আমাদের সংবিধানকে এখন আর সরকারের ভাল লাগছেনা। তাই মানুষের সমস্যা সমাধানের পথে না গিয়ে আরো সমস্যা তৈরীতে সরকারের জুড়ি মেলাভার। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে সরকার এক ঢিলে বহু পাখি মারতে চায়। প্রথমটি হল, কলমের এক খোঁচায় এক দলীয় বাকশাল ব্যবস্খায় প্রত্যাবর্তন। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলে তাৎক্ষণিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে চতুর্থ সংশোধনী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে কিছুটা নাড়াচাড়া করলে দেখা যাবে যে, পঞ্চম সংশোধনীর আগে বহাল ছিল চতুর্থ সংশোধনী। সংবিধানের এই সংশোধনী মোতাবেক দেশে বহুদলীয় পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র বিলোপ করে একদলীয় প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসন তথা বাকশাল কায়েম করার বন্দোবস্ত চূড়ান্ত করা হয়েছিল। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে কুখ্যাত বাকশালী মহা স্বৈরাচার বাতিল করা হয় এবং বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা করা হয়। দ্বিতীয়ত, পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে এখন সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ মুছে ফেলে দেয়া যাবে। এছাড়াও ‘আল্লাহর প্রতি ঈমান’ মুছে ফেলে ভারতীয় কায়দায় ধর্মনিরপেক্ষতা চালু করা যাবে। পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমেই ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে’ মুছে ফেলে ‘বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ’ অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। এই সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতি অর্থাৎ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে। এই চারটি মূলনীতির মধ্যে তিনটি মূলনীতি ধার করা হয়েছে ভারত থেকে। ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি ‘সমাজতান্ত্রিক ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে’ পরিণত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। অবশ্য পশ্চিমা দুনিয়াকে খুশি করার জন্য প্রয়োজন হলে সমাজতন্ত্রের অংশটি জাতীয় সংসদের ব্রুট মেজরিটির মাধ্যমে পরিবর্তন করার পথ খোলা থাকবে। পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে বাংলাদেশ অতি সহজেই ১৯৭২-এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তন করবে, যেখানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে খারিজ করা হবে; যেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে কিন্তু ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিক্যবাদী কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পাবে। এভাবে জাতীয় সংসদে আলাদাভাবে কোনো বিল উথাপন না করে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে ইসলামী ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী অঙ্গীকার ও চিন্তা-চেতনাকে বিলোপ করতে চায় এবং ভারতের আদলে ধর্মহীন সমাজ ও রাজনীতির পুনর্জন্ম দিতে চায়। তবে আশার কথা, অন্তত একমাসের জন্য হলেও সংবিধানকে ধর্মহীন করার এই আওয়ামী চক্রান্ত স্খগিত হয়ে গেছে। এই মুহূর্ত থেকেই যদি জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী শক্তিসমূহ সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ না হয় তাহলে নিকট ভবিষ্যতে ভারতের আদলে ধর্মনিরপেক্ষতার জোয়াল বাংলাদেশের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হবে। সে জন্য সময় থাকতেই জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহকে প্রতিরোধ বেষ্টনি গড়ে তুলতে হবে।
রাজনীতিতে জড়াবে কেন বিচার বিভাগ?
একটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার মামলায় রায় হতে পারে সম্পত্তি ফেরত দেয়া অথবা না দেয়া। মুন সিনেমা হলের মালিক মাকসুদ আলম তার সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার দাবিতে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। আইন-কানুনের সূক্ষ্ম পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট সেই সম্পত্তি ফেরত দেয়ার পক্ষে অথবা বিপক্ষে রায় দিতে পারতেন। কিন্তু ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার মত হাইকোর্ট এই মামলায় অনাবশ্যকভাবে এ দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমানকে টেনে এনেছেন। একই পথ ধরে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দুইজন বিজ্ঞ বিচারক ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর সংগঠিত রাতের পরিবর্তনকে বেআইনি এবং সংবিধান বিরোধী বলেছেন। সম্মানিত পাঠক ভাইদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে হাইকোর্টের ঐ বিতর্কিত রায়ের উৎসমূলে।
এই মামলার উৎস
১৯৭২ সালে পুরাতন ঢাকার ওয়াইজ ঘাটে অবস্খিত ‘মুন সিনেমা’ হল সরকার পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে এবং সেই সম্পত্তি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে প্রদান করে। তখন ঐ সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার জন্য জমির মালিক জনাব মাকসুদ আলম হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। এই সম্পত্তি মালিককে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য ১৯৭৭ সালে হাইকোর্ট সরকারকে নির্দেশ দেয়। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে বলা হয় যে, ১৯৭৭ সালের ৭ নং সামরিক আইন বিধির (মার্শাল ’ল রেগুলেশন) বলে হাইকোর্টের ঐ নির্দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। ১৯৯৪ সালে জনাব মাকসুদ আলম হাইকোর্টে পুনরায় রিট পিটিশন করেন। কিন্তু সেই রিট আবেদন পুনরায় প্রত্যাখ্যাত হয়। বেশ কিছুদিন পর ২০০০ সালে জনাব মাকসুদ আলম মার্শাল ’ল বিধি নং ৭-এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা করেন। অবশেষে ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং বিচারপতি ফজলে কবির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চটি শুধুমাত্র ৭ নং সামরিক বিধিই নয়, সামরিক আইন জারিকে অবৈধ ঘোষণা করে এক ঐতিহাসিক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী রায় দেয়।
হাইকোর্টের রায় : ধান
ভানতে শিবের গীত
একটু আগেই বলেছি যে মামলাটি ছিল একটি সম্পত্তি ফেরত দেয়ার দাবিতে। হাইকোর্ট পরিষ্কার বলতে পারত যে সম্পত্তিটি মাকসুদ আলম ফেরত পাবেন কিনা। এতটুকুর মধ্যেই তার রায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু তিনি সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে সর্বাত্মক রাজনৈতিক বিষয়াবলীতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন এবং একটি রাজনৈতিক রায় রচনা করেন। সেই রায়টির উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে :
১. ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খন্দকার মোস্তাক কর্তৃক ক্ষমতা গ্রহণ, দেশের সামরিক আইন জারি এবং ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট জারিকৃত ফরমান বলে মোস্তাক কর্তৃক প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ ছিল অবৈধ এবং সংবিধানের লঙ্ঘন। তাই পরবর্তীতে ঐ প্রেসিডেন্টের সমস্ত কার্যকলাপ ছিল অবৈধ।
২. রায়ে আরো বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম কর্তৃক প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ভার গ্রহণ ছিল সংবিধান বহির্ভূত কাজ। সুতরাং সেটি ছিল অবৈধ ও বেআইনি। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে তার নিয়োগ এবং ১৯৭৫ সালের ৮ ডিসেম্বর একজন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (ডিসিএমএলএ) নিয়োগ ছিল সংবিধানের লঙ্ঘন, অবৈধ এবং এখতিয়ার বহির্ভূত। ফলে তার পরবর্তী সমস্ত কার্যক্রমও ছিল অবৈধ।
৩. ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় ফরমান বলে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নিকট প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজটিও ছিল বেআইনী। ফলে পরবর্তীকালে সম্পাদিত তাদের যাবতীয় কার্যক্রমও ছিল অবৈধ।
৪. বিচারপতি সায়েম কর্তৃক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ এবং তার নিকট প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল অবৈধ এবং এখতিয়ার বহির্ভূত।
৫. ১৯৭৭ সালে ২১ এপ্রিল মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কর্তৃক ক্ষমতা গ্রহণ যেহেতু ছিল সংবিধান বহির্ভূত এবং অবৈধ, তাই পরবর্তীকালে এ ধরনের প্রেসিডেন্টের সমস্ত কাজ ছিল এখতিয়ার বহির্ভূত এবং অবৈধ।
৬. সংবিধানে গণভোটের কোনো ব্যবস্খা নেই তাই প্রেসিডেন্ট হিসেবে জনগণের আস্খা অর্জনের জন্য মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান যে গণভোট অনুষ্ঠান করেন সেটিও ছিল অবৈধ এবং বাতিলযোগ্য।
৭. সংবিধান লঙ্ঘন আইনের চোখে একটি গুরুতর অপরাধ এবং চিরদিন অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে থাকবে।
৮. ১৯৭৭ সালের মার্শাল ’ল রেগুলেশনস্ অবৈধ এবং আইনের লঙ্ঘন।
রাজনৈতিক বিষয়ে
আদালতকে জড়াবেন না
রাজনৈতিক বিষয়ে আদালতকে জড়ালে জাতির যে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতি হয়, এখন সেটাই হওয়া শুরু হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটিকে সব সময় সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত। সুপ্রিম কোর্টকে সমালোচনার টার্গেট করার কথা কল্পনাই করা যায় না। অথচ আওয়ামী লীগ এখন সেটাই করছে। খন্দকার দেলোয়ার এবং আরো তিন আইনজীবীকে হাইকোর্ট রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল করার জন্য ৩০ দিনের সময় দিয়েছে। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের বিরুদ্ধে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে আওয়ামী পন্থী সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন। তারা এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের কঠোর সমালোচনা করেছে। এটি জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই অবাঞ্ছিত পরিস্খিতি সৃষ্টির জন্য আওয়ামী সরকার এবং হাইকোর্টের ঐ দুই বিতর্কিত বিচারপতি সমভাবে দায়ী। হাইকোর্টের ঐ দুই বিচারপতি যদি তাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক রায় না দিতেন তাহলে সমস্যাটির জন্মই হতো না। কিন্তু তারা অত্যুৎসাহী হয়ে একটি রাজনৈতিক থিসিস রচনা করেন। এভাবে তারা বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করেন।
বিচার বিভাগকে দ্বিতীয় পর্যায়ে তোপের মুখে ঠেলে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। হাইকোর্টের ঐ বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল তদানীন্তন জোট সরকার। এবার ঐ আপিল মামলা প্রত্যাহার করার ফলে স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে আতঙ্ক। কারণ পঞ্চম সংশোধনী যদি শেষমেষ বাতিল হয়েই যায় তাহলে বিনষ্ট হবে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং সৃষ্টি হবে ভয়াবহ সাংবিধানিক শূন্যতা। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের ভাষায়, দেশ নিক্ষিপ্ত হতে চলেছে এক ভয়ঙ্কর নৈরাজ্যের কবলে। আওয়ামী লীগ যদি পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করতেই চায় তাহলে বিচার বিভাগের ঘাড়ে বন্দুক না রেখে জাতীয় সংসদেই সেটা করতে পারে। কারণ জাতীয় সংসদে তাদের রয়েছে চার পঞ্চমাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। যদি পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করার জন্য আওয়ামী লীগ সংসদে একটি বিল উথাপন করে তাহলে বিরোধী দল সেখানে তাদের বক্তব্য উথাপন করতে পারবে। বিরোধী দল জানতে চাইবে যে সে ক্ষেত্রে চতুর্থ সংশোধনীর কি হবে? বাকশাল ফিরে আসবে কি না? সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’, ‘আল্লাহর প্রতি ঈমান’ প্রভৃতি মূলনীতির কি হবে? দেশ ধর্ম নিরপেক্ষতায় ফিরে যাবে কিনা? আগের মতোই সমাজতন্ত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা? দেশ ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাবে কিনা? এ সকল প্রশ্নর উত্তর জাতিকে জানতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



