এরপর এমন কোনো দিক নেই যা দেখনি। এক দুঃসম্পর্কের চাচা এসে দলিলবাজী করে বাড়ীটা দখল করে নিলেন। মোটা টাকা ছড়িয়ে ছিলেন চারিদিকে, তাতে সন্দেহ নেই কোনো। ব্যাংকে কিছু নেই সেটা জানি। আমি কেবল একাদশের ছাত্র, চীরদিন চার দেওয়ালের ভেতর থাকা আর স্কুল-কলেজের বন্ধুহীন বোকাসোকা ভালোছেলে টাইপ বেকুব। আত্মীয়রা দূরে দূরে সরে থাকেন, এমন একটা কপর্দকহীন আধ-দামড়া ছেলের অভিভাবক কে হতে চায় বলুন?
ওসবে অবশ্য কোনো কষ্ট পাইনি। বাবা-মা মারা গেলে কেঁদেছিলাম, জানতাম ওঁরা আর ফিরে আসবেন না। ঘর হারিয়ে গিয়ে উঠেছিলাম পরিচিত কয়েকটা ক্লাসমেটের দয়াতে ওদের মেসে। ভাবতেই হাসি পায়, শহরের সব থেকে জাঁকালো বাড়ীটা ছিলো একসময় আমার, এখন আমি টিনের চালার অন্ধকার মত এক খুপচি ঘরে আরো দুজনার সাথে গাদাগাদি করে বাস করি। আগে ঘর আলোতে ভাসিয়ে রাখতাম, এখন বিদ্যুৎ বিলের ভয়ে টিপে টিপে বাতি জ্বালাই। রোজ কম হলেও চারটে মুখোরোচক তরকারীর বদলে একটু ঠান্ডা ভাত আর কোনোমতেমুখে তোলা যায় এমন বিচ্ছিরি শাকপাতা রান্না।
ওরাই টিউশনি জুটিয়ে দেয়। প্রথমে একটা, তার মাস দুয়েক পরে আরো দুটো। সরকারী কলেজের সুবিধে, পড়ার চাপ কম, নিয়মিত হাজিরা দেই, তবে না দিলেও চলে। একসময় এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। নিত্যদিনের মতই সহ্য হয়ে যায় সব।
এই সময়টা আমি সবকিছু ভুলে থাকতাম শুধু মিতুর জন্যে।
মিতু, আমার ক্লাস মেট, ছোটোবেলা থেকেই একসাথে বন্ধুত্ব, প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া। আমাদের একদম পাশের বাড়ীটা ছিলো ওদের, সারাদিন এখানেই কাটতো ওর একসময়। বড় হতে হতে আসাযাওয়া কমে গেলেও, মনের টানটা বেড়ে যায়। একদিন ও বুঝে ফেলে, আমাদের দুজনার প্রতি দুজনার অনুভুতিটাও একই। তখন আমরা হাই স্কুলে। একে অন্যকে স্বীকৃতি দিয়ে ফেলি একদিন, নিজেরা নিজেরা। পরে অবশ্য পরিবারের অন্যরাও টের পেয়েছিলো, তবে অমত ছিলোনা কারো সেটা উনারাও বুঝিয়ে দিতেন তখন। সে বাবা-মা বেঁচে থাকবার সময়কার কথা।
বাবা-মা মারা যাবার পর, আর স্থাবর-অস্থাবর বাকিটুকু আত্মীয়েরা ছিনিয়ে নেবার পরে আমি চলে এসেছি এই শস্তা এলাকায়। মিতুর সাথে অবশ্য রোজ ক্লাসে দেখা হয়। কথা হয়। একসাথে বসি মাঠে। তবে আগের মতন ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন দেখাটা আর হয়ে ওঠে না। নিজেদের আলাপ এখন বলতে গেলে পুরোটাই বদলে গেছে। এখন কথা হয় ভালো মার্কস, তারপর ইউনিভার্সিটি এসব নিয়ে। ভালোবাসি শব্দটা আমরা কেউ আর উচ্চারন করি না। আর সযত্নে এড়িয়ে যাই দুজনার কোনো একপতেহ চলবার স্বপ্নটা। তবু আমি ভেতরে ভেতরে খুব চাই, ও সারাজীবন আমার পাশে থাকুক, এক সাথে পথ চলুক।
মিতু একদিন জানতে চেয়েছিলো, এমন বদলে গেলাম কেন। জবাব কি দিয়েছিলাম ঠিক খেয়াল নেই। যতদূর মনে পড়ে, ওকে দেখিয়ে দিয়েছিলাম ওর আর আমার বর্তমান সামাজিক অবস্থানগত ফারাকটা। ও চলে যাবে ভালো কোনো ইউনিতে, আমার ভরসা এই লোকাল কলেজই। ওর বর জুটবে কোটিপতি, আমার তখনো চলবে দু'মুঠো যোগাড়ের সংগ্রাম। মিতুর চীরকাল ইচ্ছে ছিলো আমরা বাইরে কোথাও সেটল করবো। সেটা ওর পক্ষে সম্ভব, আমার পক্ষে এখন সেটা অবাস্তব কল্পনারও বাইরে। ও এখোনো সমাজের উঁচু তার মেয়ে, তবে আমি পিছলে পড়ে নেমে এসেছি একদম নীচ তলায়।
শুনে মীতু কিছুই বলেনি সেদিন।
পরদিন ক্লাস শেষে বাসায় ফেরবার আগে, মীতু একটা চিঠি গুঁজে দিয়েছিলো আমার হাতে। সেখানে অনেক আবেগী কথা লেখা ছিলো, আমি যেনো এসব আর না বলি, ওর ওপর ভরসা রাখি, হেরে যেনো না যাই - এসব। তারপর একসময়, আমাদের মাঝে সম্পর্কটা একটা নতুন দিকে এগোয় - অপেক্ষা।
আমি টের পেতাম, আমাকে মিতুর বাবা-মা ভালোভাবে নিচ্ছেন না, তাই যাওয়া বন্ধ করেছিলাম অনেক আগেই। আবার জুটলো নতুন উৎপাত, ওদের ড্রাইভার শ্যেন চোখে ওকে পাহারা দেয় কলেজে। আগে শুধু নামিয়ে দিয়ে যেতো আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতো, এখন সারাক্ষন বসে থাকে। আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম শুধু মাত্র চিঠি।
ছোটো ছোটো চীরকুটে খবর পাই, ভালোমন্দ মিশিয়ে। একদিন খবর পেলাম, ও দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। সেটা আমাদের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার কিছু পর। একটা ফোন নম্বর আর ঢাকার ঠিকানা, দেখা করতে হবে জরুরী। জমানো কিছু টাকা নিয়ে রওনা হলাম ঢাকায়।
ঢাকায় নেমে ফোন করলাম সেই নাম্বারে। তখন মোবাইল ফোন ছিলোনা দেশে। ল্যান্ড ফোনে কল করে চাইলাম যাকে চাইতে হবে -উর্মী। একগাদা প্রশ্নের জবাব দিয়ে উর্মীর মা ফোন দিলেন মেয়ের হাতে। উর্মী জনালো, পরদিন কোথায়-কখন দেখা করতে হবে মিতুর সাথে।
আরেকটা মেস, এটা উর্মীর প্রেমিকের। তার ঘরে দেখা হলো মিতুর সাথে। আমাদে একলা করে দিয়ে বেরিয়ে গেলো উর্মী আর ছেলেটা। মিতু ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো আমার ওপর, কাঁদছে ফুঁপিয়ে।
কান্না থামিয়ে জানালো, পরের সপ্তাহেই চলে যাচ্ছে মিতু। আমাকে অনেকদিন দেখতে পাবেনা তাই কাঁদছে। ও নাকি অনেক চেষ্টা করেছিলো দেশেই থাকতে, দেশেই পড়তে, বাবা রাজী নন। মিতু জানালো, ও ফিরবে, আমি যেনো অপেক্ষায় থাকি। বললো, সুযোগ পেলেই ফোন করবে আমাকে, আমার এক বন্ধুর বাসার নম্বরে। চিঠিও লিখবে, মোড়ের দোকানটার ঠিকানায়। অনেক কাঁদলো মিতু, ওকে জড়িয়ে ধরে বসেছিলাম সারাক্ষন। তারপর মিতু চলে গেল। আমিও ফিরতি বাসে চলে এলাম নিজের শহরে।
মিতু যাবার একমাস বাদে প্রথম ফোন পেলাম ওর। বন্ধুর ছোটোভাই ছুটতে ছুটতএ এসে জানালো, লং ডিস্ট্যান্স কল, দশ মিনিট পরে আবার করবে। আমিও গায়ে জামা চড়িয়ে ছুট দিলাম ওর সাথে। ফোন এলে একটা "হ্যালো" শুনেই বুকের ভেতরে কেমন জানি করে উঠলো। ওপাশ থেকে অনেক কথা বললো মিতু, বললো, আমাকে নাকি চিঠিও লিখেছে, জলদি পাবো। আরো বললো, পনেরোদিন পর পর ও ফোন করবে আমাকে। সেরাতে মেসের গুমোট ঘরে শুয়ে, চোখে পানি এসে গিয়েছিলো আমার।
নিয়মিত চিঠি পেতাম, ছবি থাকতো সাথে। একটু একটু করে বিদেশী লাগতে লাগলো মিতুকে আমার, সাজে, ব্যাবহারে, কথায়। তবু ফোন করে যখন বলতো, "কেমন আছো?" মনে হতো সেই পুরোনো মেয়েটিই!
একদিন কিছু ডলার পাঠালো মিতু। ফোনে ওকে মানা করার পর, একটু মন খারাপ করেছিলো। বলেছিলো, এ নাকি ওর উপার্জনের ডলার, আমি নিলে খুশি হবে। আমি বলেছিলাম, এটা নিলাম, আর না। আমার ডলার চাই না, আমার চাই মিতুকে। অনেক হেসেছিলো মিতু। বলেছিলো, ও আসবে, আমি যেনো অপেক্ষা করি।
বছর গড়ায়। মিতু এলো একদিন। আবার ঢাকা ছুটলাম ওকে দেখতে। ওর পরিবার ততদিনে সব গুটিয়ে ঢাকাতে চলে গিয়েছে। একটা চাইনিজে দেখা হলো। সত্যি কথা, সেই প্রথমবার, নিজেকে মিতুর সামনে অনেক ক্ষুদ্র মনে হলো নিজেকে। ওর আচার-আচরন সবই বদলে গেছে। ওকে হিংসে হতে লাগলো। আগের সেই আটপৌরে বাঙালী মেয়ে নেই আর, স্বাবলম্বী আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর অন্য কোনো মেয়ে মনে হচ্ছিলো ওকে। একটু নিস্প্রভ হয়ে গিয়েছিলাম সেই সন্ধেয়।
মিতু বুঝতে পেরেছিলো সেটা, প্রথমেই বলেছিলো, ওর যত বদল সব বাইরেই, ভেতরে ও আমার পুরোনো মিতুই আছে - খুব ভালো লেগেছিলো কথাটা। বেশ কিছুদিন ছিলো মিতু সেবার, পরিবারকে সময় দিয়ে যখনই পারতো, দেখা করতে চলে আসতো। আমরা ঘুরে বেড়াতাম।
তারপর ও চলে গেল, আমিও চলে এলাম। মিতু ফোন করতো নিয়মিত, চিঠিও লিখতো। তবে ভেতরে ভেতরে আমি একটু একটু করে দুরে সরে আসছিলাম। আমি জানি মিতু আর আমার মাঝে তফাৎটা এখন অনেক, আর সেটা ক্রমেই বাড়ছে। এভাবে প্রায় একবছর গেল, একদিন ফোনে মীতু জানালো, সে দেশে এসেছে। আমাকে সারপ্রাইজ দেবে বলে জানায়নি। আমি যেন পরের বাসেই রওনা হই। আমি রওনা হলাম। কেন যেনো মনে হচ্ছিলো, খুব সম্ভবত এটাই ওর সাথে আমার শেষ দেখা।
বিকেলে চাইনিজ রেঁস্তোরাতে দেখা হলো। মিতু আরো বদলেছে। আরো অনেক আত্মপ্রত্যয়ী আর ভিনদেশী মনে হচ্ছিলো ওকে। ওর চোখদুটো লাল। টেবিলে বসে প্রথম কথা বললো, "সামনের সপ্তাহে আমার বিয়ে।" এরপর আমার সম্বিৎ একটা ঘরে, একটা চেয়ারে বসে আছি, মিতু আমার হাত ধরে জোরে জোরে ঝাকাঁচ্ছে, উর্মী আর ওর প্রেমিক আমার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছে। চারদিকে চেয়ে বুঝলাম, এটা সেই মেস, উর্মীর প্রেমিক যেখানে থাকে, মিতু দেশে এলে যেখানে আমরা দেখা করি একান্তে।
মিতু কাঁদছে। ওর দিকে তাকিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, আমি কিভাবে গেলাম। মিতু জানালো, ওর বিয়ের খবর শুনে আমি নাকি একটুক্ষন ওর দিকে চেয়ে ছিলাম, তারপার সোজা উঠে রেঁস্তোরা থেকে বেরিয়ে এসে হাঁটা শুরু করি উদ্দেশ্যহীন এবং উদভ্রান্তের মতন। মিতু জোর পায়ে প্রায় ছুটে এসে আমাকে ধরে এবং রিকশায় তুলে এখানে চলে আসে। আমি নাকি কোনো জোর করিনি, যা বলেছে শুনেছি, তবে বাক্যহীন এবং ভুতগ্রস্থের মতন।
আমি ওকে শুভকামনা জানাই, আরো জানাই, আমি সবসময় চাইবো ও সুখী থাকুক। সাতেহ এটাও জানাতে ভুলি না, আমার মতন চালচুলোহীন কাউকে মিতু বিয়ে করবে, আমিসেই আশাও করি না। জবাবে সাপটে একটা চড় খেয়েছিলাম গালে, এখনো মাঝে মাঝে ঝিনঝিন ভাবটা মনে করতে পারি। চড় দিয়ে মিতু কিসব তড়বড় করে বলছিলো চোস্ত ইংলিশে। পরে শুনেছি, আমাকে গাল দিচ্ছিলো ও।
পরদিন আমরা বিয়ে করে ফেলি। মিতুর প্লান ছিলো, বিয়েটা করে রাখা, তবে এখন জানাবে না বাসায়। চেষ্টা করবে ওর বাবার পছন্দের ছেলেকে পাশ কাটাতে, যেকোনো ছুতোয়। তবে সেটা সম্ভব না হলেই ফাঁস করবে আমাদের বিয়েকরে ফেলার খবরটা। এরপর আরো দুই সপ্তা ছিলো মিতু, তারপর চলে গেল। বাসে গা এলিয়ে দিয়ে এই প্রথমবার অনুধাবন করলাম, আমি এখন একটা জলজ্যান্ত স্বামী!
ফিরে এসে তখন মাথা খারাপ অবস্থা আমার। মিতুর পড়াশুনো শেষ হবে জলদিই, আর এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের কোর্স লাগে ছয় বছর। রেজাল্ট পেতে আরো প্রায় একবছর, তবে উপায়! চোখে সর্ষেফুল দেখছিলাম, সারা জীবনে সেই প্রথম। আরো একটা বছর গড়িয়ে গেল। ফোনে আর চিঠিতে আলাপটা বদলে গেল, প্রেমিক-প্রেমিকার আলাপ বদলে গেল স্বামী-স্ত্রীর আলাপে। মিতুর পড়াশুনো শেষ হলো। এবং একদিন মিতু জানিয়ে দিলো, ও আর ফিরবে না!
এরপর............বাকিটা আমি নাই বলি..........ছোট গল্পের মত নাহয় ধরে নিন 'শেষ হইয়াও হইল না শেষ'।
গল্পটা আমার নয়, গল্পটা আপনার খুব পরিচিত কারোর হতে পারে। কে জানে গল্পটা হয়তো আপনার ও হতে পারে। গল্পটা যারই হোক তার মঙ্গলময় জীবন কামনা করছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



