মন্ত্রিসভা গঠন করার সময় শেখ হাসিনা ‘চমক' দেখানোর কথা বলেছিলেন। আসলেও ‘চমক' তিনি যথেষ্টই দেখিয়েছেন। দেখে-শুনে বাছাইও এমনভাবে করেছেন যে, তার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দেখে সচেতন অনেকে এমনকি ভীত না হয়ে পারেননি। ভীত হওয়ার কারণ, রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা মোটেও ‘চমক' দেখানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে দেশ ও জাতির সবকিছু। যাদের দেখে বেশি ভীত হতে হয়েছিল, তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিনি সামলাতে পারবেন কি না- এমন প্রশ্ন উঠেছে কিছু সঙ্গত কারণে। বিদেশ সফর এবং বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিদেশীদের সঙ্গে মেলামেশার বিষয়টি স্বভাবতই প্রাধান্যে এসেছে। উল্টো কথাও অবশ্য শোনা গেছে। কেউ কেউ বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাধারণত ভারতের বাইরে খুব একটা যেতে হয় না। মাঝখানে শুধু সেপ্টেম্বরে যেতে হয় জাতিসংঘে। এই উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন মরহুম আবদুস সামাদ আজাদ। তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে সড়ক পথেও ভারতে গিয়েছিলেন। সুতরাং ডাক্তার দীপু মনিকে তেমন সমস্যায় পড়তে হবে না।
সমস্যায় পড়া দূরে থাক, বাস্তবে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন্তু প্রথম দিনগুলো থেকেই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে সাবলীলভাবে হাত মেলানোর মাধ্যমে শুধু নয়, অন্য সব দিক থেকেও ডাক্তার দীপু মনি জানান দিচ্ছেন যে, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাঠকরা কথাটার মধ্যে কোনো ইঙ্গিত লক্ষ্য করে থাকবেন। এ ইঙ্গিত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে যে অতি দ্রুত ‘উন্নতি' ঘটতে থাকবে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। শেখ হাসিনার দিক থেকেও নির্বাচনের পর পর এ ব্যাপারে ধারণা পাওয়া গিয়েছিল। সরকারিভাবে ফলাফল ঘোষিত হওয়ার আগেই শেখ হাসিনা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিকে ফোন করে অনুরোধ জানিয়েছেন, তিনি যেন ‘বৌদিকে' সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় আসেন এবং তার (শেখ হাসিনার) শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্খিত থাকেন। এদিকে নির্বাচনের একদিন পর, ৩১ ডিসেম্বরই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী শেখ হাসিনার সঙ্গে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ' করতে সুধা সদনে গেছেন। হাজার ব্যস্ততার মধ্যে শেখ হাসিনাও মিস্টার চক্রবর্তীকে দু'ঘন্টা ধরে ‘সৌজন্য সাক্ষাতের' সুযোগ দিয়েছেন। বোঝা যাচ্ছিল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী যাকেই বানানো হোক না কেন, তাকেই ভারতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীও নেত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছা পূরণ করে চলেছেন।
এর প্রথম প্রমাণ পাওয়া গেছে তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে। শেখ হাসিনা যে দিন সরকার গঠন করেছেন সে দিনটি থেকে প্রায় প্রতিদিনই দু'চারজন করে বাংলাদেশীকে হত্যা করছে বিএসএফ। নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যার মধ্য দিয়ে ভারতের ‘বুত্বপূর্ণ' মনোভাবের প্রকাশ ঘটলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। অথচ গণতান্ত্রিক সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিএসএফের এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো দীপু মনিদের কর্তব্য ছিল। অন্য যে কোনো দেশ হলে ভারতের হাই কমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে আনা হতো এবং ভারত সরকারের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠানো হতো। কিন্তু দীপু মনিরা কিছুই করেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাই বলে আবার চুপচাপ বসেও ছিলেন না। তিনি নিজে এবং তার সহকর্মী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ভারতকে ট্রানজিট ও সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন। মনে হচ্ছে যেন ভারতকে বন্দর ও ট্রানজিট দেয়ার শর্তেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে! এখানেই শেষ নয়। প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য বাংলাদেশের দরোজা খুলে দেয়ার নামান্তর হলেও তারা সাউথ এশিয়ান টাস্ক ফোর্স গঠন করবেন। বলা দরকার, এ ব্যাপারে ভারতের হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সঙ্গ ও সমর্থন দিয়ে চলেছেন। ১২ জানুয়ারিও তিনি ট্রানজিটের জন্য জোর তাগিদ দিয়েছেন। জানিয়েছেন, আগামী মাস ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরকালে ট্রানজিট ও সন্ত্রাস দমনই হবে প্রধান আলোচ্য বিষয়। প্রলোভন দেখিয়ে পিনাক চক্রবর্তী বলেছেন, ভারতের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি করবে। ফলে বাংলাদেশ বিপুল অংকের রাজস্ব আয়ের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশকে রীতিমতো ‘জ্ঞান' দেয়ার ঢঙে মিস্টার চক্রবর্তী আরো বলেছেন, ট্রানজিট কোনো ‘রাজনৈতিক বিষয়', এটা নিতান্তই একটি ‘অর্থনৈতিক ইস্যু'!
এখন দেখা যাচ্ছে, সবকিছুর পেছনে আসলেও সুচিন্তিত পরিকল্পনাই ছিল। ‘এমন এক অবস্খায়' রেখে গেছেন বলেই ফখরুদ্দীনরা বিদায় নেয়ার পর পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী থেকে ভারতের হাই কমিশনার পর্যন্ত সবাই একযোগে তৎপর হয়ে উঠেছেন। প্রসঙ্গক্রমে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার ব্যাপারে আপত্তি ও প্রতিবাদের কারণ উল্লেখ করা দরকার। বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও ভারত নিজে কিন্তু কোনো দেশকে কখনো ট্রানজিট বা করিডোরের সুবিধা দেয়নি। ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার পর ‘পূর্ব পাকিস্তান' তথা বর্তমান বাংলাদেশের প্রয়োজনে মাত্র ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। জবাবে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল বলেছিলেন, ছয় ঘন্টার জন্যও ট্রানজিট সুবিধা দেয়া হবে না। ভারতের এই নীতির কারণে এখনো ভূমি বেষ্টিত নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভারতের ওপর দিয়ে চীন ও পাকিস্তানেও পণ্য আনা-নেয়া করতে পারছে না বাংলাদেশ। ভারত সব সময় তার নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই ভারত নিরাপত্তার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।
অন্য কয়েকটি তথ্যও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য করা দরকার। মুখে ট্রানজিট বলা হলেও ভারতের উদ্দেশ্য আসলে করিডোর আদায় করা। কারণ ট্রানজিটের অর্থ এক দেশের ভেতর দিয়ে অন্য দেশে যাওয়ার সুযোগ। অন্যদিকে ভারত চাচ্ছে ভারতেরই এক অঞ্চল থেকে অন্য কয়েকটি অঞ্চলে যাতায়াত করার সুযোগ। একে করিডোর বলা হয়। বাস্তবেও সকল উপলক্ষে ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে নিজের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করার সুযোগ চেয়েছে। এখনো তাই চাচ্ছে। নতুন করে এই চেষ্টার শুরু হয়েছিল গত বছরের এপ্রিলে। ভারত সে সময় এমন একটি চুক্তির খসড়া পেশ করেছিল যা স্বাক্ষরিত হলে ভারতের পণ্যবাহী যান ও কনটেইনার কার্গো বেনাপোল স্খলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতো এবং তামাবিল হয়ে মেঘালয়, বিবির বাজার হয়ে ত্রিপুরা এবং খাগড়াছড়ি হয়ে মিজোরামে যেতে পারতো। ভারতের যাত্রীবাহী যানবাহনও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের রাজ্যগুলোতে যাতায়াত করতো।
ভারত একই সঙ্গে রেল ট্রানজিটের জন্যও পৃথকভাবে প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রস্তাবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান পাঁচটি রেল সংযোগ দিয়ে ট্রানজিট কার্যকর করতে বলা হয়েছিল। গেদে-দর্শনা, সিঙ্গাবাদ-রোহনপুর, পেট্রাপোল-বেনাপোল এবং রাধিকাপুর-শাহজাদপুর ছাড়াও আখাউড়া থেকে ত্রিপুরার আগরতলা পর্যন্ত রেল লাইনের মিসিং লিংক তৈরি করতে বলেছিল ভারত। এ লাইনটি চালু হলে ভারত কলকাতা থেকে আগরতলা পর্যন্ত সরাসরি রেল চলাচলের সুবিধা পাবে। এর ফলে কলকাতা থেকে আগরতলার দূরত্ব ১৫০০ কিলোমিটারের স্খলে কমে হবে মাত্র ৩৫০ কিলোমিটার। অন্য এক প্রস্তাবে ভারত আশুগঞ্জে পোর্ট অব কল সুবিধা চেয়েছে। এই সুবিধা দেয়া হলে পশ্চিম বঙ্গ থেকে নৌপথে আশুগঞ্জ পর্যন্ত পণ্য এনে ভারত আখাউড়া-আগরতলা রেল লাইনের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পাঠাতে এবং ওই সব রাজ্য থেকে মূল ভূখণ্ডে পণ্যসামগ্রী নিয়ে যেতে পারবে। উল্লেখ্য, ভারতের পক্ষ থেকে সমগ্র বিষয়টিকে কেবলই ‘অর্থনৈতিক ইস্যু' হিসেবে সামনে আনা হয়েছে যেন এর সঙ্গে রাজনৈতিক এবং সামরিক বা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো কিছু জড়িত নেই! অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, ভারতকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রেন ও যানবাহন চলাচল করার সুবিধা দেয়া হলে দেশের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘিíত হবে। কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টারস' নামে পরিচিত রাজ্যগুলোতে বহু বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে। পাঁচ লাখের বেশি ভারতীয় সেনা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছে। ট্রানজিটের আড়ালে করিডোর দেয়া হলে ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে তার সেনাবাহিনী এবং অস্ত্রশস্ত্র আনা-নেয়া করবে। এর ফলে বাংলাদেশ অযথা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ শুরু করতে পারে। তেমন অবস্খায় বাংলাদেশকে ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় তথা সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। এক পর্যায়ে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়বে। ওদিকে সাত রাজ্যের স্বাধীনতা সংগ্রাম চলতে থাকবে অনির্দিষ্ট সময় ধরে। তারা স্বাধীনতা অর্জন করলেও ভারত তা মেনে নিতে চাইবে না। ভারত তখন বাংলাদেশে অবস্খান করে রাজ্যগুলোকে দমন ও ধ্বংস করতে চাইবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ভারতের অধীনস্খ হয়ে পড়বে।
পোর্ট ট্রানজিট দেয়া হলে আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশ টার্গেটে পরিণত হতে পারে। কারণ ভারত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে পণ্যের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রও আনা-নেয়া করবে। তেমন অবস্খায় ভারতের শত্রু ও প্রতিদ্বন্দবী রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্খা নেয়ার চেষ্টা চালাবে। বাংলাদেশ কখনো আক্রান্ত হলেও ভারতই সুযোগ নেবে, ফায়দা হাসিল করবে। দেশটি পাশে দাঁড়ানোর যুক্তি দেখিয়ে তার সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেবে। পরিণতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।
এভাবে যে কোনো পর্যালোচনায় দেখা যাবে, ট্রানজিট বা করিডোর দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সামান্যও সম্ভাবনা নেই। কারণ যে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তথা বাণিজ্যকে ট্রানজিটের আড়াল বানানো হচ্ছে তার কোনো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ কখনো লাভবান হতে পারেনি। ভারতের নীতি-মনোভাবের পরিণতিতে একদিকে বাংলাদেশের রফতানি আয়ে ধস নামছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে চলেছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যসব দেশের সঙ্গেও ভারতের আচরণ একই রকম। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারা অনেক উপলক্ষেই অভিযোগ করেছেন, ভারতীয়দের হীন মানসিকতার কারণে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোতে বাণিজ্যের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভারতের সদিচ্ছা থাকলে এই অঞ্চলের দেশগুলোও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারতো। বড় কথা, স্বাধীনতা পরবর্তী প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারত বাংলাদেশকে ঘাটতির মধ্যে রেখে এসেছে। ভারতের এই নীতির পরিণতিতে বাংলাদেশ ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে তো পারছেই না, কোনো কোনো অর্থ বছরে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ অনেক কমেও যাচ্ছে। কারণ, ভারতীয়রা বাংলাদেশের ভেতরে নিজেদের পণ্য ঠেলে দেয়ার ব্যাপারেই বেশি ব্যস্ত থাকে অনেক বেশি পরিমাণ ও ধরনের পণ্য পাঠায় তারা চোরাচালানের অবৈধ পথে। বাংলাদেশ থেকে আমদানি করার ক্ষেত্রেও ভারতীয়রা চোরাচালানের মাধ্যমেই বেশি আমদানি করে।
সম্পর্কের দোহাই দিয়ে যতো আশার বাণীই শোনানো হোক না কেন, সকল তথ্য-পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয়দের নীতি ও মনোভাবে পরিবর্তন ঘটবার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারতীয় নেতারা যে প্রতারণাপূর্ণ নীতি-কৌশল অবলম্বন করেন, তার বড় ধরনের একটি প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল সিডরের পর পর। সরকারিভাবে অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এদেশের কারো কারো ‘দাদা' প্রণব মুখার্জি সেবার মাত্র পাঁচ লাখ টন চাল রফতানি করা নিয়ে রীতিমতো ‘খেল' দেখিয়ে ছেড়েছেন। প্রণব মুখার্জিই অবশ্য একমাত্র ভারতীয় নেতা নন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীও কম দেখিয়ে যাননি। ১৯৯৯ সালে ঢাকা-কলকাতা সরাসরি বাস সার্ভিস উদ্বোধন উপলক্ষে ঢাকা সফরে এসে তিনি ২৫ ক্যাটাগরির বাংলাদেশী পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার বাস্তবায়ন আজও হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যেখানে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েও এতটা নির্লজ্জভাবে প্রতারণা করতে পারেন, সেখানে বাংলাদেশের নিশ্চয়ই ‘যেটুকুন' ও ‘সেটুকুন' বলে আশা করার কোনো সুযোগ থাকতে পারে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



