somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

রবীন্দ্রনাথের কোনো বিকল্প নাই -৫৫

০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৩:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একবার রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়ার শিলাইদহে যাচ্ছিলেন জমদারির কাজ দেখতে । সন্ধের সময় তার কুষ্টিয়ায় পৌছানোর কথা । কিন্তু আগের ট্রেন ধরতে না পারায় তাকে যেতে হলো পরের ট্রেনে । পরের ট্রেনে যাওয়ার কারণে কুষ্টিয়ায় পৌছতে অনেক রাত হয়ে গেল । কুঠিবাড়ির লোকজন ততোক্ষণে তার জন্যে অপেক্ষা করে চলে গেছে । রবীন্দ্রনাথ পড়ে গেলেন মহা বিপদে । নদীর ধারে এসে দেখলেন, একটা ছোট্র নৌকো ডাঙ্গার দিকে আসছে । নৌকোর মাঝিকে তিনি চিনতে পারলেন, শিলাইদহেরই একজন লোক, তারই প্রজা । মাঝি রবীন্দ্রনাথকে কুর্ণিশ করে নৌকোয় উঠতে বলল । তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার বোটের কী হলো ? তা তো এখানে থাকার কথা ! মাঝি বলল, আপনা্কে ঠিক সময়ে না পেয়ে অপেক্ষা করে বোধহয় ফিরে গেছে ।

কোনো উপায় না দেখে রবীন্দ্রনাথ নৌকোয় উঠলেন । মাঝিই তার জিনিসপত্র নৌকোয় তুলল । অন্ধকার রাত । পথও বেশ অনেকটা । চারদিকে শুধু জমাট অন্ধকার আর নদীর বুকে মাঝির বৈঠার ছপছপ শব্দ । এইভাবে সারারাত নৌকো বাইলো মাঝি । ধীরে ধীরে রাতের আঁধার কেটে গেল এক সময় । গ্রামের ভেতর থেকে মোরগের ডাক শোনা গেল । নৌকা তীরে এসে লাগল । মাঝি বলল, আমি এখনই আসছি । আপনি চিন্তা করবেন না । মাঝি চলে যাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ নৌকোয় একাকী বসে রইলেন । ততোক্ষণে বেশ রোদ উঠেছে । কিন্তু মাঝির ফেরার নাম নেই । এক সময় নদীতীরে লোকজন এসে নৌকোয় রবীন্দ্রনাথকে দেখে অবাক হয়ে গেল । কবি এখানে এলেন কেমন করে ? রাতে তো ঘাটে কোনও নৌকো ছিল না । তাদের কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ বললেন, কুঠিবাড়ির একজন প্রজা মাঝিই নৌকো করে তাকে এখানে পৌছে দিয়েছে । মাঝির নামও বললেন রবীন্দ্রনাথ । কিন্তু সেই মাঝির নাম শুনে সবাই বিস্মিত হয়ে গেল । আরে, ওই মাঝি তো ক'মাস আগে মারা গেছে ! একথা শুনে নৌকোটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ । নদীতে নৌকোটা নেই । কোন ফাঁকে যেন উধাও হয়ে গেছে । তিনি ভাবতে লাগলেন নৌকোটা অদৃশ্য হয়ে গেল কিভাবে !

রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ১১ বছর তখন তার প্রথম শহরের বাইরে শহরতলীতে যাবার সুযোগ হয় । তা ছিল কিশোর রবীন্দ্রনাথের জন্য এক অভিনব অভিজ্ঞতা । তখন ( ১৮৭২-৭৩ ) কলকাতার ঘরে ঘরে ডেঙ্গু জ্বর । ঠাকুর পরিবারের সবাই তাই গঙ্গার ধারে পানিহাটির এক বাগানবাড়িতে গেলেন হাওয়া বদলাতে । ওই বাগানবাড়ির কিছু দূরেই গঙ্গা । চাকরদের ঘরের সামনে একটা পেয়ারা গাছ, তার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় পাল তোলা নৌকো চলছে মাঝ গঙ্গায় । এই ছবি কবির স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়েছিল আমৃত্যু । যা তার কবিতায় ধরা দিয়েছে বার বার । ষোল বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ 'ভারতী'র পাতায় (১২৪৮ বাং ) 'মেঘনাদবধ' কাব্যকে তীব্রভাবে আক্রমণ করলেন এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে । রবীন্দ্রনাথ 'সবুজপত্রে' নিয়মিত কবিতা, গল্প লিখতেন । সবুজপত্রের যে গল্প নিয়ে সে যুগে সাহিত্যিক সমাজতাত্তিক মহলে সব থেকে আলোড়ন জেগেছিল সে গল্পের নাম 'স্ত্রীরপত্র' । বাংলা সাহিত্যে নারী বিদ্রোহের সূচনা হয় সবুজপত্রের রবীন্দ্রনাথের ওই গল্প থেকে ।

রবীন্দ্রনাথ অর্শ রোগের রোগি ছিলেন । তিনি এ রোগের প্রচন্ড কষ্ট পেতেন । তা ধৈর্যের সঙ্গে সহ্যও করতেন । হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন করতে হয়েছিল । রবীন্দ্রনাথ যে খুব ভালো হোমিওপ্যাথ ছিলেন সে খবর অনেকেরই জানা নেই । ইংরেজিতে ছাপা হোমিওপ্যাথির ওপর নামকরা বই প্রায় সবই তার ছিল । শেষ জীবনে বায়োকেমিষ্টের ওপরও ঝোঁক পড়ে তার । খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে রবীন্দ্রনাথ নৈলিতানের কাছে একটি বাগানবাড়ি কিনেছিলেন ।

একবার কাজী নজরুল ইসলামকে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় কবি বলায়, নজরুল এক ব্যক্তির মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন । কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী' । সাপ্তাহিক 'বিজলি'তে প্রকাশিত হয় । ঐ সংখ্যাটি বেরুবার দিন নজরুল সম্পাদক অবিনাশ চন্দ্র ভট্রাচার্যের কাছ থেকে চার কপি কাগজ নিয়ে বললেন, 'গুরুজী'র কাছে নিয়ে যাচ্ছি '। নজরুল চলে গেলেন । বিকেলে এসে সে কাহিনী শোনালেন সবাইকে । নজরুল তার বাড়িতে গিয়ে গুরুজী গুরুজী বলে চেচাতে থাকে । ওপর থেকে রবীন্দ্রনাথ বললেন, কী কাজ অমন ষাড়ের মতো চেচাচ্ছ কেন ? কী হয়েছে ? নজরুল বললেন- আপমাকে হত্যা করবো । গুরুজী আপনাকে হত্যা করবো । রবীন্দ্রনাথ বললেন- হত্যা করবো, হত্যা করবো কি, এসো, উপরে এসে বোস । নজরুল বললেন, হ্যাঁ সত্যিই আপনাকে হত্যা করবো । রবীন্দ্রনাথ বললেন আগে বোস- চা পান খাও । নজরুল রবীন্দ্রনাথের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত নেড়ে নেড়ে 'বিদ্রোহী' কবিতাটি শোনালেন । রবীন্দ্রনাথ স্তব্ধ বিস্ময়ে নজরুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন । তার পর ধীরে ধীরে উঠে কাজীকে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললেন- হ্যাঁ, কাজী তুমি আমায় সত্যিই হত্যা করবে । আমি মুগ্ধ হয়েছি তোমার কবিতা শুনে । তুমি যে বিশ্ববিখ্যাত কবি হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই । রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে খুব স্নেহ করতেন । নজরুল শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন পূজোর ছুটি কাটাতে সঙ্গে ছিলেন ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ।

১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিভাষণ দিতে আসেন । ৭ ফেব্রুয়ারি কবি নারায়ণগঞ্জের স্টিমার ঘাটে এলে তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয় । কবিকে স্বাগত জানান অধ্যাপক অপূর্ব কুমার চন্দ্র এবং অধ্যাপক মাহমুদ হাসান । করোনেশন পার্কে বক্তৃতা দেন কবি । ব্রাহ্মসমাজ মন্দির প্রাঙ্গণে 'দীপালি সংঘের' আয়োজনে প্রায় দু'হাজার মহিলার বিশাল সমাবেশে এক ঘন্টাব্যাপী বক্তৃতা দিলেন কবি । পরে বলেছিলেন, 'এতো মহিলা এমন শান্তভাবে আমাকে কোথাও অভ্যর্থনা করে নাই' । ১০ ফেব্রুয়ারী কবি কার্জন হলে The Meaning of Art শিরোনামে বক্তৃতা দেন । বলদা গার্ডেনেও বেড়াতে গিয়েছিলেন । ঘুরে ঘুরে দেখেছেন নানান গাছ গাছড়া । হঠাৎ একস্থানে থেমে একটা ক্যাকটাস গাছ কবি কৌতুহল নিয়ে দেখতে লাগলেন । পাতাহীন কান্ড সর্বস্ব গাছটিতে কয়েকটি ফুল ফুটেছিল । মুখে মুখে একটি কবিতা রচনা করে ফেললেনঃ "কাঁটায় আমার অপরাধ আছে/ দোষ নাহি মোর ফুলে/ কাঁটা থাক মোর ওগো প্রিয়তম/ ফুল তুমি নিও তুলে ।"

১৯৩০ সালে সারা প্যারিস ভেঙ্গে পড়ল কবির চিত্রকলা দেখতে । শহরের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হলো রবীন্দ্রনাথের চিত্র প্রদর্শনী । জার্মান কবি হেরমান হেসসে চল্লিশ বছর বয়সে লেখা ছেড়ে ছবি আঁকা ধরেছিলেন । আসলে কিছু কিছু ভাবনা, কিছু স্বপ্ন, যা কবিতায় বলা যায় না, তখন অন্য পথ বেছে নিতে হয় ।

রবীন্দ্রনাথের একমাত্র দৌহিত্র নিতু । কনিষ্ঠা কন্যা মীরার ছেলে । নীতিন্দ্রনাথ এর মৃত্যুর খবর শুনে রবীন্দ্রনাথ মীরাকে একটি চিঠি লেখেন -" অন্ধকারে আমরা হাতড়ে বেড়াই, যাদের ভালোবাসি তাদের না জেনে ক্ষতি করি । না বুঝে কষ্ট পাই । কিন্তু সেইটেই তো শেষ কথা নয়, সেই সমস্ত ভুল-চুক দুঃখকষ্টের মধ্যে বড়ো কথাটা এই যে, আমরা ভালোবেসেছি ।.... এসেছি সংসারে, মিলেছি, তারপর আবার কালের টানে সরে যেতে হয়েছে, এমন কত বারবার হল, বারবার হবে-এর সুখ এর কষ্ট নিয়ে জীবনটা সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে । অসহ্য দুঃখ বেদনা ঘরে ঘরে আছে, কাল প্রতিদিন তা একটু একটু করে মুছে মুছে দিচ্ছে । নিতুকে খুব ভালোবাসতুম । তাছাড়া তোর কথা ভেবে প্রকান্ড দুঃখ চেপে বসেছিল বুকের মধ্যে । আমার শোকের দায় আমিই নেব-বাইরের লোকে কি বুঝবে তার ঠিক মানে টা । ... সেখানে আমাদের সেবা পৌছায় না, কিন্তু ভালোবাসা হয়তো বা পৌছায় -নইলে ভালোবাসা এখনো টিকে থাকে কেন ?"

(চলবে...)
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×