আমার প্রিয় পোস্ট

``চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।' -- প্রাচীন গ্রীক কবি ইউরিপিডিস (৪৮০-৪০৬ খ্রীঃ পূঃ)

এই সেই বহুল আলোচিত জল্লাদখানা...!

১৪ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:১৫

শেয়ারঃ
0 4 0



এই সেই বহুল আলোচিত জল্লাদখানা ! যাকে এখন সবাই জানে ‘জল্লাদখানা বধ্যভূমি ১৯৭১’ নামে। মিরপুর দশ নম্বর গোলচক্কর থেকে এগার নম্বরের দিকে কিছুটা আগালেই মিরপুর বেনারশি পল্লীর প্রথম গেট ধরে পাকা রাস্তাটা আধা কিলোতক যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, ঠিক সেখানেই একটা বড়সড় সাইনবোর্ডের কালো জমিনে সাদা সাদা বড় হরফে উপরোক্ত কথাটি চোখে পড়বে- ‘এই সেই বহুল আলোচিত জল্লাদখানা।’


পাশের ‘zaf’ চিহ্ণিত দালানটিই একাত্তরের সেই কুখ্যাত ‘পাম্পহাউজ’। যার কূপের সামনে একাত্তরের ঘৃণ্য আলবদর রাজাকাররা বহু নিরপরাধ বাঙালিকে ধরে এনে শিরচ্ছেদ ও হত্যা করে পাম্পহাউজের পানি ভর্তি কূপ-গহ্বরে নিক্ষেপ করতো। এলাকার বিভিন্ন স্থানে শহীদ হয়েছেন এমন আরো অনেকের লাশও টেনে এনে ফেলা হতো এখানে।


১৯৭১ সালে বিহারী অধ্যুষিত মিরপুরের অনেকগুলো জায়গাই হয়ে উঠেছিলো বধ্যভূমি। এমনি দুটি স্থানে পরে ১৯৯৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর খননকাজ চালায়। স্থানীয়ভাবে এই জায়গা দুটি পরিচিত ছিল জল্লাদখানা ও নূরী মসজিদ বধ্যভূমি হিসেবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক বিগ্রেডের সহযোগিতায় এই জল্লাদখানা বধ্যভূমি থেকে ৭০টি মাথার খুলি ও ৫৩৭২টি অন্যান্য অস্থি উদ্ধার করা হয়।


আর নূরী মসজিদ বধ্যভূমি থেকে উদ্ধারকৃত খুলি ও হাড়গোড়ের সঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল ছিন্ন জামা-কাপড়, ওড়না-শাড়ি-ফ্রক, জুতো স্যান্ডেল, মানিব্যাগ, তসবি ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের অনেক জিনিস। তার কতক নমূনা এই জল্লাদখানা বধ্যভূমির মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য রাখা হয় সেই অভিশপ্ত কূপটির পাশে। এবং কূপটিকে সিমেন্ট বাধাই করে ভারী কাঁচ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে বর্বরতার স্মারক চিহ্ণ হিসেবে। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এই স্মৃতিভূমি আজো ফিরে ফিরে স্মরণ করিয়ে দেয় গণহত্যার শিকার প্রত্যেক শহীদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা।


এই শোকস্মৃতিকে ধরে রাখতে পাম্পহাউজ চত্বরে নির্মিত ‘জীবন অবিনশ্বর’ নামের স্মারক ম্যুরাল-ভাস্কর্যটির দিকে তাকালে থমকে যেতে হয় ! এর পরিকল্পনা ও নির্মাণে শিল্পী রফিকুন নবী ও মুনিরুজ্জামান। গোটা চত্বর জুড়ে শানবাঁধানো ফলকে অঙ্কিত রয়েছে এ যাবৎ খুঁজে পাওয়া দেশের বিভিন্ন বধ্যভূমির তালিকা, বহু শহীদের নাম এবং বিংশ শতাব্দিতে ঘটে যাওয়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উল্লেখযোগ্য বর্বর গণহত্যার তথ্য। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন বধ্যভূমি থেকে সংগৃহিত মাটি এনে কাঁচের আধারে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে স্মৃতি হিসেবে।


জল্লাদখানা বধ্যভূমির গেট দিয়ে ঢুকেই মনে হবে গা শিন শিন করা কোন এক নিঝুমপুরীতে বুঝি পা রাখলাম ! এখানকার আবহটাই এমন যে, হাতে গোনা দর্শনার্থীরা এসে অজান্তেই কী এক নির্জন নীরবতার মধ্য দিয়ে ঘুরে ঘুরে এই ছোট্ট পরিসরের মধ্যেই এক শোকবিভোর উপলব্ধিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মন্তব্য বইয়ে লিখে যান ইচ্ছেখুশি, অনেকেই মনের কথা মনে চেপেই ফিরে যান।


মুক্তিযুদ্ধের ন’মাসের রক্ত আর মৃত্যুর নদী পেরিয়ে স্বজন হারানোর আর্তি আর বিজয়োল্লাস যখন একাকার, তখুনি অকস্মাৎ যে ভয়াল বিষাদের ভারে গোটা জাতি স্তম্ভিত মুহ্যমান হয়ে পড়ে, তা হলো একের পর এক অসংখ্য বধ্যভূমির আবিষ্কার ! বর্বর নিষ্ঠুর কায়দায় পড়ে থাকা স্বজনের বীভৎস বিকৃত গলিত লাশের গন্ধে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে ! ভারী হয়ে উঠে জাতির হৃদয়, বিশ্ব মানবতার বিবেক হয়ে যায় স্তব্ধ ! সে ভার আর কখনো নামানো যায় নি এ জাতির বুক থেকে। দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত সবখানেই ওঠে আসে বধ্যভূমি আর বধ্যভূমি ! সোনার বাঙলাকে সত্যিই শ্মশান করে দিয়েছে ওরা !


এই সব ভয়াল গণহত্যার হোতা ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীরাই একদিন আবার এ জাতির হর্তাকর্তারূপে আবির্ভূত হতে দেখা গেলো। এক সাগর রক্ত আর লক্ষ লক্ষ মৃত্যু আর মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া লাল সবুজের পতাকা শোভিত হয়ে অপমানের পাশাপাশি এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের দ্বারা মহান জাতীয় সংসদও কলঙ্কিত হলো। যেসব ভণ্ড প্রতারক শাসকগোষ্ঠী এই স্তম্ভিত জাতির আর্তিকে তোয়াক্কাও না করে সেই বর্বর যুদ্ধাপরাধীদেরকে পূনর্বাসন পৃষ্ঠপোষকতা করে করে আবারো বিকৃত দানবে পরিণত করার ষড়যন্ত্রে ইন্দন জুগিয়েছে, তারাও আজ সমান অপরাধী।


তাই আজ গোটা জাতির একটাই প্রত্যাশা, সব সহযোগীসহ একাত্তরের ওইসব মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদেরকে অবিলম্বে বিচারের কাঠগড়ায় তুলতে হবে। এ জাতির কপাল থেকে লজ্জাকর কলঙ্কের দাগ মুছতে হলে একটাই পথ- একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই-ই চাই ! কেননা যতক্ষণ বিচার না হবে, আগামী প্রজন্মের কাছে বিশ্বমানবতার কাছে আমরাও যে ক্ষমার অযোগ্য পশুই থেকে যাবো..! মানুষ হতে পারবো না..!

(জল্লাদখানার আরো ছবি )

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): জল্লাদখানা বধ্যভূমি ১৯৭১ ;
প্রকাশ করা হয়েছে: ইমেজ  বিভাগে । বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:২৪
গাজী মো: সাইফুল ইসলাম বলেছেন:
"আজ গোটা জাতির একটাই প্রত্যাশা, সব সহযোগীসহ একাত্তরের ওইসব মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদেরকে অবিলম্বে বিচারের কাঠগড়ায় তুলতে হবে।"

সহমত +
৩. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:৩০
রানা বলেছেন: ........এই সব ভয়াল গণহত্যার হোতা ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীরাই একদিন আবার এ জাতির হর্তাকর্তারূপে আবির্ভূত হতে দেখা গেলো। এক সাগর রক্ত আর লক্ষ লক্ষ মৃত্যু আর মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া লাল সবুজের পতাকা শোভিত হয়ে অপমানের পাশাপাশি এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের দ্বারা মহান জাতীয় সংসদও কলঙ্কিত হলো। যেসব ভণ্ড প্রতারক শাসকগোষ্ঠী এই স্তম্ভিত জাতির আর্তিকে তোয়াক্কাও না করে সেই বর্বর যুদ্ধাপরাধীদেরকে পূনর্বাসন পৃষ্ঠপোষকতা করে করে আবারো বিকৃত দানবে পরিণত করার ষড়যন্ত্রে ইন্দন জুগিয়েছে, তারাও আজ সমান অপরাধী।......
আপনার সাথে একমত.....
৪. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:৩১
এস মাহবুব বলেছেন: কখনোই দেখা হয়নি। আপনার ছবির মাধ্যমে কিছুটাও হলেও দেখা হলো।
ধন্যবাদ।
৫. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১১:০৩
নাঈম বলেছেন: কোন রাজাকার জানি মাইনাস দিসে.....
৬. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১১:০৬
ত্রিশোনকু বলেছেন: রনদীপম,

কার কাছে যাব?

১/১১ এর ঠিক আগে আগে হাসিনা যুদ্ধাপরাধী শায়েখুল হাদিসের সাথে চুক্তি করে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে তাদেরকে ফৎওয়ার অধিকার দেবে।
৭. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১১:২৫
মিলটন বলেছেন: কোন সন্দেহ নেই এবার ছুটি পেলেই যাবো। আরেকটু বিস্তারিত বলবেন ঠিক লোকেশনটা। কবে বন্ধ থাকে বা খোলার টাইমটা?
৮. ১৪ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১১:৩১
মিলটন বলেছেন: সরকারী ছুটি বা শুক্রবার কি খোলা থাকে? জানালে খুশি হবো। উত্তরের আশায় থাকলাম।
১৫ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:২৩

লেখক বলেছেন: আমি যে দুদিন সেখানে গেলাম, দুদিনই ছুটির দিন ছিল। একটা শুক্রবার, অন্যটা আশুরার দিন।
অতএব, মনে হচ্ছে প্রতিদিনই খোলা।

লোকেশান একেবারে সহজ। আপনি যদি বিজয় সরণী হয়ে মিরপুর দশ নম্বর গোলচক্কর আসেন, বাঁয়ে স্টেডিয়ামের দিকে না গিয়ে অথবা ডানে চৌদ্দ নম্বরের দিকে না গিয়ে সোজা এগার নম্বরের দিকে এগিয়ে যান। কিছুদূর হেঁটে গেলেই রাস্তার ডান পাশে মিরপুর বেনারসি পল্লীর প্রথম গেটটা আপনার চোখে পড়বে। ঢুকে যান গেট দিয়ে। ওখান থেকে সর্বোচ্চ দশ মিনিট হাঁটলেই পাকা রাস্তাটা শেষ। এবং ওখানেই জল্লাদখানাটা।
আরো সহজ উপায় হচ্ছে, মিরপুর দশ নম্বর গোলচক্কর গিয়ে ফায়ার সার্ভিস অফিস কোণা থেকে যে রিক্সাটা জল্লাদখানা যাবে তাতে উঠে পড়ুন। পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবেন। ভাড়া দশ টাকা রাখবে, যদিও দূরত্ব অনুযায়ী ওটাই বেশি মনে হবে আপনার কাছে।

৯. ২০ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ২:০৭
শিবলী বলেছেন: যেতে হবে।
আমি জানতামই না এমন একটা জায়গা বাসার কাছেই আছে!!!

ধন্যবাদ আপনাকে
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ৩:৩০

লেখক বলেছেন: অবশ্যই যাবেন ! এরকম আরো যেসব জায়গা আমাদের অগোচরে রয়ে গেছে তার খোঁজও একে অন্যকে দিয়ে সহায়তা করা উচিৎ....

১০. ০১ লা এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ১০:৩২
কালাপাহাড়ী বলেছেন: প্রিয়তে রাখলাম। ধন্যবাদ আপনাকে !
০৫ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১১:৫৫

লেখক বলেছেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

১১. ২০ শে জুন, ২০১০ দুপুর ১২:৪৯
নিস্সঙ্গ যোদ্ধা বলেছেন: অসাধারণ একটা পোষ্ট। ধন্যবাদ আপনাকে .............
১৫ ই আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১২:৫৫

লেখক বলেছেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

মোট সময় লেগেছে ১.৫৭৩০ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ