সুয়েজ খাল চুক্তির মূল কারণ ছিল যোগাযোগ ব্যবস্খার উন্নয়ন এবং এ চুক্তিটি সম্ভব হয়েছিল তৎকালীন ফরাসী সম্রাজ্ঞীর ভাইয়ের সাথে মিসর শাসকের গভীর বন্ধুত্বের(!) ফলস্বরূপ। সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের সাথে অদূরদর্শী মিসর শাসক সাইদ পাশার বুত্বের পরিণাম হল- ১। ঋণের জালে মিসরের শংখলিত হওয়া। ২। দশ বছরের মধ্যে সুয়েজ খালের লভ্যাংশ ও স্বত্ব ত্যাগ। ৩। মিসরকে বিগত ১৩০ বছরব্যাপী যুদ্ধক্ষেত্র বানানো। ৪। ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ৫। লক্ষ কোটি আদম ও ফিলিস্তিনীর রক্তপাত ও নির্বাসন ৬। অনাগত কালের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়া। ৭। মিসরবাসীর ললাটে স্বৈরশাসক ও সামরিক শাসক।
পানামা খাল চুক্তির সাদামাটা কারণ ছিল যোগাযোগ ব্যবস্খার উন্নয়ন। এই চুক্তিটি সম্ভব হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্ট পানামার স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির বুত্বের ফসল। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সাথে তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির সরকারের বুত্বের পরিণাম হলো ১। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আশ্রিত রাজ্য হিসাবে পানামার অন্তর্ভুক্তি ২। পানামাবাসী যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৩টি যুদ্ধ ৩। অস্খিতিশীল কলম্বিয়া ৪। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পানামার প্রেসিডেন্টকে চোরাচালানি হিসাবে বন্দী করা। ৫। পানামাবাসীর ললাটে স্বৈরশাসক ও সামরিক শাসক। সাম্রাজ্যবাদী দৈত্য যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত বন্দীত্ব।
ইতিহাসের উক্ত শিক্ষার আলোকে ভারত-বাংলাদেশ টাস্কফোর্স করিডোর ও বন্দর চুক্তির পরিণাম আলোচনা করলে আমরা একই দৃশ্য দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা?
তত্ত্বগতভাবে একটি দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্খিতি যখন আয়ত্বের বাইরে চলে যায়, দেশের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন সন্ত্রাস দমনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয় তখনি নিজ দেশের আইন-শৃংখলা রক্ষায় অপর দেশের নিকট সেনা সাহায্য চাওয়া হয়। তত্ত্বগতভাবে বিদেশী ও স্বদেশী বাহিনীর এই জোটকে টাস্কফোর্স বলে। বাস্তবে এর কোন প্রয়োজন নাই, কেননা যখন কোন সরকার নিজ দেশের আইনশৃকôখলা রক্ষায় ব্যর্থ হয় তখন উক্ত সরকারের উচিত পদত্যাগ করে অপেক্ষাকৃত উত্তম সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা অথবা জনগণই এরূপ ব্যর্থ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সক্ষম সরকারকে ক্ষমতাসীন করে। কিন্তু কোন ক্ষমতাসীন সরকার যদি নিজেদের ব্যর্থতার দায় অপরের ঘাড়ে চাপাতে চায় সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায় যে কোন মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, জনগণ ও দেশের স্বার্থের চেয়ে দলীয় ও গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দেয় তখনি প্রয়োজন হয় নিজ দেশের জনগণকে পদানত করতে ভিনদেশী সেনা সাহায্যের। সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট সোমালিয়ার বর্তমান সরকার এভাবে চিরশত্রু ইথিওপিয়ার খ্রীস্টান বাহিনীকে নিজ দেশে আমন্ত্রণ করে নিজ দেশের জনগণকে নৃশংসভাবে হত্যা, নির্যাতন ও দমনের কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু এতেও শেষরক্ষা হয়নি। দেশপ্রেমিক শক্তির পাল্টা আক্রমণে টাস্কফোর্স নামে পরিচিত ইথিওপীয় বাহিনী সোমালিয়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। বিগত শতকের শেষ দশকে ভারত সৃষ্ট তামিল গেরিলা দমনে ব্যর্থ হয়ে শ্রীলংকা সরকার টাস্কফোর্সের নামে ভারতীয় বাহিনীকে নিজদেশে আমন্ত্রণ করেছিল কিন্তু ভারতীয় বাহিনীও শ্রীলঙ্কা থেকে প্রত্যাবর্তনে বাধ্য হয়।
অপর এক প্রকারের টাস্কফোর্স রযেছে বর্তমান ইরাক ও আফগানিস্তানে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইরাকের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য এবং এশিয়ার হৃদপিণ্ড আফগানিস্তানের কৌশলগত ভূখণ্ড আয়ত্বে রাখার জন্য প্রথমে উক্ত দেশ দুটির বৈধ সরকারকে উৎখাত করে দেশ দুটি দখল করে। পরবর্তীতে উক্ত দেশসমূহে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করে উক্ত সরকারের সাথে টাস্কফোর্সের নামে চুক্তি করে নিজেদের দখলদারিত্ব ধরে রাখার প্রচেষ্টায় রত রয়েছে।
বাংলাদেশে টাস্কফোর্স মোতায়েনের ফলে যা হতে পারে?
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতে রয়েছে ২৭০টি জঙ্গীগোষ্ঠী ও গেরিলা বাহিনী। বার্মার তিনটি প্রদেশ মূলত গেরিলা গোষ্ঠী শাসিত। এতদসত্ত্বেও ভারত নিজ দেশের জঙ্গী গোষ্ঠী দমনে কোন বিদেশী টাস্কফোর্সের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না, বার্মার তিনটি প্রদেশ গেরিলা শাসিত হওয়ার পরও বার্মা কোন বিদেশী সেনাকে নিজদেশে আমন্ত্রণ করেনি। এমতাবস্খায় শান্তিময় বাংলাদেশের জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক সরকার কেন, কি উদ্দেশ্যে বিদেশী বাহিনী দিয়ে নিজ দেশের জনগণকে দমন করতে চায়? তবে কি ডালমে কুচ কালা হায়! অর্থাৎ দেশ ও জনগণের ইচ্ছা ও স্বার্থবিরোধী ট্রানজিট ও চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা চুক্তির বিরোধিতাকারী দেশপ্রেমিকদের দমন করতেই কি এই আগাম ব্যবস্খা? জঙ্গীবাদ দমন যদি সরকারের উদ্দেশ্য হয় এবং আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর উপর আস্খা না থাকে তবে যে সব দেশ নিজ দেশের জঙ্গীগোষ্ঠী দমনে সফল হয়েছে সে সব দেশের সাথে টাস্কফোর্স চুক্তি করা যেতে পারে ভারতের সাথে নয়। কেননা ভারতের প্রতিটি প্রদেশে একাধিক জঙ্গী ও গেরিলা গোষ্ঠী রয়েছে যার একটিও ভারত নির্মূল করতে পারেনি। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কি জানা নেই যে, আমাদের সেনা-পুলিশ বাহিনী বিদেশে গিয়ে শান্তি স্খাপন করে প্রশংসিত হয় অথচ তাদেরকে ফেরত এনে আমরা কি আমাদের দেশের শান্তিশৃংখলা রক্ষা করতে পারি না? শান্তিরক্ষার জন্য আমাদের সেনাবাহিনীকে ফেরত না এনে কেন আমরা আমাদের পবিত্র ভূমিতে বিদেশী সেনাঘাঁটি স্খাপনে এত আগ্রহী?
টাস্কফোর্স চুক্তি করার জন্য সরকারের যেসব কর্তাব্যক্তি অতিমাত্রায় তৎপর হয়েছেন তাদের উচিত নিজ জাতিকে এ বিষয়ে সরাসরি অবহিত করা অন্যথায় আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হব যে, প্রস্তাবিত টাস্কফোর্স ১৯৭২ সালে ভারতীয় তত্ত্বাবধানে গঠিত রক্ষীবাহিনীর বিকল্পমাত্র। রক্ষীবাহিনী যেভাবে ১৯৭২-৭৫ সালে তৎকালীন ভারত ও বাংলাদেশ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত হাজার হাজার মুক্তিকামী জনগণকে হত্যা করে দেশকে মগের মুল্লুকে পরিণত করেছিল, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছিল বর্তমান টাস্কফোর্স ও ভিন্ননামে একই উদ্দেশ্যে গঠিত হবে।
করিডোর ও বন্দর চুক্তি :
সুয়েজ খাল চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল মিসর ফন্সান্স বুত্বের কারণে, পানামা খাল চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল পানামার স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বুত্বের কারণে, ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিট চুক্তি যদি স্বাক্ষরিত হয় তবে তা হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা স্বপক্ষের সরকার বনাম ভারতের বুত্বের কারণে। সুয়েজ ও পানামা চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল যোগাযোগ ব্যবস্খার উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক লাভ। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে লাভ হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির, সর্বনাশ হয়েছে দুর্বল মিসর ও পানামাবাসীর। ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিট ও বন্দর চুক্তির পরিণাম ও এর চেয়ে ভিন্ন হওয়ার হেতু নাই। কেননা এখানেও একপক্ষ হল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অপর পক্ষ হলো শান্তিপ্রিয় দুর্বল দেশ।
আমরা দেখেছি পানামা খালের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ঘাঁটি স্খাপন করেছে পানামায় আর সুয়েজ খালের নিরাপত্তা রক্ষায় ইউরোপ-আমেরিকা ঘাঁটি করেছিল মিসরে এবং পরবর্তীতে সুয়েজ খাল রক্ষায় অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র স্খাপন করেছে উক্ত শক্তি। উক্ত ইসরাইল দীর্ঘ ৬০ বছর যাবত সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করেছে। তেমনিভাবে করিডোরের নিরাপত্তার নামে ভারত যদি বঙ্গভূমি রাষ্ট্র ও সেনাঘাঁটি স্খাপন করে আর চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে আলাদা দ্বিতীয় ইসরাইল রাষ্ট্র স্খাপন করে তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। এর বাইরে পানামা ও মিসরের মতো এদেশও বারবার সাম্রাজ্যবাদের পদতলে পিস্ট হবে, এদেশেও পুতুল সরকার স্বৈরশাসক ও সামরিক শাসকের আবির্ভাব ঘটবে। এমতাবস্খায় নিজের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার বিষয় প্রাধান্য না দিয়ে কথিত ব্যবসায়ীক লাভকে প্রাধাণ্য দিলে অনাকাংখিত অনেক কিছুই ঘটতে পারে। যা এই দেশের শান্তিটুকু বিনষ্ট করবে।
প্রণব বাবুর সফর এবং আমাদের বোকার মত তাকিয়ে থাকা দেখে সদ্য কিশোর ও হাসে। কিন্তু আমরা কি এই হাসির অর্থ বুঝতে পারি?এদেশ টা কি বর্গা চাষীর জমি?
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?
কর্মসংস্থান? না।
বিনিয়োগ? না।
ডলার সংকট? না।
গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।
ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।