মসজিদও, যুক্তিসঙ্গত কারণেই, যেগুলো পাকা সেগুলো টিকেছিল, ধ্বসে পড়েছিল কাঁচাগুলি ৷ যারা এসবকিছুকে আলাহর গজব বলছিলেন তাঁদের বক্তব্য ছিল 'এগুলো হল পাপের ফল' ৷ কিন্তু পাপ কি তাদেরই বেশি যাদের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় থাকতে হয় এবং যাদের আশ্রয় খুবই ভঙ্গুর? যারা টেকসই বাড়িতে বসবাস করেন এবং নিরাপদ জায়গায় থাকেন হারাম পয়সায় তাদের পাপে গজব হয় কোথায়? এই বিষয়গুলি নিয়েই আরজ আলী প্রশ্ন তুলেছিলেন ৷
কোন দেশে ধর্মবিশ্বাস অনেক থাকলেও যদি পানি দূষিত হয় কিংবা পুষ্টির অভাব থাকে সর্বোপরি যদি চিকিত্সার ব্যবস্থার অভাব থাকে তাহলে সেখানে অকাল মৃত্যুর হার অনেক বেশি ৷ শাসকেরা এবং তাদের রা করতে নিয়োজিত থাকেন যেসব ধর্মপ্রচারক তাঁরা পানি, খাদ্য-পুষ্টি কিংবা চিকিত্সার বিষয়ে প্রশ্ন না তুলে অভিযুক্ত করতে থাকেন যারা গরিব, যারা ভুগছেন তাদেরই ৷
বলেন, দেশের মানুষের ঈমান কম ৷ তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, কেন তবে যেসব দেশে ধর্মবিশ্বাস কম সেসব দেশে বিনা চিকিত্সায় মৃতু্য কম? আবার ধর্মের মিথ ধরে প্রশ্ন করেন, "...আর যদি যাবতীয় জীবের খাদ্যই মেকাইল বন্টন করেন, তবে জগতের অন্য কোন প্রাণীকে নীরোগ দেহে শুধু উপবাসে মরিতে দেখা যায় না, অথচ মানুষ উপবাসে মরে কেন?" বৈষম্য কেন?১৩
এর সঙ্গেই প্রশ্ন, ভাগ্য৷ কপালের লেখা৷ তিনি বলেন, "ভাগ্যলিপি কি অপরিবর্তনীয়?...রাষ্ট্র ও সমাজ মানুষকে শিা দিতেছে-কর্ম কর, ফল পাইবে ৷ কিন্তু ধর্ম দিতেছে ইহার বিপরীত ৷
ধর্ম বলিতেছে-কর্ম করিয়া যাও, ফল অদৃষ্টে (তকদীরে) যাহা লিখিত আছে তাহাই পাইবে ৷
...বিশেষত মানুষের কৃত 'কর্মের দ্বারা ফলোত্পন্ন' না হইয়া যদি ঈশ্বরের নির্ধারিত 'ফলের দ্বারা কর্মোত্পত্তি' হয় তবে 'সত্' বা 'অসত্' কাজের জন্য মানুষ দায়ী হইবে কেন?"১৪
সম্পত্তির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা থাকলে উত্তরাধিকার প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে আসে ৷ বর্তমান সকল প্রধান ধর্মেই যেহেতু সম্পত্তির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তাকে স্থায়ী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে সেহেতু সব ধর্মেই উত্তরাধিকার বিষয়েও নিয়মবিধি আছে ৷
ইসলাম ধর্মে এ সংক্রান্ত যে বিধি সে সম্পর্কে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে তিনি বলেন, "মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তি তাহার ওয়ারিশগণের মধ্যে বন্টনব্যবস্থাকে বলা হয় 'ফরায়েজ নীতি'৷ ইহা পবিত্র কোরানের বিধান৷ মুসলিম জগতে এই বিধানটি যেরূপ দৃঢ়ভাবে প্রতিপালিত হইতেছে, সেরূপ অন্য কোনটি নহে ৷
এমনকি পবিত্র নামাজের বিধানও নহে ৷ ইহার কারণ বোধহয় এই যে, ফরায়েজ বিধানের সঙ্গে জাগতিক স্বার্থ জড়িত আছে ৷" তিনি হিসাব করে দেখিয়েছেন বিধান অনুযায়ী সবাইকে সম্পত্তি বন্টন করলে মোট সম্পত্তি দিয়ে কুলায় না ৷ দরকার হয় ষোল আনার স্থলে আঠারো আনা ৷ এই সমস্যার সমাধান করেন হজরত আলী ৷
তিনি যে নিয়মের দ্বারা উহার সমাধান করিয়াছিলেন, তাহার নাম 'আউল'৷১৫ মানুষের কেন এই সংশোধনের দরকার হল? তিনি প্রশ্ন করেন, 'পবিত্র কোরানের উক্ত বিধানটি ত্রুটিপূর্ণ কেন?'১৬
নারীর অবস্থান, নারীর অধিকার, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের 'বৈধতা'-'অবৈধতা', সন্তানের উপর অধিকার সম্পর্কে সকল ধর্মেই কড়া বিধিবিধান আছে ৷ ইসলাম ধর্মে কোরান এবং হাদিস থেকে এসব বিধিবিধান গ্রহণ ও প্রয়োগ করা হয়৷ আরজ আলী মাতুব্বর এক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন 'হিলা বিয়ে' নিয়ে ৷ এই বিয়ের প্রথা, অন্যান্য আরও অনেক আইনের মতো, কত নারীর জীবনকে বিষময় ও বিপর্যস্ত করেছে, কত নারীকে ভয়াবহ অপমানের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলেছে তার পরিসংখ্যান বের করা অসম্ভব৷
এটি এখনও চলছে ৷ স্বামী ভুলে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আবার যদি তাঁকে গ্রহণ করতে চায় তবে তার একমাত্র বিধিসম্মত ব্যবস্থা হল স্ত্রীকে অন্য একজনের সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে যার সঙ্গে কোন ভালবাসা তৈরি হবে না কিন্ত নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে ৷
আরজ আলী মাতুব্বর বলেন, "অথচ পুনঃগ্রহণযোগ্যা নির্দোষ স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণে 'হিলা' প্রথার নিয়মে স্বামীর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয় সেই নির্দোষ স্ত্রীকেই ৷ অপরাধী স্বামীর অর্থদণ্ড, বেত্রাঘাত ইত্যাদি না-ই হউক, অন্ততঃ তওবা পড়ারও বিধান নাই, আছে নিষ্পাপিনী স্ত্রীর ইজ্জতহানির ব্যবস্থা ৷ একের পাপে অন্যকে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয় কেন?"১৭
তিনি পুরো ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করে আরও প্রশ্ন করেন যে, "এইরূপ মিলন ব্যাভিচারের নামান্তর নয় কি?"১৮ অথচ 'ব্যাভিচারের' অপরাধে কত নারী পুরুষকে ভালবাসার সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ধর্মের বিধান অনুযায়ী নিষ্ঠুর যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হয়েছে এমনকি প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই ৷
ভাগ্য গড়বার জন্য, ঈশ্বরের কৃপা লাভের জন্য নানাবিধ আয়োজন ও ব্যবস্থা আছে বিভিন্ন ধর্মে ৷ ইসলাম ধর্মে শবেবরাত বা হিন্দুধর্মে লক্ষ্মীপূজা এরকম দুটি পদ্ধতি যা দিয়ে বৈষয়িক জীবন উন্নতি অনুমোদন করেন ঈশ্বর-এরকম বিশ্বাসই প্রবলভাবে কাজ করে ৷ কিন্তু আরজ আলী মাতুব্বর চারপাশের, বিশ্বের নানা দেশের উদাহরণ দিয়ে দেখান যে, সম্পদ বা স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে এগুলোর কোন সম্পর্ক দেখা যায় না ৷১৯
বরঞ্চ যারা বিপুল সম্পদের মালিক, বৈষয়িকভাবে সফল যাদের বরাত 'ভাল' তাদের বেশিরভাগ এসবের ধারে কাছেও নেই৷ তাঁদের বরঞ্চ বরাত ভাল হবার পর ধর্মের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখা যায় ভিন্ন কারণে ৷
হিন্দুধর্মে পশুবলি বা ইসলামে কোরবানি প্রথা সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও তাঁকে খুশি করবার একটি পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় ৷
বাংলাদেশে কোরবানির ব্যাপারে উত্সাহ দিনে দিনে বাড়ছে ৷ এইজন্য যে আয়োজন, উলাস এবং প্রতিযোগিতা দেখা যায় সেসব আলোচনা করে আরজ আলী বলেছেন এতে পশুর হয় 'আত্মত্যাগ' এবং কোরবানিদাতার হয় 'সামান্য স্বার্থত্যাগ'৷ মাংস ভোগের মহোত্সব দেখে তিনি প্রশ্ন করেন যে, এই সামান্য স্বার্থত্যাগের বিনিময়ে যদি দাতার স্বর্গলাভ হইতে পারে, তবে কোরবানির পশুর স্বর্গলাভ হইবে কিনা?২০
কেন তাকে দাঁড়াতে হয় লোভ আর ভয়ের উপর
ধর্মের বিভিন্ন বক্তব্য, নিয়মনীতি সর্বোপরি প্রধান ধর্মগুলোর ধর্মগ্রন্থসমূহকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিশেষণের মধ্যে আনা দরকার ৷ আরজ আলী মাতুব্বর বলেন যে, "ধর্মগ্রন্থের বাণীসমূহ লৌকিক বা অলৌকিক যা-ই হোক, তাতে মানব জীবনের অত্যাবশ্যকীয় বহু মূল্যবান তথ্যও আছে ৷ তাই যাবতীয় ধর্মগ্রন্থই আমাদের পরম শ্রদ্ধার্হ ও সমান আদরণীয়৷"২১
আরজ আলী নিজে জন্মের পর থেকেই ইসলামের আবহেই বড় হয়েছেন ৷ এই ধর্ম তাঁর অনেক নিকটবর্তী যার একদিকে শাস্ত্রীয় বক্তব্য অন্যদিকে তার বাস্তব প্রয়োগের রূপও তিনি দেখেছেন ৷ কোরান সম্পর্কে তিনি বলেন, "পবিত্র কোরান মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ এবং ইহা ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলিয়া পরিচিত৷ যেসব গ্রন্থকে ঐশ্বরিক বলিয়া দাবি করা হয়, পবিত্র কোরান তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ৷ বরং অতুলনীয়৷"২২
ধর্ম আর মানুষ কে কাকে তৈরি করে, কে কাকে পালন করে? এর জবাবই ঠিক করে দেয় একজনের মতাদর্শিক অবস্থান ৷ আরজ আলী এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, "ধর্ম মানুষকে পালন করে না, বরং মানুষ ধর্মকে পালন করে এবং প্রতিপালনও ৷"২৩ আরজ আলী বলেন, "সাধারণত আমরা যাহাকে 'ধর্ম' বলি তাহা হইল মানুষের কল্পিত ধর্ম ৷" ধর্ম প্রবর্তকদের তিনি অভিহিত করেছেন মহাজ্ঞানী হিসেবে যারা 'যুগে যুগে' 'স্রষ্টার' প্রতি মানুষের কর্তব্য এবং 'মানুষের সমাজ ও কর্মজীবনের গতিপথও' দেখিয়েছেন ৷
তাঁর মতে, এর ফলেই সৃষ্টি হয়েছে অনেক ধর্ম ও তা নিয়ে বিভেদ ৷ অনেক রক্তয়ী সংঘাতও সৃষ্টি হয়েছে এটি থেকে ৷২৪
কিন্তু 'সাপে নেউলে' সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধর্মের সারবস্তুর মধ্যে অমিলের চাইতে মিলই বেশি ৷ আরজ আলী প্রশ্ন করেন, ''লাধিক পয়গম্বর প্রায় সবাই আরব দেশে জন্মিলেন কেন?'' বাস্তবিকই আরব অঞ্চলের পর ভারত, চীন, জাপান প্রভৃতি অঞ্চলকেই ধর্ম প্রবর্তনের কেন্দ্র হিসেবে পাওয়া যায় ৷
দখল-পূর্ব আমেরিকার ধর্মের খবর এখনও প্রকাশিত হচ্ছে ৷ সেমিটিক ধর্মগুলো ধারাবাহিকতা রেখেছে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ৷ হজরত ইব্রাহিম থেকে শুরু হয়ে ইসলাম ধর্ম পর্যন্ত ৷ ভারত, চীন, জাপান ইত্যাদি অঞ্চলে ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন ধারবিাহিকতা ৷ এটা ঠিক এরকম নয় যে, একটি ধর্ম এসেছে এবং তার সূত্র ধরে সমাজ-অর্থনীতি এগিয়েছে ৷
ঘটনাটা বরঞ্চ উল্টো ৷ সমাজ অর্থনীতির ধরনের উপরই ধর্মের রূপ দাঁড়িয়েছে৷ বহু ধর্ম মরে গেছে৷ আবার বহু ধর্ম মিশে গেছে অন্য কোনটির সঙ্গে আবার কোন কোনটি ব্যাপক প্রভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে ৷ হিন্দু ধর্ম, যাকে বৈদিক ধর্মও বলা হয়, অনুসন্ধান করলে পাওয়া যাবে বহু ক্ষুদ্র আঞ্চলিক ধর্ম, পাওয়া যাবে সেগুলোর দেবদেবী বিশ্বাস আচার ৷
চলবে......
তথ্যসূত্রঃ
১৩. সত্যের সন্ধান, ১, ৮৫
১৪. সত্যের সন্ধান, ১, ৭৮
১৫. সত্যের সন্ধান, ১, ১৩১
১৬. ঐ
১৭. সত্যের সন্ধান, ১, ১৩৩
১৮. সত্যের সন্ধান, ১, ১৩৪
১৯. সত্যের সন্ধান, ১, ৯৯
২০. সত্যের সন্ধান, ১, ১০৫
২১. সত্যের সন্ধান, ১, ২৫১
২২. সৃষ্টি রহস্য, ২, ১৭২
২৩. সত্যের সন্ধান, ১, ১৩৬
আলোচিত ব্লগ
বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন
অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিএনপির আবালীপনা।


আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।