স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেঁধে দেয়া ৪৮ ঘণ্টা সময়সীমার মধ্যে পুলিশ কোন সুখবর দিতে পারেনি। তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা বললেও, সাগর-রুনী দম্পতির ঘাতক সম্পর্কে পুলিশ মুখ না খুলে রহস্যজনক আচরণ করছে। সোমবার পুলিশের আইজির সংবাদ সম্মেলন ঘিরে নানা জল্পনাকল্পনা এবং খুনিদের গ্রেফতার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট খবরের অপেক্ষায় থাকার পরও রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের সংবাদ সম্মেলনের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বেলা ১টার পরিবর্তে আড়াইটায় আইজিপি সংবাদ সম্মেলন করলেও তিনি স্পষ্ট করে কিছুই বলেননি। আদৌ কি তারা ঘাতকদের চিহ্নিত করতে পেরেছেন? এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে পরকীয়া, প্রতিহিংসা, অর্থকড়ি, পেশাগত প্রতিশোধ বা কি কারণ রয়েছে, সেই রহস্য কি গোয়েন্দারা উদ্ধার করতে পেরেছেন? ঘাতকদের ব্যবহƒত বঁটি ও ছুরির হাতের ছাপের সঙ্গে কার কার হাতের ছাপের মিল পাওয়া গেছে বা নিহতদের কারও হাতের ছাপের মিল রয়েছে কি না, সেসব প্রশ্নের কি কোন উত্তর খুঁজে পেয়েছে গোয়েন্দারা? তবে কোন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ বারবার বলছে, তদন্তের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে? সেই অগ্রগতিটা কি? কেন পুলিশ এই সাংবাদিক দম্পতির মর্মান্তিক খুনের রহস্য উদ্ঘাটনে এমন আচরণ করছে? দেশের প্রধান নির্বাহী স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে নির্দেশ দিয়েছেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের খুঁজে বের করার জন্য, সেখানে পুলিশের এত গড়িমসি কেন? এসব কেনর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেশের সচেতন মহল এখন পুলিশের ওপর থেকে আস্থা হারাতে শুরু করেছে। আর এই সুযোগে বাজারে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা গুজব। কয়েকজন টিভি সাংবাদিকের নাম সবার মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ সুযোগ ও মওকা বুঝে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে এবং আসল খুনিদের রক্ষা করতে পুরো ঘটনাই ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার ফন্দিফিকির করছেন। এ অবস্থায় একমাত্র পুলিশই পারে সব রহস্যের জাল ছিন্ন করে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে। আর যদি পুলিশের কাছে সব খবরই থেকে থাকে এবং তদন্তে যদি সবকিছু তারা পেয়েই থাকেন, তবে বিলম্ব কেন? এসব কারণে সচেতন মানুষের মনে নানা সন্দেহ বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। এদিকে গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলেছে, ঘটনার পর ওই সাংবাদিক দম্পতির মোবাইল ফোনের কললিস্ট থেকে সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনের নামের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। এদিকে লোমহর্ষক ওই জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেফতার নিয়ে রোববার রাত থেকেই নানামুখী গুজব ছড়াতে শুরু করেছে। দু’জন মিডিয়াকর্মী ও একজন অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসায়ীকে আটকের কথা শোনা গেছে। তবে সোমবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আইন-শৃংখলা বাহিনীর কোনও সংস্থা থেকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, ঘনিষ্ঠজনদের হাতেই খুন হয়েছেন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী। এ ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। কিছু আলামত পাওয়ায় তাদের ঘনিষ্ঠজন অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আর এ ঘটনাকে পুঁজি করেই কেউ গ্রেফতারের গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র ছেলে মেঘের জবানবন্দির ভিত্তিতে সাম্প্রতিক সময়ে দুটি পিকনিকের স্থির ও ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করেছে পুলিশ। এর একটি হয়েছে ১৯ জানুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির আয়োজনে। অন্যটি হয়েছে ১০ ফেব্র“য়ারি পারিবারিক আয়োজনে। এসব স্থির ও ভিডিওচিত্র মেঘকে কয়েক দফা দেখানো হয়েছে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কয়েকজন কর্মীর ছবিও দেখানো হয়েছে তাকে, যারা ওই পিকনিকে অংশ নিয়েছিলেন। তবে মেঘ ছবি দেখে খুনিকে চিনতে পেরেছে কি না সে বিষয়ে পুলিশ স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি।
এদিকে সোমবার পুলিশ সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত শেষ করতে না পারলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার। তিনি বলেছেন, ‘সব সময় বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে কাজ করা সম্ভব হয় না, তবে একটি ফ্রেমে থাকলে কাজ করতে সুবিধা হয়।’ এ কারণেই হয়তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। এদিকে এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনীকে ঘিরেই শুক্রবার রাতে ‘রাজাবাজার ট্রাজেডি’র ঘটনা ঘটেছে বলে একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, ঘটনার রাতে পরিস্থিতির শিকার হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার। গত দু’দিনে সাংবাদিক দম্পতির বেশ কয়েকজন সহকর্মী ও পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলেছে, ঘটনার রাতে ‘নাইট ডিউটি’ ছিল সাগর সরওয়ারের। সে হিসেবে তার বাসায় ফেরার কথা ছিল সকালে। কিন্তু রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত প্রায় আড়াই ঘণ্টা স্ত্রী মেহেরুন রুনীর মোবাইল ফোনটি বন্ধ থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন সাগর সরওয়ার। এ উদ্বিগ্নতার কথা ওই রাতে তিনি তার এক সহকর্মীকেও বলেছিলেন। এরপর রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ করেই বাসায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আর বাসায় ফিরেই নৃশংস খুনের শিকার হন। এদিকে সাংবাদিক দম্পতির খুনিদের খুঁজে বের করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম অবশেষে ‘বাগারম্বরে’ পরিণত হয়েছে।
দফায় দফায় অভিযান : ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে গোয়েন্দা পুলিশের ৫টি টিম কাজ করছে। এছাড়া সিআইডি ও থানা পুলিশের কয়েকটি টিমও কাজ করছে। ঘটনার পরদিন থেকে বিভিন্ন স্থানে দফায় দফায় অভিযান চালানো হচ্ছে। গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ৩ জন সিনিয়র মিডিয়াকর্মীকে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের ঢাকার বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। এই তিনজনের গতিবিধি নজরদারি করা হচ্ছে। এছাড়া এ ঘটনায় একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বেশ কয়েকজন কর্মীর মোবাইল ফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। যোগাযোগ করা হলে তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার ইমাম হোসেন বলেছেন, ঘটনার উল্লেখযোগ্য তদন্ত হয়েছে। সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে যা যা করা প্রয়োজন তার সবই আমরা করছি।
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি বলেন, পুলশ আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সবসময় বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে কোন তদন্ত কাজ শতভাগ সফল হয় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। সোমবার সকালে তদন্তের অগ্রগতির ব্যাপারে সর্বশেষ কথা হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে কিছু করতে গেলে অনেক সময় অনেক তথ্য-প্রমাণ হাতছাড়া হওয়ার আশংকা থাকে। এজন্য আমরা সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছি।
তিনি বলেন, বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে আমরা অনেক এগিয়েছি। বলা চলে, প্রায় চূড়ান্ত সফলতার কাছাকাছি চলে এসেছি। থানা পুলিশ, সিআইডি, ডিবি ও র্যাবের সদস্যরা অপরাধীদের শনাক্ত করতে অক্লান্ত চেষ্টা করছেন। এ ব্যাপারে কারও আন্তরিকতার অভাব নেই। তবে খুনিদের কাউকে চিহ্নিত করা গেছে কি না বা কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে আইজিপি ‘কৌশলগত কারণের’ দোহাই দিয়ে তা এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার আছে কি না, তদন্তের স্বার্থে তা জানতে পারছি না। তবে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে দ্রুতই আপনাদের জানাব।’ এদিকে দেশে গুপ্তহত্যা, গুম, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার মাঝে সাংবাদিক দম্পতি খুন হওয়ায় যখন মানুষ চরম উৎকণ্ঠিত, এ সময় পুলিশের আইজিপি দাবি করলেন, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো। এ মুহূর্তে তার এ দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে খোদ পুলিশেই সমালোচনা শুরু হয়েছে। শুক্রবার গভীর রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর এবং তার স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রুনী। শনিবার সকালে পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, খুনিদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
সুত্র

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



