somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নির্বাসিত শফিক রেহমান, মৃত্যু পথযাত্রী বাবা, এরশাদকে হুমকি এবং কয়েক ঘন্টার জন্য দেশে আসার অনুমুতি

২৬ শে এপ্রিল, ২০১১ বিকাল ৩:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মনে পড়ে গেল আগস্ট ১৯৮৭-তে আমার একটি বিপদের ঘটনা। তখন উদ্ধার পাওয়ার জন্য আমি আবেদন করেছিলাম অবসরপ্রাপ্ত (বা শক্তিহীন) মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহর কাছে। বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদের শাসনের সময়ে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকাটি দ্বিতীয়বার নিষিদ্ধ হবার পরে আগস্ট ১৯৮৬-তে আমাকে লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে যেতে বাধ্য করা হয়।
আগস্ট ১৯৮৭-র মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা থেকে আমাকে জানানো হয় আমার পিতা সাইদুর রহমান হলি ফ্যামিলি হসপিটালে মৃত্যু শয্যায় আছেন। তার বয়স তখন ৭৮। ডাক্তার এবং আত্মীয়স্বজনরা আমাকে দ্রুত ঢাকায় আসতে বললেন।
কিন্তু আমি ঢাকা এয়ারপোর্ট পেরিয়ে হসপিটালে যাবো কী করে?

ঢাকা এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশন পুলিশ যেন আমাকে না আটকায় সেই আবেদন করতে আমি সরাসরি চলে গেলাম প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিযুক্ত বৃটেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বা হাই কমিশনার জেনারেল শফিউল্লাহর অফিসে।
বিনা নোটিশে হাজির হওয়া সত্ত্বেও ভদ্রতা দেখিয়ে মি. শফিউল্লাহ আমাকে দেখা করার সুযোগ দিলেন।
আগস্ট মাসের মিষ্টি রোদ পর্দা পেরিয়ে হাই কমিশনারের হাই সিলিংওয়ালা রুমে এসে পড়ছিল।
গভীর মনোযোগের সাথে মি. শফিউল্লাহ আমার কথা শুনতে থাকলেন।

সংক্ষেপে তাকে বললাম, আমি পিতার বড় ছেলে এবং তার মৃত্যুর আগে আমাকে ঢাকায় ফিরতেই হবে। আমার নির্বাসনের ছয় মাস পেরুনোর পরে ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭-তে আমি ঢাকায় ফেরার চেষ্টা করেছিলাম। তখন আমাকে দুই দিন এয়ারপোর্টে আটক রেখে লন্ডনে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল ইমিগ্রেশন পুলিশ। এবার যেন সেটা না হয়।

আমি যদি আমার পিতাকে মৃত্যু শয্যায় না দেখতে পাই তাহলে কী হবে? সেটাও তাকে বললাম। আমি জানালাম, বৃটিশ সরকারের দুটি সামরিক গোয়েন্দা দফতর, এমআই ফাইভ ও এমআই সিক্স (গও ৫ ও গও ৬) থেকে অফিসাররা রিটায়ার করার পর লন্ডন থেকে কিছু দূরে চেমসফোর্ডে বেসরকারিভাবে তারা বিভিন্ন সংস্থায় বিভিন্ন কাজ করেন। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে, কনসালটেন্সি, কনট্রাক্ট কিলিং বা চুক্তি মোতাবেক হত্যা, ইভস ড্রপিং বা টেলিফোন ও অন্যান্য স্থানে আড়ি পেতে শোনা, ব্ল্যাকমেইলিং, ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি ভাড়াটে সেনাবাহিনী বা মার্সেনারি ফোর্স গঠন। উপযুক্ত টাকার বিনিময়ে রিটায়ার্ড অফিসাররা এসব করেন।

সেই সময়ে প্রেসিডেন্ট এরশাদের এক শ্যালক থাকতেন লন্ডনে এবং আরেক শ্যালক থাকতেন নিউ ইয়র্কে। দুজনাই ছিলেন অধুনালুপ্ত ব্যাংক বিসিসিআইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

মি. শফিউল্লাহকে বললাম, যে পাউন্ড অথবা ডলারের বিনিময়ে ভাড়াটে বৃটিশ সামরিক অফিসারের মাধ্যমে এদের মধ্যে একজনকে গুম করা সম্ভব সেই সঙ্গতি আমার আছে। বিষয়টা প্রেসিডেন্ট সাহেবকে জানিয়ে দিন।
আমি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম বৃটেনের বহুল প্রচারিত পাক্ষিক ম্যাগাজিন প্রাইভেট আই (চৎরাধঃব ঊুব যার মানে বেসরকারি গোয়েন্দা)। মি. শফিউল্লাহর সামনে ওই ম্যাগাজিনের একটি পৃষ্ঠায় একটি বিজ্ঞাপনে কয়েকটি ফোন নাম্বার দেখিয়ে বললাম, আমি যা বলছি এটা যে করা সম্ভব সেটা এসব নাম্বারে ফোন করলেই জানতে পারবেন। সুতরাং আমি আপনার কাছে আবেদন করছি আমার ঢাকায় যাবার ব্যবস্থা করুন।

আমার এই আবেদন শোনার পর গৌরকান্তি মি. শফিউল্লাহর মুখে দুশ্চিন্তার আভাস দেখা গেল। তিনি সশব্যস্ত স্বরে বললেন, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। চা খান। আমি আসছি।
এই বলে তিনি পাশের ঘরে চলে গেলেন।
মিনিট পনেরো পরে স্মিত মুখে ফিরে এসে বললেন, হ্যা। আপনি ঢাকায় যেতে পারবেন। আপনার পিতাকে দেখতে পারবেন। তবে শর্ত হচ্ছে এই যে, আপনি আপনার বাসস্থান ইস্কাটন গার্ডেনস থেকে শুধু ওই একই রাস্তায় অবস্থিত হলি ফ্যামিলি হসপিটালে যেতে পারবেন। আর কোথাও নয়। প্রেস ক্লাবে নয়, ঢাকা ক্লাবে নয়, কোনো পাবলিক প্লেসে নয়। অর্থাৎ ঢাকায় যে আপনি আছেন, সে কথাটি যতোটা সম্ভব গোপন রাখতে হবে।

তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, আমি ঢাকায় যাবো মৃত্যুপথযাত্রী পিতাকে দেখতেÑ পত্রিকা পুনঃপ্রকাশের চেষ্টা করতে নয়। আমাকে হয়তো সারাক্ষণ হসপিটালেই থাকতে হবে। আর কোথাও যাবার প্রবৃত্তি বা সময় হবে না।
মি. শফিউল্লার কাছ থেকে গৃন সিগনাল পাওয়ার পরপরই আমি ঢাকায় যাই।
হলি ফ্যামিলি হসপিটালে পৌছে পিতাকে দেখতে পেয়েছিলাম। তবে ততক্ষণে তার বাকশক্তি প্রায় লুপ্ত হয়েছিল। তিনি হয়তো আমাকে চিনেছিলেন। হয়তো চেনেননি।

তবু সান্ত্বনা এই যে তাকে জীবিত দেখা সম্ভব হয়েছিল। দুঃখ এই যে স্বৈরাচারী শাসকের কারণে পিতার শেষ বছরগুলোতে তার পাশে আমার থাকা সম্ভব হয়নি।

পরে শুনেছিলাম সেদিন লন্ডনে হাইকমিশনে আমাকে বসিয়ে রেখে মি. শফিউল্লাহ টেলিফোনে আলোচনা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ড. মতিনের সঙ্গে। ড. মতিন ফোন করেছিলেন হলি ফ্যামিলি হসপিটাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এবং জানতে চেয়েছিলেন (তার ভাষায়) পেশেন্ট টিকবে নাকি? উত্তর যখন নেগেটিভ হয়, অর্থাৎ পেশেন্ট টিকবে না, তাতে আশ্বস্ত হয়ে ড. মতিন প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন, আমাকে দেশে সীমিত সময়ের জন্য ফেরার অনুমতি দেয়া যেতে পারে।
পিতার মৃত্যু হয় ২৮ আগস্ট ১৯৮৭-তে।

গ্রামে কুলখানিতে যাবার অনুমতি আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু তার পরপরই আমাকে লন্ডনে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। চল্লিশা পালনের সুযোগ দেননি তদানীন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মতিন এবং তদানীন্তন ডিজি, ডিএফআই মেজর জেনারেল লতিফ।

Click This Link
১৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×