শাহবাগ মোড় ও কাঁটাবন মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বের মার্কেটের ফুলের দোকানগুলো এখন রমরমা ব্যবসা করেছে। বিভিন্ন দিবস পালনের সময় তাদের ব্যবসা একেবারে তুঙ্গে থাকে। ফুলের চাষ, ফুলের ব্যবসা এখন একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। সেতো খুশির খবর। একটি শিল্পকে কেন্দ্র করে উৎপাদনকারী ও বিক্রেতা মিলে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে। কারো শুভ কাজ বা উন্নতির খবর শুনে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো খুবই ভাল কাজ। বলা বাহুল্য, এ ফুলের সবচেয়ে বেশি কাটতি হয়েছে এবার ভালবাসা দিবসে। ফুল নিয়ে এতো কথা বলার অর্থ এই নয় যে, আমি ফুল বা ফুল বিক্রেতা ও উৎপাদনকারীদের বিপক্ষে কিছু একটা বলতে চাই। ফুলের বিপক্ষে কথা বলবো এমনটি চিন্তাও করা যায় না। কথায় আছে যে ফুল ভালবাসে না সে মানুষ হত্যা করতে পারে। অতএব এখানে আমি যে কথাটা বলতে চাই, তাহলো গোলাপের পাঁপড়ি নয় তার সাথে থাকা কাঁটা ও রেণুর মধ্যে থাকা মাইট নামক পোকা সম্পর্কে যা মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কথায় আছে, গোলাপের পাঁপড়ি যেমন আনন্দ দেয় তার কাঁটাও আবার আহত করে। এ্যাজমা বিশেষজ্ঞগণের সতর্কিকরণ হলো ফুল যেন নাকের কাছে না নেয়া হয়, তাহলে মাইট নামক পোকার দ্বারা ক্ষতি হবে, যে পোকা এ্যাজমার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। সঙ্গত কারণেই যারা ফুল দেখে আনন্দিত হয়, কিন্তু তার পেছনের ক্ষতির দিকটা মনে রাখে না, যারা ভালবেসে হারিয়ে যায় অন্যজগতে, আর এর পরিণতি জানে না, যখন জানে তখন আর কিছু করার থাকে না। তাদেরকে কিছু বিষয় মনে করিয়ে দেয়াই এ লেখার উদ্দেশ্য। কারণ, তারা অন্য গ্রহ থেকে আসা কোন প্রাণি নয়, আমাদেরই কোমলমতি ছেলেমেয়ে। আমাদের সন্তান, আমাদের ভাইবোনকে আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিতে পারি না। আর পারি না বলেই আমাদের দেশে আসা বিদেশী অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমরা কথা বলে আসছি। সফল হইনি এমন কথা বলা ঠিক হবে না। কারণ, এপ্রিল ফুল ছিল আমাদের সংস্কৃতির একটি আবিষ্কৃত অধ্যায়- যার জন্ম কাহিনী আমরা জানতাম না। কতটা বেদনাদায়ক এ এপ্রিল ফুল তা জানতাম না। আজ আমাদের জাতির একটা বিরাট অংশ বুঝতে সক্ষম হয়েছে যে, এপ্রিল ফুল কি? হাজার হাজার নারী-পুরুষকে মসজিদে বন্দী করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল হায়েনার দলেরা। মুসলমানদের সরল বিশ্বাসে আঘাত হেনে তাদের হত্যা করার পর ঐসব হায়েনা উল্লাস করে বলেছিল, মুসলমানরা কি বোকা। সে দিনটিকে তারা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমাদের কাটা ঘায়ে লবণ ছিটিয়ে দিয়ে এপ্রিল ফুল পালন করে। কত অজ্ঞ আমরা, সে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণই করি না, বরং এদেশে ঐ অনুষ্ঠানের আয়োজকও আমরা। আনন্দের বিষয় হচ্ছে আমরা দিন দিন অকার থেকে আলোর পথে ধাবিত হচ্ছি, আর আমাদের সরকারগুলোও। পশ্চিমা প্রগতির প্রবক্তারা নিজেদেরকে সংস্কৃতির ধ্বজাধারী ভাবতে খুবই পুলকিত মনে করে থাকে, আর সে ছদ্মাবরণে আমাদের দেশে পাচার করে এসব নোংরা কার্যকলাপ। আর এগুলোকে তারা সংস্কৃতির বড় অধ্যায় বলে চালাতে চায়। ভালবাসা দিবস এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। হতে পারে কেউ ভেংচি কেটে বলবে, লেখকের হৃদয়মনে হয় ভালবাসা নেই।
এবার আসা যাক আসল কথায়
২৭০ খৃস্টাব্দের কথা। তখন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস নারী-পুরুষের বিবাহ বনে আবদ্ধ হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। তার ধারণা ছিল, বিবাহ বনে আবদ্ধ হলে যুদ্ধের প্রতি পুরুষদের অনীহা সৃষ্টি হয়। সে সময় রোমের খৃস্টান গীর্জার পুরোহিত ‘ভ্যালেন্টাইন' রাজার নির্দেশ অগ্রাহ্য করে গোপনে নারী-পুরুষের বিবাহ বনের কাজ সম্পন্ন করতেন। এ ঘটনা উদঘাটিত হওয়ার পর তাকে রাজার কাছে ধরে নিয়ে আসা হয়। ‘ভ্যালেন্টাইন' রাজাকে জানালেন, খৃস্টধর্মের বিশ্বাসের কারণে তিনি কাউকে বিবাহ বনে আবদ্ধ হতে বারণ করতে পারেন না। রাজা তখন তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। এক পর্যায়ে বশে আনতে না পেরে রাজা তাকে হত্যা করে।” লেখক অন্যত্র বলেন, “কথিত আছে ‘ভ্যালেন্টাইন কারাগারে থাকাকালে কারারক্ষী এক যুবতীর প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েন। ২৭০ খৃষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দিন সে, কারারক্ষী যুবতীকে একটি চিরকুট লিখে যান যার শেষে লিখা ছিল “ঋৎড়স ুড়ঁৎ াধষবহ:রহব” অর্থাৎ তোমার ভ্যালেন্টাইন। ভ্যালেন্টাইন সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি কিছু জানা যায় না।”
প্রিয় পাঠক যে ভ্যালেন্টাইন জেলবরণ করেছিলেন এবং নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন তার খৃস্টধর্মের বিধানের প্রতি নিষ্ঠা এবং খৃস্টধর্মের একটি বিধান বিবাহ পদ্ধতি রক্ষার জন্যে, কোন অবৈধ প্রেম-মিলনের জন্যে নয়। প্রেম নিবেদনের বিরোধিতার জন্য আজ সে হতভাগা ভ্যালেন্টাইনের নামে যারা ভালবাসার ফুল বিনিময় করছে বিবাহের পূর্বে যদি আজ ভ্যালেন্টাইন থাকতেন তা হলে এসব প্রেমিক প্রেমিকাদের বিরুদ্ধে গলাফাটিয়ে চিৎকার করে বলতেন তোমরা ভুল করছো আমি খৃস্টধর্মের বিধান বিবাহ-পদ্ধতি রক্ষার জন্যেই জীবন দিয়েছিলাম। নোংরা প্রেম নিবেদনের জন্যে নয়। কোনো ধর্মই নোংরা প্রেমের প্রশ্রয় দেয় না। তাই খৃস্টধর্মের পোপও এ বিবাহ বহির্ভূত প্রেমের বিরোধিতা করে জীবন দিয়েছেন।
আজ যারা ভালবাসার নামে বিবাহ বহির্ভূত প্রেমের ভয়াবহ রাস্তায় পা-বাড়াচ্ছে তাদের এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনা যেমন দায়িত্ব মাতা-পিতার তেমনি দায়িত্ব সরকারের। ক্ষতি যতটা হয়েছে তা যেন আর সামনে এগুতে না পারে। আমরা একটা ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাচ্ছি আমাদের স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের আজ উস্কিয়ে দেয়া হচ্ছে এ নোংরামীর দিকে। ভালবাসা নি:সন্দেহে একটি পবিত্র কাজ। আমাদের সমাজে, পরিবারে যদি ভালবাসার বন না থাকে তাহলে সমাজ বা পরিবারের অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু ভালবাসার কোন দিনক্ষণ নেই, নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। নেই কোন মওসুম। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি গভীর ভালবাসা না থাকে তাহলে সে পরিবার একটি মৃত বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। আমাদের যতটা ভালবাসা আছে তা প্রাণ উজাড় করে বিনিময় করবো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে। মনের মাধুরী মিশিয়ে ভালবাসবো একে অপরকে। কিন্তু যদি স্ত্রীকে ভাল না বেসে তা গার্লফেন্সন্ডকে উজাড় করে দেই সে পুরুষ সংসার জীবনে একটি জলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ হতে বাধ্য। কলেবর বড় হওয়ার ভয়ে এখানে উদাহরণ দেয়া গেল না, আমাদের দেশে যে সব স্বামী, স্ত্রীর বটির কোপ খেয়ে মৃত্যুবরণ করেছে আর যে স্ত্রী পাঁচ তলার ছাদ থেকে স্বামীর ধাক্কা খেয়ে নীচে পড়ে গিয়ে অকালে জীবন দিয়েছে, ঝরে পড়েছে তাদের সাজানো ফুলগুলো, তাদের সন্তানেরা রাস্তায় রাস্তায় অসহায়ের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে এর সবগুলোই বিবাহ পূর্ব প্রেমের রেশমাত্র। ঐ যে বলেছি শুরুতে গোলাপের পাঁপড়ির সাথে কাঁটা থাকে সে কাটার যন্ত্রণা কতো তা বিবাহ পূর্ব প্রেমে বোঝা যায় না। বিবাহের পরে পাঁপড়িগুলো শুকিয়ে যায়, রয়ে যায় কেবল কাঁটা। পক্ষান্তরে যাদের প্রেম-ভালবাসা শুরু হয়েছে বিবাহের পরে তাদের ভালবাসা থাকে অটুট। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় লাভ মেরিজ ও স্যাটেল্ড মেরিজের উপর এক জরিপ চালায়। জরিপে দেখা গেছে প্রেমের সূত্রে ধরে যে বিয়ে হয় তার ৮৮% পরবর্তীতে ভেঙ্গে গেছে। অর্থাৎ সফলতার হার মাত্র ১২%। পক্ষান্তরে স্যাটেল্ড মেরিজের প্রায় ৭৭% ক্ষেত্রে বিবাহ টিকে থাকে অর্থাৎ সফলতার হার ৭৭%। অতএব সময় থাকতে আমাদের সাবধান হতে হবে। মনে রাখতে হবে ক্যান্সার রোগ যায় যে সারা, সময় মতো পড়লে ধরা। অথবা রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়। আমাদেরকে বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে আমাদের সন্তানদের। এইডস রোগের যেমন কোন প্রতিকার নেই তাকে প্রতিরোধ করতে হয় তেমনি এ প্রেম নামের অবাধ মেলামেশা যেন আমাদের জাতিকে পৌষমাসের পরিবর্তে সর্বনাশ না ডেকে আনে। আমাদের কোমলমতি সন্তানরা যেন এ আগুনে পা দিতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আসুন আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


