সেই পরিচিত দৃশ্য, ‘নিজেদের লোক’ হওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা। স্বার্থসিদ্ধির এ প্রতিযোগিতায় কেউই পিছিয়ে থাকতে রাজি নন। বড় কর্মকর্তা থেকে ছোট কর্মচারী, কে কার আগে নবাগত মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবেনÑ সে চেষ্টায় সবাই প্রতিনিয়ত ব্যস্ত। যেন সাতটি বছর এ দিনটির জন্যই অপেক্ষায় ছিলেন তারা। প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রীদের স্বাগত জানানোর ঘনঘটা কেমন যেন নগ্ন প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। সকালে নবাগত মন্ত্রীদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য কাজকর্ম ফেলে সচিবালয়ের ড্রাইভওয়ের দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে বেশ কিছু কর্মচারী, নেতা ও তাদের অনুসারী সহকর্মীদের। সচিবালয়ের সুউচ্চ ভবনের গায়ে গায়ে ঝুলছে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সমিতির রঙিন ব্যানার। রাজনৈতিক দলের স্লোগানসংবলিত স্তুতিবাক্যে পরিপূর্ণ প্রতিটি ব্যানার। মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ে ফুলেল শুভেচ্ছায় মন্ত্রীদের সিক্ত করতে একটুও কার্পণ্য দেখা যায়নি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
নতুন সরকারের প্রথমদিনই সচিবালয়ের একশ্রেণীর অতি উৎসাহী কর্মকর্তা ও কর্মচারী-নেতাকে ভাঁড়ামির যে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে দেখা গেছে, তাতে বলা যায় আলামত বেশি ভালো নয়। অতীতের দলবাজির পুনরাবৃত্তি ঘটানোর জন্য তারা যেন আদা-জল খেয়ে নেমেছেন। ওই ধরনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর আচরণে তোষামোদের বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা গেলেও প্রথম কর্মদিবসে মন্ত্রীরা ছিলেন একেবারেই ইনফরমাল। কর্মচারীদের মধ্যে অভূতপূর্ব আগ্রহ-উৎসাহের বিপরীতে তারা প্রত্যেকে ছিলেন নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত মনোযোগী।
নতুন মন্ত্রিসভার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই নতুন মুখ। মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই তাদের। অবশ্য তারা প্রত্যেকেই জানেন, শুরুতেই মোসাহেবদের সম্পর্কে সতর্ক এবং মতলববাজদের বিরুদ্ধে কঠোর না হলে পরিণতি ভালো হবে না। অতীতে চামচা-চাটুকারদের অশুভ তৎপরতার সুবাদে একজন মন্ত্রী বা ক্ষমতাসীন দলের এমপি নিজের অজান্তেই অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার পথে পা বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। চাটুকার-মোসাহেবরা মন্ত্রীদের মাধ্যমে দুর্নীতির প্রসার ঘটিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছেন। তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মন্ত্রী-এমপিদের সরলতা, অনভিজ্ঞতা ও দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহারে তাদের উৎসাহিত করেছেন। স্বার্থ হাসিলের জন্য দল ও সরকারকে বিপন্ন করতে একটুও কুণ্ঠাবোধ করেননি তারা।
এবারের নির্বাচনে দেশবাসী পরিবর্তনের সপক্ষে অকুণ্ঠ রায় দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় পাঠিয়েছেন। দেশবাসীর ভাগ্য উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফের যাত্রা শুরু করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। এ পর্যায়ে সরকার ও দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে পরিপূর্ণ সাফল্য নির্ভর করছে প্রজাতন্ত্রের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা ও সমর্থনের ওপর। সরকারি কর্মচারী হিসেবে সরকারকে সহযোগিতা করা তাদের আবশ্যিক দায়িত্ব। তবে এ দায়িত্ব পালনের নামে কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী যেন চাটুকার-মোসাহেবের পর্যায়ে নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগ না পান সে বিষয়টির প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখা দরকার। জনগণ আশা করেÑ নতুন সরকারের মন্ত্রীরা কোন অবস্থাতেই অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেবেন না। অতীত ও বর্তমান মন্ত্রী-এমপি-সরকারি দলের নেতাদের মধ্যে আচার-আচরণে, কাজকর্মে, চিন্তা-চেতনায় সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকতেই হবে। তোষামোদকারীদের কাছ থেকে নিজেদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। মতলববাজরা অতীতের মতো এখনও নানাভাবে সরকারের মন্ত্রীদের কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিতে চাইবেন। ঘনিষ্ঠদের প্রভাবিত করে কেউ যেন ফায়দা লুটতে না পারে সে বিষয়ে মন্ত্রিসভার সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য পর্যন্ত প্রত্যেককে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। যারা ভোল পাল্টে ‘অতি আওয়ামী লীগ’ সেজে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের কাছ থেকে দয়া-দাক্ষিণ্য ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, এখনই তাদের রুখতে হবে। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী জোট সরকার ও নতুন মহাজোট সরকারের মধ্যে গুণগত পরিবর্তন দেখতে চান দেশবাসী। অতএব ‘সাধু, চাটুকার হইতে সাবধান!’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


