদারির কাজ দেখতে । সন্ধের সময় তার কুষ্টিয়ায় পৌছানোর কথা । কিন্তু আগের ট্রেন ধরতে না পারায় তাকে যেতে হলো পরের ট্রেনে । পরের ট্রেনে যাওয়ার কারণে কুষ্টিয়ায় পৌছতে অনেক রাত হয়ে গেল । কুঠিবাড়ির লোকজন ততোক্ষণে তার জন্যে অপেক্ষা করে চলে গেছে । রবীন্দ্রনাথ পড়ে গেলেন মহা বিপদে । নদীর ধারে এসে দেখলেন, একটা ছোট্র নৌকো ডাঙ্গার দিকে আসছে । নৌকোর মাঝিকে তিনি চিনতে পারলেন, শিলাইদহেরই একজন লোক, তারই প্রজা । মাঝি রবীন্দ্রনাথকে কুর্ণিশ করে নৌকোয় উঠতে বলল । তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার বোটের কী হলো ? তা তো এখানে থাকার কথা ! মাঝি বলল, আপনা্কে ঠিক সময়ে না পেয়ে অপেক্ষা করে বোধহয় ফিরে গেছে ।
কোনো উপায় না দেখে রবীন্দ্রনাথ নৌকোয় উঠলেন । মাঝিই তার জিনিসপত্র নৌকোয় তুলল । অন্ধকার রাত । পথও বেশ অনেকটা । চারদিকে শুধু জমাট অন্ধকার আর নদীর বুকে মাঝির বৈঠার ছপছপ শব্দ । এইভাবে সারারাত নৌকো বাইলো মাঝি । ধীরে ধীরে রাতের আঁধার কেটে গেল এক সময় । গ্রামের ভেতর থেকে মোরগের ডাক শোনা গেল । নৌকা তীরে এসে লাগল । মাঝি বলল, আমি এখনই আসছি । আপনি চিন্তা করবেন না । মাঝি চলে যাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ নৌকোয় একাকী বসে রইলেন । ততোক্ষণে বেশ রোদ উঠেছে । কিন্তু মাঝির ফেরার নাম নেই । এক সময় নদীতীরে লোকজন এসে নৌকোয় রবীন্দ্রনাথকে দেখে অবাক হয়ে গেল । কবি এখানে এলেন কেমন করে ? রাতে তো ঘাটে কোনও নৌকো ছিল না । তাদের কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ বললেন, কুঠিবাড়ির একজন প্রজা মাঝিই নৌকো করে তাকে এখানে পৌছে দিয়েছে । মাঝির নামও বললেন রবীন্দ্রনাথ । কিন্তু সেই মাঝির নাম শুনে সবাই বিস্মিত হয়ে গেল । আরে, ওই মাঝি তো ক'মাস আগে মারা গেছে ! একথা শুনে নৌকোটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ । নদীতে নৌকোটা নেই । কোন ফাঁকে যেন উধাও হয়ে গেছে । তিনি ভাবতে লাগলেন নৌকোটা অদৃশ্য হয়ে গেল কিভাবে !
রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ১১ বছর তখন তার প্রথম শহরের বাইরে শহরতলীতে যাবার সুযোগ হয় । তা ছিল কিশোর রবীন্দ্রনাথের জন্য এক অভিনব অভিজ্ঞতা । তখন ( ১৮৭২-৭৩ ) কলকাতার ঘরে ঘরে ডেঙ্গু জ্বর । ঠাকুর পরিবারের সবাই তাই গঙ্গার ধারে পানিহাটির এক বাগানবাড়িতে গেলেন হাওয়া বদলাতে । ওই বাগানবাড়ির কিছু দূরেই গঙ্গা । চাকরদের ঘরের সামনে একটা পেয়ারা গাছ, তার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় পাল তোলা নৌকো চলছে মাঝ গঙ্গায় । এই ছবি কবির স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়েছিল আমৃত্যু । যা তার কবিতায় ধরা দিয়েছে বার বার । ষোল বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ 'ভারতী'র পাতায় (১২৪৮ বাং ) 'মেঘনাদবধ' কাব্যকে তীব্রভাবে আক্রমণ করলেন এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে । রবীন্দ্রনাথ 'সবুজপত্রে' নিয়মিত কবিতা, গল্প লিখতেন । সবুজপত্রের যে গল্প নিয়ে সে যুগে সাহিত্যিক সমাজতাত্তিক মহলে সব থেকে আলোড়ন জেগেছিল সে গল্পের নাম 'স্ত্রীরপত্র' । বাংলা সাহিত্যে নারী বিদ্রোহের সূচনা হয় সবুজপত্রের রবীন্দ্রনাথের ওই গল্প থেকে ।
রবীন্দ্রনাথ অর্শ রোগের রোগি ছিলেন । তিনি এ রোগের প্রচন্ড কষ্ট পেতেন । তা ধৈর্যের সঙ্গে সহ্যও করতেন । হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন করতে হয়েছিল । রবীন্দ্রনাথ যে খুব ভালো হোমিওপ্যাথ ছিলেন সে খবর অনেকেরই জানা নেই । ইংরেজিতে ছাপা হোমিওপ্যাথির ওপর নামকরা বই প্রায় সবই তার ছিল । শেষ জীবনে বায়োকেমিষ্টের ওপরও ঝোঁক পড়ে তার । খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে রবীন্দ্রনাথ নৈলিতানের কাছে একটি বাগানবাড়ি কিনেছিলেন ।
একবার কাজী নজরুল ইসলামকে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় কবি বলায়, নজরুল এক ব্যক্তির মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন । কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী' । সাপ্তাহিক 'বিজলি'তে প্রকাশিত হয় । ঐ সংখ্যাটি বেরুবার দিন নজরুল সম্পাদক অবিনাশ চন্দ্র ভট্রাচার্যের কাছ থেকে চার কপি কাগজ নিয়ে বললেন, 'গুরুজী'র কাছে নিয়ে যাচ্ছি '। নজরুল চলে গেলেন । বিকেলে এসে সে কাহিনী শোনালেন সবাইকে । নজরুল তার বাড়িতে গিয়ে গুরুজী গুরুজী বলে চেচাতে থাকে । ওপর থেকে রবীন্দ্রনাথ বললেন, কী কাজ অমন ষাড়ের মতো চেচাচ্ছ কেন ? কী হয়েছে ? নজরুল বললেন- আপমাকে হত্যা করবো । গুরুজী আপনাকে হত্যা করবো । রবীন্দ্রনাথ বললেন- হত্যা করবো, হত্যা করবো কি, এসো, উপরে এসে বোস । নজরুল বললেন, হ্যাঁ সত্যিই আপনাকে হত্যা করবো । রবীন্দ্রনাথ বললেন আগে বোস- চা পান খাও । নজরুল রবীন্দ্রনাথের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত নেড়ে নেড়ে 'বিদ্রোহী' কবিতাটি শোনালেন । রবীন্দ্রনাথ স্তব্ধ বিস্ময়ে নজরুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন । তার পর ধীরে ধীরে উঠে কাজীকে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললেন- হ্যাঁ, কাজী তুমি আমায় সত্যিই হত্যা করবে । আমি মুগ্ধ হয়েছি তোমার কবিতা শুনে । তুমি যে বিশ্ববিখ্যাত কবি হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই । রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে খুব স্নেহ করতেন । নজরুল শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন পূজোর ছুটি কাটাতে সঙ্গে ছিলেন ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ।
১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিভাষণ দিতে আসেন । ৭ ফেব্রুয়ারি কবি নারায়ণগঞ্জের স্টিমার ঘাটে এলে তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয় । কবিকে স্বাগত জানান অধ্যাপক অপূর্ব কুমার চন্দ্র এবং অধ্যাপক মাহমুদ হাসান । করোনেশন পার্কে বক্তৃতা দেন কবি । ব্রাহ্মসমাজ মন্দির প্রাঙ্গণে 'দীপালি সংঘের' আয়োজনে প্রায় দু'হাজার মহিলার বিশাল সমাবেশে এক ঘন্টাব্যাপী বক্তৃতা দিলেন কবি । পরে বলেছিলেন, 'এতো মহিলা এমন শান্তভাবে আমাকে কোথাও অভ্যর্থনা করে নাই' । ১০ ফেব্রুয়ারী কবি কার্জন হলে The Meaning of Art শিরোনামে বক্তৃতা দেন । বলদা গার্ডেনেও বেড়াতে গিয়েছিলেন । ঘুরে ঘুরে দেখেছেন নানান গাছ গাছড়া । হঠাৎ একস্থানে থেমে একটা ক্যাকটাস গাছ কবি কৌতুহল নিয়ে দেখতে লাগলেন । পাতাহীন কান্ড সর্বস্ব গাছটিতে কয়েকটি ফুল ফুটেছিল । মুখে মুখে একটি কবিতা রচনা করে ফেললেনঃ "কাঁটায় আমার অপরাধ আছে/ দোষ নাহি মোর ফুলে/ কাঁটা থাক মোর ওগো প্রিয়তম/ ফুল তুমি নিও তুলে ।"
১৯৩০ সালে সারা প্যারিস ভেঙ্গে পড়ল কবির চিত্রকলা দেখতে । শহরের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হলো রবীন্দ্রনাথের চিত্র প্রদর্শনী । জার্মান কবি হেরমান হেসসে চল্লিশ বছর বয়সে লেখা ছেড়ে ছবি আঁকা ধরেছিলেন । আসলে কিছু কিছু ভাবনা, কিছু স্বপ্ন, যা কবিতায় বলা যায় না, তখন অন্য পথ বেছে নিতে হয় ।
রবীন্দ্রনাথের একমাত্র দৌহিত্র নিতু । কনিষ্ঠা কন্যা মীরার ছেলে । নীতিন্দ্রনাথ এর মৃত্যুর খবর শুনে রবীন্দ্রনাথ মীরাকে একটি চিঠি লেখেন -" অন্ধকারে আমরা হাতড়ে বেড়াই, যাদের ভালোবাসি তাদের না জেনে ক্ষতি করি । না বুঝে কষ্ট পাই । কিন্তু সেইটেই তো শেষ কথা নয়, সেই সমস্ত ভুল-চুক দুঃখকষ্টের মধ্যে বড়ো কথাটা এই যে, আমরা ভালোবেসেছি ।.... এসেছি সংসারে, মিলেছি, তারপর আবার কালের টানে সরে যেতে হয়েছে, এমন কত বারবার হল, বারবার হবে-এর সুখ এর কষ্ট নিয়ে জীবনটা সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে । অসহ্য দুঃখ বেদনা ঘরে ঘরে আছে, কাল প্রতিদিন তা একটু একটু করে মুছে মুছে দিচ্ছে । নিতুকে খুব ভালোবাসতুম । তাছাড়া তোর কথা ভেবে প্রকান্ড দুঃখ চেপে বসেছিল বুকের মধ্যে । আমার শোকের দায় আমিই নেব-বাইরের লোকে কি বুঝবে তার ঠিক মানে টা । ... সেখানে আমাদের সেবা পৌছায় না, কিন্তু ভালোবাসা হয়তো বা পৌছায় -নইলে ভালোবাসা এখনো টিকে থাকে কেন ?"
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

