স্কুল ছাড়ার সতর বছর পার হয়ে গেল। তবু মনে হয় জীবনের সব’চে ভাল সময় ছিল সেটি। এক স্যার কিংবা আপা' দের কাছে মার খাওয়ার দুশ্চিন্তা ছাড়া অন্য কোন বিশেষ চিন্তা সেসময় ছিলনা। বিশ্বাস করুন, বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর যে একটা অনুভূতি হত সেটি আর কখনো সেভাবে পাইনি। আমার স্কুলটির নাম চট্টগ্রাম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়। নোবেল বিজয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস সহ আরো অনেক গুনী ব্যক্তির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এটি।
এই স্কুলের একজন শিক্ষকের কথা আজ খুব লিখতে ইচ্ছে করছে। স্যারের নাম অজিত কান্তি ধর। স্যারের মাথা দুলিয়ে পড়ানোর ব্যাপারটা আজো আমার কাছে একটা শৈল্পিক ব্যাপার হয়ে আছে। উনার পড়ানোর আলাদা একটা স্টাইল ছিল। একটা উদাহরন দেই। একবার ক্লাস শেষে উনি একটু ভয় দেখিয়ে বললেন “কাল যদি পড়া না পারো তাহলে তোমাদের মারতে মারতে হা-ঘা-ব।"একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ‘হা-ঘা-ব’ র মতন একটা শব্দ উচ্চারন করাতে একটু কষ্ট পেয়েছিলাম। একটু পরেই আবার বললেন “তোমাদের আজ যা পড়ালাম হা-ঘা-ব এর মধ্যেই পুরোটা আছে।” আমরা তো সবাই অবাক! “হাল্কা (হা) মাধ্যম থেকে আলো ঘন (ঘ) মাধ্যমে গেলে আপাতন (আ কার) কোন বড় (ব) হয়।” এতদিন পরেও থিওরিটা সেভাবেই মনে আছে। স্কুলে আমাদের ব্যাচের এক ছাত্র পলিটিক্স এ প্রায় যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। স্যার একদিন বললেন “দেখ বাবারা, তোমরা এখনো দুইটা মাত্র পাতা দিয়ে তৈরী একটি কুড়ি মাত্র। তোমাদের ঐ দুটো পাতা যদি কেও ছিঁড়ে ফেলে তাহলে কিন্ত পুরো গাছটাই মরে যেতে পারে। যেদিন তোমরা অনেক বড় হবে, অনেক পাতা সমৃদ্ধ বৃক্ষে পরিনত হবে, তখন দুটো পাতা ছিড়ে নিলে তোমার কিছুই হবেনা। কাজেই এখন তোমাদের প্রধান কাজ পড়াশোনা করে বড় বৃক্ষে পরিনত হওয়া।” ছাত্রদের পলিটিক্স থেকে দূরে রাখার এত সুন্দর ব্যাখ্যা আমি আজো খুব বেশী পাইনি।
শিক্ষক দের হাতে বেত আমার কখনো ভাল লাগত না। আমার কাছে মনে হয় ব্যক্তিত্ব, স্নেহপরায়নতা আর পড়ানোর ক্ষমতা এ তিনের যে কোনো দুটা থাকলেই স্টুডেন্ট দের শাস্তি দেয়ার প্রয়োজন হয়না। অজিত স্যারের মধ্যে তিনটি গুন ই ছিল। এ জন্যে তিনি ক্লাসে ঢুকলে রুমে বিরাজ করতো পিন পতন নিরবতা। সবাই নিজেদের আগ্রহেই শুনতো উনার লেকচার। এমন একজন শিক্ষক পাওয়া আসলেই এক ভাগ্যের ব্যাপার।
স্যারের জন্যে রইল আমার শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

