শুধু দেশের বিশিষ্টজনরাই যে পত্র-পত্রিকায় বিবৃতি ও বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে টিপাইমুখ বাঁধের বিরোধিতা করেছেন তা নয়, সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম শরীক রাশেদ খান মেনন এমপিও টিপাই বাঁধ নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বরাক নদীতে ভারত টিপাইমুখ বাঁধ দিলে বাংলাদেশের সুরমা ও কুশিয়ারা নদী মরে যাবে। সর্বনাশ হয়ে যাবে বাংলাদেশের। কিন্তু এ বিষয়টি সরকার বুঝতে পারছে না। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে সরকার জোরালো কোন প্রতিবাদ করছে না, মিউ-মিউ জবাব দিচ্ছে। তিনি সংসদীয় কমিটিতে বিএনপি প্রস্তাবিত বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানান। টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্বপূর্ণ কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা না গেলেও বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণে বাংলাদেশের জনগণের উৎকণ্ঠার কথা জানিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। চিঠিতে তিনি দুই দেশের অভিন্ন নদী বরাকের টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ না করার জন্য মনমোহন সিংকে অনুরোধ করেছেন। বিএনপির দফতর সম্পাদক রুহুল কবীর রিজভী আহমদ বলেন, আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও ভারতের ঐ বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে তুলবো। এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণের জন্য বিএনপি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জনের প্রত্যাহার দাবি করেছেন। তারা নতজানু অযোগ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দীপু মনির পদত্যাগও চেয়েছেন।
আমাদের সমস্যা তো এক দীপু মনি নয়, মন্ত্রী বাহাদুরদের তৎপরতায় আমাদের সংকট হ্রাসের বদলে বরং গভীর হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আর এক চ্যাম্পিয়ন হলেন বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মইনুল ইসলামের সাথে এক বৈঠক শেষে ফারুক খান সাংবাদিকদের বলেন, ভারত আমাদের ভালো বন্ধু এবং বিএসএফও ভালো আচরণ করছে আমাদের সাথে। ভারতের বন্ধুত্ব তো আমরা চাই কিন্তু প্রশ্ন হলো তিনি এভাবে সার্টিফিকেট দিতে গেলেন কেন? ভারত কি তার কাছে এমন কোন সার্টিফিকেট চেয়েছে? আসলে কে কার বন্ধু, সে কথা প্রমাণে সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না, আচরণই যথেষ্ট। ভারত আমাদের কতটা বন্ধু, কী ধরনের বন্ধু তা বাংলাদেশের জনগণ ফারুক খানের কথায় বিবেচনা করবে না, বিষয়টি নিরূপিত হবে ভারতের আচরণের নিরিখেই। ফারাক্কা বাঁধের সীমাহীন ক্ষতির পর ভারত যদি আবার শক্তির দাপট দেখিয়ে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের আগ্রাসন চালায়, এশিয়ান হাইওয়ের নামে করিডোর লাভের অপপ্রয়াস চালায় এবং প্রায় প্রতিদিন সীমান্তে পাখির মত গুলী করে বাংলাদেশীদের হত্যা করে- তাহলে এমন আচরণকে জনগণ কি নামে অভিহিত করবে? নিশ্চয়ই জনগণ ফারুক খানের ভাষায় বলবে না যে, ভারত আমাদের ভালো বন্ধু এবং বিএসএফও ভালো আচরণ করছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ আমাদের সাথে কেমন আচরণ করছে তার একটা চিত্র পাওয়া যায় মানবাধিকার সংগঠন �অধিকার'-এর রিপোর্টে। অধিকার-এর হিসাব অনুযায়ী এ বছরের পয়লা জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বিএসএফ ৪৪ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে, গুলী চালিয়ে আহত করেছে আরো ৪৮ জনকে। অপহরণ করেছে ৯ জনকে। লুণ্ঠন ও পুশইনের বেশ কিছু ঘটনাও ঘটিয়েছে বিএসএফ। এই যদি হয় বন্ধুত্বের উদাহরণ, তাহলে শত্রুর আর প্রয়োজন আছে কী?
আসলে হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মাধ্যমে বর্তমানে ভারত বাংলাদেশের কাছে আচরণের যেসব উদাহরণ পেশ করছে তাতে বন্ধুত্বের বার্তা নেই, আছে আগ্রাসনের আস্ফালন। আর আমাদের নতজানু মন্ত্রীদের মিউ-মিউ আওয়াজে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে যেন লেন্দুপ-দর্জিদের কণ্ঠস্বর। যে মন্ত্রীরা দেশের স্বার্থ রক্ষায় নির্বিকার এবং বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে ন্যায্য অধিকারের কথা উচ্চারণ করার সাহসও রাখে না- দেশের শাসন ক্ষমতায় তাদের কোন প্রয়োজন আছে কী? জাতির বর্তমান সংকট মুহূর্তে শুধু এই প্রশ্ন তোলাই যথেষ্ট নয়, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও নদী রক্ষার আন্দোলনে এখন ঐক্যবদ্ধ হতে হবে জাতিকে। পিনাক বাবুর ঔদ্ধত্যের জবাব প্রদানে যেভাবে এগিয়ে এসেছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ, পানি বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, আইনজীবী, কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ- তাতে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করার প্রেরণা পেয়েছে। আমরা আশা করবো সরকার জনগণের মনোভাবকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের সংশোধনে প্রয়াসী হবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার আলোকে সরকার যদি দেশের স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে আসে তাহলে তার পরিণতি যে কখনো শুভ হয় না তাও উপলব্ধি করতে হবে সরকারকে। জাতির এই সংকটজনক সময়ে আমরা সরকারকে বলির পাঠার সহকারী নয় জনগনের পাশে আস্থার ছায়ায় দেখতে চাই। আসুন দেশকে এই মরুময়তা, গ্যাস পাচারের ষড়যন্ত্র, কয়লা বিক্রির অভিলাষ, করিডোর দিয়ে দেশের ন্বাধীনতাকে সরাসরি হুমকি, তথাপি দেশ রক্ষার জন্য সচেতন ভাবে কাজ করি।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুন, ২০০৯ সকাল ১০:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



