গরম যখন সবাইকে কাবু করছে তখন শ্রমজীবী মানুষগুলোকে এতটুকু পর্যশ্চ টলাতে পারেনি গ্রীষ্মের উষ্ণতা। গরম যখন সবাইকে কাবু করছে তখন শ্রমজীবী মানুষগুলো গরমকে উপেক্ষা করে তাদের কর্মে অবিচল টিকে থেকেছে। এই চিত্র গ্রীষ্মের হলেও শীতের চিত্রও তার বিপরীত নয়। কনকনে শীতের সকালে কম্বল-কাঁথা মুড়ি দিয়ে যখন সবাই বহ্ন ঘরে আরামের জন্য একটু উষ্ণতা খোঁজে তখন এদেশের মেহনতি কৃষক কনকনে শীতকে চাদর বানিয়ে ছুটে যায় লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে মাঠে ফসল বুনতে। নিজের সত্তার কথা চিশ্চা না করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রক্তকে পানিতে পরিণত করে যারা জীবনের বাঁকে শ্রমের তরীর মাঝি হিসেবে তরীকে তার গশ্চব্যে নিয়ে যেতে অক্লাশ্চ পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আজ সেই সকল মেহনতি মানুষের প্রতীক মহান মে দিবস আমাদের সামনে উপন্সিত। মহান মে দিবস সারা বিশ্বে পালিত হবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে। বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারি বেসরকারি ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন শ্রমিক সমাবেশের মাধ্যমে এই দিবসটি উদযাপন করবে। কিশ্চু আমরা যদি ইতিহাসের বাঁকে ফিরে দেখি যে অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই মহান মে দিবস সেই সকল মেহনতি শ্রমিকের অধিকার আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নানা বঞ্চনা আর বৈষম্যের শিকার শ্রমিকরা তখনো জানতো না তারা কিভাবে নির্যাতন আর বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবে। তাদের ক্ষোভ শুধু ধূমায়িত হতে থাকে, একের পর এক লাঞ্ছনা বঞ্চনা নির্যাতনে যখন শ্রমিক সমাজের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তখন অধিকার আদায়ে ১৮৬০ সালে প্রথম রাস্তায় নামে শ্রমিক সমাজ। কিশ্চু সংগঠিত না থাকায় শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারেনি। ১৮৮১ সালে শ্রমিকরা তাদের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরে এবং সে বছরই ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে আমেরিকা ও কানাডায় গঠিত হয় দুটি শ্রমিক সংগঠন। এই দুটি সংগঠন বিভিন্নভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে ধরে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৪ সালে দু'দেশের শ্রমিক সংগঠন একটি প্রস্তাবনা পাস করে, এতে বলা হয় ১৮৮৬ সালের ১মে থেকে শ্রমিকদের কর্মদিবস হবে ৮ ঘণ্টা। ৮ ঘণ্টার বেশি কোন শ্রমিক কাজ করবে না। দুটি দেশের শ্রমিক সংগঠনের এই ঘোষণায় উদ্বেলিত হয় শ্রমিক সমাজ। তারা তাদের অবস্থানে থেকে এ ব্যাপারে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করে। শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ না করতে উৎসাহ যোগায়। কিশ্চু মালিক ও সরকার পক্ষ শ্রমিকদের এই প্রস্তাবনায় সাড়া না দিয়ে নির্যাতন ও নিপীড়নের পথ বেছে নেয়। এমতাবন্সায় ১৮৮৬ সালের ১ মে মৌলিক প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কতক ন্যায্য দাবি আদায়ে শিকাগো শহরের ?হে' মার্কেটের সামনে বিশাল সমাবেশের ডাক দেয়। শিকাগো শহরের ৭টি সংগঠনসহ ২২টি শ্রমিক সংগঠন এদিন মিছিলে মিছিলে ?হে' মার্কেটের সামনে সমবেত হতে থাকে। শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবির সাথে সরকার ও মালিক পক্ষ ঐকমত্য না হওয়ায় সমাবেশ বানচাল করতে পুলিশ গুলী চালালে এতে অনেক শ্রমিক নিহত হয়। কিশ্চু শ্রমিকরা মরিয়া হয়ে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু ঢেলে দিতে প্রস্তুত তবুও তাদের ন্যায্য দাবি থেকে একচুল পরিমাণও পিছপা হতে রাজি নয়। শ্রমিকদের আত্মত্যাগ আর মরিয়া ভাবের নিকট পরাজিত হয় সরকার। মেনে নেয়া হয় সকল দাবি-দাওয়া। পরবর্তীতে মার্কিন সরকার ১ মে কে ?ল ডে' হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকেই মে দিবস সকলের নিকট শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে ন্সান করে নিয়েছে। শুধু আমেরিকা আর কানাডা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই সরকারিভাবে পালিত হচ্ছে মে দিবস। বাংলাদেশেও সরকারিভাবে পালিত হয় মে দিবস। বাংলাদেশ লেবার ফোর্স এর সার্ভে অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমিক সংখ্যা ৫ কোটির কাছাকাছি, এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশ মহিলা শ্রমিক। বাংলাদেশের এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নে প্রতিশ্রক্ততি দিয়ে প্রতিবছরই আমাদের দেশে মে দিবস পালিত হলেও এদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে যারা সবচেয়ে বড় অংশীদার তাদের অধিকারের কথাগুলো সরকার থেকে শুরু করে আমরা সবাই ভুলে যাই। ফলে মে দিবস আসে মে দিবস চলে যায় কিশ্চু শ্রমিকদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয় না, জীবন যাত্রার চাকা ঘোরে না এদেশের শ্রমিক সমাজের। আমাদের দেশের শ্রমিকরা বিভিন্ন সেক্টরে তাদের শ্রম দিয়ে দেশকে সমৃহ্নির পথে এগিয়ে নিচ্ছেন। শুধু দেশেই নয় দেশের বাইরেও বিশাল সংখ্যক শ্রমিক জনগোষ্ঠী অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠিয়ে দেশকে সমৃহ্ন করছেন। কিশ্চু দুঃখজনক হলেও সত্য প্রবাসী এ শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। শুধু অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া বললে ভুল হবে তাদের চিত্র আরো ভয়াবহ। মাঠের ফসলি জমি, গোয়ালের গরু, পুকুরের মাছ, এমনকি নিজের ভিটে-মাটি বিক্রি করে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গ্রামের সহজ সরল যে শ্রমিকটি জীবন-জীবিকার সন্ধানে, ভাগ্য উন্নয়নে প্রবাসে পাড়ি জমায় তখন দালালদের খলরে পড়ে মানবেতর জীবন যাপন করে কিংবা বিদেশী দূতাবাসে আশ্রয় গ্রহণ করে জীবন বাঁচানোর প্রার্থনা করে তখন আমাদের দূতাবাসের কর্তা ব্যক্তিরা শ্রমিকদের এই দুর্দশায় যেই পথে শ্রমিকটি দূতাবাসে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করেছে আবার সেই পথেই চলে যেতে বলে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। কারণ এরা তাদের জন্য বোঝা। তারা শুধু অর্থ উপার্জনকারীদের আয়েই দেশীয় রেমিটেন্স বাড়াতে চায় মানবেতর জীবনযাপনকারী এবং বিপদগ্রস্তদের দায় তাদের উপর বর্তায় না। অসহায় অবন্সায় দেশে ফিরে এসে যখন সু-শৃঙ্কলভাবে মানববন্ধন করে প্রতারক চক্রের বিচার দাবি এবং ক্ষতিপূরণ চায় তখন সরকারের ভূমিকা রাখার কোন ইচ্ছে থাকে না, মহান মে দিবসের তাৎপর্যও আর হ্মরণ থাকে না সরকারের। দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে বাংলাদেশী শ্রমিকদের বিদেশী বাজার, অথচ সরকার শুধু মমী এমপিদের সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠিয়ে সেই দেশের কর্তা ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করেই তাদের দায়িত্ব শেষ মনে করে।
দুর্দশাগ্রস্ত প্রবাসী শ্রমিক সমাজের এই প্রতিচ্ছবির চেয়ে ভালো নেই দেশীয় শ্রমিক সমাজ। দেশে শিশুশ্রমের ব্যাপক ব্যবহার চলছে। ঘরের ঝিয়ের কাজ থেকে শুরু করে রি-রোলিং ও ইস্পাত কারখানার মতো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে শিশু-শ্রমিকদের দিয়ে। কোমলমতি যেই শিশুদের হাতে থাকার কথা ছিল খাতা, কলম আর বই আজ তাদের হাতে মেশিন তৈরির ভারী যম, লোহার আগুনে দগ্ধ কচি হাতগুলো। অন্যান্য শিশুর মতো যে শিশুটির অধিকার ছিল মা-বাবার আদর প্টেহে পালিত হওয়া, জীবিকার সন্ধানে সে শিশুটি আজ ফজরের আযানের শব্দে ঘুম থেকে উঠে কাজে লেগে যায়। অক্লাশ্চ পরিশ্রমের পরও সামান্য অসচেতনতায় নেমে আসে গালি-গালাজ, নির্যাতন। যে শিশুটি দুরশ্চ হওয়ার কথা ছিল, যার অধিকার ছিল অন্যান্য শিশুর মতো হেসে খেলে বড় হওয়া সেই শিশুটি যখন পরের ঘরে কাজ করতে গিয়ে অসাবধনতাবশত একটি পাত্র ভেঙ্গে ফেলে, তখন গৃহকর্ত্রী কর্তৃক অবুঝ শিশুটির উপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। লোহার শিক গরম করে শরীরে সেক দেয়ার ঘটনা এই সমাজের শিশু শ্রমিকদের জন্য বিরল নয়। যে গৃহকর্ত্রীরা অপরের শিশু সশ্চানের সাথে এমন নির্মম আচরণ করেন তাদের সশ্চান কিংবা ছোট ভাই-বোন যদি এমন অসাবধানতাবশত কোন পাত্র ভেঙ্গে ফেলতো তাহলে নিশ্চয় তাদের সাথে আচরণ এমন জঘন্য হতো না। বাংলাদেশের ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার রফতানি আয়ের মধ্যে ৭০০ কোটি ডলার আয় হয় তৈরি পোশাক শিল্পে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পের শ্রমিকদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। তাদের বোনাসতো দেয়াই হয় না বরং কাজের নির্দিষ্ট বেতনও ঠিকমতো পরিশোধ করে না মালিক পক্ষ। ফলে তাদের বেছে নিতে হয় আন্দোলন। আর শ্রমিকদের এই অসশ্চোষের সুযোগ নেয় বিভিন্ন হ্নার্থান্বেষী মহল। যারা পাশ্ববর্তী দেশের বিদেশী বাজার চাঙ্গা রাখতে চায় তারা শ্রমিক অসশ্চোষের এই সুযোগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ফলে একদিকে তৈরি পোষাক শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ে অন্যদিকে শ্রমিক বঞ্চিত হয় বেতন ভাতা থেকে তারা পরিণত হয় স্বার্থান্বেষী মহলের ক্রীড়নকে।
আমাদের এই দেশে শতকরা ৮০ ভাগ কৃষকের বাস হলেও কৃষকের অধিকার আজও আমাদের সমাজে অধরাই থেকে গেছে। আজও সারের জন্য, সেচপাম্পের মাধ্যমে জমিতে পানি দেয়ার জন্য বিদ্যুতের দাবিতে কৃষককে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করতে হয়। যে কৃষক শুধু নিজের জন্য চাষাবাদ করে না, ঝড়, বৃষ্টি, সাইক্লোন, বন্যা, খরা মোকাবিলা করে দেশের জন্য সম্পদ তৈরিতে জমিতে ফসল বুনে সেই কৃষক যখন দুঃখ দুর্দশায় পতিত হয় তখন মহান মে দিবসের কথা আমাদের মনে থাকে না, দাঁড়াতে পারি না আমরা সেই কৃষকের পাশে। আমরা সেই কৃষকের পরিশ্রমের মূল্য দিতে জানি না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ জীবন যাত্রার ব্যয় যখন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তখন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না এদেশের শ্রমিক সমাজের আয়, ফলে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। কেউ একবেলা খেতে পারছে তো অন্য বেলা উপোস থাকছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাবার অবস্থা। বেতন ভাতা বৃদ্ধি না হলে এবং শ্রমিকদের এভাবে মানবেতর জীবন-যাপন চলতে থাকলে মানসিক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল হতে থাকবে শ্রমিক জনগোষ্ঠী, ফলে ব্যাহত হবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন।
কৃষক-শ্রমিক-চাষী-মজুর থেকে শুরু করে হাজারো শ্রমিকের মাঝে আমাদের বসবাস। এই সকল শ্রমিক থেকে আমরা সেবা গ্রহণ করলেও আমরা তাদের পরিশ্রমের মূল্য দিতে জানি না। জানি না তাদের মর্যাদার মূল্যায়ন করতে। আমাদের সমাজের বাথরুমের ক্লিনার (মেথর) থেকে শুরু করে বাসের হেলপার কিংবা নৌকার মাঝি সকলেরই অবস্থা একই। দেড়শত বছর আগে থেকে মহান মে দিবস পালিত হয়ে আসলেও শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত বরং নির্যাতন আর নি--ষনেণর যাঁতাকলে পিষ্ট তারা। শ্রমিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এই প্রতীকও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারেনি। শ্রমিক সমাজ কি নির্যাতন থেকে কখনই মুক্তি পাবে না? তাদের মুক্তির অধিকার কি হিমাগারে থেকে যাবে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


