উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফার) চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়ার স্বীকারোক্তির পর বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এখন কী বলবেন? শুক্রবার বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, অরবিন্দ রাজখোয়াকে বাংলাদেশ থেকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি। তাকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়নি। তাকে ভারত সীমান্তে পুশব্যাকের খবরও তিনি নাকচ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরদিনই শনিবার গৌহাটির আদালত প্রাঙ্গণে অরবিন্দ রাজখোয়া সাংবাদিকদের কাছে বাংলাদেশ থেকে তাকে আটক করে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, বাংলাদেশ আমাদের সঙ্গে একশ’ ভাগ প্রবঞ্চনা করেছে, বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার পাশে থাকা উলফার সামরিক শাখার ডেপুটি কমান্ডার রাজু বড়ুয়াও সুর মিলিয়ে বলেছেন, ‘ইয়েস, অফকোর্স’। শুধু তাই নয়, উলফার আরেক নেতা প্রদীপ গগৈ কামরুপ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বলেছেন, ভুটানের বিশ্বাসঘাতকতার পর এবার বাংলাদেশ বিশ্বাসঘাতকতা করল। বিশ্বাসঘাতক বাংলাদেশকে রেহাই দেয়া হবে না। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উলফার চরম প্রতিশোধের হুমকি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হচ্ছে।
এদিকে বিবিসির পূর্ব ভারত ব্যুরো প্রধান সুবীর ভৌমিক ভারতের দৈনিক যুগশঙ্খ পত্রিকায় গতকালের সংখ্যায় নিজ নামে লেখা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, অরবিন্দ রাজখোয়াকে ঢাকায় সপরিবারে র্যাব আটক করে। র্যাবের এক কর্নেল তার কাছে এটা স্বীকার করেছেন। আলোচনার জন্য মু্ক্ত রাজখোয়াকে দিল্লিতে নেয়া হবে, নাকি সীমান্তে আটক দেখিয়ে আসামের পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হবে—এ নিয়ে দিল্লির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ। তিনদিন গুলশানের একটি বাড়িতে ভারতের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রাজখোয়ার সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালান। আসামের স্বাধীনতার দাবি ছেড়ে দিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসানোর চেষ্টা চালানো হয়। মোবাইল ফোনে রাজখোয়াকে অন্যান্য উলফা নেতার সঙ্গে আলোচনারও সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু রাজখোয়া ও অন্য নেতারা আসামের স্বাধীনতার দাবি ছেড়ে দিতে কোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতায় যেতে অপারগতা প্রকাশ করলে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ডাউকি সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে বিএসএফের হাতে তাদের তুলে দেয়া হয়। সুবীর ভৌমিক আরও জানিয়েছেন, তিনি বিবিসিতে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন এবং তা প্রচারিত হয়েছে।
রাজখোয়াকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর বিএসএফ মুখপাত্র শুক্রবার ভারতের সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন, অরবিন্দ রাজখোয়াসহ বাকি ১০ জন সীমান্তে ঘুরাঘুরি করছিলেন। তাদের চ্যালেঞ্জ করলে তারা সারেন্ডার করেন। অরবিন্দ রাজখোয়ার সঙ্গে আরও যে ১০ জনকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়, তারা হলেন, উলফার সামরিক শাখার উপপ্রধান রাজু বড়ুয়া, রাজখোয়ার দেহরক্ষী রাজা বোরা, রাজখোয়ার স্ত্রী কাবেরী কাচাড়ি, তাদের দুই ছেলে কামসেনা ও গাদাধর, রাজুর স্ত্রী নিরালা নিয়োগ, তার শিশু ছেলে হেমন্ত, কিছুদিন আগে বাংলাদেশ থেকে গ্রেফতার হয়ে গৌহাটিতে জেলে থাকা উলফার পররাষ্ট্র সচিব শশধর চৌধুরীর স্ত্রী রুমিনা চৌধুরী ও তাদের ১০ মাসের মেয়ে হেমা। তাদেরও বিএসএফ আটক করে। পরে সবাইকে আসাম পুলিশের কাছে তুলে দেয়া হয়।
আসাম পুলিশের ‘সুহাসিনি’ গেস্ট হাউসে অরবিন্দ রাজখোয়াকে প্রথমে রাখা হয়। ডাকসাঁইটে কর্তারা দফায় দফায় কথা বলেন রাজখোয়ার সঙ্গে। সমঝোতার চেষ্টা হয়। আসাম পুলিশের হেফাজতে প্রায় ৩২ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষার পালা চলে। শেষ পর্যন্ত আসাম পুলিশের বিশেষ শাখার কাহিলীপাড়ার কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে কড়া নিরাপত্তায় সন্ধ্যায় বাসে করে গৌহাটির চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রবিন ফুকনের আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক রাজখোয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি কি অরবিন্দ রাজখোয়া? জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ আমিই’। পরে বিচারক অরবিন্দের ভাই অজয় রাজকোনওয়ারকে ডেকে তার কাছ থেকেও অরবিন্দ রাজখোয়ার পরিচয় নিশ্চিত হন। পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে ১২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শুক্রবারই ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব রাজখোয়ার ভারতের হেফাজতে থাকার কথা সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন। গত দু’দিনে ভারতের এএনআই, পিটিআই, হিন্দুস্থান টাইমস, আনন্দবাজার এবং বিশেষ করে দৈনিক যুগশঙ্খের গতকালের ইন্টারেনেট সংস্করণে গৌহাটির আদালত ও আদালত প্রাঙ্গণে রাজখোয়ার বিভিন্ন বক্তব্য ও উলফার তত্পরতা নিয়ে অনেক খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে আরও দু’জন প্রভাবশালী উলফা নেতা পররাষ্ট্র সচিব শশধর চৌধুরী ও অর্থসচিব চিত্রাবন হাজারিকাকে ঢাকার উত্তরা থেকেও আটক করে ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। তখনও বাংলাদেশ বিষয়টি অনেকটা এড়িয়ে গিয়ে অস্বীকার করে। কিন্তু এবার রাজখোয়ার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে মন্তব্য করেছেন তাতে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তার বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির কাছেও সাংবাদিকরা রাজখোয়ার আটকের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বিষয়টি অনেকটা এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের মাটি কখনও অন্য দেশের বিরুদ্ধে কাউকে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ তার প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে অবিচল রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সেনসেটিভ এই ইস্যুতে কৌশলী বক্তব্য দিতে পারতেন। আর যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তব্যের ব্যাপারে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেন, তবে তার উচিত হবে বিবিসি ও ভারতের মিডিয়ায় যেভাবে খবরটি প্রচার হয়েছে তার এবং রাজখোয়ার বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করা।
অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, গত বুধবার ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ার অনলাইন সংস্করণে আগের সোমবার রাজখোয়া বাংলাদেশে আটক হয়েছেন বলে প্রচার করা হয়। বুধবার রাতে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন আমার দেশকে বলেছিলেন, এ ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই। রাজখোয়া যতক্ষণ বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে ছিলেন ততক্ষণ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের এ অবস্থান থাকলেও বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাজখোয়াকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পরদিন শুক্রবার সাহারা খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, রাজখোয়ার বাংলাদেশে গ্রেফতার বা আটকের খবর ঠিক নয়। এর আগেও সাম্প্রতিক সময়ে একইভাবে কমপক্ষেও আরও ৭ জন উলফা নেতা ও ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশ তাদের হাতে সীমান্তে নিয়ে অনানুষ্ঠানাকিভাবে হস্তান্তর করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ১৮ ডিসেম্বর ভারত সফরের আগে অরবিন্দ রাজখোয়াকে ভারতের হাতে তুলে দেয়াকে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের জেলে আটক অনুপ চেটিয়াকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় দু’দেশের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত বন্দি বিনিময়ের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে কোনো বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকায় মূলত উলফা নেতাদের গোপনে ভারতের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দিতে হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে শুধু ‘সাজাপ্রাপ্ত’ বন্দিবিনিময় চুক্তি কেন করতে যাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বরং সব ধরনের বন্দিবিনিময়ের সুযোগ থাকলে বাংলাদেশ উলফা কিংবা অন্য কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গি নেতাদের যেভাবে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হস্তান্তর করতে পারবে, তেমনি ভারতে পালিয়ে থাকা বাংলাদেশের খুনি ও সন্ত্রাসীদেরও ফিরিয়ে আনতে পারবে। কিন্তু কেন সেটা করা হচ্ছে না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশের ভেতর থেকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাধীনতাকামী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের আটকের ব্যাপারে বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনীর অজ্ঞতার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে কী ভারতীয় গোয়েন্দা বা কমান্ডোরা তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। চুক্তি না থাকার ফলে এক ধরনের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে এসব হচ্ছে। বন্দিবিনিময় চুক্তি হলে সে অজুহাত থাকবে না। সে কারণেই কী শুধু ‘সাজাপ্রাপ্ত’ বন্দিদের বিনিময়ের চুক্তি করা হচ্ছে এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


