পর্ণোগ্রাফী কি? সাধারণভাবে পর্ণোগ্রাফী হচ্ছে ঐসব সিনেমা, ম্যাগাজিন, গল্প, উপন্যাস বা ছবি যেখানে যৌনতাকে এমনভাবে উপস্খাপন করা হয় যাতে পাঠক বা দর্শক চরমভাবে যৌন উত্তেজিত ও আকৃষ্ট হয়। ফলশ্রুতিতে তারা যৌন উত্তেজনার শিকার হয়। বর্তমানে বিশ্বায়নের অংশ হিসেবে নারী ও শিশুদের বেচাকেনা এবং ব্যবহার বেড়েই চলেছে। যৌনতাবৃত্তিতে নারী ও শিশুর ব্যবহার এবং পাচার বহুকাল আগে থেকেই প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে এর পরিমাণ বহুগুণে-বহুমাত্রিকভাবে বেড়ে গেছে এবং এটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভও করেছে।
পর্ণোগ্রাফী শিশু ও নারীসহ জনমানুষকে বিকারগ্রস্ত করে তুলছে। ফলে সমাজে ব্যভিচার, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে ও যাচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত যৌনতার কারণে মরণব্যাধি এইডসও পিছু নিচ্ছে আজ নারী-শিশুসহ সমগ্র মানবজাতির। পর্ণোগ্রাফী হলো আমাদের শিশু-কিশোর ও বয়:সন্ধিকালীন তরুণ-তরুণীদের নিকট এক ধরনের যৌন শিক্ষক। সাধারণত ১২-১৮ বছর বয়সী শিশুরাই পর্ণোগ্রাফী দেখে বেশি। ব্লু ফিল্ম দেখলে মানুষমাত্রই কামোত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং বিশেষত: উঠতি শিশু-কিশোরদের মধ্যে পড়ছে এর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া। কামোত্তেজক অভিজ্ঞতার কারণে এ বয়সী ছেলেমেয়েরা মানসিক স্বাস্খ্য সমস্যার সম্মুখীন হতেও বাধ্য হচ্ছে। পর্ণোগ্রাফিক অভিজ্ঞতার চর্চা করতে গিয়ে আসক্তরা সমাজে সৃষ্টি করছে অস্খিতিশীলতা। ফলে পরকীয়া প্রেম, সংসার ভাঙ্গন ও অশান্তি সৃষ্টি বিশেষত শিশু ধর্ষণ, নারী ধর্ষণ, নারী নির্যাতন এমনকি তালাকের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। পর্ণোগ্রাফিতে আক্রান্ত শিশুরা রুগ্ন মানসিকতা নিয়ে বড়দের সাথে তাদের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ করতে পারছে না। বড়দের সাথে তাদের দূরত্ব কেবলই বাড়ছে। ফলে তারা বড়দের এড়িয়েও চলছে। আমাদের সমাজব্যবস্খায় সবসময় সুকুমারবৃত্তি ও ভালো কাজ লালন করে থাকে। কিন্তু পর্ণোগ্রাফী আমাদের কামোত্তেজনাকে বিকৃত জ্বালাময়ী করে তুলছে এবং আমাদের খারাপ দিকগুলোকে তীব্রভাবে জাগিয়ে তুলছে।
কম্পিউটারের ইন্টারনেট যতই সহজলভ্য হচ্ছে পর্ণোগ্রাফী সাইটগুলো ততই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পথকে আমাদের শিশুদের জন্য সহজ ও সুগম করে দিচ্ছে। পর্ণোছবি বয়স ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সবারই ক্ষতি করলেও বিশেষত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোমলমতি শিশুদের যে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক সর্বনাশ ডেকে আনছে তা অপূরণীয়। ২০০১ সালের এক জরিপ মতে পূর্ববর্তী ১২ মাসে শিশু-কিশোরদের মধ্যে যারা নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করছে তাদের ১৯% কোন না কোনভাবে যৌন আবেদনের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে ইন্টারনেট মাধ্যমটি উভয় সংকটে ফেলেছে সচেতন অভিভাবকদের। ইন্টারনেটে একদিকে শিশু-কিশোরদের দিচ্ছে জ্ঞানের অবারিত দরজা অন্যদিকে ইন্টারনেটের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আসছে হাজার হাজার পর্ণোগ্রাফিক ওয়েবসাইটের মতো সমাজ ও নৈতিকতা ধ্বংসকারী দানব। শিশুর জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি লোভনীয় ও চিত্তাকর্ষক শিকারী এ পর্ণোসাইটের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে। ডড়ৎষফ রিফব বিন-এর সর্বাপেক্ষা লাভজনক ব্যবসার অন্যতম হচ্ছে পর্ণোগ্রাফী আর শুধু চাইল্ড পর্ণোগ্রাফী থেকেই প্রতি বছর তিন লাখ বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে। তাই শিশু হোক বা প্রাপ্তবয়স্ক হোক সবার জন্যই পর্ণোগ্রাফী হচ্ছে নৈতিক অবক্ষয়ের একটি মোক্ষম হাতিয়ার। একদল মতলবী মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে পর্ণোকে পৌঁছে দিচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে, যারা ভাল-মন্দ না বুঝেই আসক্ত হয়ে পড়ছে এ নোংরামিতে যা সমাজের জন্য বয়ে আনছে অশনি সংকেত। ফলে তৈরি হচ্ছে এমন সব ভবিষ্যৎ নাগরিক যারা নৈতিকভাবে হচ্ছে বিকৃত ও দুর্বল। সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে যেসব শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করছে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আশায়, এদের বিরাট একটি অংশ পর্ণের ফাঁদে পড়ে হয়ে যাচ্ছে। সমাজ বিরোধী প্রযুক্তিগতভাবে শিশু নির্যাতনের জন্য এর চেয়ে বড় হাতিয়ার বোধকরি আর দ্বিতীয়টি নেই।
১৯৯৪ সালে ইন্টারনেটে মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শনের উপায় প্রচলন করে। তখন থেকেই ইন্টারনেট সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যৌন বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওয়েবসাইটে তাদের পণ্য প্রচারে উৎসাহিত করে। ফলে ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার সিয়াটলে একটি প্রতিষ্ঠান-প্রথম ওয়েবভিত্তিক পতিতাবৃত্তির ব্যবসা শুরু করে। ঐ বছরই আমেরিকার এরিজোনার কোম্পানি আরেকটি পতিতাবৃত্তির বিজ্ঞাপন দিয়ে ওয়েবসাইট চালু করে। ১৯৯৫ সালের শুরুতেই প্রায় ২০০টি এ জাতীয় বিজ্ঞাপন ও যৌনসেবাদানকারী ওয়েবসাইট চালু হয় এবং একই বছরের মাঝামাঝিতে বেশ কিছু নগ্নতাকেন্দ্রিক ক্লাবও তৈরি হয় ওয়েবসাইটে, যেখানে আইনগত পতিতাবৃত্তির অংশ হিসেবে নগ্ন নারীর ছবি প্রদর্শন করা হতে থাকে। ১৯৯৫ সালের আগস্টে গৃহীত এক জরিপে ৩৯১টি পর্ণোগ্রাফিক ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। এ সংখ্যা ১৯৯৬ সালে দাঁড়ায় ১৬৭৬-এ আর ২০০৫ সালে যার সংখ্যা ১,৩১,০০,০০০ (এক কোটি একত্রিশ লাখটি)। ১৯৯৫ সালে প্লে-বয় নামক একটি ওয়েবসাইটকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যেন তরুণ-তরুণী ও বিত্তবানরা আকৃষ্ট হয়, যারা পর্ণোগ্রাফী পত্রিকা হাতে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো না। ১৯৯৬ সালের সমীক্ষায় দেখা যায় যে, এ ওয়েবসাইটি সর্বাধিক ব্রাউসকারী ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে এগারোতম। এভাবে যৌনতাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হয়ে ইন্টারনেট ব্যবস্খার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও দ্রুত অর্থের লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার এসব পর্ণোগ্রাফী প্রতিষ্ঠান বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৫ ‘ইন্টারনেট পর্ণোগ্রাফী : আমাদের কি করণীয়' বিষয়ে ঢাকায় ‘ইয়ুথ ফর রাইটস এ্যান্ড জাস্টিস' এবং ‘সেন্টার ফর ওমেন এ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজ'-এর যৌথ উদ্যোগে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকে বাংলাদেশে পর্ণোগ্রাফী বন্ধে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ, ইন্টারনেট দেয়ার ক্ষেত্রে শর্তারোপ প্রভৃতি বিষয় আলোচিত ও এ বিষয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
সুন্দরী এক তরুণী কক্ষে ঢোকার পর সেখানে অপেক্ষমান যুবক তাকে জড়িয়ে ধরলো। যুবক নিজ হাতে ওই তরুণীর শরীরের বসন আলগা করতে থাকে। এরপর দু'জন শয্যায় গা এলিয়ে দেয়। এর পরের দৃশ্য আর বর্ণনা করার মতো নয়। এক, দুই, তিন ঘন্টা বা তারও বেশি সময়ের এমন দৃশ্যের শত শত ভিডিও সিডি প্রায় প্রকাশ্যেই দেশে বিক্রি হচ্ছে এখন। ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে এগুলো। এই ভিডিও সিডির ক্রেতাদের অধিকাংশই বয়সে কিশোর বা তরুণ। ইংরেজিতে লেখা ‘গরম মসল্লা, হটকেক, বাংলা ধামাকা, আই লাভ ইউসহ বিভিন্ন নামে-বেনামে এই ভিসিডির মোড়কগুলোও বেশ আকর্ষণীয়। বাংলাদেশী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে ধারণ করা উল্লিখিত দৃশ্য সংবলিত ভিসিডির মোড়কে রয়েছে বিদেশী মডেলদের নজরকাড়া অর্ধনগ্ন ছবি। হিন্দি পপ আর ডিস্কো সঙ্গীতের নামে নগ্ন দৃশ্যের রিমিক্স ভিসিডিও এখন সহজলভ্য। ইদানীং এই বাজার দখল করে নিয়েছে হিন্দি পপ গানের বাংলা সংকলন আর যাত্রার কুরুচিপূর্ণ নাচ-গানের ভিডিও সিডি- যার নাম শুনলেই বোঝা যায় এসবের ভেতরে কি আছে। যেমন ‘নাইট কুইন, নাই ড্যান্স, বাবুজী, টপটেন, কাঁটা লাগা, ট্যাংকি ফাইট্টা যায়, উল্টাপাল্টা, চাক ভাঙ্গা মধু, টাংকি ছেদা ইত্যাদি। এসব নগ্ন আর অর্ধনগ্ন দৃশ্যের ভিডিও সিডিগুলো সাধারণভাবে পর্ণো সিডি নামে পরিচিত। অশ্লীল ভিসিডির রমরমা ব্যবসার পাশাপাশি সাম্প্রতিককালে প্রতিযোগিতায় নেমেছে দেশের চলচ্চিত্রের একশ্রেণীর প্রযোজক ও পরিচালক। যারা অশ্লীল নৃত্য আর ধর্ষণ দৃশ্য থেকে শুরু করে এখন নগ্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর শয্যার সবটুকুই প্রদর্শনের ব্যবস্খা করে দিয়েছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সিনেমা হলগুলোতে। ঢাকার বাইরের প্রায় প্রতিটি সিনেমা হলেই কাটপিস' নামের এসব দৃশ্য অবাধে প্রদর্শন করা হচ্ছে। চলচ্চিত্রের পর্ণোগ্রাফীর দাপট দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। শহর থেকে এখন গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছেছে পর্ণোগ্রাফী। অথচ দেশের চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা বা পর্ণোগ্রাফী বন্ধ করার জন্য সরকারি উদ্যোগে ৬৪টি জেলায় জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয়েছে শক্তিশালী টাস্কফোর্স। কিন্তু তারপরও পরিস্খিতির যে তেমন উন্নতি হয়েছে তা বলা যায় না।
সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে এসব পর্ণো সিডির ব্যবসা। ব্যবসার বাইরে আতঙ্কিত করে তুলেছে তরুণীদের ও তাদের অভিভাবকদের। ব্যবসার বাইরে ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে এসব সিডি। এই মুহূর্তে ঢাকাসহ গ্রাম-গঞ্জের বাজারে সাম্প্রতিককালে হটকেকের মতো বিক্রি হয়েছে ও হচ্ছে যে কয়টি ভিডিও সিডি সেগুলোর চরিত্রই বলে দেবে কেন এই আতঙ্ক। আমাদের দেশে বিভিন্ন পন্থায় পর্ণো ভিডিও সিডি তৈরি হয়ে বাজারে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের একশ্রেণীর ছাত্র তার সহপাঠী ছাত্রীকে মিথ্যা প্রলোভনে বা প্রতারণামূলক পন্থায় ডেটিংয়ের নামে নগরীর অভিজাত এলাকার বাসায় নিয়ে যায়। ওই ছাত্র একা বা তার বন্ধুদের সহায়তায় ভিডিও ক্যামেরা চালু করে নির্ধারিত কক্ষের একস্খানে লুকিয়ে রাখে। ওই ছাত্র-ছাত্রীরা গল্প করার সময় মেলামেশা থেকে পর্যায়ক্রমে অশ্লীলতার সর্বশেষ পর্যায়ে পৌঁছে, যার সম্পূর্ণটা ভিডিও থেকে সিডি করে দেয়া হয় বন্ধুদের। বন্ধুরাও ওই ভিসিডি কপি করে অবাধে পরিচিতজনদের কাছে দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হয়, যা কিনা অসাধু ভিসিডি ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যায়। তারা তা বাজারজাত করে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়।
এসব পর্ণো ভিসিডি বাজারজাত করার জন্য এরই মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তরুণী সংগ্রহ, বাসা ও ক্যামেরার আয়োজন থেকে শুরু করে পর্ণো ভিসিডি বাজারজাত করা পর্যন্ত সবকিছুই করছে ওই চক্রের সদস্যরা। মডেলিং, সিনেমা ও টেলিফিল্মের নায়িকা বা অভিনেত্রী করার নামে বিভিন্ন স্খান থেকে সুন্দরী তরুণীদের তাদের কব্জায় আনে ওই চক্রটি। পরে কোনো ফ্ল্যাট বা কথিত আবাসিক হোটেলের কক্ষে নেয়া হয় তাকে। চক্রের নির্ধারিত যুবক থাকে তাদের সঙ্গে, যাকে ওই সুন্দরীর সহশিল্পী বা নায়ক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। তাদের স্কিন টেস্টের নামে দু'জনের জড়িয়ে ধরা থেকে শুরু করে একে অপরের শরীরের বসন আলগা করা এবং সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শয্যার সর্বশেষ দৃশ্যটি বেশ আকর্ষণীয়ভাবে ভিডিওতে ধারণ করা হয়। এরপর ভিসিডি তৈরি করার পাশাপাশি ফকিরাপুলের নির্ধারিত কিছু প্রিন্টিং প্রেসে বিদেশী নগ্ন ও অর্ধনগ্ন সুন্দরীদের ছবি দিয়ে ছাপানো হয় ভিসিডি কভার। তারপর বাজারজাত করার পালা। রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ চক্রের সদস্যরা ছড়িয়ে দিচ্ছে এসব পর্ণো ভিসিডি।
অশ্লীলতার বিষয়ে বিশ্ববিখ্যাত ‘পতিতার আত্মকথা' উপন্যাসখাত ‘ফ্যানি হিলের মামলা' সংক্রান্ত আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ তাদের মন্তব্যে বলেছেন, এমন অনেক ঘটনা আছে যা অভিনয় করে দেখানো বা ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় না। এসব ঘটনার মধ্যে যৌনমিলনের একটি। টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা নাট্যমঞ্চে যৌন-মিলনের দৃশ্যে অভিনয় করা শোভন নয়। নাটক মানুষ একা দেখে না, অনেকে মিলে দেখে। এগুলো হচ্ছে যৌথ প্রদর্শনীয়। ফ্যানি হিলের বই প্রসঙ্গে আমেরিকার ধর্মশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম স্কট মরটোন তার জবানবন্দিতে বলেছেন, ফ্যানি হিলে যেসব দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে সেগুলো সাধারণ মানুষের পক্ষে অস্বাস্খ্যকর। এতে শ্লীলতার সব রকম সীমানাকে নির্দ্বিধায় লঙ্ঘন করা হয়েছে।
এই উপমহাদেশ এক সময় ইংরেজদের অধীনে ছিল। আমাদের দেশের অনেক আইন তাদের আইনের অনুকরণে প্রণীত। ফলে ইংল্যাণ্ডের উচ্চ আদালতসমূহের রুলিং স্বাভাবিকভাবে আমাদের দেশে সম্মানিত হয়। ১৮৬৮ সালে রেমান পুরোহিত ও নারী সংক্রান্ত একটি মামলায় চিপ জাস্টিন ককবার্ণ অশ্লীলতার সংজ্ঞা দেন। এই মামলা ‘হিকলিন কেস' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। চিফ জাস্টিন ককবার্ণ বলেন, ‘যা মানুষের মনকে বিকৃত এবং দূষিত করে তা-ই অশ্লীলতা।' ১৮৮১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে ‘চিফ জাস্টিস ককবার্ণ'-এর দেয়া হিলকিন মামলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে আসছে। ১৮৯৫ সালে চারটি নারীদেহের ছবির ওপর একটি মামলা হয়। আর তিনটি ছিল আংশিক অর্ধনগ্নদেহ। ওই মামলায় আসামীকে সাজা দেয়া হয়।
প্রতি বছর সারা দেশে ঈদ কার্ডের দোকানগুলোতে কার্ড বিক্রির আড়ালে অশ্লীল ও পর্ণো ছবির (ক্যালেন্ডারসহ) ভিউ কার্ড গোপনে বিক্রি হয়ে থাকে। ঈদকে সামনে রেখে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এই চিরত্র বিধ্বংসী অনৈতিক পরিকল্পনাটি হাতে নেয়। শিশু-কিশোরদের টার্গেট করে বিদেশী নায়ক-নায়িকাদের যৌন মিলনের ছবির মাথা কেটে দেশী নায়ক-নায়িকা ও গায়ক-গায়িকাদের মাথা লাগিয়ে পিছনে কোন নতুন সালের ক্যালেণ্ডার দিয়ে এই মিনি ভিউকার্ডগুলো প্রস্তুত করা হয়। প্রতি পিস ভিউকার্ডের উৎপাদন খরচ পড়েছে মাত্র ১৫ পয়সায়, আর এটি বিক্রি হয়েছে দু'টাকায়। যা শিশু-কিশোরদের ক্রয় ক্ষমতার একেবারেই ভেতরে। মাত্র দু'টাকা মূল্য হওয়াতে হাইস্কুল পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এগুলো ক্রয়ের রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল।
রাজধানীতে বিভিন্ন বুকস্টলে দেশী-বিদেশী পর্ণো পত্রিকা ও চটি বই অবাধে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। এসব পত্রিকা যারা কেনে, তাদের অধিকাংশই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী। আজ দেশে কিশোর যুবসমাজ যেভাবে বিপথগামী হচ্ছে, যেভাবে সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় ব্যাপ্ত হচ্ছে- তার পেছনে বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তথা অপসংস্কৃতির প্ররোচনা সক্রিয় রয়েছে। পর্ণো পত্রিকা, চটি বই ইত্যাদি এই প্ররোচনার অন্যতম প্রধান বাহন। এসব পত্র-পত্রিকা স্টলগুলোতে প্রকাশ্যে বিক্রি হলেও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্খা নেয়া হচ্ছে না। প্রতিটি ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হওয়া এসব পর্ণো পত্রিকা এবং পর্ণো চটি বইয়ের প্রকাশক ও মুদ্রাকরের ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করা হয়-প্রদত্ত ঠিকানায় যাদের কোন অস্তিত্ব মিলে না। বিদেশী পর্ণো ম্যাগাজিনের অনুকরণে নগ্ন ছবিওয়ালা এসব পত্রিকা ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। সেই সাথে বিদেশী পর্ণো পত্র-পত্রিকা এবং বইও বিক্রি হয় আর সেসবের দাম একশ থেকে দু'শ/আড়াইশ টাকা। ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সীরাই সাধারণত বেশি কিনে থাকে এসব পর্ণো পত্রিকা।
অশ্লীল পর্ণো পত্র-পত্রিকা যে অবাধে দেদারকে বিক্রি হচ্ছে-এ খবর নতুন নয়। বছরের পর পরই ধরে সংবাদপত্রে এ ব্যাপারে খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং কখনো কখনো এসবের বিরুদ্ধে আইন-শৃকôখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানও পরিচালিত হয়েছে। ধরপাকড় হয়েছে, মামলা হয়েছে এবং পত্র-পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্ত, যা কখনো বন্ধ হয়নি, তা হলো পর্ণো পত্র-পত্রিকা, চটি বইয়ের ব্যবসা। অভিযান চালিয়ে ও ধরপাকড়ের সময় সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও আবার ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। হাত বাড়ালেই পর্ণো বই-পত্রিকা পাওয়া যায়। শুধু রাজধানী নগরীতেই নয়, দেশের অন্যান্য বড় শহরে এবং এমনকি মফ:স্বলেও এখন এগুলো নিতান্ত সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। দেশের আকাশ খুলে দেয়ার ফলে বিজাতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো যেভাবে অবাধ যৌনতা ছড়াচ্ছে, তেমনি ছড়াচ্ছে এই পর্ণো বই-গুলো। আকাশ সংস্কৃতির রমরমা বিকাশের আড়ালে আপাত লুক্কায়িত থাকলেও অশ্লীল বই-পত্রের প্রভাব কোনভাবেই কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশীই। প্রশ্ন উঠেছে, এ সবের রমরমা ব্যবসা অব্যাহত থাকতে পারছে কি করে?
আমাদের সমাজে পর্ণোগ্রাফি কোনো সময়ই গ্রহণযোগ্য নয়। আজকাল আমাদের দেশেও অশ্লীলতা বা পর্ণোগ্রাফির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা চলেছে। আন্দোলন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হচ্ছে একের পর এক। দেশের চলচ্চিত্র জগতের অধিকাংশই সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে একযোগে সোচ্চার ভূমিকায় অবতীর্ণ। সমাজকে অশ্লীলতার পংকিল আবর্ত থেকে উদ্ধারপূর্বক সুস্খ ধারায় প্রবাহিত করে যুব-কিশোরদেরকে তথা দেশকে অপসংস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সরকার যেমন আইন পাস করেছেন, এই একই যুব-কিশোর-তরুণ সমাজকে নীলছবির আগ্রাসন থেকে বাঁচানোর জন্য, মুক্ত করার জন্য, উদ্ধার করার জন্য কঠোর আইন ও নীতিমালা প্রয়োজন একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। যারা বিভিন্ন দোকানে ও ফুটপাথে অশ্লীলতা বিলি করছে তাদেরকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। জরিমানাসহ দোকানগুলো সিল করতে হবে। সবকিছু ধ্বংস করতে হবে। এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য প্রদর্শনের অবকাশ নেই।
এখনি সময় পরবর্তী প্রজন্মকে ভাল ভাবে বসবাস করার সুযোগ তৈরী করতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



