এইডস একটি ঘাতক ব্যাধি। এ রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু অবধারিত। প্রত্যেকটি জীবিত প্রাণী ও উদ্ভিদকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। কিন্তু সুসভ্য মানুষের কিছু অনৈতিক কার্যকলাপ ও অসেচতনার কারণে এইডস ঘাতক ব্যাধি হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার কতিপয় উন্নয়নশীল দেশ এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারত, মিয়ানমার, চীন, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে মহামারী হিসেবে বিস্তার লাভ করেছে। এমনকি বাংলাদেশও এ মরণব্যাধির ভয়াবহতা থেকে নিরাপদ নয়। তবে আশার কথা এই যে, এ রোগ প্লেগ বা কলেরার মতো পানি কিংবা বাতাসের মাধ্যমে মহামারী আকারে ছড়ায় না। বরং মানুষের পদস্খলন, অজ্ঞতা ও অসেচতনতার কারণে ইহা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, নৈতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিধি-নিষেধ অনুসরণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে এ ঘাতক ব্যাধির হাত থেকে নিমেষে, পরিবার, সমাজ ও দেশকে রক্ষা করা সম্ভব।
এইডস কি? এইডস (AIDS) বর্তমান বিশ্বে একটি অত্যন্ত ভয়াবহ রোগের নাম, যার কোন চিকিৎসা বা নিরাময় পদ্ধতি নেই। ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় দু' কোটি পঞ্চান্ন লাখ নারী-পুরুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন বয়সের প্রায় ৪কোটি ৩ লাখ নর-নারী এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এইডস (AIDS) = অ্যাকুয়ার্ড ইমিউন ডিফিসিয়েন্সি সিন্ড্রোম (Aquired Immune Deficiency Syndrome) অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধে অক্ষমতা সৃষ্টির কারণে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়া। আর এইডস রোগের মূল কারণ হিসেবে কাজ করে এইচআইভি (HIV)। এইচআইভি (HIV)-হিউম্যান ইমিউন ডিফিসিয়েন্সি ভাইরাস (Human Immune Deficiency Virous), অর্থাৎ মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধে ক্ষুদ্র জীবাণু। কাজেই বলা যায় মানুষের শরীরে এইচআইভি (HIV) জীবাণু পরিলক্ষিত হলে তা এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এই ক্ষুদ্র জীবাণুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের শরীরে প্রবেশের পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে ফলে নরনারীর শরীরে বিভিন্ন রোগ বিশেষ করে যৌন রোগ মরণব্যাধি হিসেবে স্থায়ী ভাবে বাসা বাঁধে।
এইডস-এর কারণসমূহ ঃ এইডস কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। তবে একজন এইডস (AIDS) আক্রান্ত রোগীর কিছু ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ স্পর্শ ও শারীরিক সম্পর্কের কারণে এইডস (AIDS) হতে পারে। আমরা সচেতনতার মাধ্যমে এসব ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বা কর্মকান্ড হতে নিজেদেরকে নিরাপদে রেখে এ ঘাতকব্যাধি এইডসকে (AIDS) �না' বলতে পারি। (ক) একজন এইচআইভি (HIV) জীবাণুবাহী নরনারীর সাথে যে কোন ধরনের যৌনমিলন করলে (যৌনাঙ্গের মাধ্যমে, পায়ূপথে ও মুখে) এইচআইভি জীবাণু ঐ ব্যক্তির শরীর থেকে তার যৌনসঙ্গীর শরীরে ছড়িয়ে যায়। (খ) যার শরীরে এইচআইভি জীবাণু আছে তার রক্ত বা শরীরের যে কোন অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ অন্যের শরীরে সংযোজন করলে এইডস হয়। (গ) এইচআইভি (HIV) জীবাণুবাহী রোগীর ব্যবহৃত সুঁচ, সিরিঞ্জ জীবাণুমুক্ত না করে অন্য মানুষের শরীরে ব্যবহার করলে এইডস (AIDS) ছড়িয়ে পড়তে পারে। (ঘ) যে সব গর্ভবতী মায়ের শরীরে এইচআইভি জীবাণু রয়েছে সে সব মায়ের রক্তের সঙ্গে ও দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুর মধ্যে এ রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। (ঙ) ইনজেকশনের মাধ্যমে যারা নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করে এবং এইচআইভি জীবাণুবাহী একজন রোগীর শরীরে ব্যবহৃত ইনজেকশনের সুঁচ অন্যের শরীরে ব্যবহার করা হয় তখন এইডস রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। (চ) স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধব বৈধ, অবৈধ্য যেকোন প্রকারে যৌনমিলনে একজনের এইচআইভি থাকলে অন্যজনের এইডস হয়ে থাকে। (ছ) এইচআইভি বহনকারী যৌনকর্মীদের সাথে যৌনমিলনের মাধ্যমে এইডস হতে পারে।
এইডস থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় ঃ (ক) নর-নারীর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একজন বিশ্বস্ত ও শরীয়তসম্মত মানুষের সাথে যৌন সম্পর্ক রাখা। (খ) যদি কারোর একাধিক যৌনসঙ্গী থাকে এবং তাদের মধ্যে কারো এইচআইভি ভাইরাস থাকার সম্ভাবনা থাকে তবে প্রতিবার যৌনমিলনের সময় কনডম ব্যবহার করতে হবে। (গ) একবার মাত্র ব্যবহারযোগ্য সুঁচ বা সিরিঞ্জ দ্বারা ইনজেকশন নিতে হবে। (ঘ) রক্ত নেয়ার আগে রক্ত এইচআইভি ভাইরাস মুক্ত কি না তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। (ঙ) সেলুনে চুল দাড়ি সেভ করার সময় নতুন নতুন ব্লেড ব্যবহার করতে হবে। (চ) এমনকি ট্রুথ ব্রাশ, রেজার, ক্ষুর প্রভৃতি ব্যবহারেও সতর্ক থাকতে হবে।
কিভাবে এইডস ছড়ায় না ঃ (ক) একই ঘরে বসবাস করলে, (খ) একই সাথে খাওয়া-দাওয়া ও খেলাধুলা করলে, (গ) একই বিছানায় ঘুমালে, (ঘ) একই বাসনে খাবার খেলে, (ঙ) একই স্কুলে পড়াশোনা করলে, (চ) মশা বা পোকামাকড়ে কামড়ালে, (ছ) হাত মিলালে বা কোলাকুলি করলে, (জ) হাঁচি, কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে (ঝ) একই টয়লেটে বাথ কর্ম সম্পাদন করলে, (ঞ) একই সাথে পুকুরে সাঁতার কাটলে প্রভৃতি।
এইডস এর বিশ্ব পরিস্থিতি ঃ বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার ৫শত জন এইচআইভি (HIV) ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। এই আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৮ হাজার ৫শ জন প্রতিদিন মৃত্যুর কবলে পতিত হয়। ডাক্তার আব্দুল মনসুরের তথ্যানুযায়ী ১৯৮১ সালে আমেরিকার একটি হসপিটালে প্রথম এইডস রোগি সনাক্ত করা হয় যার অসুস্থতার কারণ হিসেবে ১৯৮৩ সালে এইচআইভি নামে একটি ক্ষুদ্র জীবাণুকে দায়ী করা হয়। ২০০৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ লোক এই রোগে মারা গেছে। এবং বর্তমানে এ রোগে আক্রান্ত রোগির সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৩ লাখ। ২০০৫ সালে নতুন ভাবে প্রায় ৪৯ লাখ নরনারী এইডস রোগে আক্রান্ত হয় যার মধ্যে ৩১ লাখ ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় ৩০% নরনারী এইডস রোগে আক্রান্ত। বতসোয়ানায় ২০% এর অধিক গর্ভবতী মা এ রোগে আক্রান্ত। ২০০৫ সালে এ অঞ্চলে প্রায় ৩০ লাখ লোক মারা গেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৫৭ লাখ রোগী বর্তমানে এইডস এ আক্রান্ত হয়ে পড়েছে এবং ২০০৫ সালে মিয়ানমারে মারা গেছে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞদের ধারণা উন্নত দেশগুলোও উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশসমূহকে পিছিয়ে রাখার জন্য এইডস ও ক্ষুদ্র ঋণের গ্যাঁড়াকলকে আধুনিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশ ও এইডস ঃ ১ ডিসেম্বর ২০০৪ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ৪৬৫ জন এইডস রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের ৪৪ জন ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে। UNAIDS-এর মতে, এ সংখ্যা ১৫শ' থেকে ২ হাজার ৫শ' হবে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার অধীনে প্রায় ৭ হাজার ৫শ' জন সুস্থ মানুষের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়, এর মধ্যে ১৩৪ জনের রক্তে এইচআইভি (HIV) পাওয়া গেছে। যাদের ৭৪ জন ইতোমধ্যেই মারা গেছে।
সিলেটাঞ্চলে এইডস ঃ হযরত শাহজালাল (রঃ) পূণ্যভূমি সিলেটে ধর্মীয় অনুশাসন বহির্ভূত পদস্খলণের মাধ্যমে এইডস (AIDS) রোগে আক্রান্ত হওয়া অকল্পনীয়। তবে বহির্দেশে বসবাসকারী মানুষের দ্বারা এ অঞ্চলে এইডস (AIDS) আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পর্যন্ত সিলেটাঞ্চলে প্রায় ১২৫ জন এইডস (AIDS) আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১০/১২ জন ইতোমধ্যে মারা গেছে। এ অঞ্চলে এইডস আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ১৪ জন নারী ও ৭ জন শিশু। সিলেটের এইডস (AIDS) আক্রান্ত মহিলাদের অধিকাংশরাই স্বামীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই লোকগুলো সাধারণতঃ মধ্যপ্রাচ্যের জেদ্দাতে কর্মরত ছিল এবং স্থানীয় বিয়ানীবাজারের অধিবাসী। এছাড়া ৪ জন ট্রাক ড্রাইভার স্বামী কর্তৃক স্ত্রীরা এইডস (AIDS) রোগে আক্রান্ত হয়। একজন ভারতের করিমগঞ্জ হতে ফিরে আসা মানুষের শরীরে এইচআইভি (HIV) জীবাণু পাওয়া যায়। এছাড়া স্থানীয় হোটেলে যৌন কর্মীরা এইডস (AIDS) ছড়ানোর কাজে সহায়তা করে থাকে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলেও এ কথা সত্য, সিলেটের একজন সম্ভ্রান্ত, ভদ্র মহিলা অসুস্থ অবস্থায় বিনা পরীক্ষাকৃত রক্ত গ্রহণ করার কারণে এইডস (AIDS) রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর সন্তান বর্তমানে এইচআইভি (HIV) জীবাণু বহন করছে।
এইডস (AIDS) থেকে নিরাপদে থাকার উপায় ঃ ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ��Prevention is better than cure.�� ঘাতক ব্যাধি এইডস (AIDS)-এর হাত হতে মুক্তি নেই। তাই আমরা নিম্নোক্ত সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে নিজেদেরকে নিরাপদে রাখতে সক্ষম হতে পারি। ১। এইডস সম্পর্কে নারী-পুরুষ উভয়কে ব্যাপক হারে সচেতন করতে হবে। ২। ধর্মীয় অনুশাসনকে কঠোর ভাবে পালন করতে হবে। ৩। মানুষের নীতি-নৈতিকতার মূল্যবোধ বৃদ্ধি করতে হবে। ৪। পারিবারিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি করতে হবে। ৫। নিজের সন্তান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ জীবনের কথা চিন্তা করতে হবে। ৬। মালয়েশিয়ার মত সরকারি আইনের মাধ্যমে বিয়ের পূর্বে ছেলে মেয়ে উভয়ের এইচআইভি পরীক্ষা করাতে হবে। ৭। এইচআইভি দূরীকরণে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ৮। স্থানীয় হোটেলে যৌনকর্মীর মেলা মেশা বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনবোধে কনডম ব্যবহার করা যেতে পারে। ৯। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষদের তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে এইচআইভি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। ১০। সিলেট মহানগরীতে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি মাদকদ্রব্য নিরাময় কেন্দ্র আছে যেখানে প্রতিটিতে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী আছে। তাদের রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত পৃথক সুঁচ ও সিরিঞ্জ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।
আল্লাহ্ সীমালংঘনকারীকে পছন্দ করেন না। কাজেই আমরা প্রত্যেকে নিজে নিজের বিবেক মতো ভাল কাজ করবো, ভাল থাকবো, পরিবার, সমাজ ও দেশকে ভাল রাখবো এই হোক আমাদের স্বাধীন সোনার দেশের প্রতি প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



