আরজ আলি মাতুব্বর - ৬
আরজ আলী মাতুব্বর এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্য যতধরনের ধর্মগ্রন্থ আশেপাশে পাওয়া যায় দেখেছেন, প্রচলিত ভাষ্য নোট করেছেন আর পাশাপাশি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, প্রত্নবিদ্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আবিষ্কার, তত্ত্বের খোঁজ করেছেন, সংগ্রহ করেছেন, অধ্যয়ন করেছেন ৷ বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ ধর্মসহ অন্য সবকিছুর মতো প্রবল ছিল একই কারণে : প্রশ্নের উত্তর সন্ধান ৷ বলাই বাহুল্য বিজ্ঞান তাঁকে এসব প্রশ্নের উত্তরে যুক্তিসঙ্গত একটি কাঠামো দান করেছিল ৷
'সত্যের সন্ধান' গ্রন্থটি প্রচলিত বিশ্বাস নিয়ে বহু প্রশ্ন ও প্রশ্নের ব্যাখ্যার সংকলন ৷ 'সৃষ্টি রহস্য' গ্রন্থটি মূলত সৃষ্টি বিষয়ক বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের ধারণা এবং বিজ্ঞানের তত্কালীন সময় পর্যন্ত প্রাপ্ত জ্ঞান থেকে লেখা ৷ সত্যের সন্ধান গ্রন্থের ষষ্ঠ প্রস্তাবে আদিমানব নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন ৷ বিভিন্ন ধর্মেই আদিমানব বিষয়ে ধারণা বা বিশ্বাস পাওয়া যায় ৷ সেমিটিক সব ধর্মে আদম-হাওয়া বিষয়টি একই ৷ হিন্দু ধর্মে ব্রহ্মার মানসপুত্র মনুই আদি মানব ৷ এই বিশ্বাস এবং তার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন কাহিনী যত্নের সঙ্গে অধ্যয়ন করেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন ৷
আগুন, অস্ত্র, বাহন, তাঁত, চাকা, নৌকা ও পাল, কাগজ, ধর্ম, বাষ্পীয় শক্তি, বৈদু্যতিক শক্তি, পারমাণবিক শক্তির আবিষ্কার ও ব্যবহারের বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন ৷ কৃষি ও পশুপালন সম্পর্কে ইতিহাস পর্যালোচনা করে তিনি লিখেছেন, "সেমিটিক জাতির মতে, কৃষি ও পশুপালন শুরু করিয়াছিলেন বাবা আদম বেহেশত হইতে পৃথিবীতে আসিয়াই ৷ হালের বলদ, লাঙ্গল-জোয়াল ও ফসলের বীজ বেহেশত হইতে আমদানি হইয়াছিল কি না তাহা জানি না, তবে তিনি নাকি চাষাবাদ করিয়াই জীবন যাপন করিতেন ৷
...বাবা আদমের লাঙ্গলের আকৃতি কিরূপ ছিল, জোয়াল কিভাবে জুড়িতেন এবং রশারশি কোথায় পাইয়াছিলেন-সেই বিষয়ে কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না ৷"৩১
আদমের সময়কাল এবং স্থান নিয়ে হিসাবনিকাশ করে তিনি দেখাচ্ছেন খ্রি. পূ. ৪০০৪ সালে হযরত আদমের সৃষ্টি (জন্ম)৷ কিন্তু পাশাপাশি এটাও দেখাচ্ছেন যে, সেইসময়ের আগেই মিশরে পঞ্জিকা আবিষ্কার হয়েছে, সেইসময়ে মিশরে চাষাবাদ, লোকবসতি ৷ তারও ৪ হাজার বছর আগে লোকবসতির প্রমাণ পাওয়া যায় সিরিয়ায় ৷
তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে, "জীববিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হইয়াছিল ল ল বত্সর পূর্বে ৷ তবে আধুনিক চেহারার মানুষের আবির্ভাব ঘটিয়াছে মাত্র প্রায় ৩০ হাজার বত্সর পূর্বে ৷"৩২
মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞানের সর্বশেষ প্রাপ্ত যাবতীয় তথ্য বিশেষণ করে আরজ আলী মাতুব্বর বলছেন, "পূর্বোক্ত বিষয়গুলি পর্যালোচনা করিলে মনে আসিতে পারে যে, আদম হয়ত এশিয়া মাইনর বা আর্মেনিয়া দেশের কোন কানের বিতাড়িত ব্যক্তি এবং আরব দেশে আগন্তুক প্রথম মানুষ, সমস্ত পৃথিবীর মধ্যে আদিম মানুষ নয় ৷"৩৩
মানুষের সঙ্গে অন্যান্য জীবের শরীরতত্ত্বীয় মিল নিয়ে আরজ আলী বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ৷ এটা গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে মানুষ সম্পূর্ণ বিশিষ্ট এই ধারণার উপর অনেক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত ৷
তিনি বলছেন, "চা, কফি ও মাদক জাতীয় দ্রব্যাদি গ্রহণে ও কতক বিষাক্ত দ্রব্য প্রয়োগে মানুষ ও পশুর একই লক্ষণ প্রকাশ পায়, ইহাতে উহাদের টিস্যু ও রক্তের সাদৃশ্য প্রমাণিত হয় ৷ গো-মহিষাদি পশুরা লোমশ প্রাণী, মানুষও তাহাই এবং পশুদের দেহে যেরূপ পরজীবী বাস করে, মানুষের শরীরেও তদ্রূপ উকুনাদি বাস করে ৷
প্রজননকার্যে মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী জীবদের বিশেষ কোনো পার্থক্য নাই ৷ পূর্বরাগ, যৌনমিলন, ভ্রূণোত্পাদন, সন্তান প্রসব ও প্রতিপালন সকলই প্রায় একরূপ ৷"৩৪
নারীর রজঃশীলা ও সন্তান ধারণ বিষয়ে এরকম সাদৃশ্য দেখেছেন ৷ সৃষ্টি রহস্য-তে এটি নিয়েও আলোচনা করেছেন ৷ সত্যের সন্ধান গ্রন্থে তাঁর প্রশ্ন ছিল,
"বিশেষত আদি নারী বিবি হাওয়া নাকি রজঃশীলা হইয়াছিলেন গন্ধম ছেঁড়ার ফলে, কিন্তু অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীকূল রজঃশীলা হয় কেন?"৩৫
তাহলে অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে কি মানুষের কোন পার্থক্য নেই? তিনি বলেন, "মানুষের সহিত অন্যান্য জীবদের তথা পশুদের শত শত রকম সামঞ্জস্য বিদ্যমান ৷ কাজেই যাবতীয় জীব বিশেষত পশুরা মানুষের আত্নীয়, এ কথাটি অস্বীকার করিবার উপায় নাই ৷ তথাপি মানুষ মানুষই, পশু নহে ৷
এখন দেখা যাক যে, অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের তফাত্কি? জীবজগতে মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনটি- হাত, মগজ, ভাষা ৷"৩৬ এরপর এই বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাখ্যা করে শেষে এসে যা বলছেন তা উলেখ না করে পারা যায় না ৷
বলছেন, "...ভাষাভাষী হিসাবে মানুষ একান্তই সামাজিক জীব ৷ উন্নত মস্তিষ্ক, কর্মম হাত এবং সুসমঞ্জস ভাষা সহায়ক হইল এক রকম জীবের-তাহারই নাম মানুষ ৷ কিন্তু হাত, মগজ ও ভাষা জীবজগতের সর্বত্র দুর্লভ নহে৷ অনুন্নত জীবজগতের সর্বত্র-দুর্লভ-মানুষের হাসি ৷"৩৭
চলবে.......
তথ্যসূত্রঃ
৩১. সৃষ্টি রহস্য, ২, ১৩০
৩২. সত্যের সন্ধান, ষষ্ঠ প্রস্তাব, ১, ১১৯-২০
৩৩. ঐ, ১২২
৩৪. সৃষ্টি রহস্য, ২, ১০৫
৩৫. সত্যের সন্ধান, ১, ১০৯
৩৬. সৃষ্টি রহস্য, ২, ১০৬
৩৭. সৃষ্টি রহস্য, ২, ১০৭
আজকাল

আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প
আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন
একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
আসলে কেউ ফেরে না।
মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর
যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।